-
পরিচয়ের পোশাক
____ পি কে সরকারমানুষ পৃথিবীতে আসে একেবারে নগ্ন পরিচয়ে। জন্মের মুহূর্তে তার গায়ে থাকে না কোনো জাতির চিহ্ন, কোনো ধর্মের প্রতীক, কোনো সম্প্রদায়ের পতাকা, কোনো সামাজিক অভিধা। নবজাতকের শরীর তখন কেবল শরীর—নির্মল, নিরাভরণ, পরিচয়হীন অথচ সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ। সে জানে না, সে কোন জাতের; জানে না, কোন ধর্মের; জানে না, তার পূর্বপুরুষ কোন ভূখণ্ডে বসবাস করেছে কিংবা কোন বিশ্বাসের কাছে মাথা নত করেছে। তার কান্নার কোনো ধর্ম নেই, ক্ষুধার কোনো জাত নেই, ঘুমের কোনো সম্প্রদায় নেই। তার ক্ষুদ্র মুঠোটি যখন বাতাসে কেঁপে ওঠে, তখন সেখানে পৃথিবীর কোনো বিভাজনরেখা থাকে না।
তারপর মানুষ তাকে পোশাক পরায়।
সেই প্রথম নগ্ন দেহের ওপর নেমে আসে সভ্যতার প্রথম পর্দা।
পোশাক দেহকে আবৃত করে—এটি তার দৃশ্যমান কাজ। কিন্তু মানুষের সমাজে পোশাক কখনোই কেবল কাপড় হয়ে থাকেনি। কাপড়ের সঙ্গে মানুষ জুড়ে দিয়েছে অর্থ, স্মৃতি, সংস্কার, রুচি, শ্রেণি, অঞ্চল, পেশা, সম্প্রদায়, কখনো ধর্মও। ফলে যে পোশাক প্রথমে ছিল শরীরের আবরণ, ক্রমে তা হয়ে উঠেছে পরিচয়ের ভাষা।
মানুষ নিজের শরীরকে ঢাকতে গিয়ে অজান্তেই নিজের ওপর একটি সামাজিক পরিচয় লিখে ফেলেছে।
দেহ তখন আর শুধু দেহ থাকে না।
দেহ হয়ে ওঠে পাঠযোগ্য এক পৃষ্ঠা।
আর পোশাক হয়ে ওঠে সেই পৃষ্ঠার প্রথম দৃশ্যমান অক্ষর।
মানুষের পরিচয়ের একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। আমরা নিজেদের ভেতরে যতটা মানুষ, বাইরে থেকে আমাদের যতটা দেখা যায়, তার চেয়ে অনেক কম। অন্তরের যে মানুষটি নিঃশব্দে কাঁদে, যে একাকিত্বে ভেঙে পড়ে, যে অন্যের দুঃখে ব্যথিত হয়, যে ভালোবাসতে জানে, ক্ষমা করতে জানে, ভুল করতে জানে—তার কোনো নির্দিষ্ট পোশাক নেই। কিন্তু সমাজ তাকে চিনতে চায় বাইরে থেকে।
সে কী পরে?
কীভাবে পরে?
তার মাথায় কী আছে?
তার গলায় কী আছে?
তার শরীরে কোন রঙ?
কোন প্রতীক?
কোন অলংকার?
কোন চিহ্ন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকেই সমাজ প্রায়ই মানুষটির পরিচয় নির্মাণ করে।
অর্থাৎ মানুষকে বোঝার আগে মানুষ তাকে দেখতে শেখে।
আর দেখার সেই প্রাথমিক শিক্ষায় পোশাক একটি শক্তিশালী ভাষা।
একজন কৃষকের পোশাক তার শ্রমের কথা বলে, একজন সৈনিকের পোশাক তার দায়িত্বের কথা বলে, একজন চিকিৎসকের পোশাক তার পেশার কথা বলে। তেমনি কোনো বিশেষ পোশাক কোনো কোনো সমাজে ধর্মীয় বিশ্বাসেরও দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য ভুলে গেলে চলে না—পোশাক নিজে কোনো পরিচয় সৃষ্টি করে না; সমাজ পোশাকের ওপর পরিচয়ের অর্থ আরোপ করে।
এক টুকরো কাপড়ের নিজের কোনো ধর্ম নেই।
তার কোনো জাত নেই।
তার কোনো মতাদর্শ নেই।
মানুষ তাকে অর্থ দিয়েছে।
মানুষ তাকে প্রতীক বানিয়েছে।
মানুষই তাকে পরিচয়ের বাহক করেছে।
একসময় পোশাক ছিল প্রকৃতির বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিরোধ। শীত থেকে বাঁচা, রৌদ্র থেকে বাঁচা, শরীরকে আঘাত থেকে রক্ষা করা—এই ছিল তার সহজ প্রয়োজন। কিন্তু মানুষ কেবল প্রয়োজনের প্রাণী নয়; মানুষ অর্থেরও প্রাণী। সে পাথরে স্মৃতি খোদাই করে, মাটিতে চিহ্ন আঁকে, শব্দকে ভাষা বানায়, রঙকে প্রতীক বানায়, আর কাপড়কে বানায় পরিচয়ের বাহন।
এইখানেই পোশাকের ইতিহাস কেবল পোশাকের ইতিহাস থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস।
কোনো অঞ্চলের মানুষ অন্য অঞ্চলের মানুষের পোশাক দেখে তার ভূগোল অনুমান করে। কোনো সম্প্রদায়ের পোশাক দেখে তার সংস্কৃতির আভাস পাওয়া যায়। কোনো পেশার পোশাক দেখে তার কর্মপরিচয় বোঝা যায়। কোনো উৎসবের পোশাক দেখে তার ঐতিহ্য মনে পড়ে।
অর্থাৎ পোশাক মানুষের শরীরকে ঢেকে দিয়ে কখনো কখনো তার সমাজকে উন্মোচিত করে।
এ এক আশ্চর্য পরিহাস।
যে কাপড় দেহকে আড়াল করে, সেই কাপড়ই আবার পরিচয়কে প্রকাশ করে।
কিন্তু পরিচয় যখন প্রতীকে পরিণত হয়, তখন তার সঙ্গে জন্ম নেয় বিভাজনের সম্ভাবনাও।
কারণ প্রতিটি পরিচয় একই সঙ্গে একটি “আমি” এবং একটি “অন্য” নির্মাণ করতে পারে।
আমি কে—এই প্রশ্নের সঙ্গে অনেক সময় অদৃশ্যভাবে এসে দাঁড়ায় আরেকটি প্রশ্ন—
তাহলে অন্যজন কে?
এখানেই পরিচয়ের সৌন্দর্য কখনো কখনো সংকীর্ণতার জন্ম দেয়।
একজন মানুষ তার পোশাকে নিজের সংস্কৃতির স্মৃতি বহন করতে পারেন—এটি স্বাভাবিক। নিজের ঐতিহ্যকে ভালোবাসা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন নিজের পরিচয়ের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে অন্যের পরিচয়কে হেয় করা হয়।
একটি পোশাক তখন আর কেবল পোশাক থাকে না।
তা হয়ে ওঠে দেয়াল।
একজনের পোশাক তাকে অন্যজনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। একটি প্রতীক কখনো কখনো মানুষের চোখে মানুষকে আড়াল করে দেয়। তখন আমরা মুখ দেখি না, দেখি চিহ্ন; চোখ দেখি না, দেখি পরিচয়; হৃদয় দেখি না, দেখি বাহ্যিক আবরণ।
মানুষ হারিয়ে যায় পরিচয়ের ভিড়ে।
আমরা কি কখনো ভেবে দেখি—একটি শিশুকে যখন প্রথম কোনো বিশেষ পোশাক পরানো হয়, তখন সে কি জানে সেই পোশাকের অর্থ?
সে জানে না।
সে শুধু জানে, কাপড়টি তার শরীরকে ঢেকে রেখেছে।
অর্থটি শেখানো হয় তাকে।
পরিবার শেখায়।
সমাজ শেখায়।
পরিবেশ শেখায়।
উৎসব শেখায়।
অনুষ্ঠান শেখায়।
কখনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান শেখায়, কখনো সংস্কৃতি শেখায়, কখনো রাষ্ট্র, কখনো ইতিহাস।
ধীরে ধীরে শিশুটি শিখে যায়—এই পোশাক আমার, এই প্রতীক আমার, এই রং আমার, এই চিহ্ন আমার।
আর একসময় সে নিজের পরিচয়কে এত গভীরভাবে সেই বাহ্যিক চিহ্নের সঙ্গে যুক্ত করে ফেলে যে, চিহ্নটির সমালোচনাকে নিজের অস্তিত্বের সমালোচনা বলে মনে হতে পারে।
এখানেই পরিচয়ের মনস্তত্ত্ব অত্যন্ত জটিল।
মানুষ কেবল পোশাক পরে না; একসময় পোশাকও যেন মানুষকে পরতে শুরু করে।
তবু পোশাককে দোষ দেওয়া যায় না।
দোষ কাপড়ের নয়।
দোষ প্রতীকেরও নয়।
প্রশ্ন হলো—মানুষ প্রতীকের ব্যবহার কীভাবে করছে?
একজন মানুষ যদি নিজের পোশাকে তার সংস্কৃতির স্মৃতি বহন করেন, সেখানে সৌন্দর্য আছে। যদি কেউ তার ঐতিহ্যকে ভালোবাসেন, সেখানে আত্মপরিচয়ের স্বাভাবিক আনন্দ আছে। পৃথিবী তো বৈচিত্র্যেই সুন্দর। সব মানুষ একই পোশাক পরবে, একই ভাষায় কথা বলবে, একই রীতি পালন করবে—এমন পৃথিবী হয়তো আরও নিরস, আরও একরৈখিক।
বৈচিত্র্য মানুষের সভ্যতার অলংকার।
কিন্তু বৈচিত্র্য আর বিভাজন এক জিনিস নয়।
বৈচিত্র্য বলে—আমরা আলাদা, তবু পাশাপাশি।
বিভাজন বলে—আমরা আলাদা, তাই পরস্পরের বিরোধী।
এই দুইয়ের পার্থক্য বুঝতে না পারলেই পরিচয় বিষে পরিণত হয়।
মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় কি তার পোশাক?
তারপর জাতি?
তারপর ধর্ম?
তারপর ভাষা?
নাকি এসবেরও আগে সে একজন মানুষ?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ, কিন্তু তার প্রয়োগ কঠিন।
কারণ সভ্যতা আমাদের বহু পরিচয় দিয়েছে, কিন্তু মানবতা আমাদের একটি মৌলিক পরিচয় দিয়েছে—মানুষ।
আমরা কেউ জন্মের আগে নিজের জাত বেছে নিইনি।
কেউ নিজের পরিবার বেছে নিইনি।
কেউ নিজের জন্মভূমি বেছে নিইনি।
কেউ নিজের প্রথম ভাষা বেছে নিইনি।
অধিকাংশ মানুষ নিজের জন্মপরিচয় নির্বাচন করে পৃথিবীতে আসে না; সে উত্তরাধিকারসূত্রে তা পায়। পরে সেই পরিচয়ের সঙ্গে তার আবেগ, ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মমর্যাদা জড়িয়ে যায়।
তাই পরিচয়কে অস্বীকার করা যেমন অমানবিক, পরিচয়কে মানবতার ওপরে বসানোও তেমনি বিপজ্জনক।
পরিচয় থাকবে।
কিন্তু পরিচয় যেন মানুষকে গ্রাস না করে।
পোশাক থাকবে।
কিন্তু পোশাক যেন মানুষের চেয়ে বড় হয়ে না ওঠে।
প্রতীক থাকবে।
কিন্তু প্রতীক যেন মানুষের মুখকে ঢেকে না ফেলে।
একজন পথিকের কথা ভাবুন।
সে দূর কোনো গ্রাম থেকে শহরে এসেছে। তার পরনে গ্রাম্য পোশাক। শহরের মানুষ তাকে দেখে হয়তো তার অঞ্চল অনুমান করে। কেউ তাকে সহজভাবে গ্রহণ করবে, কেউ তার পোশাক দেখে তাকে পিছিয়ে থাকা মানুষ ভাবতে পারে। অথচ সেই পোশাকের ভেতরে যে মানুষটি আছে, তার বুদ্ধি, স্বপ্ন, ভালোবাসা, দুঃখ, আত্মসম্মান—এসব তো কাপড় দেখে বোঝা যায় না।
একজন শিক্ষিত মানুষ সাধারণ পোশাকে থাকতে পারেন।
একজন অশিক্ষিত মানুষ দামি পোশাক পরতে পারেন।
একজন দরিদ্র মানুষের পোশাক পুরোনো হতে পারে, কিন্তু তার আত্মমর্যাদা পুরোনো হয় না।
একজন ধনী মানুষের পোশাক ঝলমলে হতে পারে, কিন্তু তাতে তার হৃদয়ের মহত্ত্বের নিশ্চয়তা নেই।
অতএব পোশাক মানুষকে প্রকাশ করে—আবার একই সঙ্গে মানুষকে আড়ালও করে।
এই দ্বৈততাই পোশাকের সবচেয়ে বড় দার্শনিক রহস্য।
আমরা আয়নায় নিজেদের মুখ দেখি, কিন্তু সমাজ আমাদের দেখে পোশাকসহ।
আয়নায় হয়তো আমরা দেখি একজন মানুষকে।
সমাজ দেখে—একটি পরিচয়।
সেখানেই মানুষের একাকিত্বের শুরু।
কারণ মানুষ কখনোই কেবল সে নয়, যেভাবে তাকে দেখা হয়।
একজন মানুষের ভেতরে এমন বহু অঞ্চল থাকে, যেখানে কোনো সামাজিক পরিচয়ের প্রবেশাধিকার নেই। সেখানে তার ব্যক্তিগত ভয়, গোপন স্বপ্ন, অপূর্ণতা, অনুশোচনা, ভালোবাসা, পরাজয়, আশা—সবকিছু মিলেমিশে থাকে।
সেই মানুষটিকে কোনো পোশাক সম্পূর্ণ প্রকাশ করতে পারে না।
কোনো প্রতীক পারে না।
কোনো ধর্মীয় চিহ্ন পারে না।
কোনো জাতিগত পরিচয় পারে না।
কারণ মানুষ তার পরিচয়ের চেয়েও বৃহৎ।
তবু আমরা পরিচয়ের প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারি না।
পরিচয় মানুষকে শিকড় দেয়।
সংস্কৃতি তাকে স্মৃতি দেয়।
ঐতিহ্য তাকে ধারাবাহিকতা দেয়।
ভাষা তাকে আত্মীয়তার অনুভূতি দেয়।
বিশ্বাস তাকে অর্থ খুঁজে পেতে সাহায্য করতে পারে।
পোশাক সেই সব স্মৃতির দৃশ্যমান বাহক হতে পারে।
সুতরাং সমস্যাটি পরিচয়ে নয়; সমস্যাটি পরিচয়ের অহংকারে।
সমস্যাটি পোশাকে নয়; সমস্যাটি পোশাককে মানুষ বিচার করার একমাত্র মানদণ্ড বানানোতে।
সমস্যাটি ধর্মীয় প্রতীকে নয়; সমস্যাটি প্রতীককে মানবিকতার চেয়ে বড় করে তোলায়।
সমস্যাটি জাতিগত পরিচয়ে নয়; সমস্যাটি জাতিগত পরিচয়কে শ্রেষ্ঠত্বের অস্ত্র বানানোতে।
মানুষ যখন নিজের পরিচয়কে ভালোবাসে, তখন সে নিজের শিকড়কে ভালোবাসে।
কিন্তু মানুষ যখন নিজের পরিচয় দিয়ে অন্যকে ছোট করে, তখন সে নিজের শিকড়কে ভালোবাসে না—সে নিজের চারপাশে প্রাচীর তোলে।
একদিন পৃথিবীর সমস্ত পোশাক খুলে ফেললেও মানুষের পরিচয়ের প্রশ্ন শেষ হবে না। তখন হয়তো আমরা নতুন কোনো চিহ্ন খুঁজব। ভাষা, বর্ণ, নাম, জন্মস্থান, পরিবার, বিশ্বাস—কোনো না কোনো পরিচয় আমরা নির্মাণ করবই।
কারণ মানুষ পরিচয়প্রবণ প্রাণী।
সে জানতে চায়—আমি কে?
কোথা থেকে এসেছি?
কার সঙ্গে আমার সম্পর্ক?
আমার পূর্বপুরুষ কারা?
আমার সংস্কৃতি কী?
আমার বিশ্বাস কী?
এই প্রশ্নগুলো মানবসভ্যতার গভীরতম প্রশ্নগুলোর অংশ।
কিন্তু তার সঙ্গে আরেকটি প্রশ্নও সমান জরুরি—
আমি যত পরিচয়ের মানুষই হই না কেন, অন্য মানুষটির মানবিক মর্যাদা কি আমার পরিচয়ের চেয়ে ছোট?
উত্তর যদি “না” হয়, তবে সভ্যতার সম্ভাবনা বেঁচে থাকে।
শেষ পর্যন্ত পোশাক দেহকে ঢাকে, কিন্তু মানুষকে সম্পূর্ণ ঢাকতে পারে না।
জাতি মানুষকে চিহ্নিত করতে পারে, কিন্তু মানুষকে সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা করতে পারে না।
ধর্ম মানুষকে একটি বিশ্বাসের পথ দেখাতে পারে, কিন্তু মানুষের সমগ্র সত্তাকে একটি প্রতীকে বন্দী করতে পারে না।
সংস্কৃতি মানুষকে শিকড় দিতে পারে, কিন্তু তাকে অন্য মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর অধিকার দেয় না।
কারণ সব পরিচয়ের নিচে, সব পোশাকের নিচে, সব প্রতীকের নিচে—একটি স্পন্দমান হৃদয় আছে।
সেই হৃদয় ক্ষুধা বোঝে।
বেদনা বোঝে।
বিচ্ছেদ বোঝে।
ভালোবাসা বোঝে।
মায়ের অশ্রু বোঝে।
শিশুর হাসি বোঝে।
মৃত্যুর শূন্যতা বোঝে।
আশার আলো বোঝে।
এই জায়গাটিতেই মানুষ মানুষের সবচেয়ে কাছাকাছি।
তাই হয়তো বলা যায়—
দেহ জন্মগত, পোশাক সামাজিক; পরিচয় উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া, কিন্তু মানবতা অর্জন করতে হয়।
পোশাক আমাদের আলাদা করতে পারে—যদি আমরা তাকে বিভেদের ভাষা বানাই।
আবার পোশাক আমাদের বৈচিত্র্যের সৌন্দর্যও প্রকাশ করতে পারে—যদি আমরা তাকে সংস্কৃতির ভাষা হিসেবে দেখি।
অতএব পোশাক খুলে মানুষকে নগ্ন করা নয়, বরং পরিচয়ের অতিরিক্ত আবরণ সরিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাই প্রকৃত সভ্যতা।
কারণ শেষ পর্যন্ত—
মানুষের সবচেয়ে গভীর পরিচয় তার পরিধানে নয়, তার আচরণে; তার প্রতীকে নয়, তার বিবেকে; তার জন্মপরিচয়ে নয়, তার মানবিকতায়।
আর যে দিন আমরা পোশাকের ভাঁজ পেরিয়ে মানুষটিকে দেখতে শিখব, সেদিন হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে পুরোনো বিভাজনগুলোর কিছুটা নরম হয়ে আসবে।
তখন পোশাক থাকবে—কিন্তু পোশাকের আড়ালে মানুষ হারিয়ে যাবে না।
পরিচয় থাকবে—কিন্তু পরিচয়ের ভিড়ে মানবতা নিঃস্ব হবে না।
বৈচিত্র্য থাকবে—কিন্তু বৈচিত্র্য আর বিভেদের সমার্থক হবে না।
আর মানুষ, তার সমস্ত পোশাক ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে, অবশেষে আরেক মানুষের চোখে নিজেকে চিনতে পারবে—
একজন মানুষ হিসেবে।4 Comments-
অনেকদিন পর আপনার লেখা পেলাম মঞ্চবন্ধু!
আপনার পর্যবেক্ষণটা গভীর মনস্তাত্ত্বিক অন্তর্দৃষ্টি বহন করে। বাহ্যিক পরিচয় আর অভ্যন্তরীণ সত্তার মধ্যেকার এই ফাঁক নিয়ে চিন্তাটা মানুষের বিচ্ছিন্নতাবোধের একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎস। দর্শন, মনস্তত্ত্ব আর সমাজতত্ত্বের যে সমন্বয়, তা মানবতাবাদী চিন্তাধারার একটা চমৎকার নিদর্শন হতে পারে। -
মানুষের পরিচয় ও তার সামাজিক আবরণের মধ্যকার এই গভীর দর্শনটি আপনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা পড়ে অনেকক্ষণ চিন্তার জগতে ডুবে ছিলাম। আপনি খুব সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন যে পোশাক আসলে কেবল একটি কাপড় নয়, বরং এটি অনেক সময় মানুষের আসল সত্তাকে আড়াল করার এক নীরব দেয়াল হয়ে ওঠে, যা আপনার লেখনীর মাধ্যমে দারুণভাবে ফুটে উঠেছে। নিয়মিত লিখতে থাকুন, আপনার এই অসাধারণ ভাবনাগুলো আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়।
পি কে সরকার
“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”
Friends
মুনতাছির আহমেদ
@moontasirahmed
Kazi Adam
@kaziadam
মোঃ মাহফুজুর রহমান
@nnxnsnmfkfkkgmail-com
মো: নাজমুল আখতার
@faith
Khondkar Mostaque Ahmed
@mostaque
Kazi Fahim hossin
@fahim6542
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
@shahalam
নাদিম হোসাইন
@nadim-hossain
Latifur-rahman-Pramanik
@latifur-rahman-pramanik

আপনার এই লেখাটি পড়ে খুব ভালো লাগলো, একদম মনের মতো কথা বলেছেন। মানুষ যে তার পোশাক বা পরিচয়ের চেয়েও অনেক বড়—এই চিরন্তন সত্যটি আপনি দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। আশাকরি আপনার এই চমৎকার চিন্তাধারা অনেকেরই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে সাহায্য করবে।