Profile Photo

Violet RoseOffline

  • afsanajannatultumpa
  • Profile picture of Violet Rose

    Violet Rose

    1 day, 21 hours ago

    এটা আমার শেষ নয়
    পর্ব ১: শুরু শেষ, কিন্তু শেষ নয়
    “সে কখনো বিদায় বলেনি… কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে, তার নীরবতাই আমার জীবনে শোনা সব শব্দের চেয়ে বেশি জোরে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।”
    — আয়াজ রহমান
    ২০১১ সাল
    জানলার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল তানহা। বাইরের আবহাওয়াটা আজ অদ্ভুত সুন্দর; না খুব বেশি ঠান্ডা, না খুব বেশি গরম। ঠিক এমন এক স্নিগ্ধ সকাল
    তানহা লক্ষ্য করল পাশের বাড়িতে একটি নতুন পরিবার এসেছে। শুনল ওরা রাজধানী থেকে এসেছে। পরিবারে বাবা, মা, একটি মেয়ে আর একটি ছেলে।
    তানহার বয়স তখন মাত্র এগারো। ছেলেটিকে দেখে মনে হলো সেও ওর সমবয়সী। কিন্তু ছেলেটির দিকে তাকিয়ে তানহার মনের ভেতর এক অজানা প্রশান্তি খেলে গেল। ঘোর কাটল বাবার ডাকে। “তানহা!” “আসছি বাবা!” তানহা সাড়া দিল।
    তানহার পুরো নাম তানহা মির্জা। বাবা করিম মির্জা আর ছোট বোন চার বছরের তারিন। তারিনের জন্মের সময় তাদের মা মারা যান। স্ত্রীর শোক আর দুই মেয়ের দেখাশোনার জন্য করিম সাহেব নিজের ব্যবসা গুটিয়ে নেন। লোকে বলে, স্ত্রীর মৃত্যুতে তিনি পাগলপ্রায় হয়ে গিয়েছিলেন, তাই ব্যবসা সামলাতে পারেননি। তবে বিদেশে দশ বছর থেকে তিনি যা উপার্জন করেছিলেন, তাতে তাদের অভাব নেই।
    তানহা ছোটবেলা থেকেই দেখেছে তার বাবা তার মাকে কতটা ভালোবাসতেন। মা সামান্য অসুস্থ হলেই বাবা অস্থির হয়ে যেতেন। তানহা মনে মনে চাইত, তার জীবনেও যেন এমন একজন আসে, যে তাকে এইভাবেই আগলে রাখবে।
    মি. করিম:
    “আমি প্যানকেক বানিয়েছি। তুমি আর তারিন খেয়ে নিও। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, দরজা ভালো করে লক করে রাখবে।”
    তানহা:
    “ঠিক আছে বাবা। কিন্তু কখন ফিরবে?”
    মি. করিম:
    “তিন ঘণ্টার মধ্যে।”
    এই বলে তিনি বেরিয়ে গেলেন।
    তানহা দরজা লক করে তারিনকে ডাকতে গেল।
    তারিন তখন রান্নাঘরে বসে প্যানকেক খাচ্ছিল।
    সেই সকালেই দরজায় বেল বাজল। তানহা দরজা খুলে দেখল সেই ছেলেটি দাঁড়িয়ে। শান্ত, নিশ্চুপ। “কে তুমি?” তানহা প্রশ্ন করল। “আমি তোমাদের নতুন প্রতিবেশী। আজই এসেছি। তোমাদের কাছে কি ইলেকট্রিশিয়ানের নম্বর হবে?” তানহা নম্বরটা দিয়ে দিল। ছেলেটি কোনো কথা না বলে চলে গেল।
    পরদিন স্কুলে
    তানহা স্কুলে গেল। তার সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিল ঐশী —শৈশবের বন্ধু, প্রায় বোনের মতো।
    ক্লাসে হঠাৎ শিক্ষক বললেন—
    “আজ থেকে আমাদের ক্লাসে নতুন ছাত্র আসছে।”
    সবার দৃষ্টি দরজার দিকে গেল।
    সেই ছেলেটি ঢুকল।
    “হ্যালো, আমি আয়াজ রহমান। আমি রাজধানী থেকে এসেছি। আমার পরিবারে বাবা, মা আর বড় বোন আছে।”
    শিক্ষক হাসলেন।
    “ধন্যবাদ আয়াজ
    । তুমি সামনে খালি সিটে বসো।”
    তানহা তাকে দেখে অবাক হয়ে গেল।
    আয়াজকে তানহাদের সামনের সিটেই বসতে দেওয়া হলো। তানহা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, কিন্তু আয়াজ
    যেন তাকে চিনতেই পারল না।
    টিফিন পিরিয়ডে তানহা ও ঐশী আয়াজের কাছে গেল। “হাই! চিনতে পারছ? কাল আমাদের বাসা থেকে নম্বর নিয়েছিলে।” আয়াজ তানহার দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে ভেসে উঠল অন্য দৃশ্য। কাল নম্বর নিয়ে যাওয়ার পর তার বাবা তাকে চড় মেরেছিলেন দেরি হওয়ার জন্য।
    দেখেছিল তার বাবা-মায়ের সেই চিরচেনা তিক্ত ঝগড়া। বড় বোন আয়েশা তাকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করার চেষ্টা করছিল।
    বর্তমানে ফিরে এসে আয়াজ কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে চলে গেল। ঐশী বিরক্ত হয়ে বলল, “কী অসভ্য ছেলে! এর সাথে কথা বলার দরকার নেই।”
    তানহা কিছু বলল না, কিন্তু তার ভেতরে কেমন যেন অনুভূতি রয়ে গেল।
    স্কুলের ছুটি হলো। আয়াজ হেঁটে বাসায় ফিরছে, আর তানহা ওর পিছন পিছন হাঁটছে; যেহেতু ওদের দুজনের বাসা একই দিকে। আয়াজ হঠাৎ কী যেন মনে করে থমকে দাঁড়াল। তারপর তানহার কাছে গিয়ে (কিছুটা বিরক্তির স্বরে) বলল:
    আয়াজ: তুমি কি আমাকে ফলো করছো?
    তানহা: তোমাকে ফলো করার কোনো ইচ্ছাই আমার নেই। আমার বাসা এই দিকেই।
    আয়াজের তখন মনে পড়ল— “ও হ্যাঁ, ওর বাসা তো এই দিকেই!” এরপর আয়াজ আবার হাঁটতে শুরু করল।
    🌙 সময়ের সাথে সাথে
    স্কুলে তারা প্রায়ই ঝগড়া করত, আবার কখনও চুপচাপ একে অপরকে সাহায্য করত।
    আয়াজ বাইরে থেকে কঠিন ছিল, কিন্তু ভেতরে ছিল ভাঙা।
    তানহা সেটা বুঝতে পারত।
    ধীরে ধীরে, না চাইলেও তার মনে জায়গা করে নিল আয়াজ ।
    ২০১৩ সাল।
    আয়াজের বড় বোন আয়েশা পড়াশোনার জন্য অন্য শহরে চলে যাচ্ছে। (বয়সে সে তার চেয়ে ছয় বছরের বড় ছিল।আর সুন্দর? তার মতো সুন্দর মেয়ে খুব কমই দেখা যায়। চেহারা, ব্যক্তিত্ব, উপস্থিতি— সবদিক থেকেই যেন সে ছিল নিখুঁত।)
    যাওয়ার আগে সে আয়াজকে বলল,
    আয়েশা: আয়াজ, একটা কথা মনে রাখবি— যারা আমাদের যত্ন করে, আমাদেরও উচিত তাদের যত্ন নেওয়া। কারণ সত্যিই যত্ন করার মতো মানুষ এই পৃথিবীতে খুব কম থাকে। তুই নিজের খেয়াল রাখিস ভাই।
    আয়াজ: এই কথার মানে কী আপু?
    আয়েশা: সময় আসুক, সময় হলেই সব বুঝতে পারবি। কিন্তু আমার এই কথাটা সবসময় মনে রাখিস
    ( আয়াজ তখন অঝোরে কাঁদছিল।)
    আয়েশা: কাঁদছিস কেন? আমি তো মাঝেমধ্যে আসব তোকে দেখতে।
    আয়াজ: তুমি না থাকলে আমাকে কে দেখে রাখবে আপু?
    আয়েশা: (একটু হেসে) কেন, তানহা আছে না?
    আয়েশা হাসলেও আয়াজের মন শান্ত হলো না। সে আকুতি করে বলল:
    তুমি আমাকে তোমার সাথে নিয়ে যাও আপু। আমি আর এই জাহান্নামে (নিজের বাসায়) থাকতে চাই না।
    আয়েশা আয়াজ কে জড়িয়ে ধরল, কিন্তু কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে জানত তাদের বাবা-মা কতটা বিষাক্ত । এরপর আয়েশা চলে গেল।
    আয়েশা চলে যাওয়ার পর আয়াজ পার্কে একা বসে কাঁদছিল। তানহা এসে তাকে একটি চকলেট দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করল।পার্কে আসা সাধারণ মানুষগুলো পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কেউ কেউ মুখ টিপে হাসছিল, কেউ আবার বিরক্তির স্বরে বলছিল— “দেখো কাণ্ড! ধামড়া একটা ছেলে মাঝরাস্তায় বসে মেয়েদের মতো হাউমাউ করে কাঁদছে। কোনো লজ্জা-শরম নেই!”
    পেছন থেকে একদল তরুণ বিদ্রূপ করে বলল, “নিশ্চয়ই প্রেমে ছ্যাকা খেয়েছে! ”
    মানুষের এই আজেবাজে কথা আর বাঁকা চাউনি আয়াজের কানে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ওর প্রতিবাদ করার মতো শক্তি ছিল না। আশেপাশের মানুষ আজেবাজে কথা বলছিল, কিন্তু তানহা সেসব গায়ে মাখল না। সে শুধু জানত, এই একরোখা ছেলেটার আড়ালে এক আকাশ কষ্ট লুকিয়ে আছে। সে আয়াজকে একা ফেলে যাবে না।
    ২০২৫ সাল।
    টেলিভিশনের পর্দায় ব্রেকিং নিউজ— সুপারস্টার আয়াজ রহমান আবার এক সাংবাদিকের গায়ে হাত তুলেছেন। নিজের বিলাসবহুল বাসায় মদ খাচ্ছিল আয়াজ । তার ম্যানেজার অস্থির হয়ে বললেন,
    ম্যানেজার: এসব কী হচ্ছে আয়াজ ? আজ আবার নিজেকে এমন তর্কের মুখে ফেললে! তোমার ক্যারিয়ার তো এভাবে শেষ হয়ে যাবে। তুমি এখন সুপারস্টার, এমন ভাবমূর্তি তোমার জন্য কতটা ক্ষতিকর সেটা কি বুঝতে পারছ?
    আয়াজ: (মদের গ্লাসে চুমুক দিয়ে) জীবনটাই তো শেষ হয়ে গেছে, আর আপনি পড়ে আছেন আমার ইমেজ নিয়ে!
    আয়াজ আরও বেশি করে ড্রিঙ্ক করতে শুরু করল। নেশায় চুর হয়ে সে যখন বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে চাইল, তখন ম্যানেজার তাকে বাধা দিলেন।
    ম্যানেজার: কোথায় যাচ্ছ তুমি? এই মাতাল অবস্থায় বাইরে যেও না!
    আয়াজ ম্যানেজারের কথা কানেই তুলল না। তুলবে কী করে, সে তো তখন নিজের মধ্যেই নেই। ম্যানেজার তাকে আটকানোর জন্য ধরতে গেলে আয়াজ সজোরে একটা ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিল। এরপর সে টলমল পায়ে নিজের গাড়িতে গিয়ে বসল এবং ড্রাইভ করে নদীর ধারে চলে এল।
    চারপাশে এক গুমোট হাওয়া বইছিল। ঝোড়ো বাতাসে আয়াজের চুলগুলো এলোমেলো হয়ে উড়ছে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আয়াজের মুখে তখন এক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
    সে চিৎকার করে বলল, “আজ আমি নিজেকে এই কষ্ট থেকে মুক্তি দেব!”
    নদীতে ঝাঁপ দিল আয়াজ । জলের সেই অতল গহ্বরে আয়াজের দম যখন প্রায় বন্ধ হয়ে আসছিল, ফুসফুস ফেটে যাওয়ার মতো যন্ত্রণায় সে যখন ছটফট করছিল, ঠিক তখনই তার ঝাপসা চোখের সামনে এক অলৌকিক দৃশ্য ভেসে উঠল।
    সে দেখল, চারপাশের নীলচে অন্ধকার ভেদ করে তানহা তার দিকে এগিয়ে আসছে। ঠিক যেন কোনো এক মৎস্যকন্যার মতো সাবলীল ভঙ্গিতে সে সাঁতরে আসছে আয়াজের দিকে। জলের নিচে তানহার সেই দীর্ঘ চুলগুলো ঢেউয়ের মতো খেলছিল, আর তার শরীরের প্রতিটি ভঙ্গি ছিল মায়াবী।তখন ঠিক সেই মুহূর্তে কানে ভেসে এল আপুর সেই কথা— “যারা আমাদের কেয়ার করে, তাদের কেয়ার করা উচিত।”
    হঠাৎ এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া আয়াজ কে ছুঁয়ে গেল। চোখ মেলে সে দেখল এক অপার্থিব জগৎ। চারপাশে রঙিন ফুল, পাখি আর প্রজাপতি। পাশে বৃক্ষাকৃতির ঘড়ি , যা থমকে আছে।
    টিক… টিক… কোনো শব্দ নেই।
    পাখিগুলো ছিল সেখানে, কিন্তু একটুও নড়ছিল না।
    প্রজাপতিগুলো শূন্যে ডানা মেলে স্থির হয়ে ছিল।
    মনে হচ্ছিল, সময় নিজেই যেন… ভেঙে পড়েছে।
    তারপর সে দেখল সামনে সাদা গাউন পরা একটি মেয়ে— তার প্রিয় তানহা।
    তানহা কাছে এসে হাসল। তার চুলের সুবাসে চারপাশ ম ম করছে। আয়াজ চোখে পানি চলে এল।
    আয়াজ তাকে স্পর্শ করতে যেতেই তানহা সোনালি ধূলিকণার মতো বাতাসে মিলিয়ে গেল। সাথে সাথে সেই মৃত ঘড়িটি সচল হয়ে উঠল— টিক টিক টিক…
    আয়াজ স্থির হয়ে গেল।
    তার শ্বাস যেন থমকে গেল।
    তার চারপাশের পৃথিবী আবারও অন্ধকারে ঢেকে গেল।
    আর হঠাৎই, এক ঝড়ের মতো বাস্তবতা তাকে আঘাত করল।
    সে কোনো স্বপ্নে ভেসে নেই।
    সে অন্য কোনো জগতেও নয়।
    আয়াজ বুঝতে পারল, সে আসলে একটি কফিনে বন্দি। জীবনের ঘড়িটি হয়তো শেষ বারের মতো চলার সংকেত দিচ্ছে।
    (চলবে…)

    4
    4 Comments
    • আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও প্রাণঢালা অভিনন্দন গ্রহণ করুন!

    • বিষাক্ত শৈশবের করুণ পরিণতি….🖤

    • গল্পের প্লটটি বেশ শক্তিশালী এবং আধুনিক জীবনের এক অন্ধকার দিককে স্পর্শ করেছে।
      পরবর্তী পর্বের জন্য আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি

    • এককথায় অসাধারণ এবং রুদ্ধশ্বাস একটি সূচনা!

Skip to toolbar