Profile Photo

তাহমিনা মোরশেদOffline

  • RBTM796923t
  • Profile picture of তাহমিনা মোরশেদ

    তাহমিনা মোরশেদ

    3 months, 3 weeks ago

    বৃষ্টি থামতে থামতে সন্ধ্যা যেনো নেমে এসেছে শহরের ওপর।

    ক্যাফের কাঁচে জমে থাকা পানির রেখাগুলো ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। বাইরে রাস্তার বাতিগুলো জ্বলে উঠেছে, ভেজা রাস্তায় তাদের আলো ঝাপসা হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

    নন্দিনী ব্যাগটা কাঁধে তুলে দাঁড়ালো।
    “আমার যেতে হবে।”

    আরিয়ান মাথা নাড়লো।
    “আমারও একটা মিটিং আছে।”

    কথাটা খুব সাধারণ ছিল। অথচ দু’জনের কারোরই ইচ্ছে হচ্ছিল না এই মুহূর্তটা শেষ হোক।

    কয়েক সেকেন্ড তারা শুধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন কেউই ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না— এখন কী বলা উচিত।

    শেষমেশ নন্দিনী হালকা গলায় বললো,
    “আজকের জন্য… ধন্যবাদ।”

    আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে হাসলো।
    “কফির জন্য?”

    “না,” নন্দিনী ধীরে বললো, “আজ প্রথমবার সত্যি কথা বলার জন্য।”

    কথাটা শুনে আরিয়ানের চোখে অদ্ভুত এক নরম আলোর ঝিলিক ফুটে উঠলো।

    দু’জনে একসাথে ক্যাফের বাইরে বের হলো।

    বৃষ্টি পুরোপুরি থামেনি। হালকা ফোঁটা এখনো পড়ছে। বাতাসে কফি আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে।

    রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে নন্দিনী তার ড্রাইভারকে ইশারা করলো।
    আরিয়ান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
    “আমি ড্রপ করে দিতে পারি।”

    নন্দিনী এক মুহূর্ত চুপ করে থাকলো।

    আগে হলে হয়তো সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যেত।
    অথবা রাগ করে না বলে দিত।

    কিন্তু এখন সবকিছু বদলে গেছে।
    তাদের সম্পর্কটাও যেন নতুন করে হয়তো গোছাতে শিখছে।

    সে আস্তে মাথা নাড়লো।
    “না। আজ আলাদা আলাদাই যাই।”

    আরিয়ান উত্তর দিল না। শুধু বুঝে যাওয়ার মতো করে তাকিয়ে রইলো।

    কিছু সম্পর্ককে আবার শুরু করতে হলে মাঝখানে একটু দূরত্ব দরকার হয়।

    একটা গাড়ি এসে থামলো নন্দিনীর সামনে।

    দরজা খুলে ভেতরে ওঠার আগে সে হঠাৎ ফিরে তাকালো।
    “আরিয়ান?”

    “হুম?”

    “নিজেকে এতটা একা বানিয়ে নিও না যেখানে আর কেউ কখনো মনে মনে শত শত অভিমান জমা করে রাখে- নিজেকে একা ভাবা বন্ধ করো।”

    বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল আরিয়ানের কাঁধে।
    সে খুব ধীরে হাসলো।
    “চেষ্টা করবো।”

    গাড়িটা চলে গেল।

    আরিয়ান রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো গাড়িটার পেছনের লাল আলো মিলিয়ে যাওয়া পর্যন্ত।

    তারপর নিজের গাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলো।

    অফিসে পৌঁছাতেই আবার সেই পরিচিত ব্যস্ততা তাকে ঘিরে ধরলো।

    ফাইলের একগাদা স্তুপ আর তার বাবার পছন্দের টাইপ রাইটার। এতো আধুনিক জীবনে এইটার কেনো প্রয়োজন সেটা আজো বুঝতে পারে নি। তবে এখন হয়তো বুঝতে পারছে কিছু স্বভাবের কোনো দ্বিপান্তর (শব্দটা আসলে ব্যবহার করলাম অভ্যাসগত কিছু জিনিসের প্রতি ভালোবাসা বোঝাতে) হয় না।

    সব আগের মতোই।

    কিন্তু আজ আরিয়ানের ভেতরে কিছু একটা আলাদা লাগছে।

    তার সহকর্মী রাহাত বললো,
    “স্যার, আপনি ঠিক আছেন? আজকে unusually শান্ত লাগছে।”

    আরিয়ান তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বললো,
    “হয়তো অনেকদিন পর নিজের মনের সাথে একটু কম যুদ্ধ করছি।”

    রাহাত কিছু না বুঝেই মাথা নাড়লো।

    “মিটিং কখন? আমার একটা কাজ আছে।যতো তাড়াতাড়ি পারো শুরু করো।”

    “এইতো যাচ্ছি, স্যার। এখনি চেক করছি।” রাহাত বের হয়ে যায়।

    সবকিছুর মাঝেও হঠাৎ হঠাৎ নন্দিনীর হাসিটা মনে পড়ছিল তার। এতো অভিমান জমা রেখেছিলো সে।

    অন্যদিকে নন্দিনীও নিজের অফিসে ফিরে এসেছে।

    ডেস্কের ওপর ফাইল ছড়ানো।

    “মি. সেন” আবার অফিসের ফোনে কল করলেন।

    এবার সে রিসিভ করলো।

    “নন্দিনী, আগামী সপ্তাহের ক্যাম্পেইনের ফাইনাল ডিজাইন আজ রাতেই লাগবে।”

    “আমি কাজ করছি, স্যার।”

    কল কেটে দিয়ে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলো।

    তারপর কম্পিউটার অন করলো।

    স্ক্রিনের আলো মুখে পড়তেই হঠাৎ তার চোখে পড়লো ডেস্কের কোণে রাখা পুরোনো একটা কফি কাপ। কালো মার্কার দিয়ে কেউ একদিন লিখেছিল—

    “You overthink too much.”

    আরিয়ানের হাতের লেখা।

    নন্দিনীর ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।

    সে বুঝতে পারলো—
    সব অভিমান এখনো যায়নি।

    কিন্তু আজ অনেকদিন পর, সেই অভিমানের পাশে একটু শান্তিও জায়গা করে নিয়েছে।

    বাইরে আবার হালকা বৃষ্টি পড়া শুরু হলো।

    আর শহরের দুই প্রান্তে বসে—
    দু’জন মানুষ নিজের নিজের কাজে ডুবে গেলেও,
    মনের ভেতর ঠিকই একজন আরেকজনের জন্য একটু জায়গা রেখে দিল।

    3
    4 Comments
    • “বৃষ্টির ফোঁটা এসে পড়ছিল আরিয়ানের কাঁধে “__এ ধরনের বর্ণনাগুলো আমার ভালো লাগে। আপনার বর্ণনাগুলো সুন্দর। প্রকৃতি সঙ্গে দুজন মানুষ :নারী ও পুরুষ য্যানো মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। সুন্দর লিখেছেন। ভালো লাগলো। শুভকামনা, আপনার জন্য।

    • বৃষ্টির দিনে এক কাপ গরম কফির মতোই মায়াময় আর আরামদায়ক এক লেখনী। শুভকামনা রইল!

হ্যাঁ বা না শব্দ দুটি সবচেয়ে পুরনো এবং ছোট। কিন্তু এ কথা দুটো বলতেই সবচেয়ে বেশি ভাবতে হয়।

পীথাগোরাস

Skip to toolbar