Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    2 weeks, 3 days ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায়–তের
    পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি ওপরে ওঠেনি। পূর্ব দিগন্তে সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়েছে, কিন্তু প্রেইরির বুক থেকে ভোরের শীতলতা এখনও সরে যায়নি। রাতের শিশিরে ভেজা ঘাসের ডগাগুলো প্রথম সূর্যের আলোয় ঝিকমিক করছে। দূরের পাহাড়গুলো ধূসর নীল থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দক্ষিণ দিক থেকে আসা হালকা বাতাস শুকনো ঘাসের মাথাগুলো একসঙ্গে দুলিয়ে দিচ্ছে।

    লারসেন র‍্যাঞ্চের পেছনের খোলা জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে।

    তার সামনে গতকালের সেই কটনউডের গুঁড়ি। বহু বছরের রোদ-বৃষ্টি আর কুড়ালের আঘাতে কাঠটা ক্ষয়ে গেছে। গুঁড়ির গায়ে অসংখ্য দাগ, ফাটল আর কালচে ছোপ। তার সামনে মাটির ওপর পাশাপাশি তিনটি সরু রেখা টানা।

    মারদেকা কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে লারসেনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার পরনে র‍্যাঞ্চের সাধারণ কাজের পোশাক। হাতে কিছু নেই। কিন্তু গতকালের তুলনায় তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে সামান্য পরিবর্তন এসেছে। সে আর নিজের পায়ের দিকে বারবার তাকাচ্ছে না। বরং সামনে, পাশে, পেছনে, চারপাশের সবকিছু একসঙ্গে লক্ষ্য করার চেষ্টা করছে।

    বাড হিগিন্স একটু দূরে একটা পুরোনো কাঠের খুঁটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। দুই হাত বুকের ওপর ভাঁজ করা। মুখে সেই পরিচিত গম্ভীর ভাব, কিন্তু চোখে কৌতূহল।

    লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল, “গতকাল তুমি চোখ দিয়ে দেখতে শিখেছ।”

    মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

    লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। সকালের আলোয় তার মুখের শক্ত রেখাগুলো আরও স্পষ্ট। “আজ পা দিয়ে দেখতে শিখবে।”

    মারদেকার ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “পা দিয়ে?” সে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।

    লারসেনের ঠোঁটের কোণে সামান্য হাসি ফুটল। “শুনতে অদ্ভুত লাগছে, তাইনা?”

    মারদেকা একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল, “জ্বী, একটু।”

    লারসেন আর কিছু বলল না। মাটির প্রথম দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলল, “এখানে দাঁড়াও।”

    মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাগটার ওপর দাঁড়াল।

    লারসেন তার সামনে কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর হাত তুলে মারদেকার দুই পায়ের দিকে ইশারা করল। “পা দুটো একটু ফাঁক করো। এতটা নয়। হ্যাঁ, এবার ঠিক আছে। শরীরের ভার মাঝখানে রাখো।”

    মারদেকা ধীরে ধীরে ভঙ্গি ঠিক করল।

    লারসেন তার চারপাশে হাঁটতে শুরু করল। কখনও ডান পাশে, কখনও বাঁ পাশে, কখনও একেবারে পেছনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। তার চোখ মারদেকার পায়ের পাতা, হাঁটু আর কোমরের অবস্থান পরীক্ষা করছে।

    প্রেইরির বাতাস একটু জোরে বইছে। পাশের লম্বা ঘাসগুলো ঢেউয়ের মতো দুলছে। দূরে কয়েকটি ঘোড়া মাথা তুলে এদিকে তাকিয়ে আবার ঘাস খেতে শুরু করে।

    মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। প্রথম মিনিটটা সহজেই কেটে যায়। দ্বিতীয় মিনিটে তার ডান পায়ের পেশিতে হালকা টান পড়ে। তৃতীয় মিনিটে সে অজান্তেই বাম পায়ের ওপর শরীরের ভার একটু বেশি দিয়ে ফেলে।

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়। “ওদিকে হেলবে না”।

    মারদেকা একটু চমকে তাকায়। “আমি তো কিছু করিনি।”

    লারসেন মারদেকার কাছে এসে নিচু হয়ে পায়ের অবস্থাটা দেখে নেয়। তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়িয়ে বলে, “করেছ। তোমার শরীর ক্লান্ত হয়ে অন্য পায়ের ওপর ভর নিতে চাইছে।”

    মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকায়।

    লারসেন তার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাটির দিকে তাকায়, তারপর ধীরে বলে, “ক্লান্তি খারাপ নয়। ক্লান্তির কারণে ভুল করা খারাপ।”

    মারদেকা কোনো উত্তর দেয় না। সে আবার শরীরের ভার মাঝখানে ফিরিয়ে আনে।

    কিছুক্ষণ পর লারসেন পেছনে সরে গিয়ে হাত দিয়ে সামনে ইশারা করে। “এবার হাঁটো।”

    মারদেকা প্রথম পা বাড়াতেই লারসেন বলে ওঠে, “থামো।”

    ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে থেমে যায়।

    লারসেন তার কাছে এসে মাটির দিকে তাকায়। শুকনো ধুলোর ওপর বুটের ছাপ স্পষ্ট। “কীভাবে পা ফেললে?”

    মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে একটু ভেবে বলে, “জানি না।”

    লারসেন ধীরে মাথা নাড়ে। “সেটাই সমস্যা।”

    সে হাঁটু সামান্য বাঁকিয়ে মাটির ওপর হাত রাখে। শুকনো মাটি আঙুলের ফাঁক দিয়ে ঝরে পড়ে। “তুমি যখন হাঁটো, তোমার চোখ সামনে থাকে। কিন্তু পা মাটির সঙ্গে কথা বলে। কোথায় শক্ত, কোথায় নরম, কোথায় পাথর, কোথায় গর্ত, কোথায় শুকনো ঘাসের নিচে মাটি ফাঁপা, পা সেটা আগে বুঝতে পারে।”

    সে হাতের ধুলো ঝেড়ে উঠে দাঁড়ায়। “তুমি যদি নিজের পায়ের কথা শুনতে না শেখো, একদিন এমন জায়গায় গিয়ে পড়বে যেখানে চোখ তোমাকে বাঁচাতে পারবে না।”

    মারদেকা নিচের মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে ধীরে সামনে হাঁটতে শুরু করে। এক পা। দুই পা। তিন পা।

    লারসেন এবার কোনো নির্দেশ দেয় না।

    মারদেকা নিজের পায়ের নিচের মাটি অনুভব করার চেষ্টা করে। কোথাও শক্ত মাটি, কোথাও সামান্য নরম। কোথাও ছোট পাথর বুটের তলায় গড়িয়ে যাচ্ছে। কোথাও শুকনো ঘাস চাপা পড়ে মৃদু শব্দ করছে।

    হঠাৎ তার ডান পা একটা ছোট গর্তে ঢুকে যায়। শরীর সামান্য দুলে ওঠে। কিন্তু সে পড়ে না।

    লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। সে কয়েক কদম এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, “কী করলে?”

    মারদেকা নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয়, “পা সরিয়ে নিয়েছি।”

    লারসেন মাথা নাড়িয়ে বলে, “না। পড়ার আগেই শরীরের ভার অন্য পায়ে দিয়েছ।”

    মারদেকা এবার চুপ করে থাকে।

    লারসেন বাডের দিকে তাকায়। “দেখেছ?”

    বাড এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার খুঁটি থেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মাথা নাড়ে। “হ্যাঁ। ছেলেটার পা দ্রুত শিখছে।”

    লারসেন আবার মারদেকার দিকে তাকায়। তার চোখে ক্ষীণ সন্তুষ্টি। “শুধু পা নয়। তোমার শরীরও শিখছে।”

    দূরে একটা ঘোড়া হঠাৎ জোরে হ্রেষাধ্বনি করে ওঠে। র‍্যাঞ্চের মূল ঘরের দিক থেকে ধোঁয়া উঠছে। রান্নাঘরের কাজ শুরু হয়ে গেছে। কয়েকজন কাউবয় আস্তাবলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। সকালের ব্যস্ততা ধীরে ধীরে বাড়ছে।

    কিন্তু লারসেনের কাছে এই মুহূর্তে র‍্যাঞ্চের অন্য কোনো শব্দের গুরুত্ব নেই।

    সে দ্বিতীয় দাগটার কাছে গিয়ে বুটের আগা দিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে বলে, “এখানে দাঁড়াও।”

    মারদেকা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়।

    লারসেন এবার হাত তুলে সতর্ক করে দেয়, “এবার আমার দিকে তাকাবে না। চারপাশ দেখবে।”

    মারদেকা ধীরে ধীরে চোখ ঘোরায়।

    লারসেন তার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। “সামনে কী?”

    মারদেকা তাকিয়ে উত্তর দেয়, “গুঁড়ি।”

    “ডানে?”

    “ঘাস।”

    লারসেন আরও একটু ডানদিকে হাত বাড়ায়। “ওদিকে?”

    মারদেকা চোখ কুঁচকে তাকায়। “আস্তাবল।”

    “বাঁয়ে?”

    “পুরোনো বেড়া।”

    লারসেন এবার একেবারে পেছনে চলে যায়। কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করে প্রশ্ন করে, “পেছনে?”

    মারদেকা ঘাড় না ঘুরিয়েই বলে, “আপনি।”

    লারসেনের মুখে এবার স্পষ্ট সন্তুষ্টির ছাপ দেখা যায়। “ভালো।” সে আরও কয়েক কদম পেছনে সরে যায়। তারপর বলে, “এবার হাঁটো।”

    মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে যায়।

    লারসেন তার পেছনে আসে না।

    বাডও নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে।

    মারদেকা কয়েক কদম যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে যায়।

    লারসেন দূর থেকে জিজ্ঞেস করে, “কেন থামলে?”

    মারদেকা মাথা সামান্য কাত করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার চোখ সামনে, কিন্তু কান যেন অন্যদিকে। “শব্দ হয়েছে,” সে ধীরে বলে।

    বাডের মুখের ভাব বদলে যায়। লারসেনও সঙ্গে সঙ্গে স্থির হয়ে যায়।

    “কী শব্দ?” লারসেন এবার আগের চেয়ে নিচু গলায় জানতে চায়।

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ডান দিকের শুকনো ঘাসের দিকে তাকিয়ে বলে, “ঘাসের মধ্যে।”

    তিনজনই নিঃশব্দ হয়ে যায়। শুধু বাতাসের শব্দ। ঘাসের ঘর্ষণের শব্দ। তারপর হঠাৎ শুকনো ঘাসের আড়াল থেকে একটা খরগোশ বেরিয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে সেটি কয়েক লাফে দূরে চলে যায়।

    বাডের মুখে প্রশস্ত হাসি ফুটে ওঠে। সে মাথা নেড়ে বলে, “চোখের চেয়ে কানও খারাপ নয়।”

    লারসেন অবশ্য হাসে না। সে খরগোশটার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ধীরে মারদেকার দিকে ফিরে বলে, “পশ্চিমে যে মানুষ শুধু সামনে তাকায়, সে অর্ধেক পৃথিবী অন্ধ হয়ে দেখে।”

    মারদেকা কিছু বলে না। তার চোখ তখনও শুকনো ঘাসের দিকে।

    লারসেন মাটির তিনটি দাগের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলে, “আজকের শিক্ষা মনে রাখবে।”

    মারদেকা তার দিকে তাকায়। “কী শিখলাম?”

    লারসেন মাথা সামান্য কাত করে বলে, “তুমি বলো।”

    মারদেকা কিছুক্ষণ চিন্তা করে। তারপর নিজের বুটের দিকে তাকিয়ে বলে, “পা আগে বুঝবে।”

    লারসেন মাথা নাড়ে। “আর?”

    মারদেকা এবার চারপাশে তাকায়। সকালের আলোয় র‍্যাঞ্চের প্রতিটি জিনিস যেন তার চোখে আলাদা হয়ে উঠেছে। ঘোড়ার খোঁয়াড়, পুরোনো বেড়া, কটনউডের গুঁড়ি, দূরের ঘাস, বাতাসে দুলতে থাকা শুকনো ডাল।

    সে ধীরে বলে, “চোখ একা যথেষ্ট নয়।”

    বাডের মুখে এবার মৃদু হাসি ফুটে ওঠে। “এবার ঠিক বলেছ।”

    সূর্য ততক্ষণে আরও ওপরে উঠে এসেছে। র‍্যাঞ্চের ব্যস্ততাও বেড়ে গেছে। আস্তাবল থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ আসছে। কাউবয়রা নিজেদের কাজে ছড়িয়ে পড়ছে। রান্নাঘরের দিক থেকে ভাজা রুটির গন্ধ বাতাসে ভেসে আসছে।

    লারসেন মাটির দাগগুলোর দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে তারপর মারদেকার দিকে ফিরে দাঁড়ায়। “এখন যাও।”

    মারদেকা নড়ছে না। “কোথায়?” সে জানতে চায়।

    লারসেনের মুখে এবার অল্প হাসি ফুটে ওঠে। “যেখানে প্রতিদিন যাও। কাজের সময় হয়ে গেছে।”

    মারদেকা বুঝতে পারে। সে ঘুরে র‍্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে শুরু করে। কয়েক পা যাওয়ার পর হঠাৎ থেমে পেছনে তাকায়। লারসেন এখনও দাঁড়িয়ে আছে। বাডও তার পাশে।

    মারদেকা কিছু বলে না। শুধু একবার নিজের পায়ের দিকে তাকায়। তারপর মাথা তুলে আবার হাঁটতে শুরু করে। আজ তার হাঁটার ভঙ্গি গতকালের মতো নয়।

    পা মাটিতে পড়ছে একইভাবে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপে এখন সচেতনতা আছে। শুকনো ঘাসের শব্দ সে শুনছে। মাটির শক্ত-নরম পার্থক্য অনুভব করছে। বাতাস কোন দিক থেকে আসছে, সেটাও যেন অজান্তে বুঝতে পারছে।

    লারসেন অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়া দেখে। বাড ধীরে ধীরে তার পাশে এসে দাঁড়ায়। দুজনের মাঝখানে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা হয় না। তারপর বাড নিচু গলায় বলে, “ছেলেটা বদলাচ্ছে।”

    লারসেন চোখ সরায় না। দূরে মারদেকার ছোট হয়ে আসা অবয়বের দিকে তাকিয়েই উত্তর দেয়, “সবাই বদলায়।”

    বাড মাথা নাড়ে। “ওর বদলানোটা অন্যরকম।”

    লারসেন এবার ধীরে শ্বাস নেয়। তার চোখে এমন এক ভাব ফুটে ওঠে, যেন সে ছেলেটার বর্তমানের চেয়ে অনেক দূরের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছে। “ওকে তাড়াহুড়ো করে বড় করা যাবে না, বাড,” সে নিচু গলায় বলে। “পশ্চিম নিজেই ওকে বড় করে দেবে।”

    দুজনেই আর কথা বলে না। র‍্যাঞ্চের দিকে হাঁটতে হাঁটতে তারা দেখতে পায়, মারদেকা ইতিমধ্যে আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে গেছে।

    সে দরজায় হাত রাখে। এক মুহূর্ত থামে। তারপর ফাঁক করে ভেতরে তাকায়।

    ঘোড়াগুলোর উষ্ণ নিঃশ্বাস, খড়ের গন্ধ, কাঠের মেঝেতে খুরের মৃদু শব্দ, ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো আর সেই আলোর মধ্যে ভেসে বেড়ানো অসংখ্য ধুলোর কণা, সবকিছু আজ তার কাছে যেন অন্যরকম স্পষ্ট।

    মারদেকা ধীরে ধীরে আস্তাবলের ভেতরে ঢুকে যায়। ভেতরে ঢুকতেই দরজার ফাঁক দিয়ে আসা সকালের আলোটা তার পেছনে লম্বা একটা ছায়া ফেলে। কয়েক মাস আগের সেই ছোট, রোগা ছেলেটার সঙ্গে এখনকার মারদেকার বেশ পার্থক্য। শরীর এখনও কিশোরের মতোই সরু, কিন্তু কাঁধ দুটো আগের চেয়ে চওড়া হয়েছে। বাহুর পেশিতে কাজের টান স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ঘোড়া সামলানো, খড়ের বস্তা টানা, কাঠের বোঝা ওঠানো আর র‍্যাঞ্চের নিত্যদিনের পরিশ্রম তার শরীরকে ধীরে ধীরে শক্ত করে তুলেছে। মুখের শিশুসুলভ গোলাভাবও অনেকটা কমে এসেছে। বয়স তেরোর কাছাকাছি পৌঁছেছে, আর সেই পরিবর্তন তার হাঁটা, দাঁড়ানো এবং তাকানোর ভঙ্গিতেও ধরা পড়ে।

    আস্তাবলের ভেতরটা দিনের ব্যস্ততায় জেগে উঠছে। কয়েকটি ঘোড়া খড়ের ওপর দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে খাবার চিবোচ্ছে। কোথাও লোহার খুর কাঠের মেঝেতে ঠুকছে, কোথাও জিনের চামড়া টেনে শক্ত করার শব্দ। বাতাসে শুকনো খড়, ঘোড়ার ঘাম আর চামড়ার পুরোনো গন্ধ মিশে আছে।

    মারদেকা কোনো কথা না বলে তার কাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়ায়। একটা ধূসর ঘোড়ার পিঠের ওপর হাত বুলিয়ে কিছুক্ষণ স্থির থাকে। ঘোড়াটা মাথা ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়, তারপর আবার খাবারের দিকে মুখ নামায়।

    মারদেকা ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। তারপর খুরের পাশে জমে থাকা খড় সরিয়ে দেয়।

    আগে এসব কাজ সে করত অভ্যাসবশত। এখন তার চোখ অন্যভাবে কাজ করে। খুরের নিচে মাটি কেমন, ঘোড়াটা পায়ের ওপর সমান ভার দিচ্ছে কি না, কান দুটো স্বাভাবিকভাবে নড়ছে কি না, চোখে অস্থিরতা আছে কি না, সবকিছুই সে লক্ষ্য করে।

    আস্তাবলের দরজা ঠেলে সদ্য ভেতরে আসা বাড হিগিন্সও তাকে কিছুক্ষণ দেখে। তারপর ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। “ওটার পেছনের বাঁ পা দেখেছ?” বাড জিজ্ঞেস করে।

    মারদেকা মাথা নাড়িয়ে ঘোড়াটার পায়ের দিকে তাকায়। “হ্যাঁ।”

    বাড আর কিছু বলে না। সে ঘোড়াটার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে। খুরটা হাতে তুলে দেখে। খুরের কিনারায় সামান্য কাদা জমে আছে।

    “এটা পরিষ্কার করো,” সে বলল। “তারপর আবার দেখবে।”

    মারদেকা নিচু হয়ে কাজ শুরু করে।

    বাড পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আগের মতো তাকে প্রতিটি ধাপ বুঝিয়ে দিতে হয় না। ছেলেটা এখন নিজের চোখে ভুল ধরতে শেখে। কয়েক মুহূর্ত পর মারদেকা মাথা তোলে।

    “খুরে সমস্যা নেই।”

    বাড তার দিকে তাকায়। “তুমি নিশ্চিত?”

    মারদেকা আবার খুরটার দিকে তাকায়। তারপর ঘোড়াটার পায়ের ওপর চোখ রাখে। “খুরে নয়। হাঁটার সময় ও ডান দিকে ভার দিচ্ছে।”

    বাড এবার চুপ করে যায়। ঘোড়াটাকে সামান্য সামনে হাঁটিয়ে নেয়। কয়েক পা যেতেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়। বাম পেছনের পা মাটিতে পড়ার পর ঘোড়াটা সামান্য দ্রুত ডান পায়ের ওপর ভার সরিয়ে নেয়।

    বাড ধীরে মাথা নাড়ে। “ভালো দেখেছ।”

    মারদেকা শুধু মাথা নোয়ায়। তারপর ঘোড়াটার পা আবার পরীক্ষা করতে থাকে।

    বাড কিছুক্ষণ তাকে দেখে থেকে আস্তাবলের দরজার দিকে তাকায়। বাইরে লারসেন আর নেই। তবে কিছু দূরে তার ঘোড়াটা বাঁধা। সম্ভবত সে অন্য কাজে গেছে।

    বাড নিচু গলায় বলে, “আজ থেকে একটা কথা মনে রাখবে। চোখ যা দেখে, হাত যেন তার চেয়ে বেশি কিছু করার চেষ্টা না করে।”

    মারদেকা মাথা নাড়ে।

    এই ছোট্ট ছেলেটার মধ্যে একটা পরিবর্তন বাড বেশ কিছুদিন ধরেই লক্ষ্য করছে। আগে কোনো কাজের নির্দেশ পেলে মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সেটা করার চেষ্টা করত। এখন সে এক মুহূর্ত থামে। দেখে। ভাবে। তারপর হাত বাড়ায়।

    এই থেমে যাওয়াটাই তাকে অন্যরকম করে তুলছে।

    আস্তাবলের বাইরে তখন সূর্য আরও ওপরে উঠেছে। সকালের শীতলতা প্রায় কেটে গেছে। দূরের প্রেইরিতে বাতাসের সঙ্গে ঘাসের ঢেউ তৈরি হচ্ছে। র‍্যাঞ্চের মূল উঠোনে কয়েকজন ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাদের বুটের শব্দ ধুলো মাড়িয়ে দূরে সরে যায়।

    কিছুক্ষণ পর আস্তাবলের দরজার বাইরে লারসেনকে দেখা যায়। সে ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে। রোদ থেকে ছায়ায় আসতেই তার চোখ কিছুক্ষণের জন্য অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামে মারদেকার ওপর।

    ছেলেটা তখন ঘোড়ার পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে। লারসেন তাকে কিছু বলে না।

    মারদেকা তাকে দেখতে পেয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়।

    লারসেন ঘোড়াটার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, “কী হয়েছে?”

    মারদেকা সংক্ষেপে বলে, “পায়ে ব্যথা নেই। হাঁটার সময় ভার বদলাচ্ছে।”

    লারসেন ঘোড়াটার কাছে গিয়ে পা পরীক্ষা করে। তারপর কয়েক পা হাঁটিয়ে দেখে।

    ফিরে এসে মারদেকার দিকে তাকায়। “ঠিক ধরেছ।” এই দুই শব্দের বেশি কিছু সে বলে না।

    কিন্তু মারদেকার চোখে সামান্য পরিবর্তন দেখা যায়। প্রশংসা শুনে সে হাসে না, উচ্ছ্বসিতও হয় না। শুধু একবার মাথা নোয়ায়।

    লারসেন সেটা লক্ষ্য করে। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য সন্তুষ্টির ছায়া ফুটে ওঠে। সে ঘুরে বেরিয়ে যায়।

    মারদেকা তার চলে যাওয়া দেখে না। সে আবার ঘোড়াটার দিকে ফিরে যায়।

    বাইরে সূর্য আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ছায়া ধীরে ধীরে ছোট হচ্ছে। দিন এগিয়ে যাচ্ছে।

    আর মারদেকার ভেতরেও কিছু একটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে, যেটা কোনো একদিন হঠাৎ করে প্রকাশ পাবে না। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজ, ভুল, সংশোধন আর নীরব শিক্ষার ভেতর দিয়েই সেটা তৈরি হচ্ছে।

    বয়স বাড়ার সঙ্গে তার শরীর যেমন শক্ত হচ্ছে, তেমনি তার নীরবতাও বদলে যাচ্ছে। আগে তার চুপ করে থাকা ছিল অচেনা পৃথিবীর সামনে অসহায়তার চিহ্ন। এখন সেই নীরবতা অনেকটা সচেতনতার।

    সে কম কথা বলে। কিন্তু যখন বলে, তখন দেখে নিয়ে ভেবে চিন্তে বলে।

    আস্তাবলের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাড একবার পেছনে তাকায়।

    মারদেকা তখন ধূসর ঘোড়াটাকে ধীরে ধীরে হাঁটাচ্ছে। তার পদক্ষেপ মেপে পড়ছে। চোখ সামনে। কান চারপাশে। হাত শান্ত।

    বাডের মনে হয়, ছেলেটা আর শুধু র‍্যাঞ্চে আশ্রয় পাওয়া একটা পাহাড়ি বালক নেই। সে ধীরে ধীরে র‍্যাঞ্চেরই একজন হয়ে উঠছে।

    কিন্তু পশ্চিমের মাটিতে মানুষ যখন কোনো জায়গার অংশ হয়ে ওঠে, তখন সেই মাটির বিপদও একসময় তার নিজের বিপদ হয়ে দাঁড়ায়।

    দূরের প্রেইরির ওপরে হঠাৎ একটা কালো বিন্দু দেখা যায়। বাড প্রথমে সেটাকে বাজপাখি ভেবেছিল। তারপর বুঝতে পারে, ওটা পাখি নয়।

    দূরের পথের ওপর ধুলো উঠছে। খুব সামান্য। কিন্তু ধুলোটা স্থির নয়। কেউ ঘোড়ায় চড়ে আসছে।

    বাড চোখ সরু করে তাকিয়ে থাকে।

    মারদেকা তখনও কিছু জানে না। সে ধূসর ঘোড়াটাকে নিয়ে আস্তাবলের ভেতরে ফিরছে।

    কিন্তু বাডের মুখের ভাব বদলে গেছে। কারণ লারসেন র‍্যাঞ্চে দূর থেকে আসা প্রতিটি ঘোড়ার ধুলোকে গুরুত্ব দিতে শিখিয়েছে। আর এই ধুলোটা আসছে র‍্যাঞ্চের শহরমুখী পথ ধরে। কে আসছে, কেন আসছে, আর তার খবর কী, সেটা এখনও কেউ জানে না।

    দূরের পথের ওপর ধুলোটা ধীরে ধীরে ঘন হয়ে উঠছে। প্রথমে শুধু প্রেইরির বাদামি মাটির ওপর একটা অস্পষ্ট রেখা দেখা যাচ্ছিল, এখন বোঝা যাচ্ছে সেটি এক জায়গায় স্থির নেই, ধীরে ধীরে র‍্যাঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছে। কখনও ধুলো বাতাসে উঠে অশ্বারোহীটাকে পুরোপুরি আড়াল করে ফেলছে, আবার পরক্ষণেই তার ভেতর থেকে ঘোড়ার মাথা আর আরোহীর টুপির কিনারা দেখা যাচ্ছে। ঘোড়ার খুরের মৃদু শব্দও এখন বাতাসে ভেসে আসছে।

    বাড হিগিন্স আস্তাবলের দরজায় দাঁড়িয়ে চোখ সরু করে পথটার দিকে তাকিয়ে থাকে। এক হাত দরজার কাঠে রাখা। রোদে পোড়া মুখের ওপর সকালের আলো পড়েছে, কিন্তু তার চোখে কোনো স্বস্তি নেই। পথটা ব্ল্যাক রিভারের দিক থেকে এসেছে। এই পথ তার অচেনা নয়। প্রতিদিনই কেউ না কেউ এই পথ দিয়ে র‍্যাঞ্চে আসে, আবার চলে যায়। তবু একা অশ্বারোহীটির ধীর গতির মধ্যে এমন কিছু আছে, যা বাডের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে সতর্ক করে দেয়।

    আস্তাবলের ভেতরে মারদেকা তখন আর একটি ঘোড়ার খুর পরীক্ষা করছে। বাড কিছুক্ষণ তাকে লক্ষ্য করে তারপর নিচু গলায় বলে, “ওদিকটা দেখো।”

    সে চিবুক তুলে প্রেইরির দিকে ইঙ্গিত করে। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে কাজ থামিয়ে বাইরে আসে। কয়েক মুহূর্ত চোখ কুঁচকে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মুখে কোনো কৌতূহল নেই, শুধু মনোযোগ। “একজন আসছে,” সে ধীরে বলে।

    বাড তার দিকে তাকিয়ে থাকে। “আর কী দেখছ?”

    মারদেকার চোখ তখনও দূরের ধুলোর ওপর স্থির। “সে দ্রুত আসছে না।”

    বাড এবার সামান্য ভ্রু তোলে। “কীভাবে বুঝলে?”

    মারদেকা উত্তর দিতে একটু সময় নেয়। তারপর বলে, “ধুলো কম উঠছে। ঘোড়া দৌড়াচ্ছে না।”

    কথাটা শুনে বাড আর কিছু বলে না। ছেলেটা এখন শুধু চোখ দিয়ে দৃশ্য ধরতে শেখেনি, সেই দৃশ্য থেকে সঠিক অর্থও বের করতে শিখেছে।

    অশ্বারোহীটি ক্রমে কাছে আসে। লাল-সাদো একটি ঘোড়া, তার ওপর মাঝবয়সী এক লোক। মাথায় চওড়া কিনারার টুপি, গায়ে ধুলোমাখা বাদামি কোট। কোমরের কাছে চামড়ার বেল্ট দেখা যাচ্ছে। অস্ত্র আছে কি না এত দূর থেকে বোঝা যায় না। লোকটি ঘোড়াকে তাড়া দিচ্ছে না। বরং এমনভাবে এগিয়ে আসছে, যেন পথটা তার পরিচিত এবং গন্তব্য সম্পর্কে তার কোনো সন্দেহ নেই।

    বাড এবার মারদেকার দিকে ফিরে বলে, “লারসেনকে খবর দাও।”

    মারদেকা তার মুখের দিকে তাকায়। বাডের কণ্ঠে এবার এমন দৃঢ়তা যে আর কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন পড়ে না। মারদেকা মাথা নাড়িয়ে র‍্যাঞ্চের মূল বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে। সে দৌড়ায় না। হাঁটার গতি অবশ্য আগের চেয়ে দ্রুত। কিন্তু যাওয়ার সময়ও একবার কাঁধের ওপর দিয়ে পথটার দিকে তাকিয়ে নেয়।

    র‍্যাঞ্চের উঠোনে তখন দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। ক্লে মরগান একটা ভারী কাঠের বাক্স ছায়ার মধ্যে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। মিগুয়েল একটা ঘোড়ার জিনের বকল পরীক্ষা করছে। রুবেন কোল পুরোনো বেড়ার খুঁটিতে হাতুড়ির আঘাত বসাচ্ছে। হ্যাঙ্ক ডসন একটু দূরে দাঁড়িয়ে একটা লাগামের চামড়া পরীক্ষা করছে। মারদেকা তাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কেউ তাকে থামায় না। এখন এই র‍্যাঞ্চের প্রতিটি মানুষই জানে, মারদেকা অকারণে কখনও তাড়াহুড়ো করে না।

    মূল বাড়ির বারান্দায় উঠে সে দরজায় দুবার টোকা দেয়। ভেতর থেকে কাগজ সরানোর শব্দ আসে। তারপর লারসেনের কণ্ঠ শোনা যায়, “এসো।”

    মারদেকা দরজা খুলে ঢোকে। ঘরের ভেতরটা বাইরে থেকে অনেক ঠান্ডা। জানালার পর্দা অর্ধেক নামানো। কাঠের টেবিলের ওপর ছড়ানো কয়েকটি কাগজ, একটা পুরোনো মানচিত্র আর কালির বোতল। লারসেন মাথা নিচু করে কিছু লিখছে।

    মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে, “পথে একজন আসছে।”

    লারসেন লেখা থামায়। কলমটা ধীরে টেবিলের ওপর রেখে ছেলেটার দিকে তাকায়। “কত দূরে?” সে জানতে চায়।

    মারদেকা বলে, “আস্তাবল থেকে বেশি দূরে নয়।”

    লারসেন এবার উঠে দাঁড়ায়। “ঘোড়া?”

    “লাল-সাদা।”

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর জিজ্ঞেস করে, “তুমি নিজে দেখেছ?”

    মারদেকা মাথা নাড়ে। “জি।”

    লারসেনের চোখে সামান্য আগ্রহ ফুটে ওঠে। “আর?”

    এবার মারদেকা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, “লোকটার অত তাড়াহুড়ো নেই।”

    লারসেন আর কোনো প্রশ্ন করে না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকা তার পেছনে বেরিয়ে আসে।

    বারান্দায় দাঁড়িয়ে লারসেন দূরের পথের দিকে তাকায়। অশ্বারোহী এখন অনেকটাই কাছে। ঘোড়ার গায়ে জমে থাকা ঘাম রোদে চকচক করছে। খুরের আঘাতে শুকনো মাটি উঠে ছোট ছোট ধুলোর মেঘ তৈরি করছে। লারসেন নিচের উঠোনের দিকে তাকিয়ে বলে, “বাড।”

    বাড তখনই আস্তাবল থেকে বেরিয়ে আসে। “জি?”

    লারসেন শান্তভাবে বলে, “লোকটাকে এখানে আসতে দাও।”

    বাড মাথা নাড়ে।

    মারদেকা বারান্দায় দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ সে বলে, “লোকটা বারবার পেছনে তাকাচ্ছে।”

    লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকায়। তারপর নিজের চোখ পথের ওপর স্থির করে। অশ্বারোহী তখন কয়েকশো গজ দূরে। সত্যিই লোকটা একবার কাঁধ ঘুরিয়ে পেছনে তাকায়। কয়েক মুহূর্ত পর আবারও একই কাজ করে। লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না, কিন্তু তার দৃষ্টি আগের চেয়ে কঠিন হয়ে ওঠে।

    বাতাসের দিক হঠাৎ বদলে যায়। প্রেইরির ওপর দিয়ে একটা দীর্ঘ ঝাপটা এসে শুকনো ঘাসগুলোকে একসঙ্গে নুইয়ে দেয়। দূরের পাহাড়ের গায়ে সকালের আলো একটু ফিকে হয়ে আসে। অশ্বারোহী এবার র‍্যাঞ্চের ফটকের কাছে পৌঁছে যায়। বাড ফটক খুলে দাঁড়ায়। ঘোড়াটা ধীরে ভেতরে ঢোকে। লোকটি চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়, তারপর ঘোড়া থামায়।

    বাড এগিয়ে গিয়ে লাগাম ধরে। লোকটি ঘোড়া থেকে নামতে নামতে বারান্দার দিকে তাকায়। তার চোখ প্রথমে লারসেনের ওপর থামে, তারপর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মারদেকার দিকে যায়। কয়েক মুহূর্ত সে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর আবার লারসেনের দিকে ফিরে বলে, “ওলফ লারসেন?”

    লারসেন সিঁড়ির ওপর দাঁড়িয়েই মাথা নাড়ে। “বলে যাও।”

    লোকটি কোটের ভেতর হাত ঢোকায়। মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের দিকে চলে যায়। লারসেনও সেটা লক্ষ্য করে। লোকটি কোনো অস্ত্র বের করে না। তার বদলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বের হয়। সে কাগজটা এগিয়ে দিয়ে বলে, “ব্ল্যাক রিভার থেকে পাঠিয়েছে।”

    লারসেন সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে কাগজটা হাতে নেয়। কাগজের ওপর শহরের অফিসের সিল। সে সিলটার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর কাগজ খুলে পড়ে। প্রথম কয়েক লাইন পড়ার সময় তার মুখে কোনো পরিবর্তন নেই। কিন্তু নিচের দিকে যেতে যেতে তার চোখের দৃষ্টি ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে ওঠে। বাড দূর থেকে সেটা লক্ষ করে। মারদেকাও লক্ষ করে। কেউ কোনো প্রশ্ন করে না।

    লারসেন কাগজটা ভাঁজ করে লোকটির দিকে তাকায়। “ভেতরে এসো।”

    লোকটি ঘোড়ার দিকে তাকায়। বাড সঙ্গে সঙ্গে বলে, “ঘোড়াটা আমি দেখছি।” লোকটি লাগাম বাডের হাতে তুলে দেয়।

    লারসেন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। মারদেকাও তার পেছনে যেতে চায়। কিন্তু দরজার কাছে এসে লারসেন ফিরে তাকিয়ে বলে, “তুমি কাজে ফিরে যাও।”

    কণ্ঠে কোনো কঠোরতা নেই, কিন্তু সিদ্ধান্তটা স্পষ্ট।

    মারদেকা থেমে যায়। “জি।”

    লারসেন লোকটাকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়।

    বারান্দায় কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে মারদেকা। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে তার চোখে কোনো শিশুসুলভ কৌতূহল নেই। শুধু একটা স্থির ভাব। তারপর ধীরে ধীরে আস্তাবলের দিকে হাঁটে।

    পথে যেতে যেতে তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরে যায়। উঠোনের ধুলো, বেড়ার ওপারে দুলতে থাকা ঘাস, দূরের পথ, ফটকের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ঘোড়ার খুরের ছাপ, সবকিছুই তার চোখে ধরা পড়ে। কয়েক মাস আগেও এই দৃশ্যগুলো তার কাছে শুধু র‍্যাঞ্চের স্বাভাবিক অংশ ছিল। এখন প্রতিটি জিনিসের মধ্যে সে কোনো না কোনো অর্থ খুঁজতে শেখে।

    আস্তাবলের দরজায় পৌঁছে মারদেকা হাত রাখে। ভেতর থেকে ঘোড়ার উষ্ণ নিঃশ্বাসের শব্দ আসে। খড়ের গন্ধ বাতাসে মিশে আছে। ছাদের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদের সরু রেখার মধ্যে অসংখ্য ধুলোর কণা ভেসে বেড়াচ্ছে। সে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।

    কাজ আবার শুরু হয়। কিন্তু আজকের সকাল আর আগের মতো নেই।

    লারসেন দরজা বন্ধ করার পর ঘরের ভেতর কিছুক্ষণ কোনো শব্দ শোনা যায় না।

    বাইরে তখন র‍্যাঞ্চের স্বাভাবিক ব্যস্ততা চলছে। কোথাও ঘোড়ার খুরের শব্দ, কোথাও কাঠের বাক্স সরানোর ঘর্ষণ, কোথাও ধাতব বকলের টুংটাং। কিন্তু মূল বাড়ির এই ঘরটা যেন সেই সব শব্দ থেকে আলাদা হয়ে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া সকালের আলো টেবিলের ওপর পড়ে থাকা কাগজগুলোর ওপর সরু রেখা এঁকে দিয়েছে।

    লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই ভাঁজ করা কাগজ।

    কাগজটা সে আবার খুলে। শহরের অফিসের সিলটা একবার দেখে নেয়। তারপর নিচের অংশটায় চোখ নামায়। সেখানে কয়েকটি নাম, একটা তারিখ, আর কয়েকটি জায়গার উল্লেখ রয়েছে। শব্দগুলো খুব বেশি নয়, কিন্তু প্রতিটি শব্দের ওজন যেন আলাদা।

    লারসেন ধীরে ধীরে চেয়ার টেনে বসে। কাগজটা টেবিলের ওপর রেখে সে পাশে থাকা পুরোনো মানচিত্রটা টেনে নেয়। মানচিত্রে ব্ল্যাক রিভার, র‍্যাঞ্চের অবস্থান, দক্ষিণের পাহাড় আর পশ্চিমের দীর্ঘ পথগুলো মোটা কালো রেখায় চিহ্নিত। তার আঙুল ধীরে ধীরে ব্ল্যাক রিভার থেকে পশ্চিম দিকে এগোয়।

    তারপর থেমে যায়। কাগজে লেখা জায়গাটার সঙ্গে মানচিত্রের একটা দূরবর্তী অংশ মিলে যায়। লারসেনের মুখে কোনো বিস্ময় নেই। শুধু চোয়ালটা একটু শক্ত হয়ে ওঠে।

    লারসেন এবার শহর থেকে আসা লোকটার দিকে তাকায়। “বসো।”

    লোকটা সামনে থাকা কাঠের চেয়ারটায় বসে। লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর কাগজটা আঙুলের ডগায় ঠেলে টেবিলের মাঝখানে নিয়ে আসে।

    “এটা তোমার হাতে কে দিয়েছে?”

    লোকটা সামান্য গলা পরিষ্কার করে বলে, “ব্ল্যাক রিভারের মার্শাল এলি ব্রুকস।”

    “তোমাকে আর কী বলেছে?”

    লোকটা এবার একটু অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসে। “বলেছে, খবরটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আপনার হাতে পৌঁছানো দরকার।”

    লারসেন এবার তার দিকে তাকায়। “শুধু এতটুকু?”

    লোকটা মাথা নাড়ে। “আর একটা কথা বলেছে।”

    “কী?”

    “শহরে কয়েকজন লোককে গত দুই দিনে দেখা গেছে। তারা নিজেদের ব্যবসায়ী বলে পরিচয় দিয়েছে। কিন্তু শহরের কেউ তাদের চেনে না।”

    ঘরের বাতাস যেন একটু ভারী হয়ে যায়।

    লারসেন চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে গিয়ে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকায়। উঠোনের ওপারে কয়েকজন লোক নিজেদের কাজে ব্যস্ত। তার চোখ তাদের ওপর নয়। আরও দূরে, র‍্যাঞ্চের ফটকের বাইরে চলে যাওয়া পথের ওপর স্থির।

    “কতজন?”

    লোকটা বলে, “তিনজনকে নিশ্চিতভাবে দেখা গেছে।”

    লারসেন ধীরে জিজ্ঞেস করে, “অস্ত্র?”

    “লুকানো ছিল। তবে চলন দেখে মনে হয়েছে, ওরা খালি হাতে নয়।”

    লারসেন কোনো উত্তর দেয় না। কয়েক মুহূর্ত পর সে জানালার কাছ থেকে সরে আসে। টেবিলের ওপর রাখা কাগজটা তুলে নেয়। নিচের দিকে লেখা কয়েকটি লাইন আবার পড়ে।

    “ওরা শহরে আছে?” লোকটার কাছে জানতে চায়।

    লোকটা বলে, “শেষ খবর তাই।”

    “কতক্ষণ আগে?”

    “গত রাত।”

    লারসেন মাথা নিচু করে কাগজটা ভাঁজ করে। এবার তার মুখে সিদ্ধান্তের ছাপ দেখা যায়। “তুমি এখন কোথায় যাবে?”

    লোকটা একটু অবাক হয়ে তাকায়। “শহরে ফেরার কথা ছিল।”

    “ঠিক আছে।” লারসেন কাগজটা নিজের কোটের ভেতর ঢুকিয়ে নেয়। “তবে সূর্য ডোবার আগে র‍্যাঞ্চ ছেড়ো না।”

    লোকটা এবার মাথা নাড়ে।

    দরজার বাইরে হঠাৎ কারও পায়ের শব্দ শোনা যায়। দুজনেই একসঙ্গে দরজার দিকে তাকায়।

    শব্দটা থেমে যায়। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূর থেকে বাডের গলা শোনা যায়, “বস!”

    লারসেন দরজা খুলে বাইরে আসে।

    বারান্দায় বাড দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে স্বাভাবিক ভাব নেই।

    “কী হয়েছে?” লারসেন নিচু গলায় জানতে চায়।

    বাড একটু কাছে এসে বলে, “উত্তরের বেড়ার কাছে নতুন ঘোড়ার ছাপ পেয়েছি।”

    লারসেনের চোখ সরু হয়ে আসে। “কখন?”

    “রাতের।”

    “নিশ্চিত?”

    বাড মাথা নাড়ে। “পুরোনো ছাপের ওপর নতুন ছাপ পড়েছে। ঘোড়াটা র‍্যাঞ্চে ঢোকেনি। বেড়ার বাইরে থেমে ছিল।”

    লারসেন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকে। তারপর ধীরে বলে, “কতজন?”

    “একজনের ছাপ পরিষ্কার।”

    “আর?”

    বাড এবার একটু থামে। “আরেকটা ঘোড়া ছিল বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বাতাসে অনেকটা মুছে গেছে।”

    লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন আসে না। সে বারান্দার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করে।

    “বাড।”

    “হ্যাঁ?”

    “কাউকে কিছু বলবে না।”

    বাড মাথা নাড়ে। “বুঝেছি।”

    লারসেন হাঁটতে শুরু করে। বাড তার পাশে আসে। দুজনেই র‍্যাঞ্চের উত্তর দিকের দিকে এগিয়ে যায়।

    তাদের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে সেই অচেনা লোকটি। সে কিছুক্ষণ দুজনের চলে যাওয়া দেখে, তারপর ধীরে ঘরের ভেতরে ফিরে যায়।

    এদিকে আস্তাবলে মারদেকা কাজ করছে। বাইরের কোনো কথাই সে শুনতে পায়নি। তার সামনে এখন একটা কালো ঘোড়া। ঘোড়াটার কেশর ঘন এবং এলোমেলো। চোখ দুটো উজ্জ্বল, কিন্তু স্বভাবটা শান্ত নয়। মারদেকা তার গলায় হাত রাখতেই ঘোড়াটা মাথা সামান্য সরিয়ে নেয়। তার কান দুটো সামনের দিকে ওঠে।

    আস্তাবলের বাইরে থেকে হঠাৎ একটা শব্দ আসে। খুব ক্ষীণ। ধাতব কিছু কাঠের সঙ্গে ঠেকে যাওয়ার মতো।

    মারদেকা মাথা তোলে। সে ঘোড়াটার গলায় হাত রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এবার তার মন পুরোপুরি বাইরে।

    ধীরে আস্তাবলের দরজার কাছে যায়। দরজাটা পুরো বন্ধ নয়। কাঠের ফাঁক দিয়ে বাইরে উঠোনের একটা অংশ দেখা যায়। সেখানে তাকিয়ে সে কাউকেই দেখতে পায়না।
    (চলবে)

    3
    4 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar