Profile Photo

মোহাম্মদ শাহজামান শুভOffline

  • Mohammad-Shahzaman
  • সাদা পানির রাজনীতি
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    শহরটার নাম ছিল “দুধনগর”। নাম শুনে মনে হতে পারে সেখানে নদীর বদলে দুধ প্রবাহিত হতো, শিশুরা কান্না করত মাখনের জন্য, আর বৃদ্ধেরা সকালের হাঁটাহাঁটি শেষে সরের চায়ে চুমুক দিতেন। বাস্তবতা অবশ্য ছিল ভিন্ন। সেখানে দুধ ছিল কেবল বোতলের গায়ে আঁকা একটি ছবি, আর সর ছিল রাজনৈতিক ভাষণের মতো—শুধু ওপরে ভাসত, ভিতরে কিছু থাকত না।
    এই শহরের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন হাজী মুনছের আলী। বয়স আশির কাছাকাছি, তবুও গলায় এমন জোর ছিল যে বক্তৃতা শুরু করলে মসজিদের মাইক পর্যন্ত সংকোচে ভলিউম কমিয়ে ফেলত। তিনি ছিলেন একসময়কার ধনী ব্যবসায়ী। এক জীবনে এত সম্পদ করেছেন যে এখন তার প্রধান কাজ ছিল ওষুধ খাওয়া এবং পুরোনো দিনের গল্প বলা। কিন্তু বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীর দুর্বল হয়ে এলো। হাঁটতে গেলে হাঁটু কাঁপে, কথা বলতে গেলে কাশি আসে, আর আয়নায় তাকালে নিজের চেহারার চেয়ে দেশের অবস্থা বেশি ভয়ংকর মনে হয়।
    একদিন শহরের নামকরা ডাক্তার ডাঃ কুদরতুল হক তাকে পরীক্ষা করে বললেন,
    — “হাজী সাহেব, আপনার শরীরে শক্তির বড় অভাব। আজ থেকে প্রতি রাতে এক কেজি করে খাঁটি দুধ খাবেন।”
    “খাঁটি” শব্দটার ওপর ডাক্তার এমন জোর দিলেন যেন তিনি জানতেন এই দেশে খাঁটি জিনিস বলতে এখন শুধু প্রতারণাই খাঁটি।
    হাজী মুনছের আলী বাড়ি ফিরে সঙ্গে সঙ্গে একজন কর্মচারী নিয়োগ দিলেন। নাম তার বদরু। মুখে সবসময় বিনয়ের হাসি, কিন্তু চোখে ছিল হিসাববিজ্ঞানের ক্যালকুলেটর। কাজ একটাই—প্রতি রাতে মালিককে এক কেজি দুধ খাওয়ানো।
    প্রথম রাতেই বদরু বুঝে গেল, বৃদ্ধ মানুষ রাতের অন্ধকারে দুধের চেয়ে বিশ্বাস বেশি পান করেন। তাই সে নিঃশব্দে ২৫০ গ্রাম দুধ নিজের গলায় ঢেলে দিল, তারপর সমপরিমাণ পানি মিশিয়ে গ্লাস ভর্তি করে মালিকের হাতে দিল। হাজী সাহেব খেয়ে বললেন,
    — “আহা! খাঁটি দুধের স্বাদই আলাদা!”
    বদরু মনে মনে বলল,
    — “খাঁটি তো বটেই। শুধু গরুটা একটু নদীতে চরে এসেছে।”
    কয়েকদিন চলল এভাবেই। হাজী সাহেব ভাবলেন শরীর ভালো হচ্ছে না কেন? কিন্তু তিনি এটাও ভাবলেন—বয়স তো কম হয়নি। মানুষ যখন রাষ্ট্রের উন্নয়ন দেখে না, তখন নিজের দুর্বলতাকেই নিয়তি মনে করে নেয়।
    একদিন পাশের বাড়ির লোক মজনু মিয়া ঘটনাটা দেখে ফেলল। সে ছুটে এসে বলল,
    — “হাজী সাহেব, আপনার কর্মচারী প্রতিরাতে দুধ চুরি করে!”
    হাজী সাহেব বিস্মিত হলেন। তার চোখে জল এসে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
    — “মানুষ এত নিচে নামতে পারে!”
    পরদিনই তিনি আরেকজন কর্মচারী রাখলেন—করিম। দায়িত্ব: বদরুকে নজরে রাখা।
    করিম প্রথম রাতেই বদরুকে বলল,
    — “দেখো ভাই, তোমার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আছে। তবে আমি মানুষ ভালো। সব ফাঁস না করে অংশীদার হতে পারি।”
    সেদিন রাতেই দুইজন মিলে ৫০০ গ্রাম দুধ খেল, আর বাকি অংশে পানি মিশিয়ে মালিককে দিল। হাজী সাহেব দুধ খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
    — “আজকাল দুধে আগের মতো গন্ধ পাই না।”
    বদরু মাথা নিচু করে বলল,
    — “জনাব, গরুগুলাও এখন আগের মতো দেশপ্রেমিক না।”
    এরপর কয়েকদিন কেটে গেল। শরীর আরও দুর্বল হতে লাগল। হাঁটার সময় হাজী সাহেবের লাঠি কাঁপত, আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার উদ্বেগ বাড়ত। কিন্তু তিনি তখনও বুঝতে পারলেন না, দুর্বলতা শরীরের চেয়ে ব্যবস্থার ভেতর বেশি।
    হঠাৎ আরেকদিন এক ভদ্রলোক পুরো ঘটনাটা দেখে ফেললেন। তিনি এসে বললেন,
    — “হাজী সাহেব, দুইজনই চোর!”
    হাজী সাহেব এবার খুব রেগে গেলেন। কিন্তু রাগটা চোরদের ওপর যতটা, তার চেয়ে বেশি ছিল নিজের সরলতার ওপর। তিনি তৃতীয় একজন কর্মচারী রাখলেন—নজরুল। দায়িত্ব: আগের দুইজনকে দেখা।
    নজরুল যোগ দিয়েই বুঝল, এখানে সততা দিয়ে চাকরি টিকবে না। প্রথম রাতেই সে বলল,
    — “দেখেন ভাই, আমি যদি আপনাদের ধরিয়ে দিই, মালিক আমাকে বিশ্বাস করবে। কিন্তু যদি ভাগ দেন, তাহলে আমরা সবাই নিরাপদ।”
    সেই রাতে তিনজন মিলে ৭৫০ গ্রাম দুধ খেল। তারপর পানিতে এমন দক্ষতায় দুধের রঙ তৈরি করল যেন কোনো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রকল্পের রিপোর্ট লেখা হচ্ছে।
    হাজী সাহেব দুধ খেয়ে কাশলেন। বললেন,
    — “আজ দুধটা যেন একটু পাতলা।”
    করিম উত্তর দিল,
    — “জনাব, এখন গরুরাও স্বাস্থ্যসচেতন। ফ্যাট কম দুধ দেয়।”
    শহরের মানুষ ধীরে ধীরে লক্ষ্য করল, হাজী মুনছের আলী শুকিয়ে যাচ্ছেন। অথচ তার বাড়িতে প্রতিরাতে এক কেজি দুধ ঢুকছে। সবাই অবাক। কেউ বলল বয়সের দোষ, কেউ বলল নজর লেগেছে, কেউ বলল বিদেশি ষড়যন্ত্র। কিন্তু কেউ প্রশ্ন করল না—দুধটা আসলে কোথায় যাচ্ছে?
    কারণ দুধনগরে প্রশ্ন করার চেয়ে ব্যাখ্যা বানানো সহজ ছিল।
    একদিন ডাক্তার আবার এসে পরীক্ষা করে বিস্মিত হলেন।
    — “এ কী অবস্থা! আপনি তো আগের চেয়েও দুর্বল!”
    হাজী সাহেব এবার সত্যিই চিন্তিত হলেন। তিনি ভাবলেন, সমস্যা নিশ্চয়ই কর্মচারীদের মধ্যে। তাই আরও একজন লোক নিয়োগ দিলেন—হাশেম। দায়িত্ব: বাকি তিনজনকে নজরে রাখা।
    হাশেম প্রথম দিনই পুরো পরিস্থিতি বুঝে গেল। সে দেখল, এখানে নৈতিকতার চেয়ে ভাগের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। সে রাতেই চারজন গোল হয়ে বসে বৈঠক করল।
    বদরু বলল,
    — “আজ এক কেজি পুরোটাই শেষ করি।”
    করিম বলল,
    — “কিন্তু মালিক?”
    নজরুল হেসে বলল,
    — “মানুষ সত্য দেখে না, প্রমাণ দেখে।”
    তারপর তারা চারজন মিলে পুরো এক কেজি দুধ খেয়ে ফেলল। এত আনন্দে খেল যেন রাষ্ট্রীয় বাজেট ভাগাভাগি চলছে। শেষে হাঁড়ির ওপরে জমে থাকা একটু সর তুলে হাজী সাহেবের গোঁফে মেখে দিল।
    হাজী সাহেব সেদিন অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লেন। সকালে উঠে শরীর আরও দুর্বল লাগল। তিনি চারজনকে ডেকে বললেন,
    — “গতরাতে তো তোমরা আমাকে দুধই দাওনি!”
    চারজন একসঙ্গে বিস্মিত মুখে তাকাল। যেন তারা নির্দোষ ফেরেশতা।
    হাশেম কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,
    — “জনাব! এই বয়সে আপনার স্মৃতিশক্তি কমে গেছে।”
    বদরু তাড়াতাড়ি একটা আয়না এনে সামনে ধরল।
    — “দেখেন, আপনার গোঁফে এখনো সর লেগে আছে!”
    হাজী সাহেব আয়নায় তাকালেন। সত্যিই গোঁফে সর লেগে আছে। তিনি থমকে গেলেন। নিজের চোখকে তিনি অস্বীকার করতে পারলেন না। কারণ মানুষ নিজের অভিজ্ঞতার চেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণকে বেশি বিশ্বাস করে।
    তিনি চুপ হয়ে গেলেন।
    সেদিন থেকে দুধনগরে নতুন নিয়ম চালু হলো। এখন আর কেউ দুধ চুরি করে না—কারণ দুধই থাকে না। সবাই শুধু সরের প্রমাণ দেখায়। শহরের সভায় বক্তৃতা হয় উন্নয়ন নিয়ে, সংবাদপত্রে ছাপা হয় সাফল্যের গল্প, মাইকে প্রচার হয় সততার জয়গান। আর সাধারণ মানুষ আয়নায় নিজের গোঁফে লেগে থাকা সর দেখে ভাবে—“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই দুধ খেয়েছি।”
    ক্রমে দুধনগরের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান সেই চার কর্মচারীর মতো হয়ে উঠল। বিদ্যালয়ে শিক্ষক নেই, কিন্তু ফলাফলের ব্যানার আছে। হাসপাতালে ওষুধ নেই, কিন্তু উদ্বোধনের ফিতা আছে। রাস্তায় উন্নয়ন নেই, কিন্তু সাইনবোর্ডে লেখা—“উন্নয়নের মহাসড়ক”। মানুষ কাজের চেয়ে প্রমাণে বেশি বিশ্বাস করতে শিখল।
    শহরের কবিরা তখন কবিতা লেখা বন্ধ করে দিল। কারণ সত্য লিখলে কেউ বিশ্বাস করে না, আর মিথ্যা লিখলে সবাই হাততালি দেয়। সাংবাদিকেরা শিখে গেলেন—খবরের চেয়ে বিজ্ঞাপন নিরাপদ। বুদ্ধিজীবীরা শিখলেন—প্রশ্ন করলে সম্মান কমে, প্রশংসা করলে কমিটি বাড়ে।
    একদিন দুধনগরের কেন্দ্রীয় ময়দানে এক বিশাল সভা হলো। সেখানে চার কর্মচারীকে “বিশ্বস্ত সেবক” হিসেবে পুরস্কৃত করা হলো। বক্তারা বললেন,
    — “এরা না থাকলে হাজী সাহেব এতদিন বাঁচতেন না!”
    হাজী সাহেব মঞ্চে বসে ছিলেন। শরীর এত দুর্বল যে হাত তুলতেও কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু যখন সবাই হাততালি দিল, তিনিও দুর্বল হাতে তালি দিলেন। কারণ দীর্ঘদিন প্রতারিত হতে হতে মানুষ একসময় প্রতারণাকেই বাস্তবতা ভেবে নেয়।
    সেদিন রাতে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে তিনি নিজের গোঁফে শুকনো সরের দাগ দেখতে পেলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বুঝতে পারলেন—সর প্রমাণ হতে পারে, কিন্তু পুষ্টি নয়।
    কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে।
    পরদিন সকালে দুধনগরের পত্রিকায় শিরোনাম বের হলো—
    “হাজী মুনছের আলী সুস্বাস্থ্যের গোপন রহস্য: নিয়মিত দুধপান।”
    আর নিচে ছোট করে লেখা ছিল—
    “দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।”

    2
    2 Comments
Skip to toolbar