Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    1 week, 6 days ago

    আন্দিজের সেই বিকেলে

    আর্জেন্টিনা যাওয়ার সুযোগটা হুট করেই চলে এলো। হিমালয় দেখার তীব্র ইচ্ছে ছিল অনেকদিনের, কিন্তু বন্ধু সেজানের দাওয়াত সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিল। সেজানের স্পষ্ট কথা—”বিমান ভাড়া তোর, বাকি সব খরচ আমার।” এমন লোভনীয় প্রস্তাব হাতছাড়া করা যায় না। রাজি হয়ে গেলাম।

    সেজান আমাকে প্রথম নিয়ে গেল দক্ষিণ প্যাটাগোনিয়ার ‘সেরো চালতেন’ বা মাউন্ট ফিটজ রয় দেখতে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩,৪০৫ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই পর্বতটি আর্জেন্টিনা ও চিলির সীমান্তে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। পাহাড়ের পাদদেশের ছোট্ট সুন্দর শহর ‘এল চালতেন’-কে বলা হয় আর্জেন্টিনার ট্রেকিং রাজধানী। আঁকাবাঁকা পিচঢালা রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি ছুটে চলছিল।

    হঠাৎ করেই চোখের সামনে ভেসে উঠল মাউন্ট ফিটজ রয়-এর সেই অবিশ্বাস্য রূপ। আকাশচুম্বী খাড়া গ্রানাইটের দেয়ালগুলো যেন সরাসরি পাতাল থেকে উঠে আকাশকে ছুঁয়ে দিয়েছে। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমে আছে হাজার বছরের প্রাচীন ধবধবে সাদা হিমবাহ। সেই বরফগলা জল নিচে তৈরি করেছে পান্না সবুজ রঙের এক শান্ত হ্রদ। ওপরের নীল আকাশ আর মেঘের ভেলা সেই হ্রদের স্বচ্ছ আয়নায় প্রতিফলিত হচ্ছে। খাড়া পাথুরে চূড়ার চারপাশ ঘিরে আলতো করে জড়িয়ে আছে সাদা মেঘের কুয়াশা। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো এক অদৃশ্য যজ্ঞ থেকে শান্ত ধোঁয়া অবিরত উঠছে। স্থানীয় তেহুয়েলচে আদিবাসীরা তাই একে বলতেন ‘ধূমপায়ী পর্বত’।

    বিশাল এই সৃষ্টির সামনে দাঁড়িয়ে আমার শরীর শিউরে উঠল। মানুষের তৈরি কোনো রাজপ্রাসাদ বা শিল্পকর্ম যে এই প্রাকৃতিক কারুকার্যের কাছে কতটা নগণ্য, তা মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম। এত নিখুঁত জ্যামিতিক খাড়া পাহাড়, রঙের এমন মায়াবী খেলা কীভাবে সম্ভব! মন স্রষ্টার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা ও বিস্ময়ে নুয়ে পড়ল। পবিত্র কোরআনের সূরা আন-নাবার সেই আয়াতের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে পাহাড়কে পৃথিবীর খুঁটি বলা হয়েছে। প্রায় ২৫০ মিলিয়ন বছর আগে নাজকা আর দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষে জন্ম নেওয়া এই আন্দিজ পর্বতমালা যেন এক জীবন্ত অলৌকিকতা।

    আমার ভেতরটা এক অবর্ণনীয় প্রশান্তিতে ভরে গেল। মহান আল্লাহর এই অপার রূপের সামনে নিজেকে বড্ড ক্ষুদ্র মনে হলো। অহংকার ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না, পরম স্রষ্টার এই অসীম মহিমার কাছে মাথা নত করে সেখানেই দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করে নিলাম।

    নামাজ শেষ করে মোনাজাত শেষে দু-পা বাড়াতেই আমার চোখ গেল একটু দূরে। একটি মেয়ে দুই হাত জোড় করে কপালে ঠেকালো, তারপর পরম ভক্তিতে মাটিতে কপাল ছোঁয়ালো। প্রকৃতির এই পরম রূপের সামনে সেও যেন নিজের ক্ষুদ্রতা স্বীকার করে সমর্পণ করছে।

    মেয়েটি উঠে দাঁড়িয়ে সোজা আমার দিকে এগিয়ে এলো। তার চোখে এক অদ্ভুত দ্বিধা আর কৌতূহল—আমি তার এই আচরণে কী প্রতিক্রিয়া দেখাই, তা দেখার জন্য। সে নম্রভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “আমার নাম উইনি।”

    আমি হাসিমুখে তার সাথে হ্যান্ডশেক করলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে বিকেলের মিষ্টি রোদ মাউন্ট ফিটজ রয়ের খাড়া গ্রানাইট চূড়াগুলোকে এক নাটকীয় সোনালি আর গোলাপি রঙে রাঙিয়ে তুলল। আলোর সেই মায়াবী স্বর্গীয় খেলা দেখে আমি যখন স্তব্ধ, তখনই উইনি হুট করে কেঁদে ফেলল।

    কোনো কথা নেই, কোনো ভূমিকা নেই, মেয়েটি অঝোরে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে সে পাথুরে মাটিতে বসে পড়ল, কিন্তু আমার হাতটি তখনও শক্ত করে ধরে রেখেছে। তার এই কান্নায় কোনো সাংসারিক দুঃখ ছিল না, ছিল এই অতিপ্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিশালতার সামনে এক মানুষের আত্মিক আত্মসমর্পণের আকুলতা।

    আমি আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। উইনির হাতটা আলতো করে ধরে আমিও তার পাশে ধূসর পাথরের ওপর বসে পড়লাম। চারপাশে দাঁড়িয়ে আছে কোটি বছরের প্রাচীন আন্দিজ পর্বতমালা, আর তার বুকে বসে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুই সংস্কৃতির দুটি মানুষ নীরবতার এক অদ্ভুত আধ্যাত্মিক ভাষায় একে অপরের সাথে মিশে গেল।

    4
    2 Comments
Skip to toolbar