-
জন্মভিটে
আরিফ মাহমুদ। এক ।
“হ্যায় কুকড়ো হ্যায়। দ্যাহোদিনি হ্যা’গে হ্যা’গে কোরেচে কি! মাগি তোর আগেই কোইচি দলোক হোতি পারে ধানগুলো উঠোয় ফেলা।”
শমসের গাছির মুখের কথা তখনও ফুরোয়নি হঠাৎ আকাশভাঙা বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে শুরু করল। সে গলির ভেতর থেকে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এসে স্ত্রী সবেদা বেগমের পিঠে কষিয়ে এক লাথি বসাতেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল উঠোনে উঁচু করে রাখা ধানের রাশের ওপর। তাতেও তার বিরাম নেই। সে আগের মতোই একটানা গজগজ করে বকতে থাকলো:
“মাগি ভাত খায় ভাতারের আর গীত গায় নাঙের। আমার কতা শুনতি ভালো লাগে না বদায়। দলোক কি বড়লোকগের চোকি দ্যাকে? ঠাপায় শুধু আমাগের মতো গরীব মানশির।”
যেন অদৃশ্য কোনো শত্রুর সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত। সে একটা পাটকাঠির টুকরো দিয়ে ভেজা মাটির ওপর হিজিবিজি আঁকতে থাকে। কয়েকটি বড় ফোঁটা পড়েই বৃষ্টি থেমে গেল। বাতাসের আর্দ্রতা ধানের গন্ধে ভারী হয়ে আছে সমস্ত বাড়ি। সবেদা বেগম ধানের রাশের ওপর থেকে কোমরে হাত দিয়ে ওঠার সময় যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে বিলাপ করে:
“জারোর গায় ওসুরির মতো শক্তি। মাগি মানশির পুঙার গুড়ায় কুয়োত না খাটিয়ে ভ্যান চালালিও সংসারের ইট্টু আয়-উন্নতি হতো। ছাব্বিশ বছর ধরে তোর সংসারে আ’সে শুধু লাথি-ঝাটাই খাতি আছি। আমাবশ্যের রাতি এখনো চিৎ হয়ে শুতি পারি নে। জারো তুই হাগাড়ে-ভাগাড়ে মরে থাকতি পারিস নে।”
পদ্মপুকুর গ্রামের প্রায় শেষ প্রান্তে শমসের গাছির বাড়ি। যেন মাটির বুক চিরে উঠে আসা এক টুকরো দারিদ্র্য। এক অমোঘ গ্রামীণ সৌন্দর্য তার পরতে পরতে। ভিটের একপাশে গোরস্থান আর পেছনে ঘন বাঁশঝাড়ের ছায়াঘেরা পুকুর; যার মালিকানা পদ্মপুকুর গ্রামের প্রায় অর্ধেক মানুষের ভাগ্যে ভাগ হয়ে আছে।
শমশের গাছির বুকটা যেমন চওড়া তেমনি তার শরীরটা সুঠাম যেন এই কাদা-মাখা গ্রামেরই এক অকৃত্রিম অংশ। মাঠে তার দশ কাঠা আবাদী জমি আর ভিটের ওপর এগারো শতক জমিতে তার বসত। দুই ছেলে, দুই মেয়ে আর স্বামী-স্ত্রী নিয়ে সেই ভিটেয় ছয়জনের এক জীর্ণ সংসার তার। একসময় গ্রামের প্রায় অর্ধেক খেজুর গাছ শমশেরের হাতে রস ঝরাতো। সেই থেকেই তার নামের সাথে ‘গাছি’ তকমাটা জুড়ে গেছে। কিন্তু নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, একবার গাছ থেকে পড়ে গিয়ে পায়ে এমন চোট পেল যে সেই থেকে শমশেরের হাঁটায় চিরস্থায়ী টান ধরল। সে এখন ডিঙি মেরে হাটে। দুই পায়ে সমান ভর দিতে না পারায় এখন আর গাছে ওঠা সম্ভব হয় না।
ইরি আবাদে এবার ধানের ফলন ভালো হয়নি। নিজের দশ কাঠা জমির সঙ্গে আরও আট কাঠা বর্গা নিয়ে চাষ করেছিল শমসের। তবু সংসারে ভাতের অভাব লেগেই থাকত। ঘরে ধান উঠতেই সার, মুদিখানার বাকি আর চিকিৎসার খরচ মেটাতে অর্ধেক ধান বিক্রি হয়ে যেত। ছয়জনের সংসারের অন্নসংস্থানই ছিল শমসের গাছির সবচেয়ে বড় লড়াই।
পেট কি আর হাঁড়ির খবর রাখে? সময় হলেই সে তার দাবি জানায়। খানিক বেলা হলে একবার আর ঠিক সন্ধ্যায় আরেকবার খাবার খায় তারা; দু’বেলা খেয়েই একটি দিন পার করতে হয়। খাওয়া শেষ করে শমসের গাছি উঠোনের পেয়ারা গাছতলায় রাখা জলচৌকিতে গিয়ে বসল। শমসের একমনে দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বারান্দার দিকে তাকিয়ে বড় ছেলে জামিরকে ডেকে বলল:
“ও মনি, তোর কাছে বিড়ি আছে?”
জামিরের তখনও খাওয়া শেষ হয়নি। বাবার ডাক শুনে মুখ তুলে হতাশ চোখে মাথা নাড়ল। নিস্পৃহ গলায় জবাব দিল:
“ফুরিয়ে গেছে আব্বা, আনতি হবে।”
শমসের গাছি প্রতিত্তরে বলে:
“তোর মার কাছেত্তে দুডো ডিম নিয়ে জুমাইতের দোকানতে একমুট বিড়ি নিয়াশকে।”
দুপুরের অলস রোদ তখন উঠানের ওপর ঝিম ধরে পড়ে আছে। রোদ্দুরের তেজ কমতে আরো দিন পনেরো সময় লাগবে। দোকান থেকে ফিরে চুলার আগুনে বিড়ি ধরিয়ে দুই বাপ-বেটা টানতে থাকে। সে বিড়ির ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে পেয়ারাতলার স্থির বাতাসে ভেসে থাকে খানিকক্ষণ, তারপর নিঃশব্দে গলে যায়। শমসের গাছি ছেলের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে:
‘কালকে কালামের ইশকুলি যাতি নিষেধ করিস; বজলু মুল্লার ভুইতি জোন দিতি যাতি হবে।’
দূরে কোথাও শিয়াল ডেকে উঠল। ল্যাম্পের লালচে আলোয় ধানের রাশের পাশে উবু হয়ে বসল শমসের গাছি। দাঁড়িপাল্লার দোলার সঙ্গে যেন তার বুকের ভেতরের দুশ্চিন্তাটাও দুলে উঠল।
“এক, দুয়েট দুই, তিনেট তিন, চারেট চার, পাঁচ পা, ছবেট ছয়, সাত সা, আট আ, নবেট নয়, দশ দ…”
যে ঢিবিটা একটু আগে বেশ বড় মনে হচ্ছিল, হিসাবের সঙ্গে সঙ্গে সেটাই যেন চোখের সামনেই ছোট হতে লাগল। শমসের একবার ঘরের দিকে তাকাল। ভেতরে ছেলেমেয়েরা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। তাদের কেউই জানে না, এই ধানের রাশের ভেতরেই আগামী কয়েক মাসের ভাত লুকিয়ে আছে।ধানের ওপর দু-একটা শুকনো খড় ছড়িয়ে ছিল। শমসের গাছি আলতো করে সেগুলো সরিয়ে দিল। যেন ধান নয়, নিজের সারা বছরের ঘাম আর পরিশ্রম হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছে। তারপর আবার মনে মনে হিসাব কষে, ছয়জন মানুষের সংসার। দিনে দুবেলা ভাত। সার লাগবে। অভাবটা যেন এবার আর আগের মতো নয়; এবার সে ঘরের বারান্দায় এসে ভর করেছে।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে সবেদা বেগম অনেকক্ষণ ধরে স্বামীর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। শেষে ধীরে ধীরে কাছে এসে বলল:
“কী হলো?”
শমসের কোনো উত্তর দিল না। অনেকক্ষণ পরে ধানের রাশে হাত বুলিয়ে নিচু গলায় শুধু বলল:
“ইবাড্ডা ফলন মেলা কম হয়েচে।”
কথাটা শুনে সবেদা বেগম আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে-ও বুঝলো শুধু ধান কম হয়নি; তাদের সংসারের ভরসাটুকুও বুঝি কমে এসেছে। উঠোনজুড়ে আবার নীরবতা নেমে এলো। শুধু কুপির শিখাটা বাতাসে কেঁপে উঠছিল। যেন সেও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হিসাব কষছে।। দুই ।
কনকনে শীত। রাত প্রায় দশটা। শীত ঠেকাতে খুপির বাঁশের দরজার ফাঁকে পুরোনো একটি শাড়ি পেঁচিয়ে রাখা। শমসের গাছি আর সবেদা বেগমের ছোট্ট ঘুম নেমেছে ততক্ষণে। ঠিক তখনই উঠোন থেকে ভেসে এল একটি ডাক—
“শমসের, বাড়ি আছো হা গো?”
ঘুমের ভেতরেও শমসের চমকে উঠল। এতো রাতে কে এলো? কিছুক্ষণ স্থির হয়ে কান পেতে রইল। বাইরে আর কোনো শব্দ নেই। শুধু পেয়ারা গাছ থেকে টুপটাপ শিশির ঝরে পড়ছে।
বালিশের তলা থেকে দিয়াশলাই বের করে ল্যাম্প জ্বালল সে। দরজা খুলতেই আলোয় ভেসে উঠল পরিচিত মুখ।
“কিডা? নুয়াচা নাকি? কিরাম আছো হা গো?”
রসা জোয়ার্দার মৃদু হেসে বলল:
“ভালো আছি। সেই সকালবেলা বাড়ি থেকে বের হইছি। সগোলির সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কোত্তি কোত্তি তোমার বাড়ি আসতি মেলা রাত হয়ে গেল।”
দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শীতের কুয়াশা ল্যাম্পের আলোয় ধোঁয়ার মতো ভেসে বেড়াচ্ছে।
রসা জোয়ার্দার ধীরে ধীরে বলল:
“শমসের, একটা কতা ছিল… ভাবলাম তোমারে না কয়ে যাই কিরাম করে।”
শমসের চুপচাপ রইলো।
রসা জোয়ার্দার ল্যাম্পের আলোয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে আবার বলল:
“নারানকান্দির ধীরেন নাপিত ভারত চলে যাবে। বাড়ি-ভিটে বেচে দিতি চায়। তুমি নিতি পারো নাকি দ্যাখো। দুডো ছাওয়াল, দুডো মেয়ে… এইটুকু ভিটেয় আর কতদিন?”
কথাটা বলেই রসা চুপ হয়ে গেল। ল্যাম্পের হলদে আলোয় শমসেরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। উত্তরটা যেন তার মুখের ভাঁজেই লেখা আছে। অনেকক্ষণ পরে শমসের শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ঠিকই কয়েচো নুয়াচা…”
এমন সময় ঘরের ভেতর থেকে সবেদা বেগম বেরিয়ে এলো। এতক্ষণ সে চুপচাপ শুয়ে সব কথা শুনছিল।
“তুমি রাজি হয়ে যাও জামিরির বাপ। চাড্ডে ছেলেপেলে বড় হচ্ছে। এই ভিটেয় ঠাসাঠাসি করে আর কতদিন থাকপো? প্যাট ভরে দুটো ভাতও উগার মুকি দিতি পারিনে।“
শমসের মাথা নিচু করেই বসে রইল। ল্যাম্পের শিখাটা একবার কেঁপে উঠল। তবু তার মুখ থেকে একটি কথাও বের হলো না। রসা কিছুক্ষণ শমসেরের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো উত্তর না পেয়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“ভালো করে ভাবো। ইরাম সুযোগ বারবার আসে না।”
রসা জোয়ার্দার চলে গেল। কুয়াশায় তার অবয়বটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। বাড়িজুড়ে তখন শুধু নীরবতা।
শমসের অনেকক্ষণ বারান্দায় বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে উঠে বাড়ির পাশের গোরস্থানের দিকে হাঁটল। বাঁশঝাড়ের মাথায় ঠান্ডা বাতাস লেগে সাঁই দীর্ঘশ্বাসের মতো শব্দ উঠছে। সেখানের দুটি কবরের সামনে গিয়ে সে থামল। অনেকক্ষণ পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কোনো কথা নেই। শুধুমাত্র মাটির ওপর হাত রাখল; সে মাটি হেমন্তের শিশিরে বরফের মতো ঠান্ডা। শিউরে উঠে সে হাত সরিয়ে নিল। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এলো। সেই রাতে আর তার চোখে ঘুম নামল না।
পরদিনও শমসের গাছি কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। দিন গড়িয়ে আরেক দিন এলো। প্রতিদিন সন্ধ্যায় সে উঠোনে বসে থাকত আর চোখ চলে যেত বাড়ির পাশের গোরস্থানের দিকে। শেষ পর্যন্ত অভাবই তার বুকের ভেতরের সব দ্বিধাকে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে দিল। যেমন নদীর স্রোত একদিন নিঃশব্দে পাড় ভেঙে নেয়, তেমনি এক সকালে রসা জোয়ার্দারের প্রস্তাবে রাজি হয়ে নারানকান্দির ধীরেন নাপিতের ভিটেমাটি কিনে নিল শমসের গাছি।বাড়ির সমস্ত মালপত্র আগেই নারানকান্দিতে পৌঁছে গেছে। উঠোনটা আজ অস্বাভাবিক ফাঁকা। যে বারান্দায় সারাজীবন ছেলেমেয়েদের কোলাহল লেগে থাকত সেখানে আজ শুধু শুকনো পাতার খসখস শব্দ।
পড়শিরা একে একে বিদায় জানাচ্ছে। সবেদা বেগম সবার সঙ্গে কথা বলছে বটে কিন্তু তার চোখ বারবার ঘুরে আসছে ঘরের দিকে। যেন কিছু একটা ফেলে যাচ্ছে। অথচ কী ফেলে যাচ্ছে সে নিজেও জানে না।
শমসের গাছি একা ঘরের ভেতরে ঢুকল। খালি ঘর। দেওয়ালের তাকের মধ্যে ল্যাম্পের ধোঁয়ার কালচে দাগ এখনো রয়ে গেছে। বাঁশের খুঁটিটায় হাত রাখতেই তার বুকের ভেতরটা কেমন হু-হু করে উঠল। কত সন্ধ্যায় এই খুঁটির গায়েই হেলান দিয়ে সে বিড়ি টেনেছে। কত বর্ষার রাতে এই চালের নিচেই ছেলেমেয়েদের জড়িয়ে বসেছিল। আজ ঘরটা যেন তাকে চিনেও চিনতে পারছে না। সে ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে এলো।
বাড়ির পেছনের বাঁশঝাড়ে বাতাস লেগেছে। পাতাগুলো একসঙ্গে দুলে উঠল। যেন কেউ খুব আস্তে আস্তে তাকে ডাকছে। গোরস্থানের সামনে এসে শমসের থেমে গেল। পাশাপাশি দুটি কবর।
একটায় তার বাবা। অন্যটায় মা। কবর দুটোর ওপর শুকনো বাঁশপাতা এসে পড়েছিল। শমসের নিচু হয়ে পাতাগুলো সরিয়ে দিল। তারপর আলতো করে হাতের তালু দিয়ে কবরের মাটিটা সমান করে দিল। যেন বহুদিন পরে বাবা-মায়ের এলোমেলো বিছানা গুছিয়ে দিচ্ছে। তার ঠোঁট কাঁপল। কোনো শব্দ বের হলো না। অনেকক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে সে শুধু একবার কবর দুটোর দিকে তাকালো। তারপর ধীরে ধীরে ফিরে এলো। উঠোন পেরিয়ে যখন ভিটের সীমানায় এসে দাঁড়াল তখন আরেকবার ঘুরে তাকাল বাড়িটার দিকে।খড়ের ছাউনি। বাঁশের বেড়া। পেয়ারা গাছ। গোরস্থান। বাঁশঝাড়। সব একই রকম আছে। শুধু এই বাড়ির মানুষটা আর এখানে থাকবে না। গরুর গাড়ি চলতে শুরু করল। চাকার নিচে শুকনো মাটির দলাগুলো মচমচ করে উঠল। শমসের গাছি আর পেছনে তাকালো না।
। তিন।
ধীরেন নাপিতের আটচালা বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে শমসের অনেকক্ষণ চারদিকে তাকিয়ে রইল। তারপর পায়ের নিচের মাটিতে একবার চোখ নামালো। মাটি একই কিন্তু সব মাটিতে মানুষের শেকড় জন্মায় না। কয়েক মাস কেটে গেল। নতুন ভিটের মাটি ধীরে ধীরে পায়ের সঙ্গে সয়ে এলো।বছর ঘুরতে না ঘুরতেই নতুন ভিটের চেহারা বদলাতে শুরু করল। যে উঠোনে প্রথম দিন শূন্যতা ছাড়া আর কিছু ছিল না, সেখানে একসময় হাঁস-মুরগির আনাগোনা বাড়ল। গোয়ালে গরু বাঁধা হলো। গোলায় ধান উঠতে লাগল।
সময় আরও এগিয়ে গেল। ফুলবানুর বিয়ে হলো। জামির আলাদা ঘর তুললো। কালাম পাড়ি জমালো কুয়েতে। মরিয়ম স্কুলে যেতে শুরু করলো।নারানকান্দির সংসারে এখন অভাব নেই। উঠোনে এখন ছেলেমেয়ের হাসি। তবু সন্ধ্যা নামলে শমসেরের চোখের সামনে ভেসে ওঠে পদ্মপুকুরের সেই ছোট্ট গোরস্থান। পাশাপাশি শুয়ে থাকা মা-বাবার দুটি কবর। তখন চারদিকের সবকিছুই নিজের মনে হয় শুধু যে ভিটেতে দাঁড়িয়ে আছে, সেটাই নিজের বলে মনে হয় না।
একদিন পাশের গ্রামের এক জানাজার খবর শুনে শমসের অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল। হঠাৎ বুকের ভেতর কেমন করে উঠল। একদিন তাকেও এই গ্রামের গোরস্থানেই শুইয়ে দেওয়া হবে। আর পদ্মপুকুরের ছোট্ট গোরস্থানে বাবা-মায়ের দুই কবরের পাশের মাটিটুকু চিরদিনের মতো ফাঁকাই থেকে যাবে। বাইরে আমগাছের পাতায় হাওয়া লাগল। শমসের নিঃশব্দে মাথা নিচু করলো।। চার ।
আমের মুকুলের ঘ্রাণে চারদিক ভরে উঠেছে। বসন্তের এক সকালে হাঁসের বাচ্চার চ্যাঁ-চ্যাঁ ডাকের মধ্যেই উঠোনে এসে দাঁড়াল মোবারক। বহুদিন পর যেন ফেলে আসা গ্রামের এক টুকরো মাটি হেঁটে হেঁটে তার দুয়ারে এসেছে। সে পদ্মপুকুরের ছেলে— সম্পর্কে শমসের গাছির ভাইপো আর কালামের ছোটবেলার সঙ্গী। বহুদিন পর ফেলে আসা গ্রামের টানেই তার এ বাড়িতে আসা। এক হাতে ছোট্ট একটা ব্যাগ, অন্য হাতে পাইনঅ্যাপেল বিস্কুটের প্যাকেট ও কয়েক ছড়া পাকা কলা। সবেদা বেগম বাচ্চাগুলো টেপারির নিচে রেখে এগিয়ে এলো। মোবারককে চিনতে তার এক মুহূর্তও লাগল না।
“ও মনি ভালো আছিস মোবারক? তুই কত বড় হয়ে গিছিস? তোর মার শরীর কিরাম আছে? ওরে বাজান তোর দাদি মরলি যাতি পারি নি; আমি বাড়ি ছিলাম না। তোর কাকা গিইলো…”মোবারক শুধু মৃদু হেসে মাথা নাড়লো। এতো প্রশ্নের ভিড়ে কোন কথার উত্তর আগে দেবে, সে যেন বুঝেই উঠতে পারলো না। সবেদা বেগম বারান্দায় পাটি পেতে বসতে দিল।
মোবারক চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিল। বাড়ির পেছনে আম-কাঁঠালের বাগান। তার গা ঘেঁষে বড় একটি পুকুর। উঠোনজুড়ে হাঁস-মুরগির আনাগোনা। সে যেন এক মুহূর্তের জন্য ভুলেই গেল— এ সেই শমসের গাছির সংসার।
এমন সময় মাঠ থেকে জামির ফিরল। গামছাটা খুলে পুকুরে খেপলা জাল ছুড়তেই জালটা ভারী হয়ে উঠল। টেনে তুলতেই বড়সড় একটি রুই মাছ ছটফট করতে লাগল।
দুপুরে বারান্দায় পাটি পেতে সবাইকে একসঙ্গে খেতে বসাল সবেদা বেগম। পাটির মাঝখানে ধোঁয়া ওঠা ভাত। পাশে পাঁচমিশালি শাকভাজি, লাউ দিয়ে রুই মাছ, মাসকলাইয়ের ডাল আর নারকেলের ফালি দিয়ে রান্না করা দেশি মুরগির ঝোল। এমন আয়োজনে মোবারক কিছুক্ষণ শুধু পাটির দিকেই তাকিয়ে রইল।সবেদা বেগম মোবারকের পাতে ভাত বাড়তে লাগল। এক চামচ… তারপর আরেক চামচ। মোবারক হাত তুলে বলল:
“বড়মা, আর দিয়ো না। এতো ভাত খাতি পারবোনানে।”
সবেদা বেগম যেন শুনতেই পেল না। মাছের বড় মাথাটা তুলে তার পাতে দিল। একটু পর মুরগির দুটো টুকরো তুলে আবার ভাতের চামচে হাত দিলো। মোবারক বুঝতে পারছিল না— পাতে বাড়া ভাতের ভার বেশি নাকি বড়মার আদরের। সে মৃদু হেসে বলল:
“ইবাড্ড কলাম ভাত নষ্ট হবেনে, বড়মা…”
সবেদা বেগম এবারও থামল না। হাঁড়ির ভেতর আবার ভাত তুলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল। তার হাত কেঁপে উঠল। চোখ স্থির হয়ে রইল সাদা ভাতের ওপর। ভাতের দিকে তাকিয়েই তার চোখে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো সেই উঠোন। খালি হাঁড়ি। ক্ষুধায় কাঁদতে থাকা ছেলেমেয়ের মুখ। আর মুরগী বিক্রি করে চাল কেনার দিনগুলো। শাড়ির আঁচল মুখে চেপেও কান্না আর আটকে রাখতে পারল না।
“খুব ভাতের কষ্ট করিচি বাজান… কারো পাতে কোনোদিন প্যাট ভরে ভাত বাড়তি পারি নি। কুঁকড়ো পুষে চাল কিনে খাইচি। বচ্ছরে এট্টা কুঁকড়োও ছেলেপেলের মুকি দিতি পারি নি… এখন আল্লা কতো ভাত দিয়েচে… কতো সুখ দিয়েচে… শুদু…”
তারপর—
“শুধু নিজির ভিটেয় সুখ কোত্তি পাল্লাম না।”
শেষ কথাটা আর মুখ দিয়ে বেরোলো না। সে মাথা নিচু করে কাঁদতে লাগল। বারান্দায় আর কোনো শব্দ রইল না। মোবারকের হাত থেমে গেছে। জামির মাথা নিচু করে বসে আছে। কেউ কোনো কথা বলছে না। শুধু শমসের গাছি ধীরে ধীরে ভাত মেখে যাচ্ছে। এক মুঠো ভাত তুলে মুখের কাছে নিয়ে আবার থেমে গেল।
অনেকক্ষণ শমসের গাছি সেই ভাতের দিকেই তাকিয়ে রইল। শুধু নেই সেই ভিটে, যেখানে তার মা-বাবা পাশাপাশি শুয়ে আছেন। ধীরে ধীরে এক মুঠো ভাত মুখে তুললো।
ভাত বাড়ল কিন্তু বুকের ভেতরের খিদেটা আর কোনোদিন মিটলো না। দূরে কোথাও শালিক ডাকল। শমসের গাছি মাথা তুলে তাকালো না। তার চোখ তখনও পড়ে আছে সেই ভাতের থালায়।– সমাপ্ত –
3 Comments-
আপনার লেখনশৈলীতে যে গভীর আবেগ ও শিকড়ের টান ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী এবং প্রতিটি দৃশ্য এত জীবন্ত যে মনে হচ্ছিল আমি নিজে সেই মাটির গন্ধ আর অভাবের আর্তনাদ কাছ থেকে অনুভব করছি; আপনার এই সুন্দর ও সাবলীল বর্ণনার হাত ধরে আপনার প্রিয় পাঠক হিসেবে আমার শুধু এটুকুই চাওয়া, আপনি যেন এমন আরও অনেক গল্প দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করে যান।
Friends
Jannatul Ferdous Barsha
@jannatulferdousbarsha
janatha tv bangla
@janathatvbangla
sajib maijd
@sajibmaijd
Shahin Aktar
@shahinaktar
হানজালা মাহমুদ
@hanjala346gmail-com
ujjal mutsuddi
@ujjalmutsuddi
আবিদাতুর রাহমান
@soldierofislam
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor

আরিফ মাহমুদ, গল্পটা পড়ে সত্যিই বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল, কী দারুণভাবেই না আপনি সেই দারিদ্র্য আর শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার যন্ত্রণা ফুটিয়ে তুলেছেন! গ্রুপকে প্রাণবন্ত রাখতে অন্যদের লেখাগুলোয় নিয়মিত রিঅ্যাকশন দিন এবং সুন্দর সুন্দর সব মন্তব্য করে তাদের উৎসাহ দিন।