-
মতিনের মতিগতি
by: © আশফাকুল আউয়াল হিমুমতিন সাহেব খবর শুনছেন। তার ডায়রিয়া হয়েছে। কাজের ছেলে কাদের পলাতক। সম্ভবত সেই ফ্রিজ চুরি করেছে। তবে এত বড় ফ্রিজ সে কিভাবে চুরি করলো তা এক রহস্য । এমন সময় কলিংবেল বেজে ওঠে। তিনি দরজা খুলে দেখেন হলুদ পাঞ্জাবি পরা এক ছেলে দাড়িয়ে আছে। পায়ে জুতা নাই,ধান্দাবাজ না তো ? আজকাল দেশে ধান্দাবাজের অভাব নাই । মতিন সাহেব বললেন” কাকে খুঁজছেন ?” হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা বলল “এটা কি রুপাদের বাসা ?” মতিন সাহেব ভ্রু কুচকালেন। বদের বাচ্চা কার খোঁজ চায় ? মতিন সাহেবের একমাত্র মেয়ে এখন স্বামীর সাথে কানাডায় এবং তাদের কারো নামই রুপা না । তিনি কি বলবেন বুঝতে পারছেন না । এদের সাথে ভয়ঙ্কর অস্ত্র থাকতে পারে। ছোটখাটো চুরি ডাকাতি থেকে শুরু করে এরা ঠাণ্ডা মাথায় মানুষ খুন করতে পারে। তিনি হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলেন। কিছুক্ষণ পরেই মতিন সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল। এতো কঠিন না হলেও চলত।
মতিন সাহেবের পিপাসা পেয়েছে। ঠাণ্ডা পানি খেতে পারলে ভাল হত। ফ্রিজ যেখানে থাকার কথা সেখানে গিয়েই তার মনে পড়লো ফ্রিজতো চুরি হয়ে গেছে। বাসায় কেউ নাই। আসলে তিনি ও কাজের ছেলে ছাড়া কেউই বাসায় থাকেনা কারণ তার স্ত্রী মারা গিয়েছে । দুপুর ২টা বাজে। এসময় তিনি সামান্য কিছু খান। সমস্যা হচ্ছে তিনি রান্না ভাল পারেন না। কাজের ছেলেও পলাতক। তিনি এখন খাদ্যের খোঁজে বের হবেন। “In search of God” এর মতো “In search of Food” ।
মতিন সাহেব নিচে গিয়ে দেখেন হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা দাড়িয়ে আছে। মতিন সাহেবের ভয় করতে লাগলো। সে কি তার ওপর নজরদারি রাখছে? তিনি ঝেড়ে দৌড় দেবেন কি না বুঝতে পারছেন না। হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা তার দিকে আসতে লাগলো। তার হাত পেছন দিকে গোটানো। সম্বভত কোন অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে। মতিন সাহেব উল্টোদিকে দৌড় দিলেন। মেইন রোডের কাছে গিয়ে একবার পেছনে তাকালেন। হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা হা হা করে হাসছে। খুবই সাধারণ হাসি। কিন্তুু মতিন সাহেবের কাছে সেটাই খুব ভয়ংকর বলে মনে হলো। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে মতিন সাহেব দুটো হোটেল। খুঁজে পেলেন। দুটোই পাশাপাশি অবস্থিত। একটায় মানুষ বেশি আরেকটায় খুব কম। তিনি কম হোটেলটাতেই গেলেন। তিনি দুপুরের খাবারের মেনু দেখছেন,তবে তাতে অনেক বানান ভুল রয়েছে। যেমনঃ উপরে হোটেল বানান লেখা হয়েছে “হোঢেল”। হোটেলের নাম তিনি এতক্ষণ খেয়াল করেন নি। লেখা রয়েছে “গুগল হোটেল”। অদ্ভুত নাম। তবে এখন অদ্ভুত নামের যুগ। তার বড় নাতনির নাম রাখা হয়েছে “নৃ”। নামকরণের সময় তিনি কাছে ছিলেন না। নাহলে অবশ্যই তিনি অন্য নাম রাখতেন। তিনি ভাতের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছেন। এমন সময় একজন এসে বলল বসতে পারি? বলেই অপেক্ষা করলো না।। সাথে সাথে তার সামনে বসে পড়লো। মতিন সাহেবের ইচ্ছে হলো লোকটার গায়ে সামনে থাকা গ্লাসের পানি ফেলে দিতে। পারলেন না। কারণ সমাজে বাস করার জন্য আমাদের নিয়ম মেনে চলতে হয়। তাছাড়া এটা তার একার হোটেল না। এখানে যে কেউ বসতে পারে। সমাজের সব নিয়ম সবসময় মানা যায়না। মতিন সাহেবের মনে হচ্ছে তার সামনে বসা ব্যাক্তি দীর্ঘসময় ধরে কথা বলার জন্য এখানে এসেছে। সে বলল”ভাই,একটা হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা ছেলে আশেপাশে দেখেছেন? মতিন সাহেব মনে মনে ভয়ানক চমকালেও বাহিরে তা প্রকাশ করলেন না। হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা নিশ্চয়ই সন্ত্রাসী এবং তার সামনে যে বসে আছে সে নিশ্চয়ই সাদা পোশাকের পুলিশ। মতিন সাহেব ঘামতে লাগলেন। তার ভয় লাগছে। রিমান্ডে নেবে না তো? রিমান্ড নিয়ে তার একটি তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। একবার তিনি শখের বশে ফেসবুক খুলেছিলেন। সেখানে তিনি “জঙ্গল বাঁচাও” এর বদলে “জঙ্গি বাঁচাও” লিখেছিলেন। এরপর থানা,পুলিশ,এই মন্ত্রীর পায়ে ধরা ওই মন্ত্রীর পায়ে ধরা ইত্যাদি অনেক হাঙ্গামা করে পার পেয়েছিলেন। তিনি বললেন “হ্যাঁ,আমার বাসার সামনেই ও আছে” বলেই তিনি ভয়ানক চমকালেন,হায় হায়,এটা কি বললেন তিনি। এখন রিমান্ডে না নিলেই হয়। তার সামনে বসা লোকটা বলল “বুঝলেন ভাই,ছেলেটা মনে হয় বিরাট ড্রাগ অ্যাডিক্ট । হলুদ পাঞ্জাবি পইরা খালি পায়ে হাঁটে। বাপ-মায়ের একমাত্র সন্তান। আমি হলে থাপড়ায়ে সোজা কইরা দিতাম। বদ কোথাকার”। ভাত এসে গেছে। মতিন সাহেব দ্রুত ভাত গিলে পালিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন,এমন সময় ওই লোক বলল “ভাই, ওই বদটাকে যেখানে দেখেছেন সেখানে নিয়ে যেতে পারবেন?” মতিন সাহেব বলতে চাচ্ছিলেন – না,আমার কাজ আছে। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারলেন না। মনে হয় পুলিশদের সাথে মিথ্যা বলা কঠিন। মতিন সাহেব মাথা নেড়ে বললেন “পারব”। লোকটা বলল” ভাই,সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস আছে?”
– না
– তাহলে চলেন সিগারেট খাই
বলেই লোকটা সিগারেট ধরালো। মতিন সাহেব অাগুন না দিয়েই মুখে সিগারেট নিয়ে দাড়িয়ে থাকলেন। একটু পরেই মতিন সাহেব ও লোকটাকে তার বাসার গলির সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখা গেল। এবং আরও কিছুক্ষণ পর হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালাকে পুলিশ থানায় নিয়ে গেল। পরের দিন। মতিন সাহেব পেপার পড়ছেন। তিনি সাধারণত দুইবার পেপার পরে থাকেন। প্রথমবার পড়লে যেসব খেয়াল করা হয়না,দ্বিতীয়বার পড়লে তা খেয়াল করা হয়। যেমনঃ এক গ্রামে মৎস্যকুমারী পাওয়া গেছে। ইন্টারেস্টিং খবর। তবে মৎস্যকুমারীর ছবি নেই। গ্রামবাসী ছবি তুলতে দিচ্ছে না। পাশেই আরেকটা খবর। সেই হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালার ছবি। লেখা রয়েছে অস্বাভাবিক মৃত্যু। মতিন সাহেব চমকালেন।
দুপুরে তিনি নতুন কাজের ছেলের খোঁজে গেলেন। ‘In Search of Searvant’.কিন্তুু তেমন কাউকে পেলেন না। রাতে তিনি টিভিতে খবর শুনছিলেন। এমন সময় বারান্দায় হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা একজনকে দেখলেন। তিনি দ্রুত বারান্দায় গিয়ে দেখলেন কেউ নেই।
তিনি মনে মনে খুব ভয় পেলেন। রাতে ঘুমানোর সময় তিনি তার দুই মেয়ে এবং নাতির সাথে কথা বলেন। কিন্তু সেদিন তিনি তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়লেন।
কিছুক্ষণ পরেই তার বড় মেয়ে ফোন করলো।
– “কি হলো বাবা,আজকে ফোন করনি কেন?
– না,আজ শরীর খারাপ,তাই তাড়াতাড়ি শুয়ে পরেছি। আচ্ছা মা,তুই কি ভূত বিশ্বাস করিস?
-না,কেন বাবা?তোমার শরীর কি খুব বেশি খারাপ?
-না…
-বাবা,আমরা কিন্তু এই ঈদে বাংলাদেশে আসছি
-একটা হলুদ পাঞ্জাবি কিনে আনতে পারবি মা?
-পারবো…কিন্তু কেন বাবা?
-এম্নি
রাতে মতিন সাহেবের ঘুম ভাল হলো না। তিনি স্বপ্নে দেখলেন অনেকগুলো হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা তাকে মাছের মতো ঠোকর দিচ্ছে। সকালে উঠেই তাঁর মাথাব্যাথা করতে লাগলো।
দুপুরবেলা। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। এ সময় আবার কে আসতে পারে?
মতিন সাহেব দরজা খুলে দেখেন সেই হলুদ পাঞ্জাবিওয়ালা দাড়িয়ে আছে। মতিন সাহেব সাথে সাথে অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
মতিন সাহেব জ্ঞান ফিরতেই দেখলেন তিনি হাসপাতালের কেবিনে। তিনি পাশে থাকা নার্সকে দেখে বললেন, আমি কি বেহেস্তে?’ নার্স হাসিমুখে দাড়িয়ে থাকলো। মতিন সাহেবের ইচ্ছে করলো নার্সের গালে একটা থাপ্পড় দিতে। বয়স্ক একজন মানুষ সহানুভূতি চাইছে আর সে মুখ হাসি হাসি করে দাড়িয়ে আছে। এর মানেটা কি? দেশ থেকে কি বয়স্কদের শ্রদ্ধা করার বিষয়টা চলে যাচ্ছে? এখনকার তরুণ সমাজ শ্রদ্ধা কি তাই ভুলে যাচ্ছে। এদের সকাল বিকাল থাপড়ানো দরকার। কিছুক্ষণ পর মতিন উদ্দিন দেখলেন মফিজ তাঁর পাশে একটা চেয়ারে বসে আছে। মফিজ হলো মতিন সাহেবের প্রতিবেশী। সম্ভবত মফিজই তাকে এখানে এনেছে। মফিজ বলল, “কি ব্যাপার মতিন ভাই,সন্ধ্যায় আপনার বাসায় এসে দেখি আপনি দরজা খুলে পড়ে আছেন। ভাবলাম মার্ডার নাকি,পরে আবার আপনাকে হাসপাতালে আনলাম। নেন ভাই আঙুর খান” বলেই মফিজ তার দিকে আঙুরের ঠোঙ্গা বাড়িয়ে দিলো। মতিন সাহেব ভাবলেন মফিজ তাকে ভাই বলে ডাকছে কেন? সে কি তার সমবয়সী? তিনি কিছুই মনে করতে পারছেন না। তাঁর মাথা সম্ভবত খারাপের দিকে যাচ্ছে। কিংবা মাথা খারাপই হয়ে গেছে। কারণ তাঁর ইচ্ছে করছে আঙুরের ঠোঙ্গাটা ডাস্টবিনে ফেলে দিতে। কিন্তু তিনি এর বদলে আঙুরের ঠোঙ্গা নিয়ে আঙুর খাওয়া শুরু করলেন। নাহ,এর মানে মাথা এখনো পুরোপুরি খারাপ হয়নি।
মতিন সাহেবের তেমন কোন শারীরিক ক্ষতি হয়নি। কিন্তু তবুও একদিন হাসপাতালে কাটিয়ে দিলেন। আসলে তাঁর নিজের বাসায় যেতেই ভয় লাগছে।
পরের দিন।
মতিন সাহেব বাসার দরজা খুলে দাড়িয়ে আছেন। তাঁর বাসার অর্ধেক জিনিসই নেই। চোর মূল্যবান সব জিনিসই নিয়ে গেছে কিন্তু কোন বিচিত্র কারণে টিভির মতো একটা মূল্যবান বস্তুই সে নেয়নি। এর কারণ কি? ঢাকা শহরের চোরদের মাথা কি আউলা ধরণের হয়ে যাচ্ছে ? নাকি টিভির প্রতি চোরটার বিতৃষ্ণা আছে ?
কিছুক্ষণ পরেই মতিন সাহেবের বড় মেয়ে অবন্তি তাঁর পরিবারসহ মতিন সাহেবের বাসায় আসলো। অবন্তি এসেই দেখল তাঁর বাবা প্রায় খালি বাসায় টিভি ধরে দাড়িয়ে আছে। এর মানে কি? তাঁর বাবার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ? মতিন সাহেবের মেয়ের জামাই তাকে নির্বিকার গলায় বলল”স্লামালাইকুম বাবা, ভালো আছেন ?” তাঁর বড় নাতি নৃ বলল “নানু তুমি কি করছো?” মতিন সাহেব বললেন “তোমরা ভাল আছো?” বলার প্রায় সাথে সাথেই তাঁর হাত থেকে টিভিটা পড়ে ভেঙ্গে গেল। নৃ বলল” বুঝেছ নানু আমাদের বাসায়ও দুইটা টিভি ভেঙ্গে গিয়েছিলো। একটা আমি ভুলে খেলতে গিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছিলাম আরেকটা আব্বু আর আম্মু ঝগড়া করার সময় ‘
“নৃ, তুমি চুপ থাকো। ” বলল অবন্তি।
কয়েকদিন পর।
মতিন সাহেবের বাসায় কয়েকটা নতুন আসবাবপত্র দেখা যাচ্ছে। তবে সেটা সাময়িক। কারণ তাঁর বড় মেয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাকে অস্ট্রেলিয়া নিয়ে যাবে। এছাড়া ভাল সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। রাতে খাবারের সময় মতিন সাহেবের জামাই তাঁর সাথে কথা বলছে “বুঝলেন বাবা,অস্ট্রেলিয়া বিরাট দেশ। সম্ভবত আয়তনে বিশ্বের ৪র্থ কিংবা ৫ম। শীতের সময় দারুণ স্নো ফল হয় , তখন ফায়ারপ্লেসে বসে লালপানি খেতে খেতে তুষারপাত দেখার মজাই আলাদা, আর ক্যাঙ্গারু……’
মতিন সাহেবের কান দিয়ে ধুঁয়া বের হচ্ছে। জামাই বলে কি তাঁকে ! ফায়ারপ্লেসে বসে লালপানি খাওয়া। কোন জামাই তাঁর শ্বশুরকে এমন কথা বলতে পারে এটা তাঁর মাথাতেই আসেনি। সে এখনো বকবক করেই যাচ্ছে। তাঁর ইচ্ছে করছে তাঁকে থাপ্পড় দিতে। কিন্তু শীতের দেশে লালপানি খাওয়া যেতেই পারে। কথায় আছে – যস্মিন দেশে যদাচার।
মতিন সাহেবের বড় মেয়ে অবন্তি তাঁর স্বামী জাহিদের সাথে কথা বলছে। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে না তাড়া ঝগড়া করছে না আলাপ করছে। জাহিদ বললঃ
– তোমার বাবা মনে হয় মাথা গরম পাবলিক ।
– আমার বাবা মাথা গরম পাবলিক মানে?
– মানে উন্মাদ শ্রেণির
– তুমি আমার বাবাকে উন্মাদ বললে?
– ভুল বলেছি। তোমার বাবা ভয়ঙ্কর মানুষ। আমি খাবার টেবিলে বকবক করে গেলাম আর উনি শুধু হ্যাঁ- হু করেন। তোমার বাবার সামনে আমার দাড়াতেই ভয় লাগে।
– আমার বাবাকে তুমি ভয়ঙ্কর বললে? তোমার সাথে আমার বাস করাই উচিৎ না।
– তুমিও দেখি তোমার বাবার মতো মাথা গরম। অাচ্ছা তোমাদের বংশের সবারই কি মাথা গরম?
– তুমি বুঝি খুব ঠাণ্ডা মাথার মানুষ? তোমার মতো বেকুবের সাথে আমার বিয়ে হওয়াই উচিৎ হয়নি। এখন যদি আমরা দেশে না থাকতাম তাহলে…………
পরদিন সকালে। মতিন সাহেবের ঘুম সেদিনও ভাল হলো না। তিনি স্বপ্নে দেখলেন তিনি এবং তাঁর জামাই খালি গায়ে ছাদে দাড়িয়ে লালপানি খাচ্ছেন। কিন্তু স্বপ্নে তাঁর কাছে সেটা খুবই স্বাভাবিক লাগছিলো। তাঁর জামাই এক হাতে বন্দুক নিয়ে দাড়িয়ে আছে। আকাশে কিছু কবুতর আর কাক উড়ছে। জামাই বলল ” কবুতরগুলো কোন কাজের না । সব মেরে দেই কাকগুলো থাকুক। এরা ময়লা আবর্জনা খেয়ে পরিষ্কার করে।
মতিন সাহেব স্বাভাবিক ভাবেই বললেন ” হ্যাঁ, মারো। কবুতরের রোস্টও খাওয়া যাবে।
মতিন সাহেবের নাস্তা দেওয়া হয়েছে। তিনি এখনো খাওয়া শুরু করেননি। তাঁর দৃষ্টি বারান্দার দিকে। তাঁর মনে হচ্ছে ওপাশে কে যেন দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে। মতিন উদ্দিন বললেন, কে ওখানে ? কে ?
ভারী গলায় কেউ একজন বলল , আমি । এই গলার স্বর মতিন সাহেবের অতি পরিচিত। তাঁর মাথাব্যথা শুরু হলো। শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। ইদানীং তাঁর এই সমস্যা হচ্ছে। মনে হয় তিনি দ্রুত মস্তিষ্ক বিকৃতির দিকে যাচ্ছেন। গতবার দেখল হলুদ পাঞ্জাবি। এইবার গলার স্বরে মনে হলো আবুল। আবুল ছিল কাদেরের আগে এই বাড়ির কাজের লোক। সে চার বছর আগে রোড অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
আবুল বলল, স্যারের শইল কেমুন?’
মতিন সাহেব বললেন , ভালো। ‘
– কাজের লোক কি রাখছেন?’
-হ্যাঁ, রাখছিলাম। পালাইয়া গেছে।
আবুল বলল, ভালোই হইসে। আছেন আর অল্প কিছুদিন। কাজের লোক না হইলেও চলব।
আবুলের কথা শুনে মতিন সাহেব হতভম্ব। অল্প কিছুদিন আছেন – এর মানে কী ? তিনি এখন সবকিছু থেকে অবসর নেওয়া মানুষ । তিনি চেষ্টায় আছেন অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর মেয়ের কাছে চলে যেতে। দেশের তিনি গুষ্টি কিলান। তিনি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে থাকবেন মেয়ের কাছে। শীতের দিন ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে লালপানি খাবেন। শীতের দেশে লালপানি খেলে কার কি বলার থাকবে ? আর যাই হোক হলুদ পাঞ্জাবিরা হঠাৎ হঠাৎ বিরক্ত করবে না।
কিছুক্ষণ পর অবন্তি এসে বলল , ‘কি হল বাবা ? কার সাথে কথা বলছো ?
– আবুলের সাথে
– আবুল তো ৪ বছর আগে মারা গেছে
– ও, ভুলে গিয়েছিলাম। হা হা হা
অবন্তি অবাক হয়ে তাঁর বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। মতিন উদ্দিনের অস্বস্তি লাগতে শুরু করলো। তাঁর মেয়ে কি তাঁকে পাগল ভাবা শুরু করছে নাকি ? পরিচিতজনেরা পাগল ভাবা শুরু করলে বিষয়টা হবে খুব ভয়ঙ্কর। বাকি জীবন পাগলাগারদে কাটিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বৃদ্ধ বয়সে পাগলাগারদে দিন কাটানোর চেয়ে শীতের দেশে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসে লালপানি খাওয়া এর থেকে অনেক ভালো।
জাহিদ অবন্তিকে বললঃ
– দেখলে, বলেছিলাম না তোমার বাবা উন্মাদ
– ও, তাহলে তুমিও শুনেছো বাবার কথা?
– হুম। তোমার বাবাকে জরুরি ভিত্তিতে সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার
– তুমি কী আমার বাবাকে পাগল ভাবছ নাকি? বৃদ্ধ বয়সে এরকম হতেই পারে
– এজন্যই তো উনি মৃত মানুষদের সাথে কথা বলেন। কয়েকদিন পর দেখা যাবে আমরাও আশেপাশে মৃত মানুষ দেখতে শুরু করব। আরও কয়েকদিন পর দেখা যাবে এই বাড়িটা ভূতের বাড়ি হিসেবে পরিচিতি পাবে। কে জানে হয়তো আমরাও ভূত হয়ে যেতে পারি। আমরা সবাই রাজা আমাদেরই ভূতের রাজত্বে
– তুমি এত বকবক করছো কেন ? তোমারও তো দেখি মাথা খারাপ। তোমাকেও সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে হবে
– সমস্যা নাই। তোমাকে আর নৃ-কেও আমরা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাবো। আমরা সপরিবারে পাগলাগারদ যাবো। আমরা হবো পাগল পরিবার।
কিছুক্ষণ পর নৃ এসে বললঃ
– সাইকিয়াট্রিস্ট কী বাবা?
– সাইকিয়াট্রিস্ট হলো মনস্তত্ত্ববিদ অর্থাৎ পাগলদের ডাক্তার
– আমি বড় হয়ে পাগলদের ডাক্তার হবো বাবা
– আমিও ছোটবেলা পাগলদের ডাক্তার হতে চেয়েছিলাম
– হও নাই ক্যান ?
– তোর দাদা ছিল কঠোর মানুষ। আমি পাগলদের ডাক্তার হবো এটা শুনে তিনি আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছিলেন
– ক্যান ?
– জানিনা
– জানো না ক্যান?
– এম্নি
– এম্নি ক্যান?
– বাবা নৃ, তোমাকে এখন আমি তুলে আছাড় দিব
– আছাড় দিবে ক্যান?
– যাও, তুমি তোমার নানার সাথে ক্যান ক্যান করো
– ক্যান?
নৃ ক্যান ক্যান করতে থাকুক; আমরা মূল গল্পে ফিরে আসি,
পরের দিন বিকালবেলা। জাহিদ এসে মতিন সাহেবকে বললঃ “চলেন বাবা, ছাদ থেকে ঘুরে আসি”। মতিন সাহেবের মাথা ঘামতে লাগলো। ছাদে নিয়ে যাবে ক্যান? তাহলে কি স্বপ্নে যেটা দেখেছেন এখন সেটা ঘটতে যাচ্ছে? মতিন সাহেব বললেন ‘ চলো যাই ‘। বলেই তাঁর নিজের ওপর নিজেরই রাগ লাগছে।
– ধুর
– কিছু বললেন বাবা?
– না, না, তুমি যাও
মতিন সাহেব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তিনি ছাদে যাবেন কি যাবেন না তা বুঝতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত মতিন সাহেব সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন। ছাদে গিয়ে দেখেন কিছু কবুতর উড়ছে। এর মানে কি? বদ কবুতরগুলো এখন উড়াউড়ি করছে কেন? পাশে তাঁর জামাই নৃ-কে নিয়ে দাড়িয়ে আছে। নৃ তাঁর বাবাকে বলল “কবুতরগুলো উড়াউড়ি করছে কেন?” জাহিদ বললঃ “কবুতরগুলোর উড়তে ইচ্ছে করছে, তাই তারা উড়ছে”
– ওদের উড়তে ইচ্ছে করছে ক্যান?
জাহিদ ভাবলো বলে দেবে জানি না। কিন্তু জানি না বললে নৃ ক্যান ক্যান শুরু করবে । তাই মনে মনে একটা উত্তর ভেবে নিয়ে জাহিদ বললঃ
– তুমি কি কখনো মোটা কবুতর দেখেছো? কবুতরগুলা কিছুক্ষণ উড়াউড়ি না করলে ওরা মোটা হয়ে যাবে। এইজন্য ওরা উড়ছে যাতে ওরা মোটা না হয়
– ও, বুঝছি
বলেই নৃ যেখানে কবুতর ল্যান্ডিং করছে সেখানে গিয়ে কবুতর ধরতে গেলো। মতিন সাহেব আশ্বস্ত হলেন। স্বপ্নে নৃ ছিল না। তাঁর মানে স্বপ্ন সত্যি হওয়ার সম্ভাবনা কম। জাহিদ আর নৃ মতিন সাহেবের কাছ থেকে একটু দুরে সরে গেছে । এমন সময় একটা কবুতর ছাদের রেলিং এ দাড়িয়ে মতিন সাহেবকে বললো
“কেমন আছেন মতিন ভাই?”
মতিন সাহেবের মাথা ঘুরাতে লাগলো। বদ কবুতর কথা বলে ক্যান? কণ্ঠটাও তো চেনা চেনা লাগছে। তিনি কবুতরটাকে তাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তুু কবুতরটা ভয় না পেয়ে আরও কাছে আসতে লাগলো। “বদ পক্ষী, দুর হ!” বলে মতিন সাহেব চিল্লাতে লাগলেন। কণ্ঠটাও তিনি চিন্তে পারছেন;এটা তাঁর মৃত প্রতিবেশী জামানের কণ্ঠ। জামান তাঁকে দেখেই মতিন ভাই মতিন ভাই বলে চিল্লাতো। বদ কবুতরটা এখনো যাচ্ছে না। বরং আরো সাহস দেখাতে লাগলো। কবুতরটা আবারো বলে উঠলোঃ “ভাই গালি দেন ক্যান? আপনাকেতো ভাল মানুষ হিসেবেই জানতাম। আছেন আর অল্প কিছুদিন,এর মধ্যে আবার গালাগালি করছেন। ”
– চুপ থাক বদ পক্ষী!
– আবার গালি? এইবার কিন্তু আমি খামচি দিবো
– দুর হ বদ পক্ষী,নাইলে তোরে আমি…
– হায় হায়! তুই তোকারি করেন ক্যান? আপনাকে আমি ভাই মানতাম।
বলেই কবুতরটা উড়ে চলে গেলো। এতক্ষণে জাহিদ আর নৃ মতিন সাহেবের চিল্লাচিল্লি শুনে দৌড়ে তাঁর কাছে এসেছে। জাহিদ বললঃ
– কি হলো বাবা, কোনো সমস্যা হয়েছে?
-না,না, মানে, আরকি, মানে বক্তৃতা প্র্যাকটিস করছিলাম। হে হে হা হা হু হু
মতিন সাহেব এখন আগের চেয়েও বেশি গম্ভীর হয়ে থাকেন। তাঁকে মাঝেমধ্যেই কার সাথে যেনো কথা বলতে দেখা যায়। যেমন এখন তাঁর কথা শুনে মনে হচ্ছে খুব পরিচিত কারো সাথে কথা বলছেন। কারণ যার সাথে তিনি কথা বলছেন তাঁকে ‘তুই’ করে সম্বোধন করছেন। এটা গালাগালি নয়,আন্তরিকতার ‘তুই’ ।
– কিরে কখন আসলি?
– ………
-তাই নাকি? আমিও ঠিক করেছি যাবো
ওপাশ থেকে যে কথা বলছে তার কথা অবন্তি শুনতে পারছে না। শুনতে না পারারই কথা। অবন্তি ঠিক করেছে আজই তার বাবাকে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিয়ে যাবে।
কিছুক্ষণ পর অবন্তিকে দেখা গেলো তাঁর বাবাকে জোর করে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে।
সাইকিয়াট্রিস্টের চেহারা আইনস্টাইন টাইপ। আইনস্টাইনের মোচ ছিলো। কিন্তু তাঁর মোচ নেই।
– তাঁর মানে আপনি মরা মানুষদের সাথে কথা বলেন?
– মরা মানুষ বলে তাদের অসম্মান করা উচিৎ না। তাদের সম্মান করে “হে মৃত আত্মা” বলা উচিৎ।
– আপনি কাদের কাদের দেখেন?
– হলুদ পাঞ্জাবি দেখি,কবুতর দেখি, আইনস্টাইন দেখি
– ও, আচ্ছা
– কয়েকদিন পর আপনাকেও দেখব
– মানে? মশকরার জায়গা পান না
– আরে মাথা গরম করেন কেন? আপনি সাইকিয়াট্রিস্ট,আমি আপনার রোগী। আমার কথা আপনার ধৈর্য ধরে শুনে…
– চুপ ! তুই আমাকে শিখাস,আমার ক্লিনিকে ভর্তি হলে বুঝবি কতো ধানে কতো চাল
– কথাটা একটু আপগ্রেড করা যায় না? বলা উচিৎ কতো ভুট্টায় কতো গম
– চুপ কর
– তুই তোকারি করেন ক্যান?
সাইকিয়াট্রিস্ট অবন্তিকে পরশুদিন তার ক্লিনিকে মতিন উদ্দিনকে ভর্তি করাতে বললেন।
মতিন সাহেব ঠিক করেছেন আজ রাতেই পালিয়ে যাবেন। অনেক হয়েছে। আর নাহ। এখন যুদ্ধং দেহি ।
রাত ২ঃ৪৫
মতিন সাহেব এখনো জেগে আছেন। কারণ এখন তার জেগে থাকারই কথা। হলুদ পাঞ্জাবির সাথে কথা বলে তিনি সিদ্ধান্ত আজ রাতেই পালিয়ে যাবেন। য পলায়তি স জিবতী- যে পালিয়ে যায় সে বেঁচে থাকে। তিনি ড্রয়ার খুলে হলুদ পাঞ্জাবিটা বের করে গায়ে দিলেন। বেড় হওয়ার আগে বেশ কিছু টাকা নিয়ে নিলেন। আজকাল টাকা ছাড়া কিছুই চলে না।
বেড় হওয়ার আগে ভাবলেন জুতা পরবেন কিনা। শেষ পর্যন্ত তিনি জুতা পরেই বের হলেন। রাতের ঢাকা দেখে মতিন সাহেব মুগ্ধ। আরও পড়ে বের হলে ভালো হতো। কারণ কিছু চায়ের দোকান এখনো খোলা। ঢাকা শহরে কিছু চায়ের দোকান সারা রাতই খোলা থাকে।
অবন্তি সকালবেলা চা নিয়ে দেখে তার বাবা নেই। কিছুক্ষণ পর জাহিদ কাচের কিছু ভেঙ্গে পড়ার শব্দ শুনলো। জাহিদ গিয়ে দেখলো অবন্তি কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তবে কান্নার সময় অবন্তিকে আরও বেশি সুন্দর দেখায় বলে জাহিদ তার কান্না থামাল না।
পত্রিকায় নিখোঁজ সংবাদ,টিভিতে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরও মতিন সাহেব কে পাওয়া গেলো না। আর পাওয়া গেলেও মতিন সাহেব কে চেনা যাবে না। অনেকদিন দাড়ি-গোঁফ না কাটলে যা হয় আরকি!
সময় স্রোত কারো জন্য অপেক্ষা করে না। অবন্তি ও তার পরিবারও মতিন সাহেবের জন্য অপেক্ষা করলো না। কয়েকমাস বাংলাদেশে থেকে মতিন সাহেবের জন্য অপেক্ষা না করে তারা বাড়ি বিক্রি করে অস্ট্রেলিয়া চলে গেলো। তবে এখন মাঝে মাঝে অবন্তি তার বাবার ফোন পায়।
– অবন্তি মা, কেমন আছিস?
– ভালো, কিন্তু তুমি কেমন আছো?
– খুব ভালোই আছি
– বাবা, তুমি আর ফিরে আসবে না?
– নারে মা, আমার অনেক জরুরি কাজ। আর জানিস তো,যে হারিয়ে যেতে চায় তাঁকে হারিয়ে যেতে দিতে হয়
– বাবা শুনো…
অবন্তির গলা ভারী হয়ে আসছে। মতিন সাহেব ফোন রেখে দিলেন। ফ্লেক্সিলোডের দোকানদার মতিন সাহেবের দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে আছে। রাত বারোটার সময়েসে ফোন করা। তবে তিনি মতিন সাহেবের পরিচিত একজন।
– মতিন ভাই, আজকে রাত্রে আমার বাসায় থেকে জান
– নাহ, রাতে আমার অনেক কাজ। দিনের বেলা আসবও
বলেই মতিন সাহেব দোকান থেকে বেড় হয়ে গেলেন।
রাত ২ঃ৩০
মতিন সাহেব এখন রাস্তায় হাঁটছেন। ডানদিকে একটা গলি পেয়ে সেখানে ধুকে পড়লেন। সমস্যা হচ্ছে সেই গলিতে কোনো আলো নেই। অন্য যে কেউ হলে সেখানে ঢুকতে ভয় পেত। কিন্তু মতিন সাহেবের কোন ভয় লাগছে না। কারণ তার সাথে আছে হলুদ পাঞ্জাবি,আবুল এবং আরো অনেকেই যাদের তিনি চিনতেন কিন্তু তারা মারা গেছে।
সমাপ্ত

Ashfaqul Awal Himel
Friends
Nipun Chandra
@nipunch
Sheikh Rahman
@sheikh-tauhidur-rahman
জামাল হোসেন বিষাদ
@jamalbishad
তানভীর আলম হীরা
@t-a-hira
নির্বোধ সুদীপ্ত
@sajalbhowmick
সালাম আলী আহসান
@otibnp
Rejwana Khan
@rejwana-khan
Shoriful Shoron
@shoriful-shoron
রাহেনা বেগম
@rahena-begum


মতিন সাহেবের মতিগতি অন্য রকম। অভনন্দন চমৎকার গদ্যের জন্য।