-
ছারখার বস্তি
মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমনতখন ২০২০ সাল। আমি ইসলামিয়া হাই স্কুলের নবম শ্রেণির এক চঞ্চল শিক্ষার্থী। কৈশোরের সেই দিনগুলো বেশ আনন্দ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়েই কাটছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি স্কুলের বন্ধুদের আড্ডা আর নানা রকম কার্যক্রম—সব মিলিয়ে জীবনটা একটা চেনা ছন্দে চলছিল। নতুন বছরের শুরুতেই আমাদের বিদ্যালয়ে বার্ষিক খেলাধুলার ধুম লেগে গেল। দৌড়ঝাঁপ, হইচই আর মাঠ কাঁপানো সেই দিনগুলো শেষ হতে না হতেই স্কুল প্রাঙ্গণে এলো এক নতুন উন্মাদনা বিতর্ক প্রতিযোগিতা।
আমাদের বাংলা স্কুল প্রাঙ্গণে এই বিতর্ক সভা ও প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। বিতর্কের নাম শুনলেই মনের ভেতর এক অন্যরকম রোমাঞ্চ কাজ করত। বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের দল গঠন করা হলো। আমরা দিন-রাত এক করে যুক্তির পিঠে যুক্তি সাজানোর সব রকম প্রস্তুতি ও কঠিন প্রশিক্ষণ শেষ করলাম। দলের দলনেতা ছিল আমাদের সহপাঠী বাবলু, আর আমি ছিলাম দলের দ্বিতীয় বক্তা।
অবশেষে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিনটি। সকাল থেকেই বুকের ভেতর এক অদ্ভুত উত্তেজনা আর নার্ভাসনেস কাজ করছিল। বিতর্কের উদ্দেশ্যে সকাল ঠিক ৮টায় আমরা সবাই আমাদের ইসলামিয়া হাই স্কুলে এসে জড়ো হলাম। সেখান থেকে স্যারদের তত্ত্বাবধানে রওনা হয়ে সকাল ৯টার মধ্যে আমরা মূল প্রতিযোগিতা ভেন্যু অর্থাৎ বাংলা স্কুলে পৌঁছে গেলাম। হলভর্তি দর্শক আর বিপক্ষ দলের ধারালো যুক্তি সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতা জমে উঠেছিল একদম ক্ষুরধার। আমরা আমাদের সর্বোচ্চটা দিয়ে লড়েছিলাম। কিন্তু দিনটি হয়তো আমাদের ছিল না। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর, একেবারে শেষ মুহূর্তে সামান্য কয়েক পয়েন্টের ব্যবধানে আমরা হেরে গেলাম।
এতদিনের খাটাখাটনি আর এত কাছাকাছি এসে হেরে যাওয়ার পর আমাদের পুরো দলের মন খারাপ হয়ে গেল। বাবলুসহ আমরা সবাই তখন হারের সেই বিষণ্ণতা আর মন খারাপের রেশ কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলাম। ঠিক তখনই আচমকা বজ্রপাতের মতো এক দুঃসংবাদ নিয়ে হাজির হলেন আমাদের শিক্ষক। স্যারের মুখটা তখন ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি এসে আমাদের জানালেন, “রূপনগর বস্তিতে ভয়াবহ আগুন লেগেছে!”খবরটা শোনা মাত্রই আমাদের দলনেতা বাবলুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। কারণ ওর পুরো পরিবার ওই রূপনগর বস্তিতেই ছোট একটা ঘরে থাকত। বাবলু মুহূর্তের মধ্যে গভীর এক অজানা আতঙ্কে শিউরে উঠল এবং সবার সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়ল। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং আমাদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে স্যার আমাদের নিয়ে দ্রুত নিজেদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ফিরে যাওয়ার জন্য রওনা হলেন।
আমরা যখন ফিরতি পথ ধরলাম, চারপাশের দৃশ্য দেখে বুকটা কেঁপে উঠল। পথিমধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম অগ্নিকাণ্ডের সেই ভয়াবহ রূপ আর চারপাশের মানুষের বুকফাটা হাহাকার। পথচলতি বস্তিবাসীদের চোখে-মুখে চরম আতঙ্ক, নারীদের আর্তনাদ, আর তাড়াহুড়ো করে ঘর থেকে যেটুকু সম্ভব আসবাবপত্র ও মালামাল বের করে আনার এক আকুল, ব্যর্থ চেষ্টা। এই দৃশ্য দেখে বাবলু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। চলন্ত রিকশা থেকেই ও হুট করে নেমে পড়ল এবং চোখের পলকে ভিড়ের মাঝে নিজের পরিবারের খোঁজে তার বাসার দিকে দৌড় দিল। আমরা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এর কিছু সময় পর আমরা অত্যন্ত ভারী মনে খবর পেলাম, বাবলুদের ঘরসহ ওদের সর্বস্ব সেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তাসের ঘরের মতো বিলীন হয়ে গেছে ওদের মাথা গোঁজার শেষ আশ্রয়টুকু।
তখন বিকেল গড়িয়ে এসেছে। চারদিকের সেই কালো ধোঁয়া আর মানুষের কান্নার টানে আমিও আর ঘরে স্থির থাকতে পারলাম না। বিকেলের দিকে আমি নিজে সেই রূপনগর বস্তির ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু সেখানে গিয়ে যা দেখলাম, তা দেখার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। চোখের সামনে কোনো ঘরবাড়ি ছিল না, ছিল শুধু সারি সারি কালো কয়লা আর ধ্বংসস্তূপ। পুরো বস্তিটা আগুনে পুড়ে একেবারে ছারখার হয়ে গেছে। মানুষগুলো সব হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।
দিনটি ছিল ২০২০ সালের ১১ই মার্চ। একদিকে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর ছড়াচ্ছিল, আর অন্যদিকে চোখের সামনে এক নিমিষেই একঝাঁক মানুষের স্বপ্ন ও সংসার ছাই হয়ে যাওয়ার এই নির্মম দৃশ্য। আমার জীবনের ডায়েরিতে এই দিনটি এক গভীর ক্ষত এবং বিষাদময় এক স্মৃতি হয়ে চিরকাল রয়ে গেল।
8 Comments-
-
দুটো কষ্ট একসাথে এত সাবলীলভাবে লেখা হয়েছে যে পাঠক নিজেও সেই বিকেলে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
বাবলুর কথা মনে থাকবে। লেখার জন্য ধন্যবাদ। -
Friends
তিতা ফুল
@nadia1
নূপুর
@jahanjhumongmail-com
রেদোয়ান শাকিল
@readean
অথই মিষ্টি
@atiymistyn48
mmh mukul
@mmhmukul
Shimul Shek
@shimulshek
সালমা শিমু
@salmashimu74gmail-com
সাইফুর রহমান
@saadalqalam
কাজী এহসানুল হক জিহাদ
@jihad01



nice