-
খোলস উন্নয়ন অধিদপ্তর
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
আমাদের দেশে উন্নয়নের শেষ নেই। রাস্তা উন্নয়ন, সেতু উন্নয়ন, শিক্ষা উন্নয়ন, এমনকি বিবেক উন্নয়নেরও নানা প্রকল্প আছে। তবে সবচেয়ে সফল প্রকল্পটি সম্ভবত “খোলস উন্নয়ন প্রকল্প”। এই প্রকল্পের আওতায় মানুষকে ভেতর থেকে নয়, বাইরে থেকে উন্নত করা হয়। কারণ ভেতর উন্নত করা কষ্টকর; বাইরে উন্নত করা সহজ।
আমি এই প্রকল্পের কথা প্রথম জানতে পারি আমাদের গ্রামের সম্মানিত ব্যক্তি হাজী করিম বক্স সাহেবের কাছ থেকে। তিনি একদিন চায়ের দোকানে বসে ঘোষণা দিলেন,
—ভাইসব, মানুষ হইতে হইলে আগে খোলস ঠিক করতে হবে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম,
—ভেতরটা?
তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন,
—ভেতর দেখব কে? মানুষ কি এক্স-রে মেশিন নাকি?
চায়ের দোকানের সবাই মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। আমি বুঝলাম, বড় জ্ঞানগর্ভ কথা বলা হয়েছে।
এরপর থেকেই গ্রামে খোলস উন্নয়ন আন্দোলন শুরু হলো।
যে লোকটি সারা জীবন বাজারে বাকিতে চাল-ডাল নিয়ে দোকানদারকে কাঁদিয়েছে, সে হঠাৎ সমাজসেবক হয়ে গেল। এখন সে ফেসবুকে প্রতিদিন লিখে, “সততাই সর্বোত্তম নীতি।”
যে ব্যক্তি নিজের ভাইয়ের জমি দখল করেছে, সে শুক্রবারে প্রথম কাতারে দাঁড়িয়ে ছবি তোলে।
যে শিক্ষক ক্লাসে পাঁচ মিনিটের বেশি থাকলে মাথা ঘোরে, তিনি শিক্ষা নিয়ে সেমিনারে তিন ঘণ্টা বক্তৃতা দেন।
যে রাজনীতিবিদ জনগণকে দেখলে রাস্তা বদলে ফেলেন, তিনি নির্বাচনের সময় শিশু কোলে নিয়ে ছবি তোলেন।
সবাই খোলস পাল্টাতে ব্যস্ত।
গ্রামের মানুষ এতটাই সচেতন হয়ে গেল যে একদিন ইউনিয়ন পরিষদে “খোলস বিষয়ক সেমিনার” আয়োজন করা হলো।
সভাপতি সাহেব বক্তৃতা দিলেন,
—দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো ভালো মানুষ।
সামনের সারিতে বসা লোকজন হাততালি দিল।
আমি পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলাম,
—এই যে সভাপতি সাহেব, তিনি কি ভালো মানুষ?
লোকটি ফিসফিস করে বলল,
—অবশ্যই। গত মাসে তিন বিঘা সরকারি জমি নিজের নামে লিখাইছে। এত বড় সাহস সবার থাকে না।
আমি বুঝলাম, ভালো মানুষের সংজ্ঞা আপডেট হয়েছে।
সেমিনারের শেষে “আদর্শ খোলস পদক” দেওয়া হলো। পুরস্কার পেলেন মফিজ সাহেব।
মফিজ সাহেব এমন একজন ব্যক্তি, যিনি জীবনে কাউকে সরাসরি অপমান করেন না। তিনি খুব ভদ্র।
তিনি বলেন না, “তুমি গাধা।”
তিনি বলেন, “আপনার চিন্তার গভীরতা আমাকে বিস্মিত করেছে।”
তিনি বলেন না, “আপনি চোর।”
তিনি বলেন, “আপনার সম্পদ বৃদ্ধির রহস্য গবেষণার বিষয় হতে পারে।”
তিনি বলেন না, “আপনি মিথ্যাবাদী।”
তিনি বলেন, “আপনার কল্পনাশক্তি সত্যিই অসাধারণ।”
ভদ্রতার এমন খোলস খুব কম মানুষই তৈরি করতে পারে।
এর কিছুদিন পর সরকার নতুন একটি বিভাগ চালু করল—“জাতীয় খোলস উন্নয়ন অধিদপ্তর।”
তাদের মূল কাজ হলো মানুষকে সম্মানজনক মুখোশ সরবরাহ করা।
অধিদপ্তরের স্লোগান:
“ভেতর যেমনই হোক, বাইরে হোন উজ্জ্বল।”
নতুন চাকরিও বের হলো।
খোলস পরিদর্শক,
খোলস প্রকৌশলী,
খোলস রক্ষণাবেক্ষণ কর্মকর্তা,
এমনকি খোলস নিরীক্ষকও।
একদিন শুনলাম আমার এক বন্ধু চাকরি পেয়েছে “সিনিয়র খোলস অডিটর” হিসেবে।
আমি তাকে অভিনন্দন জানালাম।
সে বলল,
—কাজটা খুব কঠিন।
—কী করতে হয়?
—কে কত বড় ভণ্ড, সেটা দেখে তার খোলসের মান নির্ধারণ করতে হয়।
—তাহলে তো সহজ!
—না। বড় সমস্যা হলো, অনেকে খোলস এত নিখুঁত বানায় যে ভেতরের মানুষটাকে খুঁজেই পাওয়া যায় না।
আমি মুগ্ধ হলাম।
প্রযুক্তির যুগে খোলসও ডিজিটাল হলো।
এখন মানুষ বাস্তব জীবনের চেয়ে অনলাইনে বেশি ভালো।
ফেসবুকে ঢুকলেই মনে হয় দেশটা ফেরেশতায় ভরে গেছে।
সবাই মানবতাবাদী।
সবাই দেশপ্রেমিক।
সবাই নীতিবান।
সবাই জ্ঞানী।
কেবল সমস্যা হলো, এদের বেশিরভাগের সঙ্গে বাস্তবে দেখা হলে পৃথিবীটা হঠাৎ আগের মতো হয়ে যায়।
একবার এক ভদ্রলোক অনলাইনে লিখলেন,
“মানুষের প্রতি ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন।”
পোস্টটি ভাইরাল হলো।
ঠিক আধঘণ্টা পরে তিনি রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়ার জন্য এমন যুদ্ধ করলেন যে আশপাশের কুকুর পর্যন্ত বিব্রত হয়ে গেল।
আরেকজন প্রতিদিন দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখেন।
পরে জানা গেল, নিজের অফিসে কলম পর্যন্ত বাসায় নিয়ে যান।
তিনি যুক্তি দিলেন,
—জাতীয় সম্পদ তো জনগণের। আমিও জনগণ।
যুক্তির কাছে আমরা সবাই পরাজিত।
এরই মধ্যে দেশের সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিল।
খোলসের ঘাটতি।
চাহিদা এত বেড়ে গেল যে বাজারে খোলস পাওয়া যাচ্ছে না।
মানুষ লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ চাইছে “ধার্মিক খোলস”।
কেউ “সুশীল খোলস”।
কেউ “দেশপ্রেমিক খোলস”।
কেউ “বিপ্লবী খোলস”।
এক দোকানদার বিরক্ত হয়ে বলল,
—ভাই, সব শেষ। শুধু “নিরীহ খোলস” আছে।
ক্রেতা ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,
—নিরীহ খোলস দিয়ে হবে না। আমাকে এমন খোলস দেন, যেটা পরে মানুষ ভয়ও পাবে আবার সম্মানও করবে।
দোকানদার বলল,
—ওটা প্রিমিয়াম ক্যাটাগরি।
এর দাম বেশি।
এদিকে একদল গবেষক নতুন গবেষণা প্রকাশ করলেন।
তারা বললেন, মানুষের ম্যান্টল বা ভেতরের প্রাণীটি কখন বের হয়?
গবেষণার ফলাফল:
ক্ষমতা পেলে।
টাকা পেলে।
মাইক পেলে।
ফেসবুক আইডি পেলে।
অথবা আত্মীয়ের বিয়েতে মুরগির রান কম পেলে।
জাতি বিস্মিত হলো।
গবেষণাটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেল।
তবে সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটল আমাদের গ্রামে।
একদিন প্রবল বৃষ্টি হলো।
সবাই ঘরে।
হঠাৎ খবর এলো, গ্রামের সব খোলস নাকি ভিজে নরম হয়ে গেছে।
মানুষের আসল চেহারা বের হতে শুরু করেছে।
যে ভদ্রলোক সারা বছর নীতিকথা বলেন, তিনি ত্রাণের চাল আগে নিজের ঘরে তুললেন।
যে সমাজসেবক সেলফি তুলে সাহায্য করেন, তিনি ক্যামেরাম্যান না আসা পর্যন্ত বন্যার্তকে অপেক্ষা করতে বললেন।
যে নেতা জনগণের সেবার কথা বলেন, তিনি নিজের জেনারেটরের জন্য তিনটি পাড়া অন্ধকার করে দিলেন।
লোকজন হতবাক।
কেউ কাউকে চিনতে পারছে না।
অথচ আসল সমস্যা ছিল উল্টো।
তারা প্রথমবারের মতো একে অপরকে সত্যিকার অর্থে চিনতে শুরু করেছে।
পরদিন জরুরি সভা ডাকলেন গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
সিদ্ধান্ত হলো—খোলস আরও শক্তিশালী করতে হবে।
কারণ সত্য প্রকাশ পেলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সভায় এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়ালেন।
তিনি বললেন,
—তোমরা সবাই ভুল করছ।
ঘরে নীরবতা।
বৃদ্ধ বললেন,
—খোলস দরকার। সভ্যতার জন্য দরকার। কিন্তু যদি মানুষ সারাজীবন শুধু খোলস পালিশ করে, ভেতরের মানুষটাকে কখন ঠিক করবে?
সবাই চুপ।
কারণ এই প্রশ্নের উত্তর দিলে খোলস ফেটে যেতে পারে।
আজও দেশে খোলস উন্নয়ন অধিদপ্তর চলছে।
নতুন নতুন প্রকল্প হচ্ছে।
খোলস আরও চকচকে হচ্ছে।
সার্টিফিকেট দেওয়া হচ্ছে।
পদক দেওয়া হচ্ছে।
সেমিনার হচ্ছে।
শপথ নেওয়া হচ্ছে।
কেবল ভেতরের ম্যান্টলটি আগের মতোই বসে আছে।
শান্ত।
নীরব।
সুযোগের অপেক্ষায়।
আর আমরা সবাই ব্যস্ত তাকে লুকিয়ে রাখতে।
কারণ আমাদের সমাজে ভালো মানুষ হওয়ার চেয়ে ভালো মানুষের মতো দেখানো অনেক সহজ।
এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই শিল্পে আমরা বিশ্বমান অর্জন করেছি।2 Comments
Friends
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মানিকুল ইসলাম মানিক (কবি/সাহিত্যিক)
@manik123mmmgmail-com
Sol Nova
@tasnuvatamanna
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Kazi Adam
@kaziadam
Syed Farah
@syedfarah
naznin shamim
@nazninshamim
Poly Alam
@butterflywords
রাইসা আনজুম (পর্শি)
@raisaanjumporshi

‘ভালো মানুষের সংজ্ঞা আপডেট হয়েছে’—লাইনটা আমাদের বর্তমান সমাজের জন্য এক্কেবারে একশতে একশ সত্যি!