Profile Photo

Md Nurnobi islam sumonOffline

  • mdnurnobiislamsumon
  • Profile picture of Md Nurnobi islam sumon

    Md Nurnobi islam sumon

    • 4 months ago

    অসমাপ্ত ক্লাস, উন্মুক্ত রাজপথ
    মোঃ নুরনবী ইসলাম সুমন
    ইউনিভার্সিটি অফ দ্যা পিপল

    চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দুপুরটা আর দশটা সাধারণ অলস দুপুরের মতোই কেটে যেতে পারত। কলেজের দোতলার চার নম্বর ক্লাসরুমের পুরোনো সিলিং ফ্যানটা তার চেনা ছন্দে ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছিল। সেই শব্দের সাথে মিশে ছিল চকের খসখস আওয়াজ। ফিন্যান্সের স্যার ব্ল্যাকবোর্ডে মূলধনী ব্যয়ের একটা জটিল সমীকরণ মেলাতে ব্যস্ত। কিন্তু আজ সেই চকের শব্দের চেয়েও তীব্র হয়ে বাজছিল বেঞ্চের নিচে লুকিয়ে রাখা মোবাইল ফোনগুলোর ভাইব্রেশন ও নোটিফিকেশন টোন।

    বাতাস কেমন যেন ভারী হয়ে আসছিল। ক্লাসরুমের ভেতরে পিনপতন নীরবতা, কিন্তু কারও মন আজ ব্ল্যাকবোর্ডের অঙ্কে নেই। সবার চোখ খাতার আড়ালে চলে গেছে কোলের ওপর রাখা জ্বলন্ত স্ক্রিনগুলোতে। ফেসবুকের নিউজফিডজুড়ে তখন শুধুই ধোঁয়া, টিয়ারগ্যাস আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট শব্দ। ঢাকার রাজপথে নিজেদের বয়সী সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তাক্ত নিথর দেহ আর বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়া আবু সাঈদের সেই ছবিটা মাত্রই স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে। একে একে খবর আসছিল ক্যাম্পাসের ভেতরে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর নির্মমভাবে লাঠিসোটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একদল হেলমেটধারী।

    বেঞ্চে বসে থাকা শান্ত ও মেধাবী ছেলে নুরনবী (সুমন)-এর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। চশমার কাঁচটা আঙুল দিয়ে ঠিক করতে গিয়ে দেখল তার হাত কাঁপছে। এটা ভয়ের কাঁপুনি নয়, এ এক আদিম এবং তীব্র ক্ষোভ। যে বয়সে ছেলেদের ক্লাসরুমে বসে ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন দেখার কথা, সেই বয়সে তাদের রক্তে ভিজছে পিচঢালা রাজপথ।
    ঠিক তখনই পেছনের বেঞ্চ থেকে তাকবির ফিসফিসিয়ে বলল, “সুমন, আর কতক্ষণ এভাবে বসে থাকবি? ঢাকায় আমাদের ভাই-বোনদের মেরে তক্তা বানাচ্ছে। জাকিয়া আর বৃষ্টি অলরেডি লাইব্রেরির সামনে মেয়েদের জড়ো করে ফেলেছে। আমরা কি এই চার দেয়ালে বসে ফিন্যান্সের সূত্র মুখস্থ করব? আমাদের কি বিবেক বলতে কিচ্ছু নেই?”

    নুরনবী স্যারের দিকে তাকাল। স্যারের চোখ দুটোও আজ কেমন যেন উদাস, তিনিও ডেক্সে হাত রেখে জানালার বাইরে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। তিনি চকটা টেবিলের ওপর রেখে চশমাটা খুললেন। একটু নরম কিন্তু ভারী সুরে বললেন, “বস। মন যদি ক্লাসে না থাকে, তবে জোর করে লাভ নেই। আজ আর পড়াব না।” যেন স্যারও জানেন, আজ ক্লাসরুমের এই তত্ত্বীয় শিক্ষার চেয়ে বাইরের রাজপথের বাস্তব শিক্ষাটা অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে।

    নুরনবীর মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব এক নিমেষে কেটে গেল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। হাতের কলমটা খাতার ওপর রেখে ঠাস করে ডায়েরিটা বন্ধ করল। সেই শব্দের রেশ কাটতে না কাটতেই ক্লাসের দরজায় এসে দাঁড়াল সাঈদ আর সৌরভ। কলেজের পেছনের বেঞ্চের এই ডানপিটে দুই বন্ধুর চোখেমুখে আজ কোনো দুষ্টুমি বা চপলতা নেই, আছে এক অদ্ভুত কাঠিন্য। সাঈদ দরজার পাশ থেকে নিচু স্বরে ডাকল, “দোস্ত, কলেজের মূল গেটের বাইরে পুলিশ পজিশন নিচ্ছে। স্থানীয় কিছু চেনা গুন্ডাপাণ্ডাও লাঠিসোটা নিয়ে ঘুরছে। তামিম আর শাহাদাত ভাই ব্যানার নিয়ে রেডি। তুই না নামলে মিছিলের মুখ খোলা যাচ্ছে না। সবাই তোর জন্য অপেক্ষা করছে।”

    পুরো ক্লাসের সবার চোখ তখন নুরনবীর দিকে। সে-ই এই ব্যাচের অলিখিত অভিভাবক। ঠিক তখনই এক কোণ থেকে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখা, ঝামেলা এড়িয়ে চলা ছেলে সাফোয়ান হঠাৎ তার ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে ধড়ফড় করে দাঁড়িয়ে গেল। তার গলাটা একটু কাঁপলেও সে স্পষ্ট গলায় বলল, “যাবিই যখন, সবাই একসাথে চল। তোদের একা বিপদে ফেলে আমি এই আরামের বেঞ্চে বসে থাকতে পারব না। মরলে সবাই একসাথে মরব।”

    সারা ক্লাসরুমে যেন একটা বিদ্যুতের তরঙ্গ খেলে গেল। একের পর এক বেঞ্চ ছেড়ে ছাত্ররা উঠে দাঁড়াতে লাগল। করিডোর ধরে যখন তারা দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিল, তখন পুরো কলেজ জুড়ে এক অলিখিত সংকেত ছড়িয়ে পড়ল। ইকোনমিক্স, ইংলিশ, রাষ্ট্রবিজ্ঞান সব ক্লাসরুমের দরজা একে একে খুলে যাচ্ছে। উপচে পড়া প্লাবনের মতো শিক্ষার্থীরা করিডোরে নেমে আসছে।

    সিঁড়ির মুখে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল জাকিয়া, বৃষ্টি, জবা আর মিম। জাকিয়া আর বৃষ্টির হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, যাতে কাঁচা হাতে লেখা “কোটা নয়, মেধা হোক মুক্তির পথ।” অন্যদিকে জবা আর মিমের ব্যাগে আজ কোনো নোটবই নেই, আছে লাল-সবুজ রঙের ক্যানভাস, চক আর রং-তুলি। জবা নুরনবীর দিকে তাকিয়ে আলতো করে মাথা নাড়ল, যার নীরব অর্থ ছিল ‘আমরা মেয়েরাও পিছু হটব না, ভাইদের পাশে শেষ পর্যন্ত আছি।’

    প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের সামনে কয়েকজন প্রবীণ শিক্ষক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। তাদের চোখে উদ্বেগ, কিন্তু আজ আর কেউ “ক্লাসে ফিরে যাও” বা “শৃঙ্খলা ভঙ্গ করো না” বলার সাহস পেলেন না। কারণ তারা জানেন, আজ যে শৃঙ্খলা ভাঙার ডাক এসেছে, তা এক বৃহত্তর ন্যায়ের শৃঙ্খলা গড়ার জন্য।

    কলেজের প্রধান ফটকটার লোহার গ্রিল গলিয়ে যখন এই একঝাঁক তরুণ উন্মুক্ত রাজপথে পা রাখল, তখন দুপুরের কড়া রোদ তাদের পিঠ পুড়িয়ে দিচ্ছিল। পিছে পড়ে রইল তাদের চেনা ক্যাম্পাস, সাজানো টেবিল-চেয়ার, পরীক্ষার রুটিন আর একটা অসমাপ্ত ক্লাস। আর সামনে দিগন্ত বিস্তৃত তপ্ত, ধূলিময় এবং অনিশ্চিত পিচঢালা পথ।

    তামিম দৌড়ে এসে নুরনবীর হাতে একটা বড় ব্যানার তুলে দিল, যাতে কালো অক্ষরে লেখা “বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন”। তাকবির বুক ভরে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে নুরনবীর দিকে তাকাল, “সুমন, মিছিলের মুখটা এবার খুলে দে!”

    নুরনবী আকাশের দিকে তাকিয়ে তার ডান হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে ওপরে তুলল। এতক্ষণের শান্ত, চশমা পরা নরম ছেলেটার চোখ দুটো তখন জ্বলন্ত কয়লার মতো জ্বলছে। সে শুধু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “শুরু কর তাকবির।”

    তাকবিরের কণ্ঠের প্রথম স্লোগানটা যেন বোমার মতো ফাটল “আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে?”
    মুহূর্তের মধ্যে পেছনের শ-খানেক গলা এক হয়ে মফস্বল শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে গর্জে উঠল। খাতার পাতা থেকে তাদের জীবন ততক্ষণে চিরদিনের জন্য স্থানান্তরিত হয়ে গেছে পিচঢালা উন্মুক্ত রাজপথে।

    কলেজের মূল ফটকের লোহার গ্রিলটা পেরিয়ে যখন একঝাঁক শিক্ষার্থীর বিশাল মিছিলটা শহরের প্রধান ট্রাফিক মোড়ের দিকে এগোচ্ছিল, তখন চারপাশের চেনা মফস্বল শহরটাকে একদম অচেনা লাগছিল। দুপুরের চড়া রোদে পিচঢালা রাস্তাটা থেকে কেমন যেন একটা তপ্ত ভাপ উঠছিল। রাস্তার দুপাশের দোকানপাটগুলো তখন ভয়ে আধা-বন্ধ। সাধারণ পথচারীরা ফুটপাতে থমকে দাঁড়িয়ে দেখছিল এই তরুণদের। সবার চোখেমুখে এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর বিস্ময়ের মিশ্রণ। ঢাকার বাইরে এই শান্ত, ঘুমন্ত মফস্বল শহরেও যে এমন একটা উত্তাল তরঙ্গের সৃষ্টি হতে পারে, তা হয়তো কেউ ভাবেনি।

    মিছিলের একেবারে সামনে ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে ছিল নুরনবী, তাকবির, সাঈদ আর সৌরভ। তামিম একটু পর পর পেছন থেকে এসে সবার হাতে পানির বোতল তুলে দিচ্ছিল আর লাইনের শৃঙ্খলা ঠিক রাখছিল। মিছিলের মাঝখান থেকে জাকিয়া আর বৃষ্টি মেয়েদের ফ্রন্টলাইনটা শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তাদের পেছনে ছিল জবা আর মিম, যাদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ডগুলোতে আঁকা ছিল জলন্ত চোখ আর চব্বিশের জুলাইয়ের প্রতিরোধের নানা প্রতীক।
    তাকবিরের বজ্রকণ্ঠ তখন মফস্বল শহরের আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। সে যখনই গলা ফাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠছিল, “রক্তের দাগ, মুছতে দেব না!”, তখন পেছনের শ-খানেক শিক্ষার্থীর সম্মিলিত কণ্ঠ গর্জে উঠছিল, “লাড়াই করো, লড়তে হবে!” সাফোয়ান, যে এতকাল মিছিলে চড়া গলায় স্লোগান দিতে লজ্জা পেত, আজ তাকেও দেখা গেল সবার চেয়ে জোরে গলা মেলাতে। তার ফর্সা মুখটা রোদে আর ক্ষোভে লাল হয়ে উঠেছে।

    মিছিলটা যখন শহরের মূল চত্বর অর্থাৎ ‘শহীদ মিনার মোড়’-এর কাছাকাছি পৌঁছাল, তখনই দূর থেকে দেখা গেল পুলিশের একটি নীল রঙের ভ্যান আর জলকামান রাস্তা জুড়ে আড়াআড়িভাবে দাঁড়িয়ে আছে। পুলিশের হাতে টিয়ারগ্যাস লাঞ্চার আর লম্বা লাঠি। শুধু পুলিশই নয়, তাদের ঠিক পেছনেই অবস্থান নিয়েছিল স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক ক্যাডার আর চেনা গুন্ডাপাণ্ডা। তাদের হাতে ছিল ক্রিকেট ব্যাট, হকিস্টিক আর লোহার রড।

    মিছিলের গতি এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা শ্লথ হয়ে এল। পেছনের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকের মধ্যেই একটা মৃদু গুঞ্জন আর ভয়ের হিমেল হাওয়া বয়ে গেল। ঠিক তখনই নুরনবী (সুমন) তার হাতের ব্যানারটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে পেছনের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল, “কেউ পিছু হটবে না। আমরা কোনো অন্যায় করছি না, আমরা আমাদের অধিকারের কথা বলছি। ভয় পেলেই ওরা আমাদের পিষে দেবে।”

    নুরনবীর এই শান্ত অভয়বাণী জাদুর মতো কাজ করল। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছনের বেঞ্চের ডানপিটে ছেলে সাঈদ আর সৌরভ মিছিলের লাইন ভেঙে একদম সামনে এসে দাঁড়াল। সৌরভ রাস্তা থেকে একটা পরিত্যক্ত কাঠের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে বাতাসে ঘুরিয়ে চিৎকার করে বলল, “ভয় পাবি না কেউ! আমরা ভাইয়েরা সামনে আছি। কার কত বড় বুক, এসে দেখাক!”

    ঠিক তখনই এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখল পুরো শহর। শহরের চেনা রিকশাচালক শাহাদাত ভাই, যিনি প্রতিদিন এই মোড়েই যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করেন, তিনি হুট করেই নিজের রিকশাটা টেনে এনে পুলিশের ভ্যানের ঠিক বিশ গজ সামনে আড়াআড়ি করে দাঁড় করিয়ে দিলেন। শুধু তাই নয়, আশেপাশের আরও দুই-তিনজন রিকশাচালককে ডেকে বললেন, “আইসো মিয়ারা! আমাগো ছাওয়ালপাওয়ালগো বাঁচাইতে হইব।” শাহাদাত ভাই নিজের রিকশা দিয়ে একটা জীবন্ত ব্যারিকেড তৈরি করে ফেললেন, যাতে পুলিশের গাড়ি বা ক্যাডাররা চট করে মিছিলের ওপর হামলা করতে না পারে। তিনি নুরনবীর দিকে তাকিয়ে গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে চেঁচিয়ে বললেন, “তোমরা আগাও বাজানরা! আমরা গরিব মানুষ, কিন্তু তোমাদের পিছে আছি।”

    পুলিশের ওপাশ থেকে তখন প্রথম টিয়ারগ্যাসের শেলটা ছোঁড়া হলো। বাতাসে একটা শিস কাটার শব্দ হলো আর পরমুহূর্তেই বিকট শব্দে মিছিলের ঠিক মাঝখানে একটা ধোঁয়ার কুণ্ডলী তৈরি হলো। ঝাঁঝালো গ্যাসের ধোঁয়ায় চোখ-মুখ জ্বলতে শুরু করল সবার। শিক্ষার্থীরা কাশতে কাশতে এদিক-ওদিক ছুটতে লাগল। জাকিয়া আর বৃষ্টি চট করে পকেট থেকে পানির বোতল বের করে জবা আর মিমের চোখে-মুখে জল ছিটিয়ে দিতে লাগল।
    ক্যাডার বাহিনী এই সুযোগটাই খুঁজছিল। তারা “ধর ধর” চিৎকার করে লাঠিসোটা নিয়ে শাহাদাত ভাইয়ের রিকশার ব্যারিকেড ভেঙে ছাত্রদের দিকে ধেয়ে আসতে লাগল। কিন্তু মফস্বলের প্রথম স্ফুলিঙ্গ যে ততক্ষণে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করেছে, তা তারা বুঝতে পারেনি। সাঈদ আর সৌরভ ধেয়ে আসা প্রথম দলটার সামনে গিয়ে নিজেদের শরীরকে ঢাল বানিয়ে দিল। তপ্ত পিচঢালা রাজপথে প্রথম ইটের টুকরোটা এসে পড়ল।

    নুরনবী তার চশমাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাতে তাকবিরকে টেনে তুলল, যে ধোঁয়ায় কাঁপছিল। দুজনে মিলে আবার ব্যানারটা উঁচিয়ে ধরল। ইন্টারনেট ততক্ষণে ধীর হতে শুরু করেছে, মোবাইলের স্ক্রিনে আর কোনো সিগন্যাল নেই। চারপাশ থেকে বাইরের দুনিয়া বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, এক অনিশ্চিত অন্ধকারের চাদর ঢাকছে পুরো দেশকে। কিন্তু এই একমুঠো তরুণ-তরুণীর পা দুটো তখন পিচঢালা রাজপথে আরও শক্ত করে চেপে বসেছে। তারা বুঝে গেছে, এই ক্লাসটা অসমাপ্তই থেকে যাবে, যতক্ষণ না রাজপথ মুক্ত হচ্ছে।

    ১৮ই জুলাইয়ের সন্ধ্যার পরপরই পুরো দেশটা যেন এক মস্ত বড় ব্ল্যাকহোলের ভেতর পড়ে গেল। মোবাইল স্ক্রিনের কোণায় থাকা ফোর-জি (4G) চিহ্নটা এক ঝটকায় উধাও হয়ে গেল। কোনো নোটিফিকেশন নেই, কোনো মেসেজের টুংটাং শব্দ নেই, কোনো নিউজফিড স্ক্রল করা যাচ্ছে না। সরকার ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছে ডিজিটাল ব্ল্যাকআউট। মফস্বল শহরটি মুহূর্তের মধ্যে বাইরের দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে এক ভূতুড়ে রূপ নিল। ঢাকা বা দেশের অন্য কোথাও কী ঘটছে, কার ওপর গুলি চলছে, কে বেঁচে আছে আর কে শহীদ হয়েছে তা জানার আর কোনো উপায় রইল না।
    শহরের মোড়ে মোড়ে তখন সাঁজোয়া যান আর থমথমে সেনাবাহিনীর টহল। এক ধরনের দমবন্ধ করা নীরবতা আর আতঙ্ক গ্রাস করেছিল প্রতিটি বাড়িকে। কিন্তু এই অবরুদ্ধ পরিস্থিতিতেও চার নম্বর ক্লাসরুমের সেই একঝাঁক তরুণের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইটা থেমে থাকেনি। ইন্টারনেট না থাকলে কী হবে, মানুষের মনকে তো আর শাটডাউন করা যায় না!

    পরদিন ভোরে জাকিয়া আর বৃষ্টির মাথায় একটা নতুন বুদ্ধি এল। তারা বুঝতে পারল, এখন ডিজিটাল মাধ্যমের চেয়ে অ্যানালগ বা কাগজের চিরকুট অনেক বেশি শক্তিশালী। জাকিয়া তার পড়ার টেবিল থেকে ডায়েরির পাতা ছিঁড়ে ছোট ছোট চিরকুট বানাতে শুরু করল। তাতে লেখা থাকল “আজ বিকেল ৪টায় শহীদ মিনার মোড়ে জমায়েত। ইন্টারনেট বন্ধ করে আমাদের কণ্ঠ রোধ করা যাবে না। আপনার সন্তানকে রাজপথে পাঠান।”

    বৃষ্টি সেই চিরকুটগুলো ভাঁজ করে নিজের ওড়নার নিচে লুকিয়ে বের হলো। মফস্বলের চেনা গলিগুলোতে হেঁটে হেঁটে তারা পরিচিত বন্ধুদের বাড়ির দরজার নিচ দিয়ে, কিংবা বিশ্বস্ত রিকশাচালক শাহাদাত ভাইয়ের মাধ্যমে অন্য সাধারণ মানুষের হাতে এই চিরকুটগুলো পৌঁছে দিতে লাগল। এক অদৃশ্য তথ্যের জাল বোনা হতে থাকল পুরো শহর জুড়ে।
    অন্য দিকে, আন্দোলনের এই থমথমে রাতগুলোকে ক্যানভাস বানানোর দায়িত্ব নিল জবা আর মিম। ২৩শে জুলাইয়ের মধ্যরাত। পুরো শহর তখন ঘুমে কাদা, কিংবা আতঙ্কে ঘরের বাতি নিভিয়ে বসে আছে। ঠিক তখন জবা আর মিম তাদের পিঠের ব্যাগে চকের গুঁড়ো, স্প্রে পেইন্টের ক্যান আর কয়েক রঙের প্লাস্টিক ইমালশনের কৌটো নিয়ে চুপিচুপি ঘর থেকে বের হলো। তাদের সাথে পাহারাদার ও লজিস্টিকস হিসেবে ছিল তামিম এবং সাফোয়ান। সাফোয়ান তটস্থ চোখে চারদিকের গলির মোড়ে নজর রাখছিল, যাতে পুলিশের কোনো গাড়ি এলে আগেভাগে সংকেত দেওয়া যায়।

    শহরের সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের বিশাল সাদা দেয়ালটার সামনে এসে দাঁড়াল জবা। তার নরম তুলির হাতটা আজ আর কোনো শান্ত জলরঙের ছবি আঁকছিল না, আজ তার তুলি ছিল বারুদ। মিম টর্চের আলোটা হালকা করে দেয়ালের ওপর ফেলল, আর জবা দ্রুত হাতে বড় বড় অক্ষরে লিখতে শুরু করল “বুকের ভেতর দারুণ ঝড়, দেয়াল জুড়ে প্রতিরোধের স্বর।”

    স্প্রে পেইন্টের খসখস শব্দে রাতের নীরবতা ভাঙছিল। মিম অন্য একটি ওয়ালে লাল রঙ দিয়ে ফুটিয়ে তুলল একটি অবাধ্য মুষ্টিবদ্ধ হাত, যা শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসছে। তামিম ফিসফিস করে বলল, “জবা, একটু তাড়াতাড়ি হাত চালাও, মোড়ের ওপাশে একটা গাড়ির হেডলাইট দেখা যাচ্ছে!”
    জবা শেষ টান দিয়ে দেয়ালে লিখে দিল “রক্তের দাগ মুছতে দেব না।”

    পরদিন সকালে যখন মফস্বল শহরের মানুষ ঘুম থেকে উঠে বাজারের দিকে যাচ্ছিল, তখন তারা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। যে দেয়ালগুলো এতকাল বিজ্ঞাপনে নোংরা হয়ে থাকত, সেই দেয়ালগুলো আজ কথা বলছে! লাল, কালো আর সবুজ রঙের সেই গ্রাফিতিগুলো অবরুদ্ধ শহরের মানুষের মনে এক অদ্ভুত সাহস এনে দিল। ইন্টারনেট বন্ধ করেও যে তরুণদের দমিয়ে রাখা যায়নি, তার জলজ্যান্ত প্রমাণ হয়ে রইল মফস্বলের সেই দেয়ালগুলো। নূরনবী (সুমন) সেই দেয়ালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় জবা আর মিমের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হাসল। সে বুঝল, অসমাপ্ত ক্লাসের শিক্ষার্থীরা এখন দেয়াল লিখনের মাধ্যমে পুরো শহরের ঘুম ভাঙানোর মহাকাব্য লিখে চলেছে।

    জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহের সেই বিকেলটা মফস্বল শহরের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের মতো খোদাই হয়ে রইল। চারদিকের বাতাস যেন একদম স্থির হয়ে গিয়েছিল, কোনো গাছের পাতাও নড়ছিল না। আকাশটা মেঘলা হলেও ভ্যাপসা গরম আর গুমোট ভাবটা ক্রমশ বাড়ছিল, যেন কোনো এক বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস দিচ্ছিল।

    নুরনবীর নেতৃত্বে সেদিন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মিছিলটি যখন শহরের তিতাস মোড় পার হয়ে হাসপাতালের দিকে এগোচ্ছিল, তখন আচমকাই চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে পড়ে তারা। ইন্টারনেট সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় শহরের অন্য প্রান্তের কোনো খবর তাদের কাছে ছিল না। তারা জানত না যে, মাত্র আধা ঘণ্টা আগে জেলা শহরের মূল পয়েন্টগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স এবং হেলমেট পরা এক বিশাল ক্যাডার বাহিনীকে নামানো হয়েছে।
    হঠাৎ করেই কোনো ধরনের উসকানি বা সতর্কবার্তা ছাড়াই মিছিলের পেছন থেকে প্রথম হামলাটি হলো। বিকট শব্দে একটা সাউন্ড গ্রেনেড ফাটল জাকিয়া আর বৃষ্টির ঠিক কয়েক গজ দূরে। তীব্র আলো আর কান ফাটানো শব্দে পুরো এলাকা এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। জাকিয়া কানে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়ল, তার চারপাশ তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
    “সবাই একসাথে থাকো! লাইন ভাঙবে না!” নুরনবী চশমাটা এক হাত দিয়ে চেপে ধরে অন্য হাতে জাকিয়াকে টেনে তোলার চেষ্টা করতে করতে চিৎকার করে উঠল।

    কিন্তু ততক্ষণে চারদিক থেকে ইটের টুকরো আর রড নিয়ে ক্যাডাররা মিছিলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। পুলিশের তরফ থেকে অবিরাম টিয়ারগ্যাস আর রাবার বুলেট ছোঁড়া হচ্ছিল। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি লেগে গেল। যে মফস্বল শহরের শান্ত রাস্তায় মানুষ প্রতিদিন বিকেলে হাঁটত, সেই রাস্তাটা মুহূর্তের মধ্যে একটা যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হলো।
    ঠিক এই চরম বিপদের মুখে নিজেদের বুককে ঢাল বানিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল সাঈদ আর সৌরভ। কলেজের পেছনের বেঞ্চের এই দুই ডানপিটে ছেলে আজ অন্য এক ধাতুতে গড়া। সাঈদ রাস্তা থেকে একটা ভাঙা কাঠের তক্তা কুড়িয়ে নিয়ে ধেয়ে আসা তিন-চারজন হেলমেটধারীকে আটকে দিল। অন্যদিকে সৌরভ খালি হাতেই একটা ইটের আঘাত আড়াল করে বৃষ্টি আর মিমকে পেছনের একটা গলির ভেতর ঠেলে দিল, “তোরা ভেতরে যা! মিম, বৃষ্টিকে নিয়ে পালা!”

    সৌরভ যখন ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার সাঈদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে যাবে, ঠিক তখনই পুলিশের ওপাশ থেকে একটা শটগানের নল সোজা তাদের দিকে তাক করা হলো। একটা তীব্র ‘থাড’ শব্দ হলো। পরমুহূর্তেই দেখা গেল, সৌরভ তার ডান হাত দিয়ে নিজের বুকটা চেপে ধরে পিচঢালা রাস্তার ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়ছে। তার সাদা শার্টের বুকটা নিমেষের মধ্যে টকটকে লাল রক্তে ভিজে যেতে লাগল। রাবার বুলেট নয়, ওটা ছিল তাজা ছররা গুলি।

    “সৌরভ!” সাঈদের এক বুক ফাটানো চিৎকার পুরো মফস্বল শহরের কোলাহলকে ছাপিয়ে গেল। সে লাঠিসোটার পরোয়া না করে সৌরভের রক্তাক্ত দেহটা জড়িয়ে ধরল।

    এই পুরো দৃশ্যটা কয়েক গজ দূর থেকে দেখছিল সাফোয়ান। যে সাফোয়ান ক্লাসে সবসময় পেছনের কোণায় গুটিসুটি মেরে বসে থাকত, সামান্য চিল্লামিলিতে যে ভয় পেত, সৌরভের বুকের সেই তাজা রক্ত দেখে তার ভেতরের সাফোয়ানটা যেন এক সেকেন্ডে মরে গেল। আর তার জায়গায় জন্ম নিল এক চেনা-অচেনা লড়াকু তরুণ। তার চোখের সমস্ত ভয় উবে গিয়ে সেখানে জমা হলো এক অতিপ্রাকৃতিক হিংস্র ক্ষোভ।

    সাফোয়ান আর পেছনে পা বাড়াল না। সে রাস্তা থেকে একটা বড় ইটের টুকরো তুলে নিয়ে কোনো কিছু না ভেবেই সরাসরি ধেয়ে আসা ক্যাডারদের দিকে ছুটে গেল। তার এই আচমকা আর মরিয়া আক্রমণ দেখে আক্রমণকারীরাও এক মুহূর্তের জন্য ভড়কে গেল। সাফোয়ান চিৎকার করে বলতে লাগল, “তোরা আমার ভাইকে মারলি! তোদের আমি ছাড়ব না!”
    সাফোয়ানের এই অবিশ্বাস্য রূপান্তর দেখে লাইনের পেছনের অন্য ছেলেদের মধ্যেও এক নতুন শক্তি চলে এল। তারা সবাই মিলে লাঠিসোটা নিয়ে উল্টো প্রতিরোধ গড়ে তুলল। এই সুযোগে তামিম আর রিকশাচালক শাহাদাত ভাই নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বুলেটের মাঝখানেই ছুটে এলেন। শাহাদাত ভাই তার রিকশায় সৌরভের নিথরপ্রায় দেহটা তুলে নিলেন। তামিম সৌরভের ক্ষতবিক্ষত বুকটা নিজের হাত দিয়ে চেপে ধরে রাখল, যাতে রক্তক্ষরণ কিছুটা কমে। শাহাদাত ভাই গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিকশার প্যান্ডেল চেপে হাসপাতালের দিকে ছুটলেন, তার চোখ দিয়ে তখন জল গড়াচ্ছিল।

    বিকেলের আলো যখন মরে আসছিল, তখন রাজপথের ধুলো আর ধোঁয়া কিছুটা শান্ত হলো। কিন্তু তপ্ত পিচঢালা রাস্তার ওপর লেপ্টে রইল সৌরভের বুকের তাজা রক্ত। নুরনবী সেই রক্তের দাগের দিকে তাকিয়ে হাত মুঠো করল। তার চার নম্বর ক্লাসরুমের সেই চঞ্চল বন্ধুটা আজ হাসপাতালের আইসিইউতে জীবনের শেষ লড়াই লড়ছে। সাফোয়ান ক্লান্ত হয়ে রাস্তার একপাশে বসে কাঁপছিল, তার শার্টেও সৌরভের রক্তের ছিটে লেগে আছে।

    অসমাপ্ত ক্লাসের খাতাগুলো তখন হয়তো কলেজের ডেস্কে ধুলো খাচ্ছিল, কিন্তু এই তরুণরা বুঝে গিয়েছিল এখন আর ক্লাসে ফেরার কোনো পথ খোলা নেই। এই রক্তের হিসেব না চুকিয়ে তারা আর ঘরে ফিরবে না। রাজপথই এখন তাদের একমাত্র পরিচয়, একমাত্র ঠিকানা।

    ৪ঠা আগস্টের সারারাত মফস্বল শহরের কোনো বাড়িতে আলো জ্বলেনি, কিন্তু কেউ ঘুমাতেও পারেনি। হাসপাতালের সাদা বেডে তখন সৌরভ অবচেতন অবস্থায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছিল, আর বাইরে তার বন্ধুরা নুরনবী, তাকবির, সাফোয়ান চোখে এক ফোঁটা ঘুম ছাড়াই পার করে দিয়েছিল অন্তহীন এক রাত। সবার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল, কাল কী হবে?
    অবশেষে এল সেই ঐতিহাসিক ৫ই আগস্টের সকাল।
    সকাল থেকেই মফস্বলের আকাশটা অন্যদিনের চেয়ে আলাদা লাগছিল। বাতাস কেমন যেন হালকা, মেঘের ফাঁক গলে বের হওয়া রোদটা তীব্র কিন্তু স্নিগ্ধ। সকাল ১০টা বাজতেই মফস্বলের অলিতে-গলিতে মানুষের ঢল নামতে শুরু করল। এত চেনা মানুষ, এত চেনা মুখ, অথচ আজ সবাইকে কেমন যেন নতুন লাগছিল।

    নুরনবী আর তাকবির যখন হাসপাতালের গেট দিয়ে বাইরে বের হলো, তখন দেখল জাকিয়া, বৃষ্টি, জবা আর মিম অলরেডি সেখানে দাঁড়িয়ে। তাদের পেছনে প্রায় হাজার খানেক সাধারণ মানুষ। সেখানে শুধু শিক্ষার্থীরা ছিল না; ছিল সাধারণ অভিভাবক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আর রিকশাচালক শাহাদাত ভাইয়ের মতো অজস্র শ্রমজীবী মানুষ। শাহাদাত ভাই তার রিকশার হ্যান্ডেলে একটা লাল-সবুজ পতাকা বেঁধে মিছিলে সবার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

    তাকবির যখন তার জীবনের সবচেয়ে লম্বা শ্বাসটি নিয়ে শেষবারের মতো স্লোগান ধরল “স্বৈরাচারের গদিতে, আগুন জ্বালো এক সাথে!” তখন পেছনের হাজারো মানুষের কণ্ঠস্বর সুনামীর মতো আছড়ে পড়ল মফস্বলের রাজপথে।

    দুপুর ২টার দিকে আচমকাই খবরটা এল। শহরের একজন বড় ব্যবসায়ী তার দোকান থেকে একটা পুরোনো রেডিও নিয়ে রাস্তায় ছুটে এলেন, “বাবাজিরা! তোমরা জিতে গেছ! হাসিনা পালাইছে! দেশ স্বাধীন হইছে!”

    এক মুহূর্তের জন্য পুরো জনসমুদ্র স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার পরের মুহূর্তেই পুরো মফস্বল শহর এক অভূতপূর্ব উল্লাসে ফেটে পড়ল। মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল। জাকিয়া আর বৃষ্টি একে অপরের হাত ধরে খুশিতে লাফিয়ে উঠছিল, আর জবা ও মিম তাদের রঙের কৌটো থেকে লাল-সবুজ আবির আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছিল। এতদিনের ভয়, এতদিনের অবরুদ্ধ দমবন্ধ করা কষ্ট এক নিমেষে বাতাসে মিলিয়ে গেল।

    সাফোয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চোখের কোণ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিল। সে দৌড়ে গিয়ে নুরনবীকে জড়িয়ে ধরল, “সুমন, আমরা পেরেছি রে! আমাদের সৌরভের রক্ত বৃথা যায়নি!”

    বিকেলের দিকে যখন চারপাশের উল্লাস একটু শান্ত হয়ে এল, তখন নুরনবী তার বন্ধুদের দিকে তাকাল। কোনো কথা না বলেই তারা সবাই এক সাথে পা বাড়াল তাদের সেই পুরোনো চেনা কলেজের দিকে।
    কলেজের লোহার গেটটা আজ খোলাই ছিল।

    করিডোর দিয়ে হেঁটে যখন তারা দোতলার চার নম্বর ক্লাসরুমের সামনে এসে দাঁড়াল, তখন চারদিক একদম নিস্তব্ধ। ক্লাসরুমের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তারা দেখল—ঠিক চব্বিশের জুলাইয়ের সেই দুপুরের মতোই সিলিং ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাচ শব্দ করে ঘুরছে। ব্ল্যাকবোর্ডে স্যারের হাতের সেই ফিন্যান্সের সমীকরণটা চকের আবছা দাগে এখনো রয়ে গেছে।
    নুরনবী ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে তার নিজের চেনা বেঞ্চিটায় বসল। ডেস্কের ওপর হাত রাখতেই তার চোখ আটকে গেল কোণায় পড়ে থাকা একটা ডায়েরির দিকে। ঠিক চব্বিশের জুলাইয়ের দুপুরে যেভাবে খাতাটা অর্ধেক খোলা অবস্থায় ফেলে সে রাজপথে নেমে গিয়েছিল, খাতাটা আজো ঠিক সেভাবেই পড়ে আছে। বাতাসে তার সাদা পাতাগুলো ওড়ছিল।

    নুরনবী ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল। তার পাশে এসে দাঁড়াল তাকবির, জাকিয়া, বৃষ্টি, সাফোয়ান, জবা আর মিম। জবা তার পকেট থেকে একটা কলম বের করে নুরনবীর হাতে দিল।

    নুরনবী খাতার সেই অসমাপ্ত পাতাটার দিকে তাকাল। জুলাইয়ের সেই দুপুরে যেখানে ফিন্যান্সের ক্লাসের খাতা বন্ধ হয়েছিল, আজ ৫ই আগস্টের এই নতুন আলোয় সে সেখানে একটি নতুন লাইন লিখল—

    “ক্লাসটি হয়তো আজ থেকে আবার শুরু হবে, ব্ল্যাকবোর্ডে আবার মিলবে ফিন্যান্সের জটিল অংক। কিন্তু আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় এবং শ্রেষ্ঠ পরীক্ষাটা আমরা দিয়ে এসেছি বাইরের ওই উন্মুক্ত রাজপথে। চব্বিশের জুলাইয়ের রক্ত দিয়ে আমরা যে নতুন খাতাটা খুলেছি, সেখানে আর কোনো বৈষম্যের ইতিহাস লেখা হবে না।”

    নুরনবী খাতাটা বন্ধ করে জানালার বাইরে তাকাল। মফস্বল শহরের আকাশে তখন এক স্বাধীন, রক্তিম সূর্য অস্ত যাচ্ছে। আর হাসপাতালের বেড থেকে ফোনে তামিমের মেসেজ এল—সৌরভের জ্ঞান ফিরেছে, সে জিজাঙ্কু হাসিমুখে বন্ধুদের খুঁজছে। বন্ধুদের সবার চোখে তখন বিজয়ের অশ্রু, আর মুখে এক নতুন ভোরের তৃপ্তি।

    বিজয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোর পর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে আরও দুটো মাস খসে গেছে। মফস্বল শহরের আকাশে এখন আর চব্বিশের জুলাইয়ের সেই ভ্যাপসা গরম নেই; বাতাসে এখন শরতের হিমেল ছোঁয়া, কাশবনের দোলা আর এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা। শহরের তিতাস মোড় কিংবা শহীদ মিনার চত্বরে এখন আর টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝালো গন্ধ পাওয়া যায় না, বাতাসে মিশে থাকে নতুন স্বাধীন দেশের শিউলি ফুলের সুবাস।

    2
    3 Comments
    • রক্তে লেখা স্বাধীনতার ভোর…🖤

    • লেখার বর্ণনাশৈলী খুবই শক্তিশালী, বিশেষ করে মিছিলের দৃশ্যগুলো সিনেমাটিক ছিল। তবে চরিত্রগুলোর ব্যাকগ্রাউন্ড আরও গভীর হলে ভালো হতো।

Skip to toolbar