-
লাব্বায়েক: যুগে যুগে বাঙালির হজ্ব যাত্রার রোমাঞ্চ ও বিবর্তনের ইতিহাস
“লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক…”— হে আল্লাহ, আমি হাজির, আমি উপস্থিত। সৃষ্টির আদি লগ্ন থেকে তাওহীদের এই মহান ডাক বিশ্বাসী হৃদয়ে যে ব্যাকুলতার জন্ম দেয়, তার কোনো তুলনা নেই। ধূলিধূসরিত মরুভূমির তপ্ত বালুকা ফুঁড়ে জেগে ওঠা পবিত্র কাবা ঘরের দিকে যুগে যুগে ছুটে গেছে কোটি প্রাণ। ভৌগোলিক দূরত্ব, ভাষা কিংবা সংস্কৃতির ভিন্নতা কোনো কিছুই এই মহাসফরকে আটকে রাখতে পারেনি।
ঠিক এই কারণেই, ভারতীয় উপমহাদেশের একদম শেষ প্রান্তে অবস্থিত নদীমাতৃক এই বাংলার মানুষের হজ্ব পালনের ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের গল্প নয়; বরং এটি ছিল এক দীর্ঘ, রোমাঞ্চকর এবং অবিশ্বাস্য আত্মত্যাগের মহান গাঁথা। বঙ্গোপসাগরের উত্তাল তরঙ্গ আর হাজার মাইলের দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে এ দেশের মানুষের হজ্ব যাত্রার ধরণ ছিল মধ্যপ্রাচ্যের চেয়ে একদম আলাদা। শত শত বছর ধরে প্রযুক্তির উন্নয়ন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ভৌগোলিক সীমানার ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে বাঙালির এই পবিত্র যাত্রার যে বিবর্তন ঘটেছে, তা যেকোনো পাঠককে বিস্মিত ও আবেগাপ্লুত করে।
১. সুলতানি আমল: ‘মাদ্রাসাতুল বাঙ্কালিয়াহ’ ও জীবন বাজি রাখার যুগ
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলা থেকে মক্কায় যাওয়া ছিল আক্ষরিক অর্থেই জীবন বাজি রাখার মতো বিষয়। তখন কোনো সুনির্দিষ্ট রুট ছিল না। কিছু দুঃসাহসী মানুষ স্থলপথে ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে আফগানিস্তান, পারস্য (ইরান) ও ইরাকের মরুভূমি পাড়ি দিয়ে মক্কায় পৌঁছাতেন। এই যাত্রায় পায়ে হেঁটে বা ঘোড়ায় চড়ে সময় লেগে যেত কয়েক বছর। পথিমধ্যে ভাষা সংকট, দস্যুদের আক্রমণ এবং চরম আবহাওয়া ছিল নিত্যসঙ্গী।
তবে নৌপথের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা ঘটে মূলত সুলতানি আমলে (১৩শ থেকে ১৬শ শতাব্দী)। বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সাথে মক্কার শরিফদের সুদৃঢ় কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। প্রখ্যাত আরব ইতিহাসবিদ তকিউদ্দিন আল-ফাসি-র গ্রন্থ থেকে এর সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে।
বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (১৩৮৯–১৪১০ খ্রিষ্টাব্দ) মক্কার কাবার কাছে এবং মদিনার মসজিদে নববীর বাব-উস-সালামের সন্নিকটে দুটি বিশাল মাদ্রাসা ও মুসাফিরখানা নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসে এটি ‘মাদ্রাসাতুল বাঙ্কালিয়াহ’ (বাঙালি মাদ্রাসা) নামে বিখ্যাত ছিল। সুলতান জাহাজভর্তি অর্থ ও মূল্যবান উপহার সামগ্রী পাঠিয়ে এই প্রতিষ্ঠানের ব্যয়ভার বহন করতেন, যার সাথে এ দেশের প্রথম দিককার সমুদ্রগামী হাজীরাও সফরসঙ্গী হতেন।
২. মোগল ও ব্রিটিশ আমল: রাজকীয় ‘মির্শাহী’ থেকে বাষ্পীয় স্টিমার
মোগল আমলে ঢাকা যখন বাংলার রাজধানী (জাহাঙ্গীরনগর) হয়, তখন হজ্ব যাত্রা আরও সুসংগঠিত রূপ নেয়। মোগল দরবারের দাপ্তরিক দলিলপত্র—আকবরনামা ও পাদশাহনামা এবং ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের ডায়েরি থেকে জানা যায়, বাংলার ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে হাজীরা মোগল রাজকীয় জাহাজ (যেমন: মির্শাহী) বা পর্তুগিজ বাণিজ্যিক জাহাজে করে প্রথমে ভারতের সুরাট বন্দরে যেতেন এবং সেখান থেকে মূল হজ্ব জাহাজে উঠতেন। এই কাফেলাগুলোর নিরাপত্তার জন্য সরকারিভাবে ‘মীর-ই-হজ্ব’ (হজ্ব কাফেলার প্রধান) নিয়োগের নিয়ম ছিল।
১৯শ শতাব্দীতে ব্রিটিশ আমলে এসে যুক্ত হয় বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত স্টিমার। ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ সরকার “The Port Haj Committees Act, 1932” পাস করে, যার অধীনে কলকাতায় গঠিত হয় ‘বেঙ্গল হজ্জ কমিটি’। পূর্ববঙ্গের হাজীদের তখন ট্রেনে বা নৌকায় করে কলকাতা বা চট্টগ্রাম বন্দরে আসতে হতো।
‘টার্নার মরিসন’ কোম্পানির মতো বড় বড় জাহাজের ডেকে গাদাগাদি করে রান্না, ঘুমানো আর ইবাদত করে এক মাস সমুদ্র পাড়ি দিতে হতো। এই সময় লোহিত সাগরের ‘কামারান দ্বীপে’ (Kamaran Island) কঠোর কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হতো সবাইকে, যার কষ্টের বিবরণী তৎকালীন দৈনিক আজাদ বা সওগাত পত্রিকায় চিঠি আকারে প্রকাশিত হতো। সমুদ্রের ঝড় বা কলেরায় কেউ মারা গেলে ইসলামী নিয়ম মেনে তাঁর মরদেহ সাগরেই সমাহিত করা হতো।
৩. পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ: ‘হজ্জ নোট’ ও হিজবুল বাহার ট্র্যাজেডি
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের হাজীদের জন্য মুদ্রা পাচার রোধে স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান ১৯০ সালে বিশেষ ‘হজ্জ নোট’ (Haj Notes) ইস্যু করে। সাধারণ টাকার মতো দেখতে এই নোটে লেখা থাকত “Pilgrims’ Note / For Haj Pilgrims from Pakistan”। তখন বৈদেশিক মুদ্রার সংকটের কারণে জেলাভিত্তিক ‘হজ্ব লটারি’র মাধ্যমে কোটা নির্ধারিত হতো।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের ইতিহাসে সমুদ্রপথে হজ্বের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়টি রচিত হয় ১৯৮০ সালের ডিসেম্বর মাসে। বাংলাদেশ সরকারের পাঠানো বিশাল জাহাজ ‘এমভি হিজবুল বাহার’ (MV Hizbul Bahar) হজ্ব শেষে ফেরার পথে আরব সাগরে মারাত্মক ইঞ্জিন বিকলতার মুখে পড়ে। মাঝ-সমুদ্রে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে ভাসমান ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থায় থাকায় তীব্র খাদ্য ও পানি সংকটে বেশ কয়েকজন হাজী মারা যান। এই ট্র্যাজেডির পর থেকেই সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে এবং ১৯৯১-৯২ সালের দিকে সমুদ্রপথ পুরোপুরি বন্ধ করে বিমান যাত্রা বাধ্যতামূলক করা হয়।
৪. একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক বাংলাদেশ: ডিজিটাল ই-হজ্ব ও রুট-টু-মক্কা
আজকের দিনে বাংলাদেশ থেকে হজ্ব পালনের চিত্র সম্পূর্ণ আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে জেদ্দা বিমান বন্দরে নেমে ইমিগ্রেশনের জন্য হাজীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো, সেখানে এখন যুক্ত হয়েছে ‘রুট-টু-মক্কা ইনিশিয়েটিভ’ (Route to Mecca)। সৌদি সরকারের বিশেষ সহায়তায় ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরেই এখন সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন হয়ে যায়।
আইনি সুরক্ষায় এসেছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। ২০২১ সালে পাস হয়েছে “হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১”। এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আইন যা ডিজিটাল ই-হজ্ব পদ্ধতিকে আইনি স্বীকৃতি দেয় এবং বেসরকারি এজেন্সীগুলোর (HAAB) জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে হাজীদের প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করে।
উপসংহার: বাঙালির চিরন্তন হজ্ব পালন
যাতায়াত ব্যবস্থা উটের পিঠ থেকে সমুদ্রের জাহাজ হয়ে আজ বিমানের বিজনেস ক্লাসে রূপ নিয়েছে, কিন্তু বাঙালির হজ্ব পালনের ভেতরের আবেগটি আজও একই রয়ে গেছে। অতীতে বাংলাদেশ থেকে কেউ হজ্বে গেলে পুরো গ্রাম ভেঙে পড়ত, কান্নাকাটির রোল উঠত—কারণ মানুষ ধরে নিত তিনি আর নাও ফিরতে পারেন। আজ সেই জীবনসংশয় না থাকলেও, হজ্ব শেষে ফিরে আসা ব্যক্তিকে সম্মান করে ‘আলহাজ্ব’ ডাকা এবং পুরো গ্রাম বা মহল্লায় ‘তবাররক’ (মিষ্টি বা ভোজ) বিতরণের যে সামাজিক রেওয়াজ, তা আজও আমাদের গ্রামীণ ও শহর সংস্কৃতিতে এক অনন্য আত্মিক বন্ধন সৃষ্টি করে রেখেছে। যুগে যুগে পথ ও পদ্ধতি বদলেছে, কিন্তু লাব্বায়েক ধ্বনির সেই চিরন্তন আকুলতা আজও প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে অপরিবর্তিত।ঐতিহাসিক ও প্রামাণ্য তথ্যসূত্র
১. সুলতানি আমল (মাদ্রাসাতুল বাঙ্কালিয়াহ):
• আল-ফাসি, তকিউদ্দিন। العقد الثمين في تاريخ البلد الأمين (আল-ইকদুজ সামিন ফি তারিখিল বালাদিল আমিন)। (মক্কার বিখ্যাত এই প্রাচীন আরবী ইতিহাসগ্রন্থে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ কর্তৃক মক্কা-মদিনায় মাদ্রাসা ও মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে)।
• সরকার, যদুনাথ (সম্পাদিত)। The History of Bengal (Vol. II): Muslim Period. University of Dhaka, 1948.
২. মোগল আমল (মির্শাহী ও সুরাট বন্দর):
• আবু’ল-ফজল। আকবরনামা এবং লাহোরী, আব্দুল হামিদ। পাদশাহনামা। (মোগল দরবারের এই দাপ্তরিক ইতিহাস গ্রন্থগুলোতে সুরাট বন্দর থেকে পূর্ববঙ্গের হাজীদের সমুদ্রযাত্রা এবং ‘মীর-ই-হজ্ব’ নিয়োগের রাষ্ট্রীয় ফরমানের উল্লেখ রয়েছে)।
• করিম, আব্দুল। History of Bengal: Mughal Period (Vol. I & II). Institute of Bangladesh Studies, Rajshahi University.
৩. ব্রিটিশ আমল (বেঙ্গল হজ্জ কমিটি ও কোয়ারেন্টাইন):
• The Port Haj Committees Act, 1932 (Act No. XX of 1932), Legislative Department, Government of British India.
• সাময়িকী ও সংবাদপত্র: ১৯৩০ ও ১৯৪০-এর দশকের দৈনিক আজাদ, সওগাত এবং মাসিক মোহাম্মদী-র আর্কাইভ (যেখানে কামারান দ্বীপে কোয়ারেন্টাইনে থাকা বাঙালি হাজীদের চিঠিপত্র ও বেঙ্গল হজ্জ কমিটির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হতো)।
৪. পাকিস্তান ও স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ আমল:
• স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান (১৯৫০): অফিসিয়াল সার্কুলার ও হজ্জ নোট আর্কাইভ (Pakistan Haj Notes, 1950–1970)।
• সংবাদপত্র আর্কাইভ (১৯৮০-১৯৮১): দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক বাংলা (ডিসেম্বর ১৯৮০ ও জানুয়ারি ১৯৮১ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘এমভি হিজবুল বাহার’ জাহাজের মাঝ-সমুদ্রে বিকল হওয়া এবং হাজীদের উদ্ধারের সচিত্র প্রতিবেদন)।
৫. আধুনিক বাংলাদেশ ও আইনি দলিল:
• গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার: হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১ (২০২১ সনের ৪ নং আইন), ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ গেজেট।
• ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় (MoRA), বাংলাদেশ: ই-হজ্ব পোর্টাল ও রুট-টু-মক্কা ইনিশিয়েটিভ বার্ষিক প্রতিবেদন (২০১৯-২০২৫)।3 Comments
Friends
Masfi K
@masfi-mohammad
Violet Rose
@afsanajannatultumpa
Md.hazrat belal
@md-hazratbelal
Suranjit Master
@suranjitmaster
ছন্নছাড়া মহাপ্রান
@mihirmilton
এম এ খায়ের
@dmpcttc
তাহমিনা মোরশেদ
@rbtm796923t
কাশফিয়া নাহিয়ান
@kashfianahian
প্রাপ্তি রোজারিও
@praptirozario


বাঙালির হজ্ব যাত্রার এক জীবন্ত ও ঐতিহাসিক দলিল।