-
একটি সাদা মানিব্যাগ
অথবা একজন সান্তাক্লজশেষ পর্ব
১৩.
রিক্সাওয়ালার বয়স পঞ্চাশ কি পঞ্চান্ন হবে। গায়ে জোর বেশি নেই মনে হয়। রিক্সা টানতে তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। তার উপর একটু পর পর কাশছে। শান্ত রিক্সাওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলো, কী মামা? আপনার কি রিক্সা চালাতে কষ্ট হচ্ছে? নেমে যাবো?
রিক্সাওয়ালা ঝট করে পেছন দিকে বললো, না মামা… কোনো সমস্যা হইতেছে না।
তাহলে এত আস্তে চালাচ্ছেন কেন? বিয়ারিং নষ্ট নাকি?
না… না… বিয়ারিং ঠিক আছে।
তাহলে?
রিক্সাওয়ালা আরেকবার পেছন ফিরে হাসলো। শান্ত ল্যাম্পপোস্টের উজ্জ্বল আলোয় রিক্সাওয়ালার মুখের দিকে তাকিয়েই বললো, মামা একটু সাইডে থামান।
রিক্সা সাইডে থামতেই শান্ত বললো, আমার দিকে তাকান।
রিক্সাওয়ালা শান্তর দিকে তাকালো। আরো একদফা কাশলো। শান্ত রিক্সাওয়ালার কপালে হাত দিয়ে বললো, একি মামা! আপনার তো অনেক জ্বর। এই শরীরে রিক্সা চালাচ্ছেন! নিজেও মরবেন, আমাকেও মারবেন!
বাবা, রাগ কইরেন না! আসলে আমি খুব ঝামেলায় আছি। তাই বাধ্য হইয়া এই শরীরেও গাড়ি নিয়া বের হইছি।
শান্ত ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো, কী সমস্যা?
বাবারে! আমার মাইয়াটা মেডিকেল কলেজে পড়ে। খুব মেধাবি। আমি রিক্সা চালায়া চালায়া মাইয়াটারে এতদূর নিয়া আসছি। ছোটবেলায় মাইয়াটা ওর মারে হারাইছে। আমি খুব আদর সোহাগ দিয়া ওরে বড় করছি। গেরামে থাকতে একটা রাইসমিলে কাজ করতাম। একদিন মিলে আগুন লাগলো। সবকিছু পুইড়া খাক হইয়া গেলো। মাইয়াটা ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাইছে। হলের পরিবেশ ভালো না দেইখা একটা হোস্টেলে থাইকা লেখাপড়া করে। আমি গেরাম থেইকা শহরে আইলাম। মাইয়ার লগে দেখা করলাম। মাইয়া আমার সব শুইনা সে কি কান্দন। আমি কইলাম, কান্দিস না…
কথার মাঝখানেই আবার সে কাশতে লাগলো। কাশি থামতে আবার বলতে শুরু করলো।
মাইয়ার কান্দন থামে না। ও কইলো, লেখাপড়া ছাইড়া চাকরি করবো। আমি দিলাম বকা! আচ্ছা আপনেই কন বাবা, ফাইনাল ইয়ারে কেউ লেখাপড়া ছাইড়া দেয়! আমি জিন্দা আছি না, কন?
শান্ত রিক্সাওয়ালার প্রশ্নের জবাবে কিছু বলতে পারে না! অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। যেন এক বিশাল মহিরুহকে দেখছে শান্ত। এমন এক আশ্রয়, যার জন্য নিরাপদ নামক শব্দটিও যথার্থ নয়। শান্ত নিজের বাবার সাথে এই বৃদ্ধটির অদ্ভুত মিল খুঁজে পেলো। ওর বাবাও ওকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছেন। ওর ভাই অনন্তকেও। অথচ ও পারছে না, বাবার সেই কষ্টকে সার্থক করতে। এই ব্যর্থতা, এই গ্লানি, এই অপারগতা ওর মনের ভেতর যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে, তার বেদনা কেউ বুঝবে না। এসব কথা ভাবতেই শান্তর চোখ ছলছল করে উঠলো।
বাবা, আপনে কান্দেন ক্যান?
কই না তো। মনে হয়ে চোখে বালু ঢুকেছে। আপনি বলেন। এরপর কী হলো?
রিক্সাওয়ালা আরেকদফা কেশে বললো, মাইয়া জিগাইলো ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা সামনে? সেইটার ফি কেমনে দিবা? হোস্টেল ফি কেমনে দিবা? আমি ওরে কইলাম চিন্তা না কইরা মন দিয়া পড়তে। শেষে একটা গ্যারেজে গিয়া, মহাজনরে সব বুঝায়া কইলাম। আইজ দুই মাস ধইরা এই শহরে রিক্সা চালাইতেছি বাবা। মাইয়ার পরীক্ষার ফি এখনও জমা করতে পারি নাই। হোস্টেল ফি-ও বাকি পইড়া আছে।
সব শুনে শান্ত ভাবলো, আহা! এক বাবা তার মেয়ের জন্য কত কষ্ট করছে! ও কি এই লোকটাকে সাহায্য করতে পারে না? ঝট করে একটা বুদ্ধি এলো ওর মাথায়। পারে! ও এই লোককে সাহায্য করতে পারে!
আপনার মেয়ের পরীক্ষার ফি কবে দেয়া লাগবে?
১৫ দিনের মধ্যে।
হোস্টেল ফি আর পরীক্ষার ফি সহ কত টাকা দেয়া লাগবে?
বারো হাজার টাকা।
কোন মেডিকেলে পড়ে?
শরিফুল্লাহ মেডিকেল কলেজ।
ওর নাম কী? কোন ডিপার্টমেন্ট?
রিক্সাওয়ালা শান্তর মুখের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন স্বরে বললো, কেন বাবা? আপনি জাইনা কী করবেন?
শান্ত মৃদু হেসে বললো, কী করবো না করবো, সেটা আপনি জানতে পারবেন। আগে যেটা জিজ্ঞেস করেছি তার উত্তর দেন।
আমার মাইয়ার নাম আয়েশা আক্তার। আর যেন কী জিগাইলেন বাবা?
ডিপার্টমেন্ট, আপনার মেয়ে কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ে?
আমি তো সেইটা কইতে পারি না। ফরেন কি যেন একটা…
ফরেনসিক মেডিসিন?
যে… যে… ফরেন মিডিসিন।
শান্ত হেসে ফেলে বললো, আচ্ছা ঠিক আছে। শোনেন, আপনাকে একটা ঠিকানা দিচ্ছি। কাল ওখানে গিয়ে বলবেন, আমি আপনাকে পাঠিয়েছি। এই নাম্বারে ফোন করে যাবেন। আপনাকে আর রিক্সা চালাতে হবে না। ওখানে আপনার কাজের একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বুঝেছেন?
রিক্সাওয়ালা অবাক হয়ে শান্তর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বাবা… এইটা কার ঠিকানা? আপনার অফিসের?
রিক্সাওয়ালার কথা শুনে শান্ত বললো, আমার অফিস! না মামা… আমি বেকার। এটা আমার পরিচিত একজনের ঠিকানা। এই দেখেন, এতক্ষণ কথা বললাম অথচ আপনার নামটাই জিজ্ঞেস করা হলো না। আপনার নাম কী, মামা?
আমার নাম আক্তার হোসেন। আমার বৌয়ের নাম আয়েশা খাতুন। দুইজনের নাম জোড়া দিয়া মাইয়ার নাম রাখছি আয়েশা আক্তার।
বাহহ… খুব ভালো!১৪.
দরজাটা খুলতেই অবাক হয়ে গেলো শান্ত। ওর ছোট ভাই অনন্ত দাঁড়িয়ে আছে সামনে। হাসছে মিটিমিটি।
সারপ্রাইজ!
আরে, তুই! কখন এলি?
এসেছি বিকালের দিকে।
শান্ত ছোটভাইকে জড়িয়ে ধরলো। তার ভাইটা ঢাকায় আসে কদাচিৎ। পড়াশোনার চাপে আসার সুযোগই পায় না তেমন। আজ প্রায় দুই মাস পরে শান্ত অনন্তকে দেখলো।
হয়েছে ভাইয়া, এবার ছাড়ো। নইলে দম বন্ধ হয়ে মরেই যাবো।
শান্ত ভাইকে ছেড়ে ওর হাত ধরে চলে এলো বসার ঘরে। একটা বেতের সোফায় বসলো দুই ভাই। দুজনের কথাবার্তার আওয়াজ পেয়ে বাবা মা-ও এসে ঢুকলো। মুখে হাসি। তারা জানে, এই দুই ভাই একে অপরকে কতোটা ভালোবাসে। এরকম ভাতৃপ্রেম আজকাল তেমন দেখা যায় না।
শান্ত বাবাকে বললো, বাবা তুমি বলোনি কেন অনন্ত যে এসেছে।
সাদিক সাহেব হেসে বললেন, আমি কি করবো? ও-ই তো বলতে মানা করলো।
অনন্ত বললো, আসলে তোমাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য বাবাকে বলতে মানা করেছি ভাইয়া। বাবার কোনো দোষ নেই।
রাশেদা বললেন, হয়েছে। দুই ভাই খোশগল্প পরে করিস। খাবার রেডি করছি। তুই ফ্রেশ হয়ে আয়। আজ কিন্তু অনন্তের পছন্দের খাবার রান্না করেছি।
‘নো প্রবলেম’ বলে শান্ত দ্রুত উঠে পড়লো ফ্রেশ হবার জন্য।খাওয়া দাওয়া শেষে অনন্তকে নিয়ে শান্ত নিজের রুমে এসে বসলো। বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অনন্ত বললো, যা-ই বলো ভাইয়া, তুমি খুব লাকি।
তাই নাকি! কেন রে ভাই?
এই যে প্রতিদিন মায়ের হাতের খাবার খেতে পারো। হোস্টেলের খাবার যে কি ভয়াবহ, তা তো জানো না।
হুম। তা অভ্যেসটা কবে থেকে ধরলি?
অভ্যেস? কীসের অভ্যেস?
সিগারেটের অভ্যেস?
অনন্ত অবাক হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকালো, তারপর মাথা নিচু করে অপরাধি স্বরে বললো, সরি ভাইয়া। প্লিজ বাবা-মাকে বলো না।
ঠিক আছে, বলবো না। আমি জানি সিগারেটের অভ্যাস হুট করে ছেড়ে দেওয়াটা একটু কষ্টকর। তবে চেষ্টা কর, পারবি। আমিও তো খেতাম। এখন ছেড়ে দিয়েছি।
আচ্ছা ভাইয়া। কিন্তু তুমি কীভাবে বুঝলে?
শান্ত একটু হালকা হেসে বললো, ঐ যে বললাম… আমিও খেতাম। সো, অভিজ্ঞতা আছে আর কি। তবে স্মেলটা সামান্য ছিলো। অন্য কেউ বুঝতে পারতো না।
অনন্ত হেসে বললো, হুম… কিন্তু ভাইয়া, বাবা বললো, তুমি ইদানিং কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছো। অদ্ভুত মানে হচ্ছে, কেমন যেন আনমনা হয়ে থাকো। কথাবার্তা কম বলো। বিষয়টা কী? চাকরির টেনশন?
নাহহ… ওটার টেনশন করারও ফুরসত পাচ্ছি না।
তাহলে?
শান্ত ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো, বলতে পারি। তবে মা-বাবাকে কিছু বলতে পারবি না। প্রমিজ কর!
প্রমিজ। এবার বলো, কী হয়েছে।
শান্ত মানিব্যাগটা সম্পর্কে বললো। বললো বৃদ্ধ রেদওয়ানের কথাও।
সব শুনে অনন্ত বললো, ভাইয়া… আই এম সো প্রাউড অফ ইউ। সত্যিই। অন্য কেউ হলে, টাকাগুলো এতদিনে হজম করে ফেলতো। আর তুমি ঐ কয়টা টাকা যেভাবে আগলে রেখেছো, সেটা বেশ প্রশংসনীয়।
কিন্তু তাতে লাভ কিছু হচ্ছে না। তাই আমি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
কী সিদ্ধান্ত?
শান্ত রিক্সাওয়ালার ও তার মেয়ের বিষয়টাও ভাইকে জানালো। এরপর বললো, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, টাকাগুলো মেয়েটাকে দেবো। যেহেতু এখন পর্যন্ত কেউ দাবি করেনি, তাই এটার উপর একজন অসহায় মানুষের অধিকার আছে বলে আমি মনে করছি।
অনন্ত একটু ভেবে বললো, সব ঠিক আছে। কিন্তু আমার মনে হয়, টাকাগুলো দেওয়ার আগে রিক্সাওয়ালা সত্যি বলছে কি না যাচাই করে দেখা।
হুম, আমিও সেটা ভেবেছি।
অনন্ত ফোন বের করে বললো, শরিফুল্লাহ মেডিকেলে আমার পরিচিত একজন ছোট ভাই পড়ে। তাকে জিজ্ঞেস করে দেখি।
শান্ত খুশি হয়ে বললো, তাহলে তো খুবই ভালো হয়। কিন্তু এত রাতে নক দিবি?
আরে ধুর ভাইয়া… কতোই আর রাত! এখন ব্যাটা নির্ঘাত ক্যাম্পাসের কোনো চিপায় বসে তাস পিটাচ্ছে।
অনন্ত ফোন দিলো। ওপাশ থেকে সাড়া পেতেই বললো, হ্যালো নিরঞ্জন? কেমন আছিস?… হ্যাঁ, আজকেই এসেছি… কাল আসবো একফাঁকে… আচ্ছা শোন, একটা মেয়ের বিষয়ে খোঁজ নিতে ফোন দিলাম… আয়েশা আক্তার… হ্যাঁ হ্যাঁ… ঠিক জানিস, ভুল হচ্ছে না তো…? ঠিকানা দিতে পারবি?… হুম, হোস্টেলে থাকে… আচ্ছা। থ্যাংকিউ ভাই।
ফোন কেটে দিয়ে অনন্ত শান্তর দিকে তাকিয়ে হাসলো।
ভাইয়া, মনে হচ্ছে টাকাগুলোর এবার সদগতি হবে।
সব তথ্য ঠিক আছে?
হান্ড্রেড পার্সেন্ট। এই মেয়ে তো ক্যাম্পাসের জুয়েল। সবাই চেনে।
অথচ, বিপদে কেউ এগিয়ে আসছে না। আশ্চর্য!
অনন্ত মুখ বিমর্ষ করে বললো, হুম… এমনই হয় ভাইয়া। তোমার মনে আছে, বাবা যখন তোমার সেকেন্ড ইয়ারের ফিসের জন্য চাচুর কাছে গিয়েছিলো, চাচু তখন কেমন ব্যবহার করেছে? আপন মানুষই যেখানে মুখ ফিরিয়ে নেয়, পরের কাছে কিছু আশা করাটা সেখানে বোকামি।
হুম…
পরিবেশটা হালকা করতে অনন্ত বললো, যাক বাদ দাও। এবার বলো সাফা ভাবি কেমন আছে?
ভাবি? এই ছোকরা, আমাদের বিয়ে হয়েছে এখনও?
অনন্ত হেসে বললো, হয়নি মানে? আলবৎ হয়েছে। মনে মনে তোমরা যে কলমা পড়ে বসে আছো, সেটা আমি জানি না ভেবেছো? আজ হোক, কাল হোক, তোমাদের বিয়ে হবেই। সো ভাবি বললে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে না।
খুব বড় হয়ে গেছিস না! বড়দের মতো কথা বলছিস!
অফকোর্স। যাক… আমি এখন ঘুমাবো। অনেক টায়ার্ড লাগছে। কাল বিকালের বাসেই ব্যাক করবো।
কালকেই চলে যাবি?
সরি ভাইয়া, যেতে হবে। পরীক্ষা চলে এসেছে। আমি তো আসতাম না। শুধু তোমাদের দেখতে ইচ্ছে হলো বলে চলে এসেছি। ক্লাস মিস করা যাবে না।
শান্ত হেসে ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, ঠিক আছে। আমি তোকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসবো। তো এখন কি এখানেই ঘুমাবি?
ইয়েস। আর নড়ার শক্তি নেই। গুড নাইট।
শান্ত মৃদু হেসে রুমের লাইটটা নিভিয়ে ফোন হাতে বের হয়ে আসলো। বাবা-মা ঘুমিয়ে পড়েছে। ও সোফায় বসে সাফাকে ফোন দিলো। আক্তার হোসেনের বিষয়টা জানিয়ে রাখতে হবে।১৫.
বিকেলের বাসে অনন্তকে উঠিয়ে দিয়ে শান্ত চলে আসলো রমনা পার্কে। আজকে আর টিউশনি করবে না। কিছুক্ষণ রমনার হাওয়া খেয়ে সন্ধ্যের পরে সাফার বাসায় যাবে। ওর বাবা ডেকেছে। শান্ত কালই বলে দিয়েছিলো সাফাকে, টাকাগুলো যেন আক্তারকে দিয়ে দেয়। আর ওর বাসায় কোনো একটা কাজে যেন নিয়ে নেয়।
সাফা শুনে বলেছিলো, বাহহ শান্ত! খুবই দারুণ একটা কাজ করেছো। আসলেই, এই টাকাটা ওর মেয়ের খুবই দরকার। আমার কী মনে হয় জানো?
কী মনে হয়?
মনে হয়, আক্তারকে টাকাগুলো তোমার হাত দিয়ে দেওয়ার জন্যই মানিব্যাগটা আল্লাহ তোমার কাছে গছিয়ে দিয়েছে।
শান্ত হেসে বলেছিলো, হা হা হা… তোমার যা কথা! আমি কি অলি আউলিয়া নাকি! আর যদি আল্লাহ মানিব্যাগটা আক্তারকেই দিতে চাইতো, তাহলে সেটা রমনায় না পড়ে ওই বুড়োর রিক্সায় পড়লেই তো পারতো। তাই না?
ওসব তুমি বুঝবা না। তুমি এইসব বিশ্বাস করো না, তাই এমন বলছো।
ভুল। আমি অবিশ্বাসী নই। তবে যেটা যৌক্তিক, সেটাতেই আমি বিশ্বাস করি। যাই হোক, আক্তারকে কোন ধরনের কাজ দেবে?
দেখি। মনে হচ্ছে লোকটাকে দারোয়ানের কাজ দেওয়াটা ঠিক হবে না। ঘরের ভেতরে রাখা দরকার। আমাদের কাজের বুয়ার হেল্পিং হ্যান্ড হিসেবে রেখে দেবো কি না ভাবছি।
দেখো যা ভালো বোঝো। তবে লোকটার একটা গতি হওয়া চাই।
ওকে। শোনো, রাতে বাসায় এসো।
রাতে কেন?
বাবা তোমাকে ডেকেছে?
উরি বাবা! কেন ডেকেছে?
তোমাকে বকবে।
শুধু বকবে? নাকি মারও দেবে?
হি হি হি… ভয় পেয়েছো?
খুউব!
ভয় পেয়ো না। বাবা তোমাকে ডিনারের আমন্ত্রণ জানিয়েছে।
ও, আচ্ছা। ঠিক আছে, আসবো তাহলে।সেই বেঞ্চটায় এসে বসলো শান্ত। প্রকৃতি বেশ শান্ত আর নির্মল। গাছের সবুজ পাতায় হালকা বাতাসের দোলা প্রাণটা জুড়িয়ে দিচ্ছে। একটা কোকিল ডাকছে কাছেই কোনো গাছের ডালে। কদমফুলের ঘ্রাণ ভাসছে বাতাসে। বহুদিন পর বুকের ভেতর এক ধরনের শান্তি অনুভব করছে শান্ত। যেন দীর্ঘদিন ধরে বহন করা একটা ভার হঠাৎ নেমে গেছে। চোখ বন্ধ করে ও উপভোগ করতে লাগলো বিশুদ্ধ প্রকৃতির স্নিগ্ধতা।
কেমন আছো, শান্ত?
ঝট করে চোখ মেলে তাকালো শান্ত। সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বৃদ্ধ, রেদওয়ান! সেদিনের মতোই আজও হুট করেই যেন মাটি ফুঁড়ে এসে হাজির হয়েছে বৃদ্ধটি। পরনে সেই একই পোশাক। মুখে হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে সে শান্তর দিকে।
বসতে পারি?
বৃদ্ধকে দেখে গলা শুকিয়ে গেলো শান্তর। ভাবছে, এতদিন ধরে এই বুড়োকে খুঁজছে সে। অথচ, আজই এর আসার দরকার ছিলো! মানিব্যাগটার বিষয়ে যদি কিছু জানতে চায়, কী জবাব দেবে সে?
তোতলাতে তোতলাতে শান্ত বললো, আ… আপনি?
যেন শুনতে পায়নি, এমন ভঙিতে রেদওয়ান আবার বললেন, বসতে পারি?
ব…বসুন।
বেশ আয়েশ করে শান্তর পাশে বসলো বৃদ্ধ। শান্ত প্রমাদ গুনছে। ও জানে না, কী হতে চলেছে।
আজও কী ইন্টারভিউ দিয়ে এলে নাকি?
জি না। আমার ভাইকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে আসলাম।
ও… আচ্ছা!
শান্ত বৃদ্ধর মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, আপনি আজ কার সাথে দেখা করতে এসেছেন?
শান্তর কথায় বৃদ্ধ হেসে বললেন, তোমার সাথে।
আ… আমার সাথে? কেন?
বৃদ্ধ হেসে বললো, কারণটা তুমি জানো বোধহয়।
শান্তর মাথা আউলে গেলো। মুখে শব্দ যোগাচ্ছে না।
বুঝতে পারছি না।
অবশ্যই তুমি বুঝতে পারছো। কিন্তু এতো ভয় পাওয়ার কী আছে? তুমি তো অন্যায় কিছু করোনি।
বুড়োর কথার আগামাথা বুঝলো না শান্ত। ব্যাটার টাকা সে আরেকজনকে দিয়ে দিয়েছে। আর রেদওয়ান বলছেন, সে অন্যায় কিছু করেনি!
স্যার, মানিব্যাগটা আপনার-ই ছিলো, তাই না?
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, হয়তো ছিলো, হয়তো না।
মানে? ব্যাগটার মালিক আপনি না?
বৃদ্ধ হেসে বললেন, এই পৃথিবীতে মানুষ কোনো কিছুরই মালিক না। মালিকানা জিনিসটার সমস্ত স্বত্ব পরম করুণাময় নিজ অধিকারে রেখেছেন। তোমার আমার যা কিছু আছে, সবই সাময়িক। দয়াল দেন, আবার কেড়েও নেন। যখন যার যতটুকু দরকার, ততটুকুই। বেশিও না, কমও না।
আমি বুঝলাম না।
সব কিছু বুঝতে গেলে জীবন ঘোলা হয়ে যাবে। তার থেকে সহজভাবে দেখাই ভালো, যেমনটা তুমি দেখেছো।
আপনি বলছেন আমি অন্যায় কিছু করিনি। আমি কি করেছি আপনি জানেন?
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললেন, সব জানি।
কীভাবে জানেন? আপনি আসলে কে? সাফার আত্মীয়, নাকি আমার বন্ধুদের কারো পরিচিত? এটা কী কোনো খেলা?
রেদওয়ান ভারি গলায় বললেন, জীবনটা একটা খেলাই বটে। এই খেলায় হার জিত আছে, আনন্দ বেদনা আছে, প্রাপ্তি আছে, হতাশা আছে, আছে প্রত্যাশাও। আমরা সবাই সেই খেলার খেলোয়াড়। আর হ্যাঁ, আমি কারো আত্মীয় নই, কারো পরিচিতও নই। তবে বলতে পারো, সবার সব খবরই আমি রাখি।
শান্ত বললো, আমি দুঃখিত। আমাকে ক্ষমা করবেন।
কেন? কীসের জন্য?
আপনার মানিব্যাগটা আমি কুড়িয়ে পেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা…
শান্তকে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধ বললেন, বললাম তো… আমি সব জানি। তোমাকে কৈফিয়ত দিতে হবে না।
আপনাকে খুঁজেছিলাম। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনও দিয়েছিলাম।
শান্ত, তুমি কিন্তু অশান্ত হয়ে উঠেছো। প্লিজ, শান্ত থাকো। এত ভয়ের কিছুই নেই। আমি তোমার কাছে আমার মানিব্যাগ চাইতে আসিনি।
শান্ত অবাক হয়ে বললো, তাহলে কেন এসেছেন?
বৃদ্ধ একটু নড়ে চড়ে বসে বললেন, শান্ত… আমি তোমার হতাশা দেখেছি, তোমার ভালোবাসা দেখেছি। আজ তোমার দায়িত্ববোধও দেখলাম।
মানে? টাকাগুলো হারিয়ে আপনার রাগ হয়নি? কষ্ট হয়নি?
আমার রাগ বা কষ্ট সামান্য কটা কাগজের উপর নির্ভর করে না শান্ত। বরং বলতে পারো আমি অনেক খুশি হয়েছি।
শান্ত বিস্মিত হয়ে বললো, খুশি হয়েছেন?
বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বললো, অন্য কেউ হলে টাকাটা নিজের কাছেই রেখে দিতো। মৌজ মাস্তি করে ফুরিয়ে ফেলতো। অথচ, তুমি, এমনকি নিজের মায়ের চিকিৎসার জন্যেও টাকাগুলো খরচ করোনি। বরং এমন একজন মানুষকে টাকাগুলো দিয়েছো, যার প্রয়োজন তোমার চেয়েও বেশি। তাই আমি খুশি।
কিন্তু আপনার টাকাগুলো? ওগুলোর জন্য নিশ্চই আপনাকে বসের ঝাড়ি খেতে হয়েছে!
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন, শোনো, মানুষের টাকা হারালে ক্ষতি হয় সামান্য। কিন্তু মনুষ্যত্ব হারালে ক্ষতি হয় অপূরণীয়।১৬.
গোধূলির লাল আভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশে। একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে। প্রকৃতির নিয়ম মেনে আরো একবার সূর্য অস্তাচলে বিলীন করে দেবে নিজেকে। শান্ত আর রেদওয়ান, দুজনেই আকাশের দিকে তাকিয়ে রক্তবর্ণ আকাশে উড়ে যাওয়া পাখিদের দেখছে। তাদের ডানায় ঘরে ফেরার তাড়া। হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন রেদওয়ান।
ঠিক আছে শান্ত। আজ যাই। শিঘ্রই তুমি কোনো সুসংবাদ পাবে। তোমার সুদিন আসবে। তবে সবসময় নিজের উপর ভরসা রেখো। আস্থা রেখো মানুষের উপর।
শান্ত মন খারাপ করে বললো, এখনই চলে যাবেন?
বৃদ্ধ হেসে বললেন, যেতেই হবে। নইলে চাকরি থাকবে না।
আপনার অফিসের ঠিকানা আমি গুগলে খুঁজে পাইনি।
ও, আচ্ছা!
আপনার ঠিকানাটা?
মাথা নেড়ে বৃদ্ধ বললেন, প্রয়োজন নেই। আমি চাই তুমি নিজের ঠিকানাটা আগে খুঁজে নাও। সেটাই বাস্তবসম্মত হবে।
একটা প্রশ্ন করতে পারি?
করো।
আপনি আসলে কে?
বৃদ্ধ হেসে বললেন, একটা বিখ্যাত গান আছে। শুনবে?
শান্ত মাথা নেড়ে সায় দিলো। বৃদ্ধ সুর করে গাইতে লাগলো…
আমি এক যাযাবর…
আমি এক যাযাবর…
পৃথিবী আমাকে আপন করেছে
ভুলেছি নিজের ঘর…গাইতে গাইতেই শান্তকে হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে হাঁটতে লাগলো বৃদ্ধ পিছন ফিরে। ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকা অবয়বটার দিকে তাকিয়ে থাকলো শান্ত।
হঠাৎ ফোন বেজে উঠলো। এই সময়ে আবার কে ফোন দিলো!
হ্যালো!
হ্যালো। মিস্টার সাঈদুর রহমান শান্ত বলছেন?
জি বলছি।
আমি হ্যানসন গ্রুপ থেকে বলছি।
শান্ত ভ্রু কুঁচকে বললো, কোথা থেকে?
হ্যানসন গ্রুপ। আপনি আমাদের এখানে ইন্টারভিউ দিয়েছিলেন কমিউনিকেশন ম্যানেজারের পদের জন্য।
হ্যাঁ, মনে পড়েছে।
ওপাশ থেকে উচ্ছসিত কণ্ঠে বললো, ওয়েল… আমাদের কোম্পানি আপনাকে সিলেক্ট করেছে। আপনি কি আগামী পরশু থেকে জয়েন করতে পারবেন?
আমার চাকরি হয়ে গেছে?
জি, হয়ে গেছে। আমাদের এমডি শহরের বাইরে ছিলেন বলে আপনাকে জানাতে একটু দেরি হয়ে গেলো।
সত্যিই আমার চাকরি হয়ে গেছে!
জি স্যার। আপনি পরশু থেকে জয়েন করতে পারবেন?
জি পারবো।
গুড, তাহলে পরশু দেখা হচ্ছে। বেস্ট অফ লাক।ফোন কেটে যেতেই হঠাৎ শান্তর মনে পড়লো বৃদ্ধ রেদওয়ানের বলা কথা।
“শিঘ্রই তুমি কোনো সুসংবাদ পাবে। তোমার সুদিন আসবে।”
শান্ত ঝট করে পেছনে তাকিয়ে বৃদ্ধ রেদওয়ানকে খুঁজলো। সন্ধ্যের আবছা আলোয় বহুদূরে তাকে দেখা যাচ্ছে অস্পষ্টভাবে। ধীরে ধীরে গাছের সারির মাঝে সবুজ ছায়ার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেলো রেদওয়ান নামের বৃদ্ধটি। যে নিজেকে যাযাবর মনে করে।
যাযাবর!
নাকি, সান্তাক্লজ?7 Comments
Friends
মো: মনিরুজ্জামান সারজিল
@zaman2802
Shafi Hoque
@shafi-hoque
সারোয়ার -ই-কায়নাত
@mohammadsarwar-ekaynat
Eagles Dance Company
@eaglesdancecompany
BONI AMIN
@boniamin
TARIN
@tarin
আরাফাত অভি
@arafatavi
Hafez Abdullah Abdullah
@hafezabdullahabdullah
Sanaullah Al-Mubin
@sanaullahal-mubin


রেদওয়ান চরিত্রটা যেন বাস্তব না, কোনো অলৌকিক কিছু মনে হলো…