Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    • 4 months, 1 week ago

    পিতৃহারা আর্তনাদ

    ​ঘর জুড়ে এক অচেনা, ভারী নীরবতা। যে ঘরে ফজরের আযানের পর বাবার কোরআন তেলাওয়াতের মৃদু গুঞ্জন শোনা যেত, যেখানে সকালে চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার শব্দ আর বাজারের গল্প ছিল নিত্যদিনের ঘটনা, আজ সেই ঘরটাই যেন দম বন্ধ করে আছে। দেওয়ালের পুরাতন ঘড়িটার টিক টিক শব্দ এখন আর সময়ের হিসেব দেয় না, বরং প্রতিটি টিক যেন গভীর শূন্যতার জানান দেয় আরিশা-কে।

    ​প্রায় দু’মাস হলো। বাবা আকমল হোসেন সাহেবের আকস্মিক ইন্তেকালের পর থেকেই তাদের পরিবার এক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রথম ক’দিন আত্মীয়-স্বজনদের ভিড় ছিল, সমবেদনা ছিল, জানাজার পর সবাই আসছিলেন। এখন সবাই চলে গেছেন, পড়ে আছে শুধু শূন্যতা আর সেই অসহ্য নীরবতা। বাবার প্রিয় তসবিহ-টি শেলফের উপর তেমনই রাখা আছে, আরিশা সেটি স্পর্শ করতে ভয় পায়। তসবিহ-টা যেন বাবার হাতে ধরার স্মৃতি নিয়ে আছে, আর সেই স্পর্শের অনুপস্থিতিটাই এখন সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা।

    ​মা রওশন আরা বেগম শোকের ভারে একেবারেই ভেঙে পড়েছেন। সারাদিন জায়নামাজে বসে থাকেন, অথবা বিছানায় শুয়ে থাকেন চুপচাপ। দেওয়ালে ঝোলানো বাবার ছবির দিকে তাঁর একপলক দৃষ্টি। আরিশা যখন খাবার নিয়ে আসে, তিনি শুধু মাথা নেড়ে না করে দেন। ইশারায় বোঝান, তাঁর ক্ষিদে নেই। এই নীরব শোকের মোকাবিলা করা আরিশা’র জন্য সবচেয়ে কঠিন। মায়ের চোখে পানি নেই, তাই হয়তো আরিশা’র চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু ঝরে।

    ​ছোট ভাই ফারহান, সবে নবম শ্রেণিতে উঠেছে। বাবার হঠাৎ মৃত্যুতে সে যেন দিকভ্রান্ত। হাসিখুশি, চঞ্চল ছেলেটা এখন ঘরে বসে থাকে, বইয়ের পাতায় চোখ থাকলেও মন থাকে দূরে কোথাও। আরিশা বোঝে, ফারহান বড় হয়ে উঠছে, আর এই কঠিন সময়ে তার মাথার উপর থেকে নির্ভরতার ছায়া সরে গেল। সে জানে না কীভাবে ভাইকে সান্ত্বনা দেবে, কারণ তার নিজেরই এখন নির্ভরতার প্রয়োজন।
    ​আরিশা, বাইশ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া, এখন এই পরিবারের একমাত্র অভিভাবক। আকমল সাহেবের স্বল্প সঞ্চয় ছিল, কিন্তু তা দিয়ে আর ক’দিন চলবে? প্রতি মাসের শুরুতেই বাড়ির মালিকের কড়া গলায় ভাড়া চাওয়ার অভ্যাসটা এখন আরও বেশি নির্মম মনে হয়। মাস গেলে ফারহানের স্কুলের বেতন, মায়ের ওষুধের খরচ, আর নিত্যদিনের বাজার খরচ সব কিছুর ভার এখন তার কাঁধে।

    ​একদিন গভীর রাতে, যখন চারদিক শান্ত, আরিশা বাবার পুরোনো কাঠের সিন্দুকটি খুলল। সিন্দুকের ভেতরের চেনা গন্ধ পুরোনো কাগজপত্রের গন্ধ, কর্পূরের মিশ্রিত ঘ্রাণ, আর বাবার কাপড়ের পরিচিত সুবাস তার বুক চিরে গভীর দীর্ঘশ্বাস হয়ে বেরিয়ে এলো। এই মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়লে চলবে না। সে সিন্দুকের তলা থেকে একটি ছোট চামড়ার ব্যাগ বের করলো। সেখানে পাওয়া গেল কিছু প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, ব্যাঙ্কের পাসবুক, আর একটি ভাঁজ করা চিঠি। বাবার অবসরকালীন সামান্য কিছু টাকা হাতে আসবে, কিন্তু তা পেতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

    আর এই মুহূর্তে প্রয়োজন নগদ অর্থের।
    ​আরিশা সিদ্ধান্ত নিলো, তাকে কাজ খুঁজতে হবে। সেলাইয়ের কাজ সে খুব ভালো জানে। পাড়ার করিম চাচা-র দর্জির দোকানে গিয়ে কথা বলল। করিম চাচা আকমল সাহেবকে চিনতেন, তিনি প্রথমে সহানুভূতির দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর বললেন, “আরিশা মা, এই ছোট কাজ তুমি কেন করবে? তোমার বাবা শুনলে…”

    ​আরিশা মাথা নিচু করে দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “করিম চাচা, এখন ছোট-বড় ভাবার সময় নেই। আমার কাজ চাই। আমি মজুরিতে সেলাই করে দেব।”
    ​করিম চাচা তাকে কিছু বাচ্চাদের ফ্রক আর কামিজ সেলাইয়ের কাজ দিলেন। মজুরি সামান্য, কিন্তু শুরুটা হলো।

    ​পরের দিন থেকে আরিশা’র নতুন জীবন শুরু। ফজরের আযানের আগেই ঘুম থেকে উঠে যায়। মায়ের সেবা করা, ফারহানকে নামাজ পড়তে বসানো এবং জোর করে নাশতা করানো, তারপর সেলাই মেশিন নিয়ে বসা। মেশিনের একটানা প্যাডেলের আওয়াজ এখন তাদের ঘরে একমাত্র গতিশীলতার শব্দ। হাতের আঙুলে সুঁইয়ের খোঁচা লাগে, কাপড় সেলাই করতে গিয়ে পিঠে ব্যথা ধরে যায়, কিন্তু সে থামে না।

    প্রতিটি সেলাই যেন দারিদ্র্যের সাথে তার নিরলস সংগ্রাম, প্রতিটি ফোঁড় যেন বাবার অসমাপ্ত দায়িত্ব পালনের নীরব অঙ্গীকার।
    ​কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লো। রাতের পর রাত জেগে কাজ করে তার চোখের নিচে কালি পড়েছে। একদিন সেলাই মেশিনটা হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল।

    দীর্ঘদিনের ব্যবহার আর তেল না দেওয়ার কারণে মেশিন জ্যাম হয়ে গেছে। ফারহান ঘরে ছিল, সে দিদিকে শান্ত করতে এগিয়ে এলো। “আপু, আমি কাল তেল এনে দেব। তুমি একটু বিশ্রাম নাও।”

    ​ফারহানের এই আকস্মিক দায়িত্বজ্ঞান আরিশা’কে আরও কষ্ট দেয়। এই বয়সে তার তো ক্রিকেট খেলা বা গল্পের বইয়ে ডুবে থাকার কথা ছিল। কিন্তু সে এখন সংসারের হাল বুঝতে শিখছে।
    ​সেদিন রাতে, আরিশা যখন সেলাইয়ের টুকরোগুলো গোছাচ্ছে, হঠাৎ ফারহান এসে তার পাশে দাঁড়ালো। “আপু, আব্বা কেন চলে গেলেন?”

    ​প্রশ্নটা যেন হিমশীতল তীরের মতো আরিশা’র বুকে বিঁধলো। সে মাথা তুলে ভাইয়ের দিকে তাকালো। ফারহানের চোখে সেই শিশুসুলভ চঞ্চলতা নেই, আছে এক গভীর জিজ্ঞাসা, যা কোনো উত্তর খোঁজে না।
    ​আরিশা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আল্লাহর ইচ্ছা ছিল, ফারহান। আমাদের চেয়ে আল্লাহ তাঁকে বেশি ভালোবাসেন।”

    ​ফারহান শান্তভাবে বলল, “কিন্তু আপু, আব্বা তো বলেছিল, আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে দেখবে। আমার রেজাল্ট বেরোলে মিষ্টি আর আমার পছন্দের সাইকেলটা কিনে দেবে। তাহলে কেন চলে গেলেন?”
    ​আরিশা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলো। এই সময়টাতে বাবা হারানোর যে গভীর বেদনা ফারহানের মধ্যে চাপা ছিল, তা এখন কান্নার রূপে বেরিয়ে এলো। “আপু, আমার খুব ভয় করছে। আব্বা ছাড়া…” ফারহান ফিসফিস করে কাঁদতে লাগলো।

    ​আরিশা ফারহানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। সে নিজেও নিঃশব্দে কেঁদে উঠলো। এই কান্না শুধু বাবার জন্য নয়, এই কান্না তাদের অনিশ্চিত ভবিষ্যতের জন্য, এই কান্না ফারহানের কেড়ে নেওয়া শৈশবের জন্য, এই কান্না মায়ের নীরব কষ্টের জন্য। এই কান্নাটাই হলো ‘পিতৃহারা আর্তনাদ’, যা শুধু ঘরের চার দেওয়াল আর নিরব আকাশ শুনতে পায়।
    ​এই ঘটনার পর আরিশা যেন নতুন করে মনোবল পেল। শুধু সেলাই করে সংসার চলবে না। তাকে আরও কিছু করতে হবে। সে বিকেলবেলা কয়েকটি বাচ্চাকে টিউশন দেওয়া শুরু করলো। তার নিজের লেখাপড়ার জ্ঞান কাজে লাগালো। চারজন ছাত্র এলো। তাদের পড়ানো শেষ করে যখন সে ফিরতো, তখন এশার আযানের সময়।
    ​এক সন্ধ্যায়, বাড়ি ফেরার পথে সে দেখল তাদের পুরনো প্রতিবেশী আক্তার সাহেব, যিনি বাবার একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন, অন্য একজন প্রতিবেশীর সাথে তার পরিবার নিয়ে আলোচনা করছেন।

    ​”আহা, আকমলের স্ত্রী তো অসুস্থ। মেয়েটা একা আর কতদিন টানবে? শেষমেশ খুব কষ্ট হবে মনে হচ্ছে! কারো সাহায্য ছাড়া…”
    ​কথাগুলো আরিশা’র কানে তপ্ত সীসার মতো লাগলো। সে দ্রুত পা চালিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। ভেতরের রাগ আর অভিমান তার চোখের জল শুকিয়ে দিল। সাহায্য? কারো করুণা? না, তা হবে না। সে বাবার সম্মান রক্ষা করবে, নিজের মেহনতে তাদের মাথা উঁচু রাখবে।

    ​রাতে যখন সেলাই মেশিন চলছে, তখন সে নতুন করে প্রতিজ্ঞা নিলো। সেলাই মেশিনের একটানা ঘড়ঘড় শব্দে সে যেন বাবার কণ্ঠস্বর শুনতে পেল—”আরিশা মা, ভয় পেও না। আল্লাহ্ তোমার সহায়। তুমি সাহসী মেয়ে।”

    ​সেলাইয়ের সুতো ছিঁড়ে গেল। সে সুতো বাঁধল। সেলাই মেশিনের তেল ফুরিয়ে এলো, সে ফারহানকে বলে রাখল। শরীর দুর্বল হলো, কিন্তু সে থামল না। প্রতিটি বাধা তার ভেতরে আরও জেদ তৈরি করলো।
    ​মাস শেষ হলো। সেলাইয়ের মজুরি, টিউশনির টাকা, সব মিলিয়ে সে বাড়ির ভাড়া আর ফারহানের স্কুলের বেতন দিতে পারল। টাকাগুলো যখন বাড়ির মালিককে দিল, তখন আরিশা’র মনে হলো, সে আজ বাবার অসমাপ্ত কাজটা শেষ করলো। মালিককে টাকা দেওয়ার পর হাতে যা রইল, তা দিয়ে চলতেই হবে।

    ​সেদিন রাতে মা রওশন আরা বেগম হঠাৎ উঠে বসলেন। আরিশা অবাক হয়ে দেখল, মা উঠে দাঁড়িয়েছেন, দীর্ঘ দু’মাস পর। মা ধীরে ধীরে বাবার ছবিটার দিকে গেলেন। তারপর একটি দীর্ঘ, শীতল শ্বাস নিলেন।
    ​”আকমল, তুমি দেখেছো? আমাদের মেয়েটা…” বলতে গিয়ে তিনি আর পারলেন না, তার চোখে জল এলো। কিন্তু এবার সেই জল শুধু শোকের নয়, তাতে যেন এক চাপা গর্বের ঝলক।
    ​আরিশা ছুটে এসে মাকে জড়িয়ে ধরলো। মা ফিসফিস করে বললেন, “এখন কাঁদিস না, মা। এখন তো তোর বাবার স্বপ্নগুলো পূরণ করার সময়। তুই একা নয়, আমি আছি, আর আল্লাহ্ আছেন।”

    ​সেই রাতে আরিশা অনুভব করলো, পিতৃহারা আর্তনাদ তাকে দুর্বল করেনি, বরং তাকে ইস্পাতের মতো কঠিন করেছে। বাবা নেই, কিন্তু বাবার দায়িত্ব তার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। সেলাই মেশিনের আওয়াজ আরও জোরে হলো। আগামীকালের সূর্য আরও কঠিন দিনের বার্তা নিয়ে আসবে, কিন্তু আরিশা এখন আর একা নয়। সে জানে, এই লড়াই তার একার নয়, এই লড়াই এই পরিবারের অস্তিত্বের।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar