Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    2 months, 3 weeks ago

    “শেষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে তুমি”

    আমি এখন যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকে শেষ ল্যাম্পপোস্টটা দেখা যায় না। কিন্তু আমার মন জানে, এখনও যদি বৃষ্টি হয়, ওই ল্যাম্পপোস্টটার হলদেটে আলোর নিচে শ্যাওলা-ধরা ফুটপাথটা নিশ্চয়ই চিকচিক করে ওঠে। শীতকালে ওর চারপাশে ভিড় করে আসে জোনাকিরা, আর গরমের রাতে পুরনো দিনের মতো এখনও হয়তো কোনও যুবক তার প্রেমিকার জন্য অপেক্ষা করে হাতে দুটো ভাঁজ করা চিঠি আর বুকে একরাশ চাপা অস্থিরতা। সেই যুবকটা আমিই ছিলাম, অথবা আমিই হতে চেয়েছিলাম।
    প্রথমেই মনে পড়ে দীপের কথা। ও ছিল আমাদের ত্রয়ীর মেরুদণ্ড। আমি ছিলাম একটু চুপচাপ, ধ্যানী কবিতা লিখতাম, আর নীলা ছিল স্বপ্নের মতো আর্দ্র, ছায়াঘেরা।

    আমাদের বাড়িগুলো ছিল একটা পুরোনো লেনের শেষ মাথায়। আর সেই লেনের শেষ প্রান্তে ছিল ওই ল্যাম্পপোস্টটা। একটা সময় ছিল যখন দিনের শেষে আমরা তিনজন সেখানে না দাঁড়ালে দিনটা সম্পূর্ণ হতো না। কোনো গোপন পরিকল্পনার জন্ম হতো ওখানে, কিংবা সদ্য দেখা কোনো সিনেমার রিভিউ। দীপের উচ্চকণ্ঠ হাসিটা এখনও আমার কানে বাজে। ওর চোখে ছিল পৃথিবীর প্রতি এক তীব্র আগ্রাসন সবকিছু জয় করার এক নেশা।

    আমাদের যৌবনের সমস্ত এলোমেলো আবেগ, সমস্ত নীরব ভাষা, ওই আলো-ছায়ার খেলার মধ্যেই বেড়ে উঠেছিল।
    আমার আর নীলার প্রেমের বীজ উপ্ত হয়েছিল অনেকটা দীপের মাধ্যমেই। আমি নীলাকে দেখতাম, কিন্তু বলার সাহস পেতাম না। আমার মনের কথাগুলো যেন কেবল দীপের কাছেই পৌঁছাত—ও-ই ছিল আমার বার্তাবাহক, আমার অপ্রকাশিত ভাষার স্বরলিপি।

    “নীলা, তোর জন্য রূপম একটা গান লিখেছে, শোন…”
    দীপের গলাটা ভেসে আসত দূর থেকে, আর আমি লজ্জায় মাটির সঙ্গে মিশে যেতাম। নীলা শান্ত চোখে তাকাত, ওর কালো চোখ দুটোয় যেন লক্ষ লক্ষ তারা জ্বলত, আর সেই তারার আলোয় আমার সমস্ত দ্বিধা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে যেত।

    একদিন দীপের সাইকেলটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেদিন সন্ধ্যা নামার পর শুধু আমি আর নীলা হেঁটেছিলাম। সেদিন বৃষ্টি ছিল না, বাতাসও ছিল না। প্রকৃতি যেন শ্বাস চেপে ধরেছিল আমাদের প্রথম নিরাবরণ নীরবতাটুকু শোনার জন্য।
    “তোর কবিতাগুলো খুব সুন্দর,” নীলা বলেছিল।

    আমার হাত-পা তখন কাঁপছিল। আমি কেবল মাথা নেড়েছিলাম।

    “আর ওই শেষ ল্যাম্পপোস্টের কাছেই কেন যেন সব ভালো কথা মনে আসে, তাই না?”
    আমি সাহস করে ওর দিকে তাকালাম। “জানিস নীলা, কখনও কখনও মনে হয় ল্যাম্পপোস্টটা শুধু আমাদের জন্যই জ্বলে। ওটা সব দেখে, সব জানে… কিন্তু চুপ করে থাকে।”

    আমাদের প্রেমটা ছিল ওই ল্যাম্পপোস্টের আলোর মতোই—ছায়া মাখা, নরম, কিন্তু চারপাশের অন্ধকারকে ভয় পায় না। আমরা কখনোই হাত ধরি নি, কখনোই সরাসরি প্রেম নিবেদন করি নি। আমাদের প্রেম ছিল একে অপরের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা, দীর্ঘ নীরবতা, আর দীপের অনুপস্থিতিতে ঘটা সেইসব সংক্ষিপ্ত মুহূর্তগুলো।

    কিন্তু সময়টা একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না। সেটা আমরা ভালো করেই জানতাম। আর দীপের জীবনের গতি ছিল আমাদের চেয়েও দ্রুত।

    দীপের জীবনের মোড় ঘুরে গেল খুব আচমকা। ও কোনো এক অদ্ভুত নেশায় মেতেছিল পাহাড় দেখবে, পৃথিবীর অন্য প্রান্তে যাবে। ওর কাছে আমাদের এই শহরটা, আমাদের এই ল্যাম্পপোস্টটা—সবটাই ছিল একটা পুরোনো, বাঁধা জীবন। একদিন খুব ভোরে ও চলে গেল। কাউকে কিছু না বলে। শুধু একটা চিরকুট রেখে গেল আমার টেবিলে, সেখানে লেখা ছিল: “আলোর নিচে বেশিদিন থাকা যায় না, রূপম। ছায়াগুলো বড় অস্বস্তি দেয়। কিন্তু তোর আর নীলার ছায়াটা যেন চিরকাল ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে থাকে। আমি ফিরলে যেন সবটা একই রকম দেখতে পাই।”

    দীপের চলে যাওয়াটা ছিল আমাদের জীবনে প্রথম বড়সড় আঘাত। ও শুধু আমার বন্ধু ছিল না, ছিল আমাদের মধ্যেকার সেতু। ও চলে যেতেই আমাদের ত্রয়ীর একটা বাহু ভেঙে পড়ল।

    প্রথম কয়েকমাস আমরা অপেক্ষা করেছিলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতাম—আমি আর নীলা। মনে হতো এই বুঝি দীপের পরিচিত সাইকেলের বেলের আওয়াজ শোনা যাবে।
    অপেক্ষাগুলোই আসলে ‘হারিয়ে যাওয়া সময়’ হয়ে ফিরে আসে।

    দীপের অনুপস্থিতিতে আমার আর নীলার সম্পর্কটা আরও নিবিড় হয়ে উঠল, কিন্তু একই সাথে আরও কঠিন। দীপের চলে যাওয়ার শূন্যতাটা আমাদের মাঝখানে এসে দাঁড়িয়ে গেল। এখন আমি চাইলে নীলার হাত ধরতে পারতাম, বা আমার মনের কথাগুলো স্পষ্ট করে বলতে পারতাম। কিন্তু দীপের স্মৃতি আমাদের দুজনকে বেঁধে রাখল এক নীরব অপরাধবোধে। যেন দীপের স্বপ্নের জগৎটা আমাদের দুজনকে একসাথে থাকতে বারণ করত, যতক্ষণ না ও ফিরে আসে।
    সেই সময়টায় ল্যাম্পপোস্টের আলোটা যেন ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল। ওর নিচে এখন আর হাসি নেই, নেই কোনো দুষ্টু পরিকল্পনা। শুধু দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন।

    একদিন নীলা আমাকে বলল, “দীপের কথা খুব মনে পড়ছে, রূপম। ও না থাকলে যেন সব আলো মরে যায়।”

    আমি ওর দিকে তাকিয়েছিলাম। ওর চোখ দুটো ছলছল করছিল। সেদিন আমার বুকে একটা প্রচণ্ড কষ্ট হয়েছিল। ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের দ্বন্দ্বে আমার তরুণ প্রেমটা যেন শ্বাস নিতে পারছিল না। আমি জানতাম, আমি যদি ওকে সেদিনই আমার ভালোবাসার কথা জানাতাম, তবে ও দীপের স্বপ্নটাকে ঠেলে দিয়ে হয়তো আমার কাছে আসত। কিন্তু আমি পারলাম না। আমার বন্ধুত্বের ঋণ, না-ফেরা সময়ের প্রতি আমার আনুগত্য আমাকে সেদিন নীরব থাকতে বাধ্য করল।
    আমাদের সম্পর্কের শেষ মুহূর্তগুলোও ওই ল্যাম্পপোস্টের নিচে।

    তখন আমি কলেজে। নীলা তার বাবার বদলির জন্য শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। বিদায়ের দিন বিকেলে, যখন শেষবারের মতো সূর্য ডুবছিল, আমরা দুজনে গিয়েছিলাম সেই ল্যাম্পপোস্টটার নিচে।
    পুরো রাস্তাটা ছিল জনশূন্য। গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বিকেলের লাল আলোটা এসে পড়েছিল নীলার মুখে। ও একটা সবুজ শাড়ি পরেছিল, আর ওর খোলা চুলগুলো বাতাসে উড়ছিল।

    “রূপম,” ও ডাকল। ওর গলায় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা।

    আমি ওর দিকে তাকালাম। আমার বুকের ভেতরটা তখন ধুকপুক করছে। এই তো শেষ সুযোগ! এই মুহূর্তে আমাকে বলতে হবে ‘নীলা, যেও না। তোমাকে ছাড়া আমার অস্তিত্ব অর্থহীন।’

    কিন্তু আমার ঠোঁট দুটো যেন সেলাই করা ছিল। আমি কেবল বললাম, “সাবধানে থেকো।”

    নীলা মৃদু হাসল। সেই হাসিটার মধ্যে ছিল একরাশ অভিযোগ, একরাশ না-বলা কথা। ও হয়তো আমার মুখ থেকে কিছু একটা শোনার অপেক্ষা করছিল। ও হয়তো চেয়েছিল, আমার অব্যক্ত প্রেমটা শেষবারের মতো চিৎকার করে উঠুক।

    “রূপম, তুই জানিস,” নীলা বলল, “ওই ল্যাম্পপোস্টটা কেন শুধু আমার চোখে পড়ে? কারণ, ওটা আলো দেয় বলেই চারপাশের অন্ধকারটাকে আরও স্পষ্ট করে দেখায়।”
    ও দাঁড়িয়েছিল ল্যাম্পপোস্টের ঠিক নিচে। ওর মুখটা পুরোপুরি আলোয় ভেজা। আমি দাঁড়িয়েছিলাম ছায়ায়। আমাদের দুজনের অবস্থানটা যেন আমাদের সম্পর্কের প্রতীক ছিল ও ছিল আলোর দিকে, আর আমি কেবলই ছায়া।

    তারপর ও ধীরে ধীরে হাঁটা শুরু করল। আর আমি… আমি শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম। আমি দেখলাম, নীলা লেনের মোড় ঘুরছে। ওর শাড়ির আঁচলটা শেষবারের মতো উড়ে গেল ল্যাম্পপোস্টের হলদে আলোয়। আর তারপর, ও মিলিয়ে গেল।
    আমি তখনও দাঁড়িয়ে ছিলাম।

    ল্যাম্পপোস্টের নিচে এখন আর কেউ নেই। দীপের চিরকুট, আমার না-বলা প্রেম, আর নীলার ফিরে না আসা সবকিছু একসাথে মিশে গেল সেই নির্জন ল্যাম্পপোস্টের নিচে। আর সেই মুহূর্ত থেকে আমি স্পষ্ট বুঝেছিলাম, যে সময় একবার হারিয়ে যায়, সে সত্যিই আর কখনও ফিরে আসে না। কারণ, যারা চলে যায়, তারা সবথেকে জরুরি মানুষগুলোকে সাথে নিয়েই যায়, আর রেখে যায় শুধু শূন্যতা আর শেষ ল্যাম্পপোস্টের নিচে জমে থাকা স্মৃতিরাশি।

    4
    7 Comments
Skip to toolbar