-
রূহের সফর ও মৃত্যুদর্শন
মুহাম্মদ আবুল হুসাইনমানুষের রূহ বা আত্মার যাত্রা এক মহাসড়কের মতো বিস্তৃত, যার কোনো বিরাম নেই। এই নিরন্তর ছুটে চলার পথটি শুরু হয় ‘আলম-ই-আরওয়াহ’ বা রুহের জগত থেকে। এরপর সেই আত্মা ক্রমান্বয়ে অবস্থান নেয় মাতৃগর্ভের নিভৃত আঁধারে, সেখান থেকে পাড়ি জমায় এই দৃশ্যমান পার্থিব জীবনে (দুনিয়ায়)। দুনিয়ার পাঠ চুকিয়ে তাকে প্রবেশ করতে হয় ‘আলম-ই-বারজাখ’ বা কবর নামক অন্তর্বর্তীকালীন জগতে। এরপর কিয়ামত ও পুনরুত্থানের মহালগ্ন পেরিয়ে, হাশরের ময়দানে বিচার দিবসের মুখোমুখি হয়ে অবশেষে আত্মা প্রবেশ করবে তার চূড়ান্ত ও অনন্ত আবাসে—জান্নাত অথবা জাহান্নামে।
এই অন্তহীন অভিযাত্রায় আত্মাকে যে বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় ধাপ অতিক্রম করতে হয়, তা অত্যন্ত বিস্ময়কর ও চমৎকার। এর একেকটি ধাপ যেন একেকটি সম্পূর্ণ ভিন্ন জগত। এই যাত্রার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো, আত্মা যখন যে জগতে অবস্থান করে, তখন সে তার পরবর্তী জগত সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা করতে পারে না। যেমন—মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় কোনো মানব শিশু কল্পনাই করতে পারে না যে বাইরে এক সুবিশাল দুনিয়া রয়েছে। যদি তাকে বলা হতো যে তার সামনে সূর্য, চাঁদ, সমুদ্র, পাহাড় ও নক্ষত্রভরা এক বিশাল জগৎ অপেক্ষা করছে, তবে তার সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে সে তা কখনোই উপলব্ধি করতে পারত না। ঠিক তেমনি, দুনিয়ার মানুষও তার চেনা পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে মৃত্যুর পরের জীবন কিংবা পরজগতের বাস্তবতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না; অথচ প্রতিটি জগতই পরম বাস্তব। এক জগত থেকে আরেক জগতে প্রবেশ করতে মানুষকে বা আত্মাকে তার দেহ বা অবয়ব পরিবর্তন করতে হয়, যা অনেকটা পোশাক পরিবর্তন করার মতো।
মানুষের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি আজ তাকে পৃথিবীর সীমানা পেরিয়ে মহাকাশের অসীমতায় নিয়ে গেছে। মানুষ চাঁদে পা রেখেছে, মহাকাশ স্টেশনে দীর্ঘদিন অবস্থান করছে। কিন্তু এই মহাজাগতিক যাত্রার একটি পরম সত্য হলো—পৃথিবীর বাইরে কোথাও মানুষ তার বর্তমান স্বাভাবিক দেহ নিয়ে এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে পারে না। চাঁদে যেতে হলে নভোচারীদের বিশেষ স্পেসস্যুট বা পোশাক পরতে হয়। কারণ, মানুষের বর্তমান শরীর কেবল পৃথিবীর পরিবেশ ও বায়ুমণ্ডলের জন্য উপযোগী করে তৈরি। চাঁদ তো আসলে পৃথিবীরই একটি উপগ্রহ এবং আমাদের অতি নিকটবর্তী একটি মহাজাগতিক স্থান; তাতেই যদি মানুষের পার্থিব দেহ অচল হয়ে পড়ে, তবে সৃষ্টির অনন্য রহস্য জান্নাত কিংবা স্রষ্টার সান্নিধ্যে যাওয়ার জন্য এই ভঙ্গুর ও সীমাবদ্ধ দেহ নিয়ে পাড়ি দেওয়া কীভাবে সম্ভব? স্পেসস্যুট কেবল একটি উপমা; পরকালের জন্য দরকার সম্পূর্ণ নতুন অস্তিত্বগত কাঠামো। পৃথিবীর জীবজগতের দিকে তাকালেও আমরা উপযোগিতার এই সার্বজনীন নিয়ম দেখতে পাই। মাছ পানিতে বেঁচে থাকে, কিন্তু স্থলে নয়। পাখি আকাশে উড়তে পারে, কিন্তু পানির গভীরে শ্বাস নিতে পারে না। মরুভূমির প্রাণী ও মেরু অঞ্চলের প্রাণীর দেহকাঠামোর মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। অর্থাৎ, প্রকৃতির নিয়মই হলো—প্রতিটি পরিবেশ তার উপযোগী সুনির্দিষ্ট অস্তিত্ব ও অবয়ব দাবি করে। পৃথিবী থেকে মাত্র কয়েক লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত চাঁদে মানুষের শরীরকে টিকিয়ে রাখতে যে স্পেসস্যুটের প্রয়োজন হয়, তা মূলত পৃথিবীর পরিবেশেরই একটি কৃত্রিম ক্ষুদ্র সংস্করণ, যা নভোচারী তার শরীরের চারপাশে বহন করেন।
এখন প্রশ্ন আসে, মানুষ যখন এমন কোনো জগতে প্রবেশ করে যার প্রকৃতি বর্তমান মহাবিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন, যেখানে সময়, স্থান ও পদার্থের নিয়ম আমাদের চেনা পদার্থবিজ্ঞানের সূত্র মানে না; সেখানে কি শুধু একটি কৃত্রিম পোশাক যথেষ্ট হবে? অবশ্যই না। সেখানে প্রয়োজন হবে অস্তিত্বের এক আমূল এবং মৌলিক রূপান্তর। এখানেই মৃত্যুকে দেখার একটি নতুন ও ইতিবাচক দিগন্ত উন্মোচিত হয়। আমরা সাধারণত মৃত্যুকে জীবনের নির্মম সমাপ্তি বা এক অন্ধকার অবসান হিসেবে দেখি। কিন্তু প্রকৃতির গভীর নিয়মের দিকে তাকালে দেখা যায়, সমাপ্তি বলে যা মনে হয়, তা আসলে এক নতুন ও বৃহত্তর রূপান্তরের সূচনা মাত্র। একটি বীজ মাটির নিচে পচে গিয়ে বিলীন হয়ে যায়, কিন্তু সেখান থেকেই জন্ম নেয় এক বিশাল মহীরুহ। একটি শুঁয়োপোকা কোকুনের বা গুটির ভেতরে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে গুটিয়ে নেয়, যা দেখে মনে হতে পারে তার জীবন শেষ; কিন্তু কিছুদিন পর সেখান থেকেই ডানা মেলে এক বর্ণিল প্রজাপতি। প্রকৃতির এই রূপান্তরই প্রমাণ করে যে, রূপ বা অবয়বের পরিবর্তন মানেই বিনাশ নয়।
ইসলামি আকিদা অনুযায়ী, মৃত্যু কোনো বিনাশ নয়, বরং এটি এক জগত থেকে অন্য জগতে স্থানান্তরের একটি তোরণদ্বার। ইসলাম আমাদের স্পষ্ট করে জানায়, পৃথিবীর এই নশ্বর, ক্ষয়িষ্ণু এবং সীমাবদ্ধ দেহ নিয়ে পরকালের জীবনে পাড়ি দেওয়া অসম্ভব। সে কারণে আত্মাকে এই পার্থিব দেহ ও জগৎ ছেড়ে দিয়ে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে হয় এবং আলমে বারজাখসহ অন্যান্য ধাপগুলো অতিক্রম করতে হয়। পরকাল হলো চিরস্থায়ী—সেখানে জান্নাতের নিয়ামত যেমন সীমাহীন, তেমনি জাহান্নামের শাস্তিও অনন্ত কালের। বর্তমান মানবদেহ সামান্য আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায়, সামান্য অসুখ বা আঘাতে অচল পড়ে। এই ভঙ্গুর শরীর নিয়ে অনন্তকাল বেঁচে থাকা পরকালের জগতের নিয়মের পরিপন্থী। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন যে, মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের দিনে তিনি মানুষকে এক নতুন দেহ দান করবেন, যা হবে পরকালের নতুন জগতের উপযোগী। সূরা আল-ওয়াকিয়াহ-তে আল্লাহ বলেন: “আমি তোমাদের আকার আকৃতি পরিবর্তন করতে আর তোমাদেরকে (নতুনভাবে) এমন এক আকৃতিতে সৃষ্টি করতে পারি যা তোমরা জান না।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: ৬১)
হাদিসে আল্লাহর রাসূল (স.) বিষয়টি আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘‘জান্নাতিদের শরীর হবে রোগ-শোকহীন, বার্ধক্যহীন, নিখুঁত এবং চিরযৌবনা। সেখানে ক্ষুধা-পিপাসা বা মলমূত্র ত্যাগের মতো পার্থিব শারীরিক সীমাবদ্ধতা থাকবে না।’’ অর্থাৎ, চাঁদে যাওয়ার জন্য যেমন বিশেষ পোশাকের (স্পেসস্যুট) প্রয়োজন, ঠিক তেমনি পরকালের অতিপ্রাকৃতিক জগতে টিকে থাকার জন্য আল্লাহ প্রদত্ত বিশেষ ‘নতুন দেহ’ অপরিহার্য।বাস্তবতা হলো, বিজ্ঞান মূলত ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষাগারের প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল। যা কিছু পঞ্চেন্দ্রিয় ও যন্ত্রের সীমানার বাইরে, সে বিষয়ে বিজ্ঞান নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। তাই পরকাল বা আত্মার এই অদৃশ্য যাত্রা সম্পর্কে বিজ্ঞানের এই নীরবতা কোনোভাবেই তার ‘অসত্যতা’র প্রমাণ নয়; বরং এটি কেবল বিজ্ঞানের পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতার পরিচয় দেয়। বিজ্ঞান বলে কীভাবে, দর্শন প্রশ্ন করে কেন; আর ওহি জানায় কোন উদ্দেশ্যে। যেখানে বিজ্ঞানের সীমানা শেষ, সেখান থেকেই দর্শনের গভীর যাত্রা শুরু। দর্শন প্রশ্ন করে—মানুষের এই বিপুল মেধা, চেতনা ও ন্যায়বিচারের আকঙ্ক্ষার শেষ পরিণতি কী? পৃথিবীতে অসংখ্য মানুষ আজীবন অন্যায়ের শিকার হয়েও বিচার পায় না, আবার বহু অপরাধী বুক ফুলিয়ে পার পেয়ে যায়। যদি মৃত্যুর মাধ্যমেই সব শেষ হয়ে যেত, তবে এই মহাবিশ্ব হতো চরমতম অবিচারের এক রঙ্গমঞ্চ। কিন্তু পরকালের ধারণা ও ঐশ্বরিক আদালত সেই অতৃপ্ত প্রশ্নের এক যৌক্তিক সমাধান দেয়। পরকাল আমাদের উপলব্ধি করতে শেখায়, পার্থিব জীবন হলো একটি পরীক্ষাক্ষেত্র, আর মৃত্যু হলো সেই পরীক্ষার খাতা জমা দিয়ে ফলাফল ও নতুন জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার মহালগ্ন।
চাঁদে যাওয়ার আগে মানুষ যেমন দীর্ঘ প্রস্তুতি নেয় এবং স্পেসস্যুট পরিধান করে, ঠিক তেমনি অনন্তকালের অন্তহীন যাত্রার আগেও মানুষের এক মহান প্রস্তুতির প্রয়োজন। পার্থিব জীবনে নেক আমল, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের মাধ্যমে মানুষ মূলত পরকালের সেই দীর্ঘ যাত্রার পাথেয় সংগ্রহ করে। আর মৃত্যু হলো সেই মহান রূপান্তরকামী প্রক্রিয়া, যা মানুষের আত্মাকে তার জীর্ণ, সীমাবদ্ধ ও নশ্বর খোলস থেকে মুক্ত করে এক চিরন্তন, অবিনশ্বর এবং জ্যোতির্ময় অস্তিত্বের দিকে নিয়ে যায়। অতএব, মৃত্যু কোনো সমাপ্তি নয়; “মৃত্যু হলো এক নশ্বর জগত থেকে মহিমান্বিত অন্য জগতে প্রবেশের এক অনিবার্য, যৌক্তিক ও সুন্দর তোরণদ্বার।”
2 Comments
Friends
শিপন সরকার
@shepon
Md shohag rana
@shohag9011
Syed Farah
@syedfarah
BONI AMIN
@boniamin
সাবিত রিজওয়ান
@rejon
অভিমানী মন
@ovimanimon
মো: নাজমুল আখতার
@faith
ইফতিশা খানম
@eftishakhanam
শ.ম.ওয়াহিদুজ্জামান
@sharifmuhammadwahiduzzaman


মৃত্যু এক নতুন তোরণদ্বার….🖤