Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    • 4 months, 1 week ago

    হাফ লেডিস? না, আমি পুরোপুরি আমি!

    রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে নূরনবী আজ হঠাৎ থমকে দাঁড়ায়। পেছন থেকে একদল তরুণের উচ্চহাস্য ভেসে আসে, সঙ্গে তীক্ষ্ণ একটি মন্তব্য,

    “দেখ দেখ, ওটা সেই হাফ লেডিস! হা হা হা!”
    তারা নিজেদের মধ্যে হেসে গড়াগড়ি খায়।
    নূরনবীর মুখ থমথমে হয়ে ওঠে। সে পেছনে তাকায় না, প্রতিবাদও করে না; ঠোঁটের কোণে কেবল এক চিলতে মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। কিন্তু ওটা কি আদেও হাসি? না, ওটা আসলে একটা চাপা কান্না, যা সে পরম মমতায় মুখের অবয়বে এনে বুকের গভীরতম প্রকোষ্ঠে চেপে রাখে।

    “হাফ লেডিস!” এই শব্দটা আজ আর তার কানে কেবল কাঁটা হয়ে বিঁধে না, বরং ধারালো ছুরি হয়ে বুকের ভেতর ক্ষত তৈরি করে।

    সে মনে মনে ভাবে, মানুষ বড় অদ্ভুত! তারা বোঝে না যে একটা কণ্ঠের কোমলতা মানেই মেয়েলি স্বভাব নয়। তারা শেখে নি যে, নম্রতা কোনো দুর্বলতা নয়। মানুষ কেন বোঝে না যে, কেউ নিজের জন্মগত শারীরিক গঠন বা কণ্ঠস্বর নিজের ইচ্ছায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না আর তার কোনো প্রয়োজনও নেই।
    নূরনবী ছোটবেলা থেকেই সমবয়সীদের চেয়ে একটু ভিন্ন ছিল। তার কণ্ঠটা ছিল সুমিষ্ট, কিছুটা পাতলা। চেহারায় এক ধরনের সহজাত কোমল ভাব। বন্ধুদের হুল্লোড়ের মাঝে সে ছিল শান্ত ও গম্ভীর। আর এই ভিন্নতার জন্যই সমাজ তাকে খোঁটা দিত— “তুই মেয়ে না ছেলে রে?” কেউ কেউ আড়ালে হাসাহাসি করত “দেখিস না, হাফ লেডিস একটা!”

    স্কুলে পড়ার সময় একদিন ক্লাসের এক শিক্ষক পর্যন্ত সবার সামনে বলে ফেলেছিলেন,
    “তোর কণ্ঠে তো পুরো মেয়েদের মতন সুর!”
    মুহূর্তেই পুরো ক্লাসরুমে হাসির রোল উঠেছিল।

    নূরনবী সেদিন বাসায় এসে ঘরের কোণে চুপচাপ চোখের জল ফেলেছিল। মা এসে পরম আদরে তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন,
    “সোনা আমার, তোর এই কণ্ঠ আল্লাহর দেওয়া এক পবিত্র আমানত। মানুষ অশিক্ষিত আর বিবেকহীন বলেই এমন ঠাট্টা করে। তুই দেখিস, এই স্বর দিয়েই তুই একদিন গান গাইবি, কবিতা পড়বি, মানুষের মনে আলো ছড়াবি।”

    সেদিন অবুঝ নূরনবী জানত না মায়ের মুখ থেকে বের হওয়া এই ‘স্বর’ শব্দটাই একদিন তার জীবনের পথচলার শক্তি হবে, আবার একই সাথে সমাজলড়াইয়ের মূল অস্ত্রও হয়ে উঠবে।

    সময় তার নিজস্ব নিয়মে গড়ায়। কলেজে উঠে নূরনবী পুরোদমে আবৃত্তি আর গান শুরু করে। প্রতিটি প্রতিযোগিতায় মঞ্চে দাঁড়িয়ে সে নিজের প্রতিভা দিয়ে সবার মন জয় করে নেয়। তবুও কিছু মানুষের বাঁকা নজর পিছু ছাড়ে না। পেছনে ফিসফিসানি শোনা যায়—
    “ও তো হাফ লেডিস! ছেলেরা আবৃত্তি করবে গর্জন দিয়ে, ও করে ফিসফিসিয়ে!”

    একদিন এক বড় আঞ্চলিক প্রতিযোগিতায় সে মঞ্চে উঠল। পিনপতন নীরবতায় সবাই তার পরিবেশনা শুনছিল। তার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দের ভাঁজে ছিল কাব্যের শরীর আর হৃদয়ের গভীর স্পর্শ। অনুষ্ঠান শেষে এক শ্রোতা এসে বললেন,
    “তোমার কণ্ঠটা ভীষণ সুন্দর হে তরুণ। কিন্তু বড্ড মেয়েলি শোনায়। একটু ‘ভয়েস ট্রেনিং’ নাও, পুরুষালি করো।”

    নূরনবী শুধু মৃদু হাসল। কারণ, এই অযাচিত পরামর্শ আর কটূক্তির দেয়াল সে অনেক আগেই ডিঙিয়ে এসেছে। এখন মানুষের করতালির চেয়ে নিজের আত্মতৃপ্তিই তার কাছে বড় প্রাপ্তি।

    এরই ধারাবাহিকতায় একদিন ঢাকা শহরের একটি স্বনামধন্য টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকে আমন্ত্রণ পেল সে। অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘তারুণ্যের প্রতিভা’, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিভাবান তরুণ-তরুণীরা অংশ নিচ্ছিল।

    মঞ্চের আলো ঝলমল করে উঠতেই সঞ্চালক নূরনবীকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে বললেন,
    “আজ আমাদের মাঝে আছেন ভোলার ছেলে কবি, আবৃত্তিকার ও গায়ক নূরনবী। তবে তার কণ্ঠ শুনলে আপনারা হয়তো কিছুটা বিভ্রান্ত হতে পারেন। কারণ সেটি বেশ সুরেলা এবং একটু… কী বলব, হাফ লেডিস টাইপের!”

    নূরনবী তখনো মঞ্চের পেছনে দাঁড়িয়ে। সঞ্চালকের এই অপ্রত্যাশিত মন্তব্যে সে মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। বহু বছর ধরে জমিয়ে রাখা পুরোনো সব অপমান আর কষ্ট একযোগে তার বুকে ভর করল। কিন্তু পরক্ষণেই এক বুক আত্মবিশ্বাস নিয়ে সে নিজেকে গুছিয়ে নিল। ধীরস্থির পায়ে মঞ্চে উঠে মাইক্রোফোনটা হাতে নিয়ে বলল:
    “ধন্যবাদ আমাকে ‘হাফ লেডিস’ বলে সম্বোধন করার জন্য। তবে আজ এই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই আমি পুরোপুরি একজন পুরুষ, পুরোপুরি একজন মানুষ, এবং সবচেয়ে বড় কথা আমি পুরোপুরি ‘আমি’।

    আমার প্রতিভা, আমার কণ্ঠ আর আমার আত্মা এই তিনের সমন্বয়ে আমি একজন পরিপূর্ণ সত্তা। মানুষকে যদি ছোট করতেই হয়, তবে তার কণ্ঠস্বর বা চেহারা দেখে নয়, তার নিচু মানসিকতা আর আচরণ দেখে বিচার করুন। আমি জন্মেছি পুরুষ হয়ে, মরবও পুরুষ হয়েই। কিন্তু আমার আসল পরিচয় শুধু লিঙ্গে নয়, আমার পরিচয় আমি একজন শিল্পী।
    আপনাদের ‘হাফ’ শব্দের সংকীর্ণ ঘৃণায় আমার ‘পূর্ণতা’ কখনও হারিয়ে যাবে না।”

    পুরো মিলনায়তন জুড়ে এক মুহূর্তের স্তব্ধতা নেমে এল। আর তার ঠিক পরের মুহূর্তেই যেন বজ্রপাতের মতো করতালির ঝড় উঠল।
    সেদিনের সেই বলিষ্ঠ বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। চারদিকে শিরোনাম ওঠে:

    “আমি হাফ লেডিস না, আমি পূর্ণ একজন মানুষ” নূরনবী। সমাজ যেন নতুন করে অনুধাবন করতে শিখল সব কণ্ঠ, সব চেহারা কিংবা সব আচরণকে এক জোড়াতালির ছাঁচে ফেলা যায় না।

    আজ নূরনবী নিজের শহরে একটি স্বনামধন্য সাহিত্য সংগঠন পরিচালনা করে। বহু তরুণ-তরুণী সেখানে আসে আবৃত্তি, গান আর বক্তৃতার শিল্পকলা শিখতে। একদিন এক কিশোর দ্বিধাগ্রস্ত কণ্ঠে তাকে প্রশ্ন করল,
    “ভাইয়া, আমার কণ্ঠটা একটু বেশিই কোমল। লোকে এই নিয়ে খুব হাসাহাসি করে। আমি কী করব?”

    নূরনবী তার কাঁধে হাত রেখে পরম ভরসায় জবাব দিল,
    “তুমি প্রকৃতিগতভাবে যা, সেটাই তোমার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দুনিয়ার মানুষ হাসলে হাসুক। মনে রাখবে, তোমাকে জয় করতে হবে তোমার এই নিজস্ব স্বরেই, তোমার এই রূপেই, সম্পূর্ণ নিজের মতো করে।”
    সে জানে, সমাজ রাতারাতি বদলে যায় না। এখনো হয়তো চেনা রাস্তায় হাঁটলে কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে ফিসফিস করে বলে— “ওই দেখ, হাফ লেডিস যায়!”

    কিন্তু এখন আর নূরনবীর মাথা নিচু হয় না। সে বুক চিতিয়ে, নিজের আত্মসম্মান ও গর্ব নিয়ে হেঁটে চলে। কারণ সে জানে, সে কারও অর্ধেক কিছু নয়। সে সমাজের তৈরি কোনো সস্তা সংজ্ঞার ‘লেডিস’ নয়। সে তার নিজের মতো করেই অনন্য, নিজের মতো করেই সুন্দর ঠিক যেমনটা তার কণ্ঠ, আর ঠিক যেমনটা তার পবিত্র মন।

    5
    8 Comments
Skip to toolbar