Profile Photo

A K Sarker ShaonOffline

  • aksarker
  • Profile picture of A K Sarker Shaon

    A K Sarker Shaon

    2 weeks, 6 days ago

    মোমের শেষ শিখা
    এ কে সরকার শাওন

    বাহার ও নাহার গনিপুর শহরের সরকার পাড়ায় একইসাথে বড় হয়েছে। শাওনাজ বিশ্ববিদ্যালয়েও ওদের লিখাপড়া প্রায় শেষের পথে। প্রেম ও পড়া দু’টোই পূর্ণ পরিণতির দিকে। নাহার বাংলায়। বাহার আইনে।

    ক্যাম্পাসের কৃষ্ণচূড়া গাছটার নিচে যখন নাহার আর বাহার বসত, তখন যেন সময় থমকে দাঁড়িয়ে যেতো। নাহার ছিল শান্ত দীঘির মতো নিশ্চুপ, আর বাহার চঞ্চল প্রমত্তা এক নদী। একদিন গোধূলি লগ্নের ম্লান আলোয় ক্যাম্পাসের দীঘির পাড়ে নাহার হুট করেই প্রশ্ন করল
    -বাহার, তুমি আমাকে কেমন ভালোবাসো?
    বাহার নাহারের কোলে শুইয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর খুব শান্ত গলায় বলল
    -আমার ভালোবাসা প্রশ্নাতীত নাহার। তোমায় আমি মোমের মতো ভালোবাসি।
    নাহার অবাক হয়ে তাকাতেই বাহারের পকেট থেকে বেরিয়ে এল ছোট্ট একটি ডায়েরি। সেখানে সে সম্প্রতি লিখেছে চারটি পঙক্তি
    “মোমের মতো জ্বলবো সতত
    নিঃশেষ হবো হেসে;
    শত সূর্যের আলো হয়ে
    ফিরবো প্রতি প্রত্যুষে।”

    নাহার সেদিন সেই কথার গভীরতা বোঝেনি। সে শুধু জানত, বাহারের হাত ধরলে পৃথিবীটাকে তার কাছে সুন্দর ও নিরাপদ মনে হয়। কিন্তু নিয়তি অন্য কোনো নকশা এঁকে রেখেছিল তাদের জন্য।

    বাহারের বাবা জগলু চৌধুরী ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং কঠোর মেজাজের মানুষ। তাঁর কাছে আভিজাত্যই ছিল শেষ কথা। সাধারণ ঘরের মেয়ে নাহারের সাথে নিজের ছেলের মেলামেশা তিনি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারলেন না। কোনো আলাপ-আলোচনা নয়, কোনো যুক্তি নয়—একপ্রকার জোর করেই বাহারকে পাঠিয়ে দিলেন সুদূর কানাডায়। ছেলে ডক্টরেট হবে সেই আশায়।

    বিমানের জানালার পাশে বসে বাহার যখন মেঘের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন তার ও নাহারের অশ্রুতে পৃথিবীতে মুষলধারে বৃষ্টি ঝরছিল। বাহার জানত না, এই বিচ্ছেদ কত দিনের।

    অন্যদিকে, বাহার যাওয়ার পরপরই নাহার ও নাহারের পরিবারকে সহ্য করতে হলো চরম লাঞ্ছনা। অপমানে বাবা মারা গেল হার্ট স্ট্রোকে। বাবার শোকে মা-ও পিছু নিলেন বছর ঘুরতে না ঘুরতেই। চৌধুরী সাহেবের ক্রমাগত মানসিক চাপ আর লোকচক্ষুর অন্তরালে করা অপমানের মুখে নাহার গনিপুর শহর ছাড়তে বাধ্য হলো। সে তার সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে চলে গেল পাহাড়ের কোলে রাঙ্গামাটির চন্দ্রঘোনায়।
    সেখানে সিদ্দিকুর রহমান নামে নাহারের এক কাজিন লিচুবাগান এলাকায় তাকে মোটামুটি নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়।

    চন্দ্রঘোনার কর্ণফুলী নদী ঘেঁষে সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে একটি ছোট মিশনারি স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করল নাহার। পাহাড়, মেঘ আর কর্ণফুলী নদীর জলের নাচন হলো তার নিত্যসঙ্গী। একমাত্র সিদ্দিকুর রহমানের পরিবারবর্গ ছাড়া অন্য কেউ জানত না তার অতীতের কথা। তবে নাহারের ভেতরে যে দহন ছিল, তা থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে নিল কলমের আঁচড়ের মাধ্যমে। সে লিখলো
    “আমার মনের গভীর ক্ষত;
    নাই-বা জানলো কেউ,
    হাসির রেখায় ঢেকে থাকুক
    সাত সাগরের ঢেউ!”

    সে নিয়মিত পত্রিকায় লিখতে শুরু করল। তবে নিজের নামে নয়, ‘মোমের আলো’ ছদ্মনামে। তার গল্প-কবিতায় বিষাদ, অপেক্ষা আর আক্ষেপের সুর এমনভাবে ফুটে উঠত যে পাঠকরা মুগ্ধ হয়ে পড়ত। তার লেখাগুলোর মূলে থাকত সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতি মোমের মতো জ্বলে নিঃশেষ হওয়ার গল্প।

    ওদিকে কানাডার টরন্টো শহরে বাহারের দিনগুলো কাটত যান্ত্রিকতায়। বাবার অবাধ্য হতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু নিজের মনকেও বোঝাতে পারেনি। সে মনে মনে নিজেকে সেই মোমের মতোই কল্পনা করত, যা একাই জ্বলে শেষ হয়ে যাবে কিন্তু অন্য কাউকে নিজের জীবনে স্থান দেবে না। নাহারের জন্য অনেক আশা নিয়ে দেশে ফিরে এলো চার বছর পর। পিএইচডি করা শেষ হলো না তার।

    দেশে এসে দিনে-রাতে খেয়ে না খেয়ে তন্নতন্ন করে তার নাহারকে খুঁজতে লাগল। এদিকে ওর বাবার নিকট অনেক প্রস্তাব এসেছে বিয়ের, কিন্তু বাহার ছিল নাহারের প্রেমে অবিচল। বাহার রয়ে গেল চিরকুমার। আজ এখানে কাল ওখানে। ভবঘুরে জীবন তার।

    দেখতে দেখতে আরও বারোটি বছর পার হয়ে গেল। জগলু চৌধুরী এখন বৃদ্ধ, প্রায় শয্যাশায়ী। ক্ষমতার দম্ভ আর আভিজাত্যের অহংকার বার্ধক্যের কাছে পরাস্ত। তিনি লক্ষ্য করলেন, অঢেল সম্পদ থাকলেও তাঁর পাশে বসার মতো কেউ নেই। একমাত্র ছেলে দেশে থেকেও যেন এক অচেনা দ্বীপে বাস করছে। বাহারের চোখের সেই আনন্দ বহু বছর আগেই নিভে গেছে। দিনের পর দিন রুদ্ধদ্বারে কেঁদে কেঁদে তার চোখের জ্যোতিও যায় যায়।

    চৌধুরী সাহেব একদিন রাতে পুরোনো আলমারি ঘাঁটতে গিয়ে একটি ডায়েরি পেলেন। বাহারের সংরক্ষিত ডায়েরি। সেখানে নাহারকে নিয়ে লেখা সেই চার লাইনের কবিতাটি পেলো। ওটা যে বারবার পড়া হয়েছে বোঝা যাচ্ছিল। তাতে হঠাৎ করেই চৌধুরী সাহেবের মনে অপরাধবোধ জেগে উঠল। তিনি বুঝতে পারলেন, আভিজাত্য রক্ষা করতে গিয়ে তিনি দু’টি জীবনকে মৃতপ্রায় করেছেন। তিনি বাহারকে বাড়ি ফিরে আসার জন্য আকুল অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখলেন।

    বাহার গনিপুর ফিরলে ওর বাবা বললো
    -যেখান থেকে পারিস নাহার মা’কে খুঁজে নিয়ে আয় খোকা।
    -বহু খুঁজেছি বাবা। সবই নিস্ফল খোঁজা।

    জগলু ম্যানশন নামে বিলাসবহুল বাড়িতে বাহারের মন টিকে না। একদিন প্রত্যুষে উদ্দেশ্যহীনভাবে সে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ল চট্টগ্রামের দিকে। শেষ দুপুরের রোদে সে এসে দাঁড়াল পতেঙ্গার গোল্ডেন বিচে। সমুদ্রের বিশালতা আর ঢেউয়ের গর্জন তাকে যেন শৈশবের সেই হারানো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল।

    বিচের এক কোণে তপ্ত দুপুরে একটি ঝাউগাছের ডাল ধরে দূর সমুদ্রের সফেদ উর্মিমালা দেখছিল এক মধ্যবয়স্ক নারী। পরনে সাদা শাড়ি, চোখে গাঢ় কালো সানগ্লাস। তার মুখে যেন পৃথিবীর সমস্ত বেদনা লুকায়িত। বাহারের মনে পড়ে গেল কবি এ কে সরকার শাওনের
    ‘প্যারাগন অফ বিউটি’ কবিতার অংশবিশেষ।
    “চৈত্রের কাঠফাটা দুপুরে
    পতেঙ্গার সাগরতীরে
    সফেদ সাদা ধূধূ বালুচরে
    বিরহ ব্যথাতুর তুমি
    দাঁড়িয়ে কালো সানগ্লাস পরে
    দৃষ্টি তোমার দূরে বহুদূরে
    উত্তাল উর্মিমালার শিয়রে
    কোন অজানায় আচিনপুরে!”

    বাহার দূর থেকে তার নাহার ভেবে এগিয়ে গেল। একটু কাছে যেতেই তার ভুল ভাঙল। সে তার নাহার নয়। মহিলার হাতে একটি বই ‘মোমের শেষ শিখা’।
    বাহারের মনে পড়ে গেল তার জীবনের একমাত্র লেখা চার লাইনের কবিতা। তার মনে সন্দেহের উদ্রেক হলো। এটি নাহারের লেখা বই না তো!

    বাহার এগিয়ে গেল মহিলার দিকে।
    -আসসালামু ওয়ালাইকুম আপা। আপনার হাতে যে বইটি ‘মোমের শেষ শিখা’ ওটি কার লেখা জানতে পারি?
    -ওয়ালাইকুম সালাম। এই উপন্যাসের লেখিকা ছদ্মনামে মানে ‘মোমের আলো’ নামে লিখেন।
    -ওটা কোন প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে?
    তিতুমীর প্রকাশনী, আন্দরকিল্লা, চট্টগ্রাম।

    সেদিনই সে আন্দরকিল্লা থেকে লেখিকার কয়েকটি বই সংগ্রহ করল। কিন্তু মোম ও মহিলা লেখক ছাড়া আর কোনো তথ্য পেল না। পরদিন সারাদিন অপেক্ষার পর প্রকাশক মাজহারুল আলম তিতুমীর সাহেবের সাথে দেখা পেলো। বাহার ‘মোমের শেষ শিখা’ উপন্যাসের লেখিকার তথ্য চাইল। অনেক অনুনয়-বিনয়ের পর তিতুমীর সাহেব লেখিকার তথ্য দিলেন।

    পরদিন সকালে বাহার চন্দ্রঘোনা গেল। স্কুল খুঁজে পেতে সমস্যা হলো না। ছুটির দিন বিধায় তৎসংলগ্ন নাহারের বাড়িতে গেল। সেখানে একটি বয়স্ক মহিলা বলল
    -হয়তো বাড়ির পিছনে কর্ণফুলী নদীর পাড়ে মনমরা হয়ে বসে আছে। স্কুল না থাকলে ওটাই তাঁর একমাত্র কাজ।

    ঠিক তাই। নাহার একা বসে ছিল নদীর পাড়ে। তার চোখে ছিল বহু বছরের অপেক্ষার ক্লান্তি, আর বুকের ভেতর জমাটবাঁধা অজস্র না বলা কথা। মাঝে মাঝে সে গভীর নদীর জলে তাকাচ্ছিল। নদীর পাড়ে সেদিন অদ্ভুত নীরব ছিল। শুধু দুরন্ত বাতাসের শা শা শব্দ হচ্ছিল। ঢেউগুলো যেন বিষাক্ত ফনা তুলছিল।
    হঠাৎ কোথা থেকে যেন ভেসে এলো এক পরিচিত কণ্ঠ—
    -নাহার!
    কণ্ঠটা এতই চেনা, এতই আপন! নাহারের বুক কেঁপে উঠল। দ্রুত পেছনে ফিরে তাকাল সে। স্বগতোক্তি করলো
    -বাহার!
    যেন সময় হঠাৎ পেছনে ফিরে গেছে। চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই মানুষ, যার জন্য সে সব হারিয়েছে, সব ছেড়েছে, এবং যাকে আর কখনো পাওয়ার আশা করেনি। নাহারের ঠোঁটে কাঁপতে কাঁপতে একটুখানি হাসি ফুটল। চোখ ভরে উঠল অশ্রুতে। সে উঠে দাঁড়াতে গেল;
    ঠিক তখনই হঠাৎ চারদিক যেন অন্ধকার হয়ে এলো। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। পায়ের নিচের মাটি সরে গেল।
    এক মুহূর্ত
    আর তারপর একটি শব্দ
    ঝপাৎ!
    নাহারের শরীর সোজা ৩০ ফুট নীচে কর্ণফুলীর গভীর জলে অতলে তলিয়ে গেল।
    -নাহার!
    বাহারের গলা ফেটে চিৎকার বেরিয়ে এলো। সে এক মুহূর্তও নিজের জীবনের কথা ভাবেনি। নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল তার নাহারকে রক্ষা করতে । কিন্তু নদী সেদিন শান্ত ছিল না।
    তার গভীরে ছিল অদৃশ্য টান, নির্মম স্রোত।
    দুজনেই হারিয়ে গেল সেই উন্মত্ত ঢেউের স্রোতে। বাহারের হাত আর নাহারের হাতকে ছুঁতে পারল না শেষ পর্যন্ত।
    অতঃপর নদীর উপর আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা। অতঃপর স্বাভাবিকতা। যেন কিছুই ঘটেনি!
    শুধু নিমিষেই গভীর জলের তলায় দু’টি অসমাপ্ত ভালোবাসা চিরদিনের জন্য সলিল সমাধিস্থ হয়ে মিলিয়ে গেলো মহাকালের মহাস্রোতে। মোমের শেষ শিখাটি ধপ করে চিরতরে নিভে গেল।

    2
    3 Comments
    • সকাল সকাল মনটা খারাপ করে দিলেন লেখকপ্রিয়, ভালোবাসার এমন নির্মম মৃত্যু কোনভাবেই মেনে নিতে পারছিনা!

    • এ কে সরকার শাওন, আপনার লেখনশৈলীতে যে আবেগ ও নিপুণ শব্দচয়ন ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই হৃদয়স্পর্শী এবং প্রতিটি দৃশ্যপট আমার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ধরা দিয়েছে। চরিত্রের বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের এই বেদনাদায়ক রূপকল্পটি অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে গভীরভাবে নাড়া দেওয়ার মতো একটি চমৎকার সৃষ্টি। আপনি নিয়মিত এমন মন ভালো করা বা গভীর ভাবনার খোরাক জোগানো গল্প লিখে আমাদের সমৃদ্ধ করে তুলবেন—এমন প্রত্যাশা রইল।

    • আপনার লেখা গল্পটি পড়ে সত্যি অনেক খারাপ লাগছে, বাহার আর নাহারের এমন পরিণতি মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। আপনি কি সচেতনভাবেই গল্পটিকে ট্র্যাজেডিতে শেষ করেছেন, নাকি অন্য কোনোভাবে তাদের মিলন ঘটানোর কথা ভেবেছিলেন?

এ কে সরকার শাওন

কবি ও সাহিত্যিক

কবি, গীতিকবি ও কথাসাহিত্যিক এ কে সরকার শাওন (দালিলিক নাম মোঃ আবদুল কাদের সরকার) ১৯৬৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর উপজেলার গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব ও কৈশোরের সোনালী দিনগুলো ঝালকাঠিতে কাটানোর পর কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি ঢাকা, চট্টগ্রাম ও নাটোরে অবস্থান করেন এবং বর্তমানে ঢাকার উত্তরখানের নিভৃত আলয় ‘কবিকুঞ্জ শাওনাজ ভিলা’য় স্থায়ীভাবে বসবাস করে নিরবিচ্ছিন্নভাবে সাহিত্য সাধনা করছেন।

ঝালকাঠি শহরের উদ্বোধন হাইস্কুলে তাঁর শিক্ষার হাতেখড়ি এবং সেই বিদ্যালয়ে পাঠকালেই তাঁর ভেতর সৃষ্টিশীল মননের বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তীতে তাঁকে সাহিত্যের আঙিনায় সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করায়। জীবনের পরতে পরতে তিনি জ্ঞানার্জনের স্পৃহাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন; অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পাশাপাশি ইংরেজি সাহিত্য, আইন ও ইনফরমেশন টেকনোলজির মতো বৈচিত্র্যময় বিষয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছেন দেশে ও বিদেশে। খাদ্য নিরাপত্তার উপর আইএফসি ও প্রান গ্রুপের যৌথভাবে প্রদেয় তিনটি অভিজ্ঞানপত্র রয়েছে তাঁর।

তাঁর কর্মজীবন অত্যন্ত বর্ণাঢ্য ও গৌরবোজ্জ্বল। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সুদীর্ঘ ১৮ বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি এয়ারম্যান ট্রেনিং ইনস্টিটিউটে (ATI) অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে টানা ১০ বছর সফল প্রশিক্ষক হিসেবে নতুনদের গড়ে তুলেছেন। বিমান বাহিনীর পাট চুকিয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠীতে প্রশাসনিক ও উচ্চ ব্যবস্থাপনা পদে কাজ করে একজন দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কঠিন পেশাগত জীবনের মাঝেও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগে তিনি কখনো ভাঁটা পড়তে দেননি। তাঁর লেখনীতে রোমান্টিকতা, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার চমৎকার মেলবন্ধন ঘটেছে, যা পাঠক হৃদয়ে আলাদা স্থান করে নিয়েছে।

সাহিত্য অঙ্গনে তাঁর রয়েছে বিপুল ও বৈচিত্র্যময় সৃষ্টি। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ 'কথা-কাব্য', 'নীরব কথোপকথন', 'আপন-ছায়া', কাব্যধর্মী উপন্যাস 'অতল জলে জলাঞ্জলি' এবং অটোফিকশন উপন্যাস 'শাওনাজ আইল্যান্ড' সুধী মহলে সমাদৃত হয়েছে। প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে কসমিক ফিকশন 'মস্তিষ্কে মহাকাশ' (ও এর ইংরেজি সংস্করণ 'Metacosm Of Mind'), উপন্যাস 'বাঁশফুল', ইংরেজি রোমান্টিক উপন্যাস 'Layla: The Modern Ruth', এবং 'চেয়ার ও চোর', 'প্রণয়-প্রলাপ', 'প্রলয়-প্রলাপ', 'সজনী', 'আলো-ছায়া', 'প্রান্তিক-প্রান্তরে', 'ঋতুরং', শিশুতোষ কাব্যগ্রন্থ 'বাঁকা চাঁদের হাসি', গল্পগ্রন্থ 'মেকাপ-বক্স', ও 'মোমের শেষ শিখা', ইংরেজি কাব্যগ্রন্থ 'Songs of Insane' সহ বেশ কিছু গ্রন্থ। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে লিখছেন তাঁর ৮০ পর্বের বৃহৎ আত্মজীবনী 'আমার জীবন নদীর বাঁকে বাঁকে'।

সাহিত্যের পাশাপাশি দৃশ্যশ্রাব্য মাধ্যমেও তাঁর অবদান অনুস্বীকার্য। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচারিত হয়েছে তাঁর রচিত জনপ্রিয় টেলিফিল্ম 'শুটিং', 'আদর্শ-লিপি' ও 'পরিবর্তন'। গান রচনায় তাঁর দক্ষতা প্রকাশিত হয় ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ বেতারে এবং ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে গান সম্প্রচারের মাধ্যমে। শুধু লেখালেখিই নয়, সঙ্গীতচর্চায়ও তিনি শৌখিন শিল্পী হিসেবে বেশ জনপ্রিয় এবং স্টারমেকার প্ল্যাটফর্মে বেশ উপরের সারিতে স্থান করে নিয়েছেন। সাহিত্য ও শিল্পকলায় এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে তিনি কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ ‘বাংলা এক্সপ্রেস পুরস্কার’-এ ভূষিত হন।

ব্যক্তিজীবনে ১৯৯১ সালে তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য সমালোচক নাজমা আশেকীন শাওনের সাথে, যিনি ষাটের দশকের নন্দিত চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব এ কে এম জহিরুল হক ইব্রাহিমের (চলচ্চিত্রে আশেক জহির) দ্বিতীয় কন্যা। এক সফল ও রত্নগর্ভা দাম্পত্যে তাঁদের ঘর আলো করে এসেছে তিন রাজকন্যা, যাঁরা বর্তমানে নিজ মেধা ও যোগ্যতায় যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া ও ভারত সরকারের পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ (Full-funded Scholarship) নিয়ে উচ্চশিক্ষায় অধ্যয়ন করছেন।

Skip to toolbar