-
আড়ালের ছায়া (ক্রাইম থ্রিলার)
“নয়”
তদন্ত টীম রাফিকে নিয়ে থানায় ফিরে এলো। তাকে দেখেই শিরিনের চোখ-মুখ গেল শুকিয়ে। উল্টোদিকে রাফির চোখে তখন আগুন। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যাওয়াটা নজর এড়ালো না শামিম সাহেবের। তাকে নিয়ে তিনি আলাদা একটা ঘরে ঢুকলেন।“আপনি বলছেন, লিনাকে আপনি খুন করছেন। তা মোটিভ কি?” সামনে রাখা একটা চেয়ারে বসতে বললেন রাফিকে। নিজেও আর একটা চেয়ার টেনে মুখোমুখি বসলেন।
“না। আমি আসলে বলতে চাইছি। খুনটা আমি সরাসরি করিনি। কিন্তু, আমার কারণেই আজ লিনাকে প্রাণ দিতে হলো।” রাফির দৃষ্টি আনত।
“ফাজলামো করেন মিয়া?” ইন্সপেক্টর সাহেব রেগে গিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। “এখানে কি লুকোচুরি খেলা চলছে?” হাতটা আবার মাথায় চলে যাচ্ছিল। পরমুহুর্তে ওটাকে থামালেন। ধপ্ করে বসে পড়ে মাথাটা সামনের দিকে ঠেলে দিলেন। রাফির মুখের সামনে এসে ওর চোখের দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন। তারপর আবার পিছিয়ে এসে শরীরটা চেয়ারের ব্যাকরেস্টে এলিয়ে দিয়ে বললেন, “ঘটনাটা কি? এখানে আপনার ভূমিকাটা পুরো খুলে বলেন দেখি।”
এবার রাফিকে কিছুটা সুস্থির মনে হলো। “আমি মাঝে মাঝে পড়তে পড়তে মাথা ধরে এলে ছাদে যেতাম। একদিন সন্ধ্যেয় ছাদে যেয়ে দেখি দুজন মানুষ একজন আরেকজনকে জড়াজড়ি করে আছে। আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। তড়িৎ কোন শব্দ না করে নিচে নেমে এলাম। তারপর আমার ফ্লাটের দরোজার সামনে এমন ভাব করে দাঁড়িয়ে থাকলাম, যেন আমি তালা খুলতে যাচ্ছি।”
“তারপর?”
“বেশ কিছুক্ষণ পর মাথায় ওড়না চাপানো একটা মেয়ে উপর থেকে সিড়ি বেয়ে নিচে নেমে যায়। মেয়েটা শিরিন। আমাদের বাড়িওয়ালার কাজের মেয়ে। তারপরও আমার একটু সন্দেহ হয়। ভাবলাম, সে হয়তো তিনতলা থেকে আসছে। আমি অপেক্ষা করি, পুরুষ মানুষটা কে নামে, তা দেখার জন্য।” একটা জোরে শ্বাস নেয় রাফি। “দেখি যে মানুষটা নামছে, সে আর কেউ নয়। আমার ফ্লাটের উল্টোদিকের সোহেল ভাই। রোকসানা ভাবীর বর। উনার মুখ থেকে সিগারেটের কড়া গন্ধ আসছে। উনি আমাকে দেখে, ‘একটা বিড়ি টেনে এলাম’, বলে হেসে দিলেন। আমিও স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলাম, ’ও আচ্ছা’। বাসায় থাকলে উনি প্রায়ই ছাদে যেয়ে সিগারেট টানেন, এটা আমার জানা ছিল।” একটু থামলো রাফি।
শামিম সাহেবের উত্তেজনা তুঙ্গে। “তারপর কি হলো?”
সোহেল ভাই বাসায় ঢুকে যেতেই, আমি আবারো দৌড়ে ছাদে গেলাম। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলাম না। বুঝে গেলাম, মেয়েটা শিরিনই ছিল।
“কিন্তু, এর সাথে লিনা কিভাবে জড়ালো?” ইন্সপেক্টর মাথা নাড়িয়ে জানতে চাইলেন।
“তারপর দিনই সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে লিনার সাথে দেখা। ওকে আমি পছন্দ করতাম। কিন্ত, কখনো সাহস করে বলতে পারিনি। সত্যি বলতে কি, ওর সাথে আমার কখনো কোন কথাই হয়নি। স্রেফ দেখা হলে চোখাচোখি, এই পর্যন্ত। ভাবলাম ওর সাথে কথা বলার এটাই সুযোগ। তাছাড়া শিরিন মাঝেমাঝে ওদের টুকটাক কাজ করে দিত, সেটা আমি দেখেছি। তাই বিন্দুমাত্র ভনিতা না করে, সোহেল ভাই-শিরিনের ব্যপারটা ওকে বলে দিলাম। ও খুব অবাক হলো। বললো, ‘প্রমাণ ছাড়া কিছু বলা ঠিক হবে না’। ওর নাম্বার দিল, বললো আবার তেমন কিছু দেখলে আমি যেন ওকে জানাই।”
“হুম্ম, লিনার নাম্বার আপনার কাছে কিভাবে এলো বুঝতে পারছি।” শামিম সাহেব ভ্রু উঁচু করে বললেন। “কিন্তু, এটা লিনার খুন পর্যন্ত গেল কিভাবে?”
“একদিন সন্ধ্যায় আমার ফ্লাটে ঢুকতে যাবো। এমনি সময় রোকসানা ভাবী বেরিয়ে এলেন। আমাকে দেখে বললেন, ’বাবার বাড়ি যাচ্ছি। কদিন থাকবো। মা’র শরীরটা ভালো না’। ভাবী দরজা লক করে নেমে যেতেই আমার মাথা খুলে গেল। তড়িৎ আমার ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে আই হোলে চোখ রেখে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পরেই দেখি সোহেল ভাই বাসায় ঢুকলেন। তার মিনিট খানেক পরেই শিরিন এলো উপর থেকে। উল্টোদিকের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে এদিক-সেদিক তাকালো। তারপর দরজাটা খুলতেই টুক করে ভেতরে ঢুকে গেল। পুরো ব্যপারটা বুঝে আমার মাথা ঘুরতে লাগলো। আমি দ্রুত লিনাকে ফোন দিলাম। সে তখনও বাসায় ফিরেনি। বললো আমাকে চোখে চোখে রাখতে। ফিরেই ব্যবস্থা নেবে।”
শামিম সাহেবের চোখ-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। “বলে যান, তারপর কি হলো“
“ঘন্টা খানেক পর উল্টোদিকের দরোজা খুলে গেল। সোহেল ভাই বেরিয়ে আশপাশ তাকালো। তারপর উনার পেছন থেকে শিরিনকে বেরিয়ে নিচে চলে যেতে দেখলাম। ততক্ষণে সোহেল ভাই আবার দরোজা লাগিয়ে দিয়েছে। তখনও আমি জানতাম না, নিচে লিনা সিড়ি বেয়ে উপরে উঠছে। ফলে শিরিন লিনার মুখোমুখি পরে গেল। “
“পুরো ব্যপারটাই এবার বুঝলাম। কিন্ত, এর জন্য আপনি নিজেকে খুনী ভাবছেন কেন?”
“স্যার আমি যদি লিনাকে এই ব্যপারটা না বলতাম, তাহলে আজ তাকে মরতে হতো না।” একটা বড় করে দীর্ঘশ্বাস নিল রাফি। তার চোখ-মুখ আবারো আর্ত হয়ে উঠেছে। “ওর মৃত্যুর জন্য আমিই দায়ী।”
হেসে দিলেন শামিম সাহেব। তার বুকটা অনেক হালকা হয়ে গেল। বুঝতে পারলেন, টিন-এজ আবেগের বশে ছেলেটা প্রেমিকার খুনের জন্য নিজেকে দোষী ভাবছে। রাফি খুনী নয়, এটা বুঝতে পেরে তিনি খুব স্বস্থি বোধ করলেন।
এমনি সময় কনষ্টেবল এসে জানালো, মুদি দোকানের মোবাইল থেকে নেওয়া নাম্বারটার হদিস পাওয়া গেছে। ওটা সোহেল আহম্মেদ নামে রেজিষ্টার্ড করা। “ওকে বয়। ইউ আর ফ্রী নাও। বাট মাইন্ড ইট, ইউ আর আওয়ার মেইন উইটনেস। সো নেভার লিভ দা টাউন উইদাওট মাই পারমিশন। ওকে?” রাফির উদ্দেশ্যে শেষ কথা ক’টি বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
সোহেল ভাইকে থানায় ডাকা হলো। সঙ্গে তার স্ত্রীও আছেন।
পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “আপনি শিরিনকে চিনেন?”
সোহেল চমকে গেল। বলল, “মানে… ওকে দেখেছি, আমাদের সামনের ফ্লাটে মাঝে মাঝে আসত।”
“আপনার সঙ্গে ওর কোনো সম্পর্ক ছিল?”
সোহেল এবার চুপ। ঘামতে লাগল। তার স্ত্রী তেড়ে উঠলেন, “কি বলছে ওরা? সম্পর্ক মানে?”
ইন্সপেক্টর এবার সব কিছু খুলে বললেন।
রোকসানা ভাবী চেঁচিয়ে উঠলেন, “ও, এ জন্যই বুঝি তোমার সিগারেট খাবার ব্যামো উঠলেই ছাদে চলে যেতে। অথচ এদ্দিন ভাবছি, আমি সিগারেটের গন্ধ সহ্য করতে পারিনা বলে তুমি ঘর থেকে বাইরে যেতে।” তিনি দু’হাতে মাথা চাপড়াতে লাগলেন।
সোহেল এবার আর চুপ থাকতে পারল না। সে মাথা নিচু করে বলল, “আমি ভুল করছি স্যার। আসলে আমাদের বাচ্চা হয়না। তাই শিরিনরে ফুঁসলাইছিলাম, যদি ও কনসিভ করে, তাহলে ওকে আমি বিয়ে করব।
কিন্তু ও ভয় পাইছিল। বলছিল, ‘মেয়েটা (লিনা) ওকে দেখে ফেলেছে’। আমি বলছিলাম কিছু হবে না। কিন্তু ও মানছিল না। তাই ওর ভায়েরে লাগাইছিল মেয়েটারে ব্ল্যাকমেইলিং করতে। কিন্তু, লিনা ভয় পায় নাই। ”“তাহলে খুনের সময় আপনি ছিলেন কোথায়?”
সোহেল মুখ তুলল না। চোখে জল। “শিরিন যখন লিনাকে ভয় দেখাইতেছিল, আমি তখন বাইরের ঘরেই ছিলাম। ওইদিন আমি অফিসে যাই নাই। লিনা খুন হবার একটু আগেই বাসা থেকে বের হই সিগারেট খেতে। ছাদে যাবার পথে শিরিনের সাথে দেখা হয়। বলে, সে লিনার ছবিগুলো পাইছে। এখন যাইতাছে ওরে ভয় দেখাইতে। আমিও ওর পিছু নিলাম। লিনা দরোজা খুলতেই কিছু বুঝে উঠার আগেই শিরিন ঘরে ঢুকে গেল।”
“আপনি সঙ্গে গেলেন?”
“আমি প্রথম বাইরেই দাঁড়ায়া ছিলাম। পরে কেউ দেখে ফেলবে এই ভয়ে ভেতরে ঢুকে গেলাম। শুনলাম শিরিন আর লিনা কথা কাটাকাটি করছে। পরমুহুর্তে একটা ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে লিনার রুমে ঢুকে দেখি শিরিন পেছন থেকে লিনাকে জাপটে ধরে এক হাতে মুখ চেপে আছে। আমায় দেখেই বললো, ’হারামজাদির গলাটা চাইপ্পা ধরো, চিল্লাইলে তুমি-আমি দু’জনেই শেষ’।”
তখনি লিনার মুখ থেকে হাত সরে যায় শিরিনের। সেই সুযোগে সে চেঁচিয়ে উঠে, ‘আমি তোদের মুখোশ খুলে দিব’।”
“আমার তখন কি যে হয়। লাফিয়ে ওর সামনে চলে যাই। সর্বশক্তি দিয়ে ওর গলাটা চেপে ধরি। ও শ্বাস নেবার জন্য হাশপাশ করে উঠলো। কিন্তু, শিরিন ওকে পেছন থেকে জাপটে ধরায় সুবিধা করতে পারলো না। কতক্ষণ পর দেখি ওর চোখ উল্টে গেছে। আমি ভয় পেয়ে গলা ছেড়ে দেই। তখন বুঝিনি ও মরে গেছে। বিশ্বাস করেন স্যার, আমি তাকে মারতে চাইনি। শুধু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম।”
উপস্থিত সবাই চুপ। সোহেলের কথা শুনে সবাই শ্বাস ফেলতেও ভুলে গেছে। রোকসানা ভাবী ফুপিয়ে উঠলেন, “এই জন্যই আমি বাবার বাড়ি গেলে তুমি যেতে চাওনা। এই ছিল তবে তোমার মনে। শয়তান, ধোঁকাবাজ, খুনী, আমি তোর ফাঁসি চাই।”
শিরিনকে আবার জেরা করা হয়। পুলিশ জিজ্ঞেস করে, “তুমি খুন করেছ?” শিরিন মাথা নাড়ায় না। চোখে জল।
সে শুধু বলে, “আমি জানতাম না, ও মারা যাবে। আমি চেয়েছিলাম ভয় দেখাতে। ও আমার জীবনটা ধ্বংস করে ফেলত।”
“তুমি কিন্তু একবারো বলনি, খুন তুমি করেছো। এখন কিন্তু, প্রমাণ হলো, এই খুনে তুমিও জড়িত।”
“আমি জানি স্যার, আমি দোষী। কিন্তু বিশ্বাস করেন। আমি চাইনি ও মরে যাক।”
সোহেল ও শিরিন দুজনেই গ্রেপ্তার হয়। তাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও হত্যা মামলার চার্জশিট হয়। তদন্ত শেষে আদালত জানায়। শিরিন-লিনার গোপন প্রণয় প্রকাশ পাওয়ার ভয়ে করা এটা পরিকল্পিত হত্যা, যাতে
শিরিন ও সোহেল দু’জনেই সমান অপরাধী। সকল সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিচারের রায়ে তাদের ফাঁসির আদেশ হয়।লিনার মা সায়মা রহমান বারান্দায় বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার মনে হলো আকাশ থেকে একটা তারা ঝরে গেল। তারপরেও আকাশটা আগের মতই ঝলমলে রইলো। একটা তারা নেই হয়ে যাবার পরেও আকাশের সৌন্দর্য এতটুকু ম্লান হয়নি। জল চলে এলো তার চোখে।
চেহারায় একটা বোবা যন্ত্রণা। তার বুকের ভেতর কেবল একটাই জিজ্ঞাসাঃ “আমার মেয়েটা শুধু একটা মিথ্যে সম্পর্কের আড়াল সরিয়ে সত্যটা প্রকাশ করতে চেয়েছিল। এজন্য কেন তাকে মরতে হবে? তবে তো প্রমাণ হলো, সত্যের চেয়ে মিথ্যাই শক্তিশালী।
(শেষ)8 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
জুলহাজ আলী জীবন
@julhaj
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
পিপীলিকা
@abujubair
কাশফিয়া নাহিয়ান
@kashfianahian
জিসান মাহমুদুল হাসান
@mxesun
Md fujal Hossen
@mdfujalhossen
shewly khatun
@shewlykhatun
আরাফাত আল মেহেদী
@arafat76
Hossain Muhammad Anwar
@hossainmuhammadanwar



আড়ালের ছায়ায় সত্যের মৃত্যু…..🖤