-
পরমতসহিষ্ণুতা : সভ্যতার অন্তর্লীন প্রজ্ঞা
__ পি কে সরকারমানুষ একা বাঁচে না। সে পরিবারে বাঁচে, সমাজে বাঁচে, রাষ্ট্রে বাঁচে, এবং সর্বোপরি একটি বৃহত্তর মানবসমাজের অংশ হিসেবে বাঁচে। এই সহাবস্থানের জগতে সকল মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, মূল্যবোধ, রুচি, সংস্কৃতি ও জীবনদর্শন কখনোই একরকম হতে পারে না। প্রকৃতির মতো মানবসমাজও বৈচিত্র্যময়। ফুলের বাগানে যেমন কেবল একটি ফুল থাকলে সৌন্দর্য পূর্ণতা পায় না, তেমনি সমাজও একমাত্রিক চিন্তায় প্রাণবন্ত হতে পারে না। ভিন্নতা তাই কোনো দুর্বলতা নয়; বরং মানবসভ্যতার অন্যতম শক্তি। আর এই ভিন্নতাকে সম্মান করার যে মহান মানবিক গুণ, তারই নাম পরমতসহিষ্ণুতা।
পরমতসহিষ্ণুতা কেবল একটি সামাজিক আচরণ নয়; এটি এক গভীর নৈতিক চেতনা। এর অর্থ এই নয় যে, অন্যের মতের সঙ্গে অবশ্যই একমত হতে হবে। বরং এর প্রকৃত অর্থ হলো— আমি তোমার মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করব। এই বোধের মধ্যেই নিহিত রয়েছে সভ্যতার পরিণত রূপ।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, পৃথিবীর অধিকাংশ সংঘাত, যুদ্ধ, রক্তপাত এবং বিভেদের মূল কারণ ছিল অসহিষ্ণুতা। যখন কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা রাষ্ট্র মনে করে যে কেবল তার চিন্তাই সত্য এবং অন্য সকল চিন্তা ভ্রান্ত, তখনই শুরু হয় দমন, নিপীড়ন ও সংঘর্ষের পথচলা। মতের ভিন্নতাকে যখন শত্রুতা হিসেবে দেখা হয়, তখন সমাজে অবিশ্বাস জন্ম নেয়; আর অবিশ্বাসের মাটি থেকেই ঘৃণার বিষবৃক্ষ বেড়ে ওঠে।
অন্যদিকে, যে সমাজে পরমতসহিষ্ণুতা বিদ্যমান থাকে, সেখানে মতের পার্থক্য বিভাজনের কারণ হয় না; বরং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার বিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করে। সেখানে বিতর্ক থাকে, কিন্তু বিদ্বেষ থাকে না; মতভেদ থাকে, কিন্তু মনভেদ থাকে না। কারণ একটি পরিণত সমাজ জানে, সত্যের একক মালিক কেউ নয়। সত্যের অনুসন্ধান বহু কণ্ঠ, বহু অভিজ্ঞতা এবং বহু দৃষ্টিভঙ্গির সম্মিলিত যাত্রা।
বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো মতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি সংযুক্ত হলেও হৃদয়ের দূরত্ব অনেক ক্ষেত্রে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা প্রায়ই দেখি, ভিন্নমত প্রকাশ করলেই মানুষ একে অপরকে অপমান করে, হেয় করে, ঘৃণা ছড়ায়। যুক্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণকে গুরুত্ব দেয়। ফলে সংলাপের সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিভাজনের দেয়াল ক্রমেই উঁচু হতে থাকে।
কিন্তু সভ্যতার অগ্রযাত্রা কখনো একক কণ্ঠের মাধ্যমে সম্ভব হয়নি। বিজ্ঞান, দর্শন, সাহিত্য, রাজনীতি কিংবা সংস্কৃতি— প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন চিন্তার জন্ম হয়েছে প্রশ্ন, মতভেদ এবং মুক্ত আলোচনার মধ্য দিয়ে। যে সমাজ প্রশ্নকে ভয় পায়, ভিন্নমতকে দমন করে, সে সমাজ সাময়িকভাবে স্থির থাকতে পারে; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার চিন্তার বিকাশ থেমে যায়। কারণ স্বাধীন চিন্তার বাতাস ছাড়া জ্ঞানের বৃক্ষ বিকশিত হয় না।
পরমতসহিষ্ণুতা মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা সামাজিক সম্পর্কে অধিকাংশ দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো— আমরা শুনতে চাই কম, বলতে চাই বেশি। আমরা বুঝতে চাই কম, বিচার করতে চাই বেশি। অথচ একজন মানুষ যখন অন্যের অবস্থান থেকে বিষয়কে দেখার চেষ্টা করে, তখন তার মধ্যে সহমর্মিতা জন্ম নেয়। আর সহমর্মিতাই সহিষ্ণুতার প্রথম পাঠ।
সত্যিকার অর্থে পরমতসহিষ্ণুতা দুর্বলতার পরিচয় নয়; এটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ। যে ব্যক্তি নিজের বিশ্বাস সম্পর্কে নিশ্চিত, সে ভিন্নমতকে ভয় পায় না। ভয় পায় সে-ই, যার বিশ্বাসের ভিত দুর্বল। তাই ইতিহাসে দেখা যায়, মহান চিন্তাবিদরা কখনো প্রশ্নকে দমন করেননি; বরং প্রশ্নকে স্বাগত জানিয়েছেন। কারণ তারা জানতেন, সত্যের শক্তি যুক্তির মধ্যেই নিহিত, জবরদস্তির মধ্যে নয়।
রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও পরমতসহিষ্ণুতা একটি অপরিহার্য মূল্যবোধ। গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো মতের বহুমাত্রিকতা। বিরোধী মতকে শত্রু হিসেবে নয়, বরং বিকল্প চিন্তার উৎস হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিপক্বতা প্রকাশ পায়। যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকে, সেখানে নাগরিক স্বাধীনতা বিকশিত হয়; আর যেখানে ভিন্নমতকে ভয় করা হয়, সেখানে স্বাধীনতার পরিসর সংকুচিত হতে থাকে।মানবসভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাস আমাদের একটি গভীর শিক্ষা দেয়— শক্তি দিয়ে মানুষকে নীরব করা যায়, কিন্তু সম্মান অর্জন করা যায় না। ভয় দেখিয়ে আনুগত্য আদায় করা যায়, কিন্তু হৃদয়ের বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। প্রকৃত শান্তি আসে তখনই, যখন মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে করে, নিজের কথা বলার অধিকার অনুভব করে এবং অন্যের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকেও সমানভাবে মর্যাদা দেয়।
পরমতসহিষ্ণুতা তাই কেবল একটি সামাজিক গুণ নয়; এটি সভ্যতার আত্মা। এটি মানুষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে, বিভেদের দেয়াল ভেঙে দেয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তি নির্মাণ করে। যে সমাজ এই মূল্যবোধকে ধারণ করে, সে সমাজে মতের বৈচিত্র্য থাকে, কিন্তু সংঘাত কমে; প্রতিযোগিতা থাকে, কিন্তু বিদ্বেষ জন্ম নেয় না; স্বাধীনতা থাকে, কিন্তু বিশৃঙ্খলা নয়।
অতএব, আমাদের মনে রাখতে হবে— সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় একমতের আধিপত্যে নয়, বরং ভিন্নমতের সহাবস্থানে। পরমতসহিষ্ণুতা সেই মহৎ প্রজ্ঞা, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়, মতের কারণে শত্রু নয়। কারণ শান্তি, সম্প্রীতি ও মানবিকতার যে বৃক্ষ আমরা সমাজে রোপণ করতে চাই, তার প্রথম বীজটির নামই হলো পরমতসহিষ্ণুতা। এটি শুধু একটি শব্দ নয়; এটি সভ্য সমাজ ও সুস্থ রাষ্ট্র নির্মাণের চিরন্তন বীজমন্ত্র।3 Comments
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik
afrida-jahar
@afrida-jahar
আমীর হামজা (লাম)
@amit
Md-Akadullah
@md-akadullah
Md. Omar Faruk
@mofaruk



চমৎকার। ভাল লাগলো। শুভ কামনা।