-
ধনী হওয়ার সহজ উপায়/
গুপীবাগের মতিন সাহেবের গলিতে দুই কাঠার উপর আমাদের একটা টিনের ঘর ছিলো। বাবা তার চাকুরি-জীবনের মাঝামাঝি ঘরটা করেছিলেন। আমাদের ছেলেবেলা কেটেছে এই ঘরে। বোনেরা ঘরের সামনে গেটফুলগাছ লাগিয়েছিলো। ছোট্ট উঠানের চারপাশে ছিলো লাল চীনা-গোলাপ। উঠানের মাঝখানের কাঠাল গাছটায় সকাল-সন্ধ্যায় প্রচুর চড়ুই পাখি জড় হয়ে আমাদের কানে তালা লাগিয়ে দিতো। বিকেলে আমরা ব্রাদার্স ইউনিয়নের মাঠে ফুটবল খেলে এসে কলপাড়ে ট্যাপ ছেড়ে গোসোল করতাম। আমার বোনরা লাল ফিতায় দুইবেনী করে কপালে কালো টিপ আর চোখে কাজল টেনে পড়শিদের সাথে এক্কা-দোক্কা খেলতো।
আমাদের পাশের প্লটে ছিলো কাস্টম-চাচার বাসা—একই রকম; টিনের চালের।
বাবা ছিলো কাস্টম চাচার বড়। বাবাকে খুব মান্যগন্য করতো। সন্ধ্যায় নওয়াব আলীর দোকানে গিয়ে দুজনে ঝোল দিয়ে পুরি খেতো, আর খুব গল্প করত। কাস্টম চাচা প্রতিদিনই এক্সটা ইনকাম করতো বিধায় বাবাকে কখনই চা-পুরির বিল দিতে হতো না। বড় বোনের বিয়ের পুরো খরচটাই বাবা কাস্টম চাচার কাছ থেকে নেয়। আমরা কলেজ, ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার সময়ও বাবা ওনার কাছ থেকে ধার করে।
কাস্টম চাচার উপরী-ইনকাম থাকায় টাকা দিতে কার্পণ্য করতো না। একে একে বোনদের বিয়ে হয়ে যায়। মা’র রান্নাঘরের ব্যস্ততা কমে আসে। মা প্রায়ই কাস্টম চাচীর সঙ্গে গল্প করতে ওদের বাসায় যায়। চাচীর এক ছেলে, এক মেয়ে; আমাদের মতো কলেজ, ভার্সিটি নিয়ে মেতে থাকে। এই সময়টায় বাবা পেনশনে যায় বটে, আমরা তখনো ইনকাম-সক্ষম হয়ে উঠি নি; ফলে বাবার খরচ কমে না। তখনো কাস্টম চাচা বাবাকে টাকা দেয়।
বাবা এবং কাস্টম চাচার লেনদেন নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। ভালো পড়শীর মতো বেড়ে উঠি। কাস্টম চাচার ছেলে দোলন আমাকে বড় ভাইয়ের মত জানে। কনা টেন-ইলেভেন ক্লাশে পড়ার সময় আমার সঙ্গে প্রেম-প্রেম ভাব জমিয়েছিলো বটে, মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর ও পাল্টে যায়। আমিও ওর দিক থেকে মন ফিরিয়ে নিয়ে সময়গুলোকে ভার্সিটি-কেন্দ্রিক করে ফেলি।
বাবার রিটায়ার্ডমেন্টের পর দুই ভাই চাকুরি নিয়ে নেয়। এই টিনের ঘর আর ওদের ভালো লাগে না। ওরা বিয়ে করে নতুন ঢাকায় ফ্লাট-বাড়িতে উঠে যায়। বাবার কিডনী আর ডায়বেটিসের অসুখ বেড়ে যাওয়ায় ওরা ছুটির দিনে বউ, নিয়ে বেড়াতে আসে, আর বউদের বলে—আমাদের গেটফুলগাছ ছিলো, চীনা গোলাপের সারি ছিলো উঠানের চারপাশে। বউরা কাঠাল-তলার বেঞ্চে বসলে মা ওদের চা খেতে দেয়। আমি সপুর দোকান থেকে গরম গরম পুরি আনি। আগে ডাল-পুরি হতো; মুদ্রাস্ফিতির কারনে এখন পুরিতে আলু দেয়। বউরা আধুনিক। ওরা তেলেভাজা এড়াতে এক,দুই কামড় মুখে নেয়।
বাবার কিডনির অসুখ বেড়ে গেলে ঘর থেকে আর বেরুতে পারে না। ফলে কাস্টম চাচার সঙ্গে যোগাযোগটা বড় আপা চালিয়ে যায়। বড় আপার বিয়েতে কাস্টম চাচা উকিল বাপ ছিলো। কারন, বড় দুলাভাই ওনার দূর-সম্পর্কের ভাগ্নে। দুজনে আজকাল খুব আসে, কাস্টম চাচার সঙ্গে মিটিং করে আর বাবাকে সপ্তাহে সপ্তাহে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
বাবা মারা গেলে চাচা ‘ভাই, ভাই…’ করে খুব কাঁদে। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে দাফন-কাফনের সব ব্যবস্থা করে। চল্লিশার খাওনিতে বিরাট ভূমিকা রাখে; যেনো বাবা ওনার আপন ভাই।
বাবা চলে যাওয়ার পর বাসাটা নিরব হয়ে যায়। আমি বাইরে বাইরে থাকি। চাচি এসে মাকে সঙ্গ দেয়। কিন্তু বড় আপা মাকে একা থাকতে দিতে চায় না। দুই মেয়েকে সঙ্গে করে এসে মাকে নিয়ে যায়। ফলে আমি একাই বাসায় থাকি। এমন এক সকালে কাস্টম চাচার ছেলে দোলন এসে বলে—ভাই, আপনার ঘরটায় এখন থেকে আমি থাকবো।
আমি বলি—অবস্যই। এই নাও চাবি।
সকাল বেলায় দোলনের হাতে চাবি তুলে দিয়ে মতিন সাহেবের গলিটাকে পিছে ফেলে বড় রাস্তায় উঠে আসি, আর শহরটা অচেনা হয়ে যায়। আগে হলে মা রুটি, আলু ভাজি করে রাখতো; আমি ডিম পোজ করে ডাইনিং টেবিলটায় খেতে বসতাম। আজ ব্রেকফাস্টের ইচ্ছেটা মরে যায়। হাটতে হাটতে পার্কে এসে ঢুকি। সকালের নিরব, সবুজ পার্ক হেসে উঠে বলে—আয়, আমার কোলে বস।
আমার বিষাদ কাটে না। অপুকে দেখি, এক দঙ্গল ছেলে,মেয়ে নিয়ে এসে মিছিলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। আমাকে দেখে বলে—আরে আপনি! চলেন, মিছিলে যাবেন।
কিসের মিছিল?
গনতন্ত্রের জন্য; আমরা গনতন্ত্র পাবো; আর সবাই মিলে ভালো থাকবো…।
মিছিল পার্ক ছেড়ে রাস্তায় উঠে গেলে আমিও ওদের সঙ্গে সামিল হই। অনেক মানুষের মধ্যে আমাকে আর আলাদা করা যায় না। আমি মিছিলের সঙ্গে হাটি/ কেউ যেনো আমার কান্না না দেখে।3 Comments
Friends
MD.Mazharul Islam Ripon
@md-mazharulislamripon
Tanjina Talukder
@tanjinatalukder
Zakir Hossan
@zakirhossan
Mikdad Hossain
@mikdadhossain
সামিরা হিমু
@himu56
Md Al Maun
@mdalmaun
Mst. Hena Parvin
@mst-henaparvin
Mohammad Rahman
@mohammadrahman
Rakib Hossain mahadi
@rakibhossainmahadi


অভিমানী মন, আপনার লেখাটি পড়ে শৈশবের সেই হারানো দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল যা সত্যিই অসাধারণ। গল্পটা পড়ার সময় একদমই অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছিল।