Profile Photo

রতন চন্দ্র রায়Offline

  • ratanchandraroy
  • Profile picture of রতন চন্দ্র রায়

    রতন চন্দ্র রায়

    • 1 month, 2 weeks ago

    আলোছায়া সিনেমা ঘর
    (পরবর্তীকালে ‘চিত্রমহল’)
    ✍️ রতন চন্দ্র রায়

    জন্মবর্ষ: ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দ
    সূচনা: ১৯১৩-র সেই অদ্ভুত দিনটি
    তখন আমি নিছকই ইট-সুরকির তৈরি একটা নতুন দালান। কলকাতার এক ঘিঞ্জি গলির মোড়ে আমার লাল ইটের শরীর দাঁড়িয়ে আছে। সালটা ১৯১৩। চারপাশের মানুষগুলোর পরনে ধুতি-পাঞ্জাবি, কিংবা শাড়ি। ট্রাম চলাচলের ‘ঠং ঠং’ শব্দে শহর মুখরিত।
    সে বছরই আমার বুকে ঘটল এক অলৌকিক ঘটনা। আলো নিভিয়ে সাদা পর্দায় ফুটিয়ে তোলা হলো একটা ছবি—‘রাজা হরিশচন্দ্র’। কোনো শব্দ নেই, ভাষা নেই, শুধু আলো আর ছায়ার খেলা। মানুষ হাঁ করে তাকিয়ে রইল। কেউ ভাবল জাদুটোনা, কেউ বলল নতুন যুগের কেরামতি। আমার অন্ধকার পেটের ভেতর বসে মানুষগুলো একসাথে হাসল, কাঁদল। আর সেই আলো-আঁধারির মায়ায় আমার আত্মপ্রকাশ ঘটল—আমি হয়ে উঠলাম আলোছায়া সিনেমা ঘর।
    প্রথম যৌবন: নীরবতার যুগ ও মানুষের কোলাহল
    আমার জীবনের প্রথম দুটো দশক কাটল সম্পূর্ণ নীরবতায় (Silent Era)। পর্দার নিচে বসে থাকত পিয়ানো, হারমোনিয়াম আর তবলা বাদকেরা। পর্দার ছায়ার মুভমেন্ট দেখে তারা সুর তুলত।
    আমার ৩ আনার কাঠের বেঞ্চে বসে বিড়ি খেতে খেতে রিকশাওয়ালারা ছবি দেখত, আর ওপরের ১২ আনার বেলকনিতে বসে সাহেবি পোশাকের বাবুরা চুরুট ফুঁকত। আমি ভেদাভেদ দেখিনি; সমাজের সবস্তরের মানুষকে ছাতার মতো আশ্রয় দিয়েছি।
    ১৯৩১: আমি কথা বলতে শিখলাম!
    আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চমক এলো ১৯৩১ সালে। ‘আলম আরা’ সিনেমাটি যখন আমার পর্দায় চলল, মানুষ চমকে উঠল। আলো আর ছায়ার সাথে এবার যুক্ত হলো শব্দ! মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে শুনল পর্দার মানুষগুলো কথা বলছে, গান গাইছে।
    সেই থেকে আমার ভেতরে জমে থাকা নীরবতা কাচ ভাঙার মতো চুরমার হয়ে গেল। আমি মুখরিত হয়ে উঠলাম করতালিতে, শিষ দেওয়ার শব্দে, আর দর্শকের সমবেত উচ্ছ্বাসে।
    ঝড়ের দিনগুলি: ইতিহাসকে কাছে থেকে দেখা
    আমি কেবল বিনোদন দিইনি, ইতিহাসকেও খুব কাছ থেকে দেখেছি।
    * ১৯৪২-এর ভারত ছাড়ো আন্দোলন: বাইরে মিছিলের গর্জন, আর আমার প্রজেক্টর রুমে স্বাধীনতার আগুন ছড়ানো দেশাত্মবোধক খবরের ভেতরের দৃশ্য।
    * ১৯৪৩-এর মন্বন্তর: আমার ফটকের সামনে হাজার হাজার বুভুক্ষু মানুষের হাহাকার। আমি নিঃশব্দে অশ্রুপাত করেছি।
    * ১৯৪৭-এর দেশভাগ: আনন্দের মাঝেও বুকের ভেতর একটা বিশাল ক্ষত তৈরি হলো। অনেক পরিচিত মুখ হঠাৎ উধাও হয়ে গেল ওপার বাংলায়।
    কিন্তু অন্ধকার নামলেই মানুষ আবার আমার কাছে আসত এক চিলতে শান্তি আর আশ্রয়ের খোঁজে।
    সোনালী বিকেল: উত্তম-সুচিত্রার রঙিন দিন
    ৫০ আর ৬০-এর দশক ছিল আমার সোনালী যুগ। ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট থেকে রঙে রঙিন হয়ে উঠলাম আমি। আমার বাইরে তখন ঝুলছে বিশালাকার হাতে আঁকা কাঠের কাটআউট।
    উত্তম-সুচিত্রার ছবি এলে আমার টিকিট কাউন্টারে যেন যুদ্ধ লেগে যেত! মারামারি, টিকিট ব্ল্যাকিং, চিনেবাদামের খোসার স্তূপ—এসব নিয়েই আমার ভরা সংসার ছিল। রোমান্টিক দৃশ্যে দর্শকদের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা, কিংবা ট্র্যাজেডিতে রুমাল দিয়ে চোখ মোছা—আমি প্রতিটা মানুষের চোখের জল আর হাসির ইতিহাস হয়ে রইলাম।
    বার্ধক্য ও অবক্ষয়
    আস্তে আস্তে সময় বদলে গেল।
    * ৮০-র দশকে মানুষের ঘরে ঘরে এল ভিসিআর (VCR)।
    * ৯০-এর দশকে এল টেলিভিশনের কালার চ্যানেল।
    হঠাৎ করেই আমার কাটআউটগুলো ধুলো পড়া শুরু করল। প্লাশ সিটগুলো ছিঁড়ে গেল, প্রজেক্টর ঘর থেকে আর আগের মতো আলোর তীব্র রশ্মি বের হতো না। দেয়ালের প্লাস্টার খসে পড়তে লাগল। টিকিট কাউন্টারে এখন আর সেই লম্বা লাইন পড়ে না। কিছু ভবঘুরে আর প্রেমিক-প্রেমিকা ছাড়া আমার অন্ধকার হলে আসার লোক কমে গেল।
    বর্তমান: এক হারিয়ে যাওয়া রূপকথা
    আজ প্রজেক্টরের আওয়াজ স্তব্ধ। আমার নামবোর্ডটি মরচে ধরে ঝুলে আছে। দেয়াল জুড়ে গজিয়ে উঠেছে অশ্বত্থ গাছ। হয়তো আর কিছুদিন পর আমাকে ভেঙে সেখানে উঠে দাঁড়াবে এক বিশাল শপিং মল বা মাল্টিপ্লেক্স (Multiplex)।
    কিন্তু আমার কোনো আফসোস নেই। ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দের সেই প্রথম দিনটি থেকে শুরু করে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আমি এক শহরের আবেগ, ভালোবাসা, বিরহ আর বিনোদনের নীরব সাক্ষী ছিলাম। মাল্টিপ্লেক্সের চকচকে রিক্লাইনার সিট হয়তো আরাম দেবে, কিন্তু আমার সেই তিন আনার কাঠের বেঞ্চের আবেগ তারা কোথায় পাবে?
    আমি আলোছায়ায় লেখা এক পুরানো ইতিহাস—আজও একা দাঁড়িয়ে স্মৃতির জাবর কাটি।

    4
    4 Comments
    • Ratan Chandra Roy, আপনার লেখায় ১৯১৩ সালের সেই প্রেক্ষাপট থেকে শুরু করে একটি সিনেমা হলের আত্মকথন যেভাবে ফুটে উঠেছে তা সত্যিই অতুলনীয় এবং বিশেষ করে “আমি ভেদাভেদ দেখিনি; সমাজের সবস্তরের মানুষকে ছাতার মতো আশ্রয় দিয়েছি”—এই পঙ্‌ক্তিটি হলের মানবিক রূপটিকে এক নিমেষেই চোখের সামনে জীবন্ত করে তোলে, তাই আপনার এই আবেগী শৈল্পিক বর্ণনাকে আরও সমৃদ্ধ করতে আপনি চাইলে সিনেমা হলটির পরিবর্তনের সাথে সাথে চারপাশের পরিবেশের বিবর্তনের ওপর আরও কিছু খুঁটিনাটি স্মৃতি যোগ করে দেখতে পারেন।

    • পুরানো দিনের এই সিনেমা হলের গল্পটা পড়তে খুব ভালো লাগল। আপনার লেখাটা পড়ে মনে হচ্ছিল চোখের সামনে যেন সিনেমার একটা দৃশ্য ভেসে উঠছে। আমাদের শহরের হারিয়ে যাওয়া এই ইতিহাসগুলো এভাবেই বেঁচে থাকুক আপনার লেখনীতে।

    • ভালো লাগলো স্মৃতির জাবরকাটা ।

রতন চন্দ্র রায়

ইম্পোজিটর

রতন চন্দ্র রায় 

পেশা - সরকারি চাকরি

শখ- লেখা / কবিতা/ গল্প/ উপন্যাস

কর্মস্থল- বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয় (বিজি প্রেস), তেজগাঁও, ঢাকা- ১২০৮

ঠিকানা- ৪১০ নবীনবাগ উত্তর গোড়ান,

  1. খিলগাঁও,  ঢাকা ১২১৯
Skip to toolbar