-
ব্রিজের নিচে শ্রাবণ ‘৭১
বর্ষার মেঘে আকাশ তখন থমথম করছে। ১৯৭১ সালের সেই শ্রাবণ-ভাদ্রে মেঘনা আর ডাকাতিয়ার অববাহিকায় থৈ থৈ পানি। চাঁদপুর-কুমিল্লা রোড তখন পাকিস্তানি মিলিটারিদের জন্য এক আতঙ্কের নাম। ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলারা একের পর এক কালভার্ট আর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়ে ওদের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অগত্যা জান বাঁচাতে আর রাস্তা পাহারা দিতে ব্রিজের গোড়ায় শক্ত বাংকার খুঁড়ে বসে আছে পাকিস্তানি সেনারা।
চারিদিকে থই থই পানি, তার ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের চোরাগোপ্তা হামলা। কখনো কচুরিপানার আড়াল থেকে, কখনো বা পাড়ের ঝোপঝাড় থেকে আচমকা গর্জে ওঠে থ্রি-নট-থ্রি কিংবা এলএমজি। মিলিটারিরা তটস্থ, কাকে বিশ্বাস করবে বুঝতে পারে না। তাই জারি হয়েছে কড়া নিয়ম—নৌকা চললে ছই রাখা যাবে না। ছইয়ের ভেতর কী আছে, মানুষ নাকি ওত পেতে থাকা মুক্তি, তা বাইরে থেকে দেখা যাওয়া চাই।
তখন আমার বয়স মাত্র ছয় কি সাত। যুদ্ধ কী, রাজনীতি কী—তার অতশত বুঝতাম না। শুধু বুঝতাম চারপাশের এক থমথমে ভয়। সেই ভয়ের মধ্যেই একদিন মা আমাকে আর আমার ছোট ভাইকে নিয়ে নৌকায় উঠলেন। গন্তব্য মামার বাড়ি।
আমাদের ছই তোলা নৌকাটা যখন চাঁদপুর-কুমিল্লা রোডের সেই অভিশপ্ত ব্রিজের কাছাকাছি পৌঁছাল, মাঝিরা নিয়ম মেনে নৌকার ছইটা খুলে ফেলল। আমাদের উদ্দেশ্য দক্ষিণ দিক থেকে ব্রিজের নিচ দিয়ে উত্তর পাশে যাওয়া। আকাশ খোলা, মাথার ওপর শ্রাবণের মেঘ। আমরা মাঝনদীতে একদম অরক্ষিত।
ঠিক তখনই ঘটল ঘটনাটা। উত্তর পাশে আচমকা কী একটা শব্দ হলো। আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ব্রিজের বাংকার থেকে পাকিস্তানি মিলিটারিরা উন্মত্তের মতো গুলি চালাতে শুরু করল।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ নরক গুলজার হয়ে উঠল। কান ফাটানো গুলির আওয়াজ আর পানির বুকে বুলেটের ছপছপ শব্দ। আমাদের ছইহীন নৌকাটা মাঝনদীতে একদম স্থবির হয়ে গেল। আতঙ্কে মা আমাদের দুভাইকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে নৌকার পাটাতনে শুইয়ে দিলেন। ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।
ঠিক সেই মৃত্যুকূপের মাঝখানে, আমার ছোট্ট দুটি চোখ আটকে গেল একটা অদ্ভুত দৃশ্যের ওপর।
উত্তর পাশ থেকে, ঠিক মিলিটারিদের বাংকারের নিচ দিয়ে, থোকা থোকা বড় বড় কচুরিপানার জঙ্গল ভেসে আসছে। আর সেই কচুরিপানার ঘন সবুজ পাতার আড়াল থেকে জেগে আছে একটা ছোট্ট শিশুর মাথা! একজন বাবা তার সন্তানকে এক হাতে উঁচিয়ে ধরে, নিজে পানির নিচে নাক-মুখটুকু শুধু জাগিয়ে রেখে সাঁতরে পার হচ্ছেন।
তার ঠিক পেছনেই, কচুরিপানার ফাঁকে ফাঁকে ভেসে উঠছে একজন নারীর অবয়ব। তাঁর চোখে-মুখে তীব্র আতঙ্ক, কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে জেগে আছে সন্তান আর স্বামীকে বাঁচানোর আদিম আকুতি। চারদিকে বুলেটের বৃষ্টি, আর তার মাঝখান দিয়েই জীবনের চরম বাজি ধরে, কচুরিপানাকে ঢাল বানিয়ে তারা উত্তর পাড় থেকে দক্ষিণ পাড়ের দিকে ছুটে আসছেন।
মৃত্যু যেখানে ওত পেতে আছে, সেখানে এক চিলতে কচুরিপানা কীভাবে একটা আস্ত পরিবারের বর্ম হয়ে উঠল, তা আজও আমার কাছে এক পরম বিস্ময়।
টানটান উত্তেজনার সেই কয়েকটা মিনিট যেন কয়েক যুগ মনে হলো। অলৌকিকভাবে, মিলিটারিদের চোখ এড়িয়ে সেই বাবা-মা তাদের সন্তানকে নিয়ে একসময় দক্ষিণ পাড়ের নিরাপদ আশ্রয়ে গিয়ে উঠলেন। ঘাসের আড়ালে হারিয়ে গেল তাঁদের অবয়ব।
দুপুরের সেই গোলাগুলি যখন একসময় থামল, ততক্ষণে চারপাশ নিস্তব্ধ। তবে ব্রিজের ওপরের প্রহরীরা আমাদের আর এগোতে দিল না। রাইফেল উঁচিয়ে আমাদের ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিল।
দুপুর গড়িয়ে তখন বিকেল। মামার বাড়ি আর যাওয়া হলো না আমাদের। মাঝি নৌকা ঘুরিয়ে আবার আমাদের নিজেদের বাড়ির ঘাটে এনে ভেড়াল।
আজ এত বছর পরও, যখনই বর্ষা আসে, আর পানির ওপর কচুরিপানা ভেসে থাকতে দেখি—আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে ১৯৭১ সালের সেই দুপুর। বুলেটের শব্দ ছাপিয়ে আমার মনে পড়ে যায় সেই নিষ্পাপ শিশু আর তার বাবা-মায়ের লড়াই। বাংলাদেশ তো শুধু মানচিত্রে স্বাধীন হয়নি, এমন হাজারো বেনামী মানুষের কচুরিপানার আড়ালে জীবন বাঁচানোর আর লড়াই করার অদম্য ইচ্ছার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি হয়েছে এই দেশ।2 Comments
Friends
আয়েশা সিমা
@ayesha-sima
Kabi Doctor Mohammad Zakir Hossain Biplob
@zakir-hossain
Hridoy
@solayman-uddin-hridoy
চিন্তাতরঙ্গিনী
@thoughtwaves
Fatima Sadia
@fatimasadia
রিফায়াত নিগার
@refayat-nigar
সাফায়াত প্রতীক
@protik
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
শাহ্ সাকিরুল ইসলাম
@shahsakirulislam


nice