Profile Photo

রাইসা আনজুম (পর্শি)Offline

  • raisaanjumporshi
  • আমাকে ফাঁকা ক্লাসরুমে বসতে বলে স্যার চালে গেলেন। আমি ব্যাগটা ক্লাসরুমে ফেলে চলে এসেছি। ধুর! এই লোকটাে একদমই পছন্দ না আমার। এখনই ছুটি হয়ে যাবে। ব্যাগটা আনলে ভালো হতো। বেঞ্চ থেকে বের হয়ে বোর্ডের সামনে গেলাম। আচ্ছা, আমি কি টিচার হতে পারবো? ভাবছিলাম। হঠাৎ দরজা লাগানোর শব্দ হলো।
    আরে! স্যার আমি তো ক্লাসে। আপনি দরজা কেন দিলেন!? স্যার দরজা কেন দিলেন আপনি!? দরজা খুলে দিন!
    দরজায় কিল মারলাম কয়েকটা। বাইরে থেকে ছিটকিনি দিয়ে উনি চলে গেলেন। উনি চলে যাচ্ছেন আমি দেখলাম তবে আর ডাকতে পারলাম না। আমার গলা দিয়ে আর শব্দ বের হচ্ছে না। আমি কি ভয় পাচ্ছি? না না! আমি ভয় কেন পাবো! কি আশ্চর্য! দোতলার এইদিকটায় কেউ আসে না। তিনতলায় কেউ নেই। চারতলায় আমাদের ক্লাস। নিচতলায় টিচার্সরুম। আমি ডাকলে কেউ কি শুনতে পারবে না? আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। আমি কি কাঁদছি? না আমার চোখ দিয়ে পানি পরছে না। তারমানে আমি ভয় পাইনি। You’re a tough kid Troyee! You’re strong, brave, nothing is gonna happen to you. I’m with you. You’re strong, you’re not afraid. Stand up! আরে বসতেছিস ক্যান ভাই! দাঁড়া!
    আমি ধপাস করে বসে পড়লাম৷ চারপাশে তাকাতে সাহস পাচ্ছি না। আমার হাত-পা কাঁপছে। সাহস করে দেখতে লাগলাম চারদিকে। আমি কি গান গাইবো একটা? হুম~ হুম~~ (গলা কাঁপছে) নাহ্! আমি কাঁদছি না! ক্লাসরুমটা এতো বড়ো! এতো অন্ধকার! আমি বোধহয় ক্লাসের পিছনের দেওয়ালটা দেখতে পাচ্ছি না। না না পাচ্ছি। আমি কি ঘামছি? হ্যা। কিন্তু আমার পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে।
    কেউ আসছে! আঙ্কেল আসছেন তালা দিতে ক্লাসে। উনিতো তালা দিয়ে চলে যাবেন। আরে ত্রয়ী, কথা বল! Speak up buddy! আমি কথা বলতে পারছি না। উনি এদিকেই আসছেন। উনি শিস দিচ্ছেন, আমি শুনছি, আরে ত্রয়ী প্লিজ কথা বল না!!
    উনি তো চলে যাচ্ছেন!!
    ফোনটাও আমার ব্যাগে। কেউ কি বুঝতে পারছে না যে আমি ক্লাসে নেই? আমি এখন কী করবো? আমি কি সারারাত এখানেই থাকবো নাকি?
    আম্মু!!
    ঘ-ঘ-ঘুউউম ঘ-ঘুম চাঁআদ~~
    আআআআ~!!!! আমি কথা বলতে পারছি না। I’m strong, I’m calling someone for help. Is there anyone out there!? Hello?

    আমার আড়ষ্ট হাত দিয়ে দরজায় আঘাত করলাম অনেকটা শক্তি দিয়ে। কিন্তু আঘাতটা দরজায় টোকা দেওয়ার মতো শব্দ করলো।

    -কে? কে ওখানে?
    আমি: কে! কেউ কি আছে?
    – এই কে?
    -আমি। (আমি কথা বলতে পারছি!)
    -এই আমিডা কে আবার?
    কোনোভাবে উঠে দাঁড়ালাম।
    -আমি আমি। আমি। আমি ত্রয়ী।
    – আরে তুমি এখানে কি করো?
    – প্লিজ!
    এই লোকটাকে কি আমি চিনি? কে সে?
    -দরজায় তো তালা দিয়ে গেছে। তুমি ভিতরে কেন? এই রহমত! রহমত!! দোতলায় আসো। কই তুমি? চাবি নিয়া আসো। স্টুডেন্ট আছে ভিতরে।

    -তরয়ী?
    -হুম?
    -তুমি এখানে কেন?
    এপাশ থেকে আমার কথা বন্ধ হয়ে গেছে আবার।
    -তরয়ী, আম্মু? মা?
    -হুম?
    – আসতেছে। তালা খুলতেছি। ভয় পাইও না। আমি আছি।
    – হুম। (ফিজিক্স স্যার। উনি আমার নাম ভুল উচ্চারণ করেন সবসময়। উনি আছেন।) আমি ভয় পাচ্ছি না স্যার।

    রহমত আঙ্কেল আসলেন। চাবির শব্দ হচ্ছে। পুরো দোতলা খালি। অনেকগুলো চাবির শব্দ হচ্ছে। আমি অনুভব করছি, আমার শরীর গরম হয়ে আসছে। দরজা খুলে গেলো। আমি ধীরে সুস্থে বাইরে বের হয়ে আসলাম। ঠান্ডা বাতাস লাগলো আমার মুখে। ভেতরে এতো অন্ধকার ছিলো, মাথায় একটা ধাক্কা মতো লাগলো। আলোটা একটু তেজী মনে হলো। স্যার আমার মাথায় হাত রাখলেন। আমার হতে-পায়ে, গায়ে ঢুলো লেগে আছে। ওনারা দুজন কি বললেন কিছুই বুঝতে পারলাম না। হা করে তাকিয়ে আছি। স্যার আমার হাত ধরে নিয়ে গেলেন দোতলায় অফিস রুমে। ফ্যানটা আমার দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।
    -হিজাবটা আলগা করো? একটু বাতাস লাগুক। এই রহমত পানি নিয়ে আসো যাও!
    রহমত আঙ্কেল চলে গেলেন পানি আনতে।
    স্যার আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। আমার হাত ঝেড়ে দিলেন।
    আমি পানি খেলাম। কিছুক্ষণ বসলাম। তারও কিছুক্ষণ পর স্যার জিজ্ঞেস করলেন।
    – তুমি ঐ ক্লাসে কেন গেছিলা?
    – আমাকে সুরুজ স্যার বলেছিলেন কাজ আছে। আমি ওনার কথা শুনে আসি। তারপর ওখানে বসতে বলে উনি বাইরে থেকে ছিটকিনি দিয়ে চলে গেলেন।
    – সে কি জানতো না?
    – হ্যা।
    রহমত আঙ্কেল: আমি যহন তালা দেই তহন কি ভিত্রেই আছিলা?
    -জ্বি।
    রহমত আঙ্কেল : ডাকো নাই ক্যান?
    -আমি কথা বলতে পারছিলাম না।
    স্যার: আচ্ছা ঠিক আছে। এখন সব ঠিক আছে। সুরুজ মনে হয় বুঝতে পারেনি তুমি ভিতরে ছিলা।
    -না স্যার! উনি জানতেন।
    স্যার: আচ্ছা। আমি দেখবো বিষয়টা। তুমি কাউকে কিছু বইলো না।
    (আমি হা করে তাকিয়ে আছি। তারমানে চুপ করে যাবো? কাউকে জানাবো না?)
    স্যার: কলেজ তো অনেকক্ষণ হইছে ছুটি হইছে। বাসায় যেতে পারবা? তোমার ব্যাগ কই? বাসা কোথায় তোমার?
    – জোড়পুলে বাসা। আর ব্যাগ ক্লাসে।
    – রহমত, যাও ওর ব্যাগটা নিয়ে আসো। সায়েন্সের ৪০২ নাম্বার ক্লাস।
    রহমত আঙ্কেল আবার চলে গেলেন।

    -স্যার, উনি ইচ্ছে করে দরজা দিয়ে চলে গেছেন।
    – আচ্ছা। আমি দেখবো সেসব। বাসায় যদি জিজ্ঞেস করে কেন দেরি হইছে, বলবা আমি কাজ দিছিলাম। আর তোমার রোল যেন কতো?
    – ৯০৮২।
    – আচ্ছা। আমি দেখবো। বলবা খাতার কোড বসানোর কাজ দিছি। Ok?
    – হুম।
    – ভয় পাচ্ছো?
    – না স্যার।
    – একদম ভয় পাবা না। বোকারা ভয় পায়। সবকিছু ঠিক আছে। আমি দেখবো।

    রহমত আঙ্কেল ব্যাগ নিয়ে আসলেন।
    স্যার: চলো তোমাকে বাসে উঠায় দেই।
    – না স্যার। আমি একাই যেতে পারবো।
    – আমি যাই তবু।
    স্যার আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিলেন। আর একা ছাড়তে রাজি হলেন না। রহমত আঙ্কেল বাসে উঠিয়ে দিলেন আর ভাড়াও দিয়ে দিলেন।

    5
    5 Comments

আমি রাইসা আনজুম পর্শি, জন্ম ঢাকার ধানমন্ডিতে, সাভারে বেড়ে ওঠা। এখনো বাড়ছি। ডাইরিতে টুকটাক লিখি, দুই-একটা কবিতা প্রকাশ হয়েছে, তাতে কিছু লোকের প্রশংসা পাই এতে লেখালেখির প্রতি আগ্রহ বাড়ে৷ কবি বা লেখিকা হওয়ার চাইতে পাঠিকা হতে বেশি পছন্দ করি। প্রচুর বই পড়ি। আকাশ দেখতে পছন্দ করি, কথা বলতে আর মানুষের কথা শুনতে পছন্দ করি, যেকোনো বয়সের মানুষের সাথে আলাপ জমাতে পারি। বড়ো হচ্ছি তো, হয়তো সামনেই কিছু একটা করে ফেলবো। আপাতত পড়ছি, লিখছি এ-ই।

Skip to toolbar