-
বর্ষাবরণ (অনুগল্প)
.
ক’দিনের কাঠফাটা রোদে মৃত্তিকার অনুজীবগুলো এক-এক করে যখন না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছিল, তখনও সূর্যদেবের করুণ ভ্রুকুটি এতটুকুও কমেনি। আর আজ কালোমেঘের সেই অভিশাপ আকাশের কান্না হয়ে সকাল থেকে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে ধরণীমাতার রুক্ষ বুকে। কখনো কখনো মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে, আবার কখনোবা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি।
.
মেঘেদের গুড়ুগুড়ু ডাকে মহাপৃথিবী আজ জাগ্রত ; বটবৃক্ষের শিকড়ের ন্যায় বিদ্যুতের আভা গগনে সহস্র বক্ররেখা এঁকে ফের মুহূর্তেই আত্মগোপন করছে— সে দৃশ্য বড়ই রোমাঞ্চকর !
অবিরাম বর্ষণ জমিনের দুঃখ-কষ্টের ফাঁটলগুলি বারিধারার কোমল চাদরে ঢেকে দেয়। খরাপীড়িত ঝিঁ-ঝিঁ পাড়ায় ফের বেঁজে ওঠে আনন্দঢাক। অতীতের সব দুঃখ ভুলে ব্যাঙের কণ্ঠে সুর পায় বর্ষাবরণের গান।
.
কুঁড়েঘর নেই ; টিনের চালে বৃষ্টিবালিকাদের নৃত্য মনের মধ্যে এক দ্যোতনার জন্ম দেয়। মন চায় আমিও গিয়ে তাদের সঙ্গী হই। কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে আমার প্রিয়ার কথা। কিজানি সেও বিরহী রাধার মত নীল শাড়ি পড়ে আমার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছে ; হয়তোবা হিজলের পাঁপড়িতে মনের বিরহগাঁথা লিখে জলে ভাসিয়ে দিচ্ছে !
.
দেহ থেকে মনটা যেন তার কাছে ছুটে চলে যায়। অতঃপর, বৃষ্টিতে ভেজা আর হয়ে উঠে না। মলিন বদনে আবার ঘরে ফিরে যাই, গিয়ে বসি জানালার পাশে। খোলা বাতায়ন আমার দৃষ্টিকে নিয়ে যায় খালের অদূরে একাকী দাঁড়ানো কদমগাছটার দিকে। আহা, কি ফুলের মেলা ! কাল অব্দি যে গাছে একটা ফুলও ছিল না, আজ তার প্রতিটি শাখায়-শাখায় শতশত কদমকলি যেন ফুলের মেলা বসিয়েছে।
.
আমার কল্পনা গভীর থেকে আরও গভীরে চলে যায়। বার বার ইচ্ছে হয়, যদি একগোছা কদম ফুল তাকে দিতে পারতাম। হয়তোবা সে ফুলে মালা বানিয়ে পড়িয়ে দিত আমার গলায়। কদমতলায় কদমফুল দিয়েই তৈরি হত আমাদের প্রণয়শয্যা ! সে আমাকে জড়িয়ে ধরে, আমার বুকে মাথা রেখে একদা ঘুমিয়ে পড়ত !!
.
একদা আমার কল্পনার ঘোর কেটে যায়। কল্পনা আর বাস্তবতার মধ্যেকার ফারাকটুকু মনের মধ্যে আন্তঃদ্বন্দ্বে জড়িয়ে কলহের সৃষ্টি করে। ক্ষোভ আর হিংসায় আমি হয়ে উঠি বিদ্রোহী। নিষ্ঠুর প্রণয়িনীরূপ কদমগাছটিকে কেটে ফেলতে উদ্যত হই। কিন্তু তা আর সম্ভব হয় না।
.
বৃষ্টিবালিকারা তখনো আপন মনে জল-কাদার খেলা খেলে চলে। তারপর, একদা সন্ধ্যা নামে প্রকৃতির বুকে; আঁধারে ছেয়ে যায় চারদিক। দূর মসজিদে মুয়াজ্জিনের আযানের ধ্বনি কানে ভেসে আসে। ঘোষদের পাড়ার তখন শাখের তালে তালে পিতলের থালায় মৃদুমন্দ ঘণ্টাধ্বনি মুহুর্মুহু সুর সাঙ্গ করে দিবসাবসানের সে আয়োজন !
.
খালের পাড়ের ব্যাঙের ঘ্যাঙোর-ঘ্যাঙ ডাক আর ঝিঁ-ঝিঁ পোকার একটানা রি-রি শব্দে বাতাসে এখনো এক নতুন ব্যাঞ্জনা সৃষ্টি হচ্ছে। আমার দৃষ্টি তখনো অন্ধকারে নিক্ষেপিত। হয়তোবা এখনো হারানো কিছুকে খুঁজে বেরাচ্ছে সে দৃষ্টি !!
অতঃপর, একদা ঘুমপরীরা এসে আমাকে নিয়ে যায় শ্রান্তির দেশে…4 Comments
Friends
ab titu
@abtitu
Foyzur Khan
@foyzur-khan
Nipun Chandra
@nipunch
স্মৃতি রানী রত্না
@srratna1990
Mohammad Al-Mamun
@mohammad-al-mamun-titu
ভাস্কর
@vaskarchou
Prithula Zaman
@prithula
AdabenTatali
@adabentatali
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta


সুন্দর অনুগল্প। শব্দের নির্বাচন ও ব্যবহার মনমুগ্ধকর। শুভেচ্ছা নেবেন।