-
বীজতলার রাজনীতি
গ্রামে একসময় সন্তান জন্ম নিলে মসজিদে মিষ্টি যেত, প্রতিবেশীদের বাড়িতে সেমাই যেত, আর দাদারা গর্ব করে বলতেন, “আমাদের বংশের বাতি এসেছে।” এখন সময় বদলেছে। সন্তান জন্মের খবর শুনে প্রথম প্রশ্ন হয়—”কোথায় ভর্তি করাবেন?” শিশুটি তখনও “মা” ডাকতে শেখেনি, কিন্তু তার শিক্ষাজীবন নিয়ে ইতোমধ্যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান, চারটি মতাদর্শ, কয়েকজন শিক্ষক, একঝাঁক হুজুর এবং অর্ধডজন আত্মীয় নীরব রাজনৈতিক জোট গঠন করে ফেলেছে।
আমাদের গ্রামের রাহেলার ছেলেটার বয়স ছয় বছর। বয়স মাত্র ছয়, কিন্তু তার সামাজিক গুরুত্ব ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনী প্রার্থীর চেয়েও বেশি। কারণ সে একটি “ভর্তি-যোগ্য শিশু”। আর বর্তমান সময়ে ভর্তি-যোগ্য শিশু মানে হলো হাঁটতে থাকা একটি আসন, একটি ভবিষ্যৎ ফলাফলের পোস্টার, একটি সম্ভাব্য বৃত্তি, একটি সম্ভাব্য অনুদান, এবং প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদনে ছাপার উপযোগী একটি সংখ্যা।
রাহেলার স্বামী বিদেশে থাকেন। মরুভূমির দেশে ঘাম ঝরিয়ে সংসারের ব্যয় মেটান। ফলে সন্তান প্রতিপালনের সমস্ত দায়িত্ব রাহেলার কাঁধে। রাহেলা স্বভাবতই শান্ত প্রকৃতির নারী। সংসার করেন, সন্তান সামলান, মানুষের খোঁজখবর রাখেন। তার জীবনে সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল, ছেলেটাকে মানুষ করবেন কীভাবে। কিন্তু তিনি জানতেন না, তার এই একটি সন্তানকে মানুষ করার আগে পুরো গ্রাম তাকে নিয়ে নিজেদের মানুষ বানানোর প্রতিযোগিতায় নেমে পড়বে।
দুপুরবেলা ভাত খেয়ে পাশের বাড়ির পরশির সঙ্গে গল্প করছিলেন রাহেলা। এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ।
দরজা খুলে দেখেন গ্রামের নূরানী মাদরাসার মাওলানা সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। পরিপাটি পোশাক, সুরমা দেওয়া চোখ, মুখে স্নিগ্ধ হাসি। রাহেলা সম্মানের সঙ্গে ঘরে বসালেন।
হুজুর সোফায় এমন আরাম করে বসলেন, যেন তিনি বহুদিনের পারিবারিক উপদেষ্টা। নাস্তার দ্বিতীয় বিস্কুটে কামড় দিয়ে বললেন,
—ভাবি, ভাই তো খুবই ধর্মভীরু মানুষ। আলেমদের খুব মহব্বত করেন। আখেরাতে শান্তি চাইলে ছেলেকে মাদরাসায় পড়াতে হবে। ছোটবেলা থেকে দ্বীনি শিক্ষা না দিলে মানুষ মানুষ হয় না।
এরপর জান্নাত, নেকি, ফজিলত, সওয়াব এবং পরকালের উন্নয়ন পরিকল্পনার এক বর্ণিল উপস্থাপনা শুরু হলো।
রাহেলা মাথা নেড়ে সম্মতি না অসম্মতি—কোনোটাই প্রকাশ করলেন না। তিনি শুধু ভাবলেন, ছেলেটার হাতে এখনও ঠিকমতো ভাত খাওয়ার অভ্যাস হয়নি, অথচ তার আখেরাতের পরিকল্পনা শুরু হয়ে গেছে।
পরদিন সকাল।
রাহেলা ছেলেকে নিয়ে বারান্দায় বসে আছেন। এমন সময় আরেক দল অতিথি।
একই পাড়ার নয়ন মাস্টার, সঙ্গে কেজি স্কুলের আরও কয়েকজন শিক্ষক।
ড্রয়িংরুমে বসেই নতুন বয়ান শুরু।
—ভাবি, ছেলেটার স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়েছে। আমাদের স্কুলে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি আরবি পড়ানো হয়। প্রতিবছর পনেরো-বিশটা বৃত্তি পাই। আপনার ছেলে খুব মেধাবী মনে হচ্ছে।
রাহেলা বিস্মিত হলেন।
ছেলেটা এইমাত্র নাক মোছে জামার হাতায়। একটু আগে রঙ পেন্সিল দিয়ে দেয়ালে একটি বেঁকা গোল এঁকে দাবি করেছে, এটা নাকি একটি হাতি।
কিন্তু ভর্তি মৌসুমে সব শিশুই মেধাবী। হামাগুড়ি দেওয়া শিশুকেও ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক কিংবা আন্তর্জাতিক গবেষক হিসেবে ঘোষণা করা যায়।
সন্ধ্যার দিকে আবার কড়া নাড়ার শব্দ।
এবার উত্তরপাড়ার সালাফি মাদরাসার প্রতিনিধি দল।
তাদের বক্তব্য আরও দৃঢ়।
—ভাবি, ভাই তো বিদেশে থাকে। নিশ্চয়ই সহিহ আকিদা বোঝেন। আমাদের মাদরাসায় দিলে ছেলে সহিহ ইসলাম, সহিহ হাদিস শিখবে।
রাহেলার মনে হলো, পৃথিবীতে সহিহ এবং অসহিহের চূড়ান্ত সীমানা নির্ধারণ হবে তার ছেলের ভর্তি ফরমের মাধ্যমে।
সন্ধ্যার পর মাথা একটু ধরেছে রাহেলার। কিন্তু বিপদ তখনও বাকি।
পরদিন সকালে পাশের গ্রামের কওমি মাদরাসার একদল হুজুর এলেন।
তারা ঘরের ভেতরে ঢুকলেন না। বাইরে দাঁড়িয়েই বললেন,
—ভাবি, আপনাদের পরিবার তো আমাদের অনেক উপকার করে। আপনার শ্বশুর সাহেব কতবার মাহফিলে গেছেন! কখনো অনুদান দেওয়া বাদ দেননি। ভাবছিলাম, ছেলেটাকে যদি আমাদের মাদরাসায় দেন, তাহলে দাদার আত্মাও শান্তি পাবে।
রাহেলা এবার প্রথম উপলব্ধি করলেন, তার ছেলের ভর্তি কেবল শিক্ষার প্রশ্ন নয়; এটি পূর্বপুরুষদের আত্মিক শান্তির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
বিকেলে এল পশ্চিমপাড়ার সুন্নি মাদরাসার প্রতিনিধি দল।
তাদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত—
—আমাদের প্রতিষ্ঠান সুন্নত তরিকার। এখানে দিলে ছেলে প্রকৃত সুন্নি হবে।
রাহেলা এখন আর কিছুই বলছেন না।
তিনি শুধু তাকিয়ে আছেন।
মনে হচ্ছে, তার ছেলেটি কোনো সাধারণ শিশু নয়; সে যেন এক বিরল জাতের চারাগাছ, যাকে নিজেদের বাগানে রোপণ করতে পারলেই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ সবুজ হয়ে উঠবে।
রাতে ফোন দিলেন রাহেলার খালাতো ভাই।
কণ্ঠে উন্নয়নের সুবাস।
—আপা, আমরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল করেছি। ছোটবেলা থেকে ইংরেজি পড়ালে ভবিষ্যতে ইউরোপ-আমেরিকা যেতে সুবিধা হবে। কোথাও ভর্তি কইরো না। আমার স্কুলে দিও।
রাহেলা বললেন,
—ও তো এখনও ভালো করে বাংলা পড়তেই পারে না।
খালাতো ভাই হাসলেন।
—এই জন্যই তো ইংলিশ মিডিয়াম!
ফোন কেটে গেল।
রাহেলা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
পরদিন তিনি পরামর্শ নিতে গেলেন তার ভাসুর মানিক মাস্টারের কাছে।
মানিক মাস্টার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।
অত্যন্ত বাস্তববাদী মানুষ।
তিনি বললেন,
—ছেলেকে সরকারি স্কুলে দাও। উপবৃত্তি আছে, বই ফ্রি, বেতন নাই, দুধ আছে, ডিম আছে, কলা আছে, রুটি আছে।
একটু থেমে যেন বিষয়টা মনে পড়ল—
—আর পড়াশোনাও আছে।
এই “পড়াশোনাও আছে” কথাটা এমনভাবে বললেন, যেন এটি মূল প্যাকেজের বাইরে বাড়তি একটি উপহার।
রাহেলা এখন গভীর চিন্তায় ডুবে গেলেন।
তিনি ভাবতে লাগলেন, গ্রামের মানুষেরা এত ঐক্যবদ্ধ কবে হলো?
রাস্তা ভাঙলে কারও মাথাব্যথা নেই।
ড্রেন আটকে গেলে কেউ আসে না।
মশার উৎপাত বাড়লে সবাই নিজের দরজা বন্ধ করে।
কিন্তু তার ছেলের ভর্তি প্রসঙ্গে পুরো গ্রাম অভূতপূর্ব ঐক্য প্রদর্শন করছে।
মনে হচ্ছে, তার একমাত্র সন্তানটি কোনো শিশু নয়; বরং বিরল প্রজাতির একটি চারা, যাকে নিয়ে গ্রামের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাগানবিলাসে নেমেছে।
সেই রাতে রাহেলার ঘুম এলো না।
তিনি বারবার ভাবলেন, তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল কী?
একটি মাত্র সন্তান জন্ম দেওয়া।
যদি পাঁচটি সন্তান হতো!
একটাকে নূরানীতে দিতেন।
একটাকে কেজি স্কুলে।
একটাকে সালাফি মাদরাসায়।
একটাকে কওমিতে।
একটাকে ইংলিশ মিডিয়ামে।
আর যদি ছয় নম্বর সন্তান থাকত, তাহলে সরকারি বিদ্যালয়ও খুশি হতো।
কী চমৎকার গণতান্ত্রিক ভারসাম্য!
সবাই খুশি।
সব প্রতিষ্ঠান সন্তুষ্ট।
সব মতাদর্শ প্রতিনিধিত্ব পেত।
কেউ অভিমান করত না।
পরদিন সকালে রাহেলা বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘক্ষণ ভাবলেন।
তারপর হঠাৎ একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন।
সাদা চুন দিয়ে রাস্তার ওপর বড় বড় অক্ষরে লিখলেন—
“অধিক সন্তান জন্ম দিন, প্রতিষ্ঠান স্থাপনে অংশ নিন।”
নিচে আরও লিখলেন—
“চারটার কম সন্তান নয়, পাঁচটা হলে ভালো হয়।”
কিছুক্ষণ পর লোকজন ভিড় জমাল।
কেউ হাসতে হাসতে কুঁকড়ে গেল।
কেউ বলল, “রাহেলার মাথা গেছে।”
কেউ আবার বলল, “কথাটা কিন্তু মন্দ বলেনি!”
রাহেলা দূরে দাঁড়িয়ে মৃদু হাসলেন।
তিনি একটি গভীর সত্য বুঝে ফেলেছেন।
এই গ্রামে মানুষের সংখ্যা যত দ্রুত বাড়ছে না, তার চেয়েও দ্রুত বাড়ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে ব্যানার, ফেস্টুন, ভর্তি বিজ্ঞাপন, মতাদর্শ এবং শিক্ষাদর্শ।
শুধু শিশুদের সংখ্যা সেই হারে বাড়ছে না।
ফলে একটি ছয় বছরের শিশু আর কেবল শিশু থাকে না।
সে হয়ে ওঠে একটি আসন, একটি সম্ভাব্য ফলাফল, একটি বার্ষিক প্রতিবেদনের সংখ্যা, একটি ভবিষ্যৎ প্রচারপত্রের ছবি।
এবং শিক্ষা তখন কখনো কখনো জ্ঞানার্জনের পথ না হয়ে বীজতলার রাজনীতিতে পরিণত হয়—যেখানে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নিজের জমিতে যত বেশি চারা রোপণ করা যায়, সেই হিসাবেই ব্যস্ত।
রাহেলা শেষ পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না।
তবে তিনি জীবনের একটি গভীর সত্য বুঝে গেলেন—
একটি সন্তান মানুষ করা কঠিন, কিন্তু একটি সন্তানকে নিয়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে খুশি রাখা তার চেয়েও কঠিন।
এবং এই কারণেই আজকাল কোনো গ্রামে শিশু জন্মের খবর শুনে মানুষ আর শুধু বলে না, “অভিনন্দন।”
তারা একটু কাছে এসে, কণ্ঠ নিচু করে আরেকটি প্রশ্ন করে—
“ভর্তি কোথায় করাবেন?”1 Comment
Friends
আশরাফুল আলম রিশি
@rishi
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মানিকুল ইসলাম মানিক (কবি/সাহিত্যিক)
@manik123mmmgmail-com
Sol Nova
@tasnuvatamanna
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Kazi Adam
@kaziadam
Syed Farah
@syedfarah
naznin shamim
@nazninshamim
Poly Alam
@butterflywords

রম্যরস, ব্যঙ্গ এবং সামাজিক পর্যবেক্ষণের ভারসাম্যে লেখাটি অত্যন্ত প্রাণবন্ত।