Profile Photo

Syed FarahOffline

  • syedfarah
  • Profile picture of Syed Farah

    Syed Farah

    3 weeks, 3 days ago

    দুই প্রান্তের এক সুর

    পদ্মা নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে জাল গুটিয়ে নিচ্ছিলেন জেলে রহমত আলী। আজ সাগরে বা নদীতে আগের মতো মাছ নেই। ঠিক একই সময়ে, পৃথিবী থেকে হাজার মাইল দূরে অ্যান্টার্কটিকার বরফহীন পাথুরে সৈকতে একদল কিং পেঙ্গুইন ডানা ঝাপটাচ্ছিল। তারা আর রহমত আলী যেন এক সুতোয় বাঁধা, অথচ কেউ কাউকে চেনে না।

    স্কুল থেকে ফিরে রহমত আলীর ছোট ছেলে আবির বাবাকে একটা ছবি দেখাল। ছবিতে সমুদ্রের পাড়ে পেঙ্গুইনরা তাদের পায়ের ওপর ডিম আগলে দাঁড়িয়ে আছে। আবির বলল, “জানেন বাবা, শিক্ষক আজ ক্লাসে বলেছেন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় এই পাখিদের খাবার নাকি অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। তাই এরা ছানাদের ঠিকমতো খাওয়াতে পারছে না।”

    রহমত আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ঠিক আমাদের মতোই রে বাবা! সমুদ্রের গরম হাওয়া আর অনিয়মিত বৃষ্টির কারণে নদীতেও এখন মাছের ডিম ছাড়ার সময় ওলটপালট হয়ে গেছে। ভরা মৌসুমেও মাছ পাই না। আমাদের ফজলু মিয়ার চাষাবাদেরও একই দশা। কার্তিক-অগ্রহায়ণে কখন ধান বুনবে আর কখন কাটবে, আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনায় তার কোনো নিয়ম নেই।”

    আবির অবাক হয়ে ভাবল, দূর মেরু অঞ্চলের পেঙ্গুইন আর তাদের পদ্মাপাড়ের গ্রাম—দুই জায়গার সংকট তো একই! জলবায়ুর এই পরিবর্তন পেঙ্গুইনদের বাসস্থান যেমন কেড়ে নিচ্ছে, তেমনই ফজলু মিয়ার মতো কৃষকদের ঘরে অভাব ডেকে আনছে। আয়-রোজগার কমে যাওয়ায় গ্রামের মেলা, উৎসব আর মানুষের মেলামেশার আনন্দও যেন দিন দিন কমে যাচ্ছে।

    আবির তার বন্ধুদের ডেকে বলল, “প্রকৃতি যখন সংকেত দেয়, তখন পেঙ্গুইন বা মানুষ—কেউই রক্ষা পায় না। সমুদ্রের ভারসাম্য নষ্ট হলে আমাদের পুষ্টি আর খাদ্যশৃঙ্খলও ভেঙে পড়বে।”

    তরুণ শিশুরা মিলে প্রতিজ্ঞা করল, তারা চরের বুকে প্রচুর গাছ লাগাবে এবং নদীকে দূষণমুক্ত রাখবে। আবির মনে মনে ভাবল, বিশ্বজোড়া সমস্ত শিশু আর প্রকৃতির এই অবুঝ প্রাণীদের সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য আমাদের এখনই সচেতন হতে হবে।

    দিনশেষে পদ্মার বুকে যখন চাঁদ উঠল, রহমত আলী আর আবির নৌকার ওপর বসে দূর আকাশের দিকে তাকাল। তাদের বিশ্বাস, মানুষের একটুখানি সচেতনতাই পারে এই চিরচেনা প্রকৃতি, দূরের ওই পেঙ্গুইন আর মানুষের জীবনকে আবার আগের মতো সুন্দর করে তুলতে।

    সহায়ক তথ্য-
    এম্পেরর পেঙ্গুইনের ডিম আগলে রাখার বিস্ময়কর কৌশলঃ
    এম্পেরর পেঙ্গুইনরা অ্যান্টার্কটিকার হাড় কাঁপানো শীত আর বরফের চরম প্রতিকূলতা থেকে নিজেদের ডিম রক্ষা করতে এক চমৎকার ও অবিশ্বাস্য পদ্ধতি বেছে নেয়। ডিমটি যদি কোনোভাবে বরফের সংস্পর্শে আসে, তবে তীব্র ঠান্ডায় ভেতরের ভ্রূণটি মুহূর্তেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে বাবা পেঙ্গুইন তার পায়ের পাতার ওপর ডিমটি রেখে পেটের নরম চামড়ার একটি বিশেষ উষ্ণ থলি বা ‘ব্রুড পাউচ’ (Brood pouch) দিয়ে তা পুরোপুরি ঢেকে রাখে।

    এই প্রক্রিয়ার কিছু দিক-
    পায়ের নিখুঁত ভারসাম্য: ডিমটিকে বরফের হিমশীতল স্পর্শ থেকে দূরে রাখতে পেঙ্গুইনরা তাদের পায়ের পাতার ওপর অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেটির ভারসাম্য বজায় রাখে।
    প্রকৃতির তৈরি হিটার (ব্রুড পাউচ): অ্যান্টার্কটিকার তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায়, তখনও পেঙ্গুইনের পেটের পালকহীন চামড়ার ভাঁজটি ডিমের ভেতর প্রায় ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা ধরে রাখতে পারে।
    বাবাদের একনিষ্ঠ ত্যাগ: ডিম পাড়ার পরপরই মা পেঙ্গুইন খাবারের খোঁজে দীর্ঘদিনের জন্য সাগরে চলে যায়। এই পুরো সময়টায়, অর্থাৎ প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় ধরে, বাবা পেঙ্গুইন কোনো প্রকার খাবার না খেয়ে একা হাতে ডিম পাহারা দেয় ও তা ফোটানোর দায়িত্ব পালন করে।
    দলবদ্ধ লড়াই বা ‘হাডল’ (Huddle): মেরু অঞ্চলের তীব্র তুষারঝড়ের মুখোমুখি হলে পুরুষ পেঙ্গুইনরা সবাই মিলে একে অপরের সাথে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে গোল হয়ে দাঁড়ায়। এই দলবদ্ধ অবস্থান বা ‘হাডল’ তাদের শরীরের তাপমাত্রা ধরে রাখতে এবং তীব্র ঠান্ডা থেকে বাঁচতে দারুণ সাহায্য করে।

    6
    3 Comments
    • দুই মেরুর এক কান্না, এক প্রতিজ্ঞা…..🖤

    • তথ্য আর গল্পের সুন্দর সমন্বয় হয়েছে।

    • প্রকৃতি বাঁচলে তবেই বাঁচবে মানুষ, বাঁচবে পেঙ্গুইন, বাঁচবে আগামী পৃথিবী।

Skip to toolbar