Profile Photo

পি.কে. সরকারOffline

  • PKSarker
  • ক্ষুধা, বিবেক ও মানুষের দায়
    ____ পি কে সরকার

    মানুষের জীবনে কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর বইয়ের পাতায় সহজে পাওয়া যায় না। কিছু প্রশ্ন মানুষের অস্তিত্বের গভীরে গিয়ে আঘাত করে; তার নৈতিকতা, বিবেক, মানবিকতা এবং বেঁচে থাকার প্রবল আকাঙ্ক্ষাকে মুখোমুখি দাঁড় করায়। চরম ক্ষুধা ও বিবেকের দ্বন্দ্ব তেমনই একটি প্রশ্ন।
    পেট ভরা মানুষের কাছে নীতি সহজ; কিন্তু খালি পেটে নীতি কতটা দৃঢ় থাকে—সেটিই মানুষের জীবনের কঠিন পরীক্ষা।
    ক্ষুধা কেবল শরীরের প্রয়োজন নয়; চরম ক্ষুধা কখনো কখনো মানুষের চিন্তা, বিচারবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতার ওপরও গভীর চাপ সৃষ্টি করে। যে মানুষটি স্বাভাবিক সময়ে অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, অন্যের সম্পদে হাত বাড়াতে লজ্জা পায়, অন্যায়কে অন্যায় বলার সাহস রাখে—সেই মানুষটিও যখন দিনের পর দিন অভুক্ত থাকে, সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে না পারে, অসুস্থ মায়ের ওষুধ কেনার সামর্থ্য হারায়, তখন তার সামনে জীবনের এক নির্মম প্রশ্ন এসে দাঁড়ায়—
    “আমি কি আগে নৈতিক মানুষ, নাকি আগে একজন ক্ষুধার্ত মানুষ?”
    এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া সহজ নয়।
    কারণ ক্ষুধা যুক্তির ভাষা সবসময় বোঝে না। ক্ষুধা কখনো কখনো মানুষকে এমন প্রান্তসীমায় নিয়ে যায়, যেখানে নৈতিকতার দীর্ঘ বক্তৃতার চেয়ে একমুঠো খাবার অধিক জরুরি হয়ে ওঠে। তখন মানুষ অপরাধ করতে চায় বলে নয়, বরং বেঁচে থাকার তাগিদে তার বিচারবোধ দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
    তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা প্রয়োজন—
    ক্ষুধা কোনো অন্যায়কে ন্যায় করে না; কিন্তু ক্ষুধার্ত মানুষকে বিচার করার আগে তার পরিস্থিতিকে বুঝতে শেখায়।
    একজন ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে অন্যায় দেখলে আমরা শুধু তার হাতটিই দেখতে পারি; কিন্তু একজন মানবিক মানুষ তার পেছনে থাকা শূন্য থালা, দীর্ঘশ্বাস, অনাহারী পরিবার এবং অসহায়তার ইতিহাসটিও দেখতে চেষ্টা করে।
    সমাজের বড় সমস্যা এখানেই।
    আমরা প্রায়ই ফলাফল দেখি, কারণ দেখি না। আমরা মানুষের ভুল দেখি, কিন্তু তার ভাঙনের গল্প দেখি না। আমরা কারও পতন দেখি, কিন্তু তাকে কতবার ঠেলে দেওয়া হয়েছিল—সেটি জানতে চাই না। আমরা বলি, “সে অন্যায় করেছে”; কিন্তু খুব কম মানুষ প্রশ্ন করি, “কেন সে এমন অবস্থায় পৌঁছাল?”
    অবশ্যই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যায় না। আইন থাকবে, ন্যায়বিচার থাকবে, মানুষের অধিকার রক্ষার ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু একটি সভ্য সমাজের দায়িত্ব শুধু অপরাধের পরে শাস্তি দেওয়া নয়; অপরাধের জন্ম দেওয়ার মতো সামাজিক পরিস্থিতি কমিয়ে আনা।
    কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যদি একদিকে থাকে নৈতিকতার উপদেশ আর অন্যদিকে থাকে একবেলার খাবার, তবে কেবল উপদেশ দিয়ে সমাজের দায়িত্ব শেষ হয় না।
    একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার পেটে খাবার দেওয়াও প্রয়োজন। একজন তরুণকে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখানো যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার সামনে সেই কর্মসংস্থানের বাস্তব পথ তৈরি করাও প্রয়োজন। একজন অসুস্থ মানুষের কাছে সুস্থ থাকার পরামর্শ দেওয়া সহজ; কিন্তু তার চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হলো মানবিকতার বাস্তব প্রয়োগ।
    মানবিকতা কথায় নয়, মানুষের প্রয়োজনের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি প্রকাশ পায়।
    আমাদের সমাজে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা আছে—আমরা দারিদ্র্যকে অনেক সময় ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখি। যেন দরিদ্র হওয়া মানেই মানুষটি যথেষ্ট পরিশ্রম করেনি; যেন অভাব মানেই তার অযোগ্যতা। অথচ বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল।
    কেউ জন্মগতভাবে সুবিধাবঞ্চিত পরিবেশে জন্মায়। কেউ কর্মক্ষমতা হারায়। কেউ আকস্মিক বিপর্যয়ে সর্বস্বান্ত হয়। কেউ শিক্ষার সুযোগ পায় না। কেউ কর্মসংস্থান হারায়। কেউ পরিবারের দায়িত্ব বহন করতে গিয়ে নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দেয়। আবার কেউ এমন সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বড় হয়, যেখানে তার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথই সংকীর্ণ।
    তাই মানুষের আর্থিক অবস্থাকে তার চরিত্রের সম্পূর্ণ পরিচয় হিসেবে দেখা অন্যায়।
    একজন দরিদ্র মানুষও সৎ হতে পারে, মর্যাদাবান হতে পারে, জ্ঞানী হতে পারে, স্বপ্ন দেখতে পারে। আবার একজন সচ্ছল মানুষও নৈতিকতার দিক থেকে দরিদ্র হতে পারে। মানুষের সম্পদের পরিমাণ তার মানবিকতার পরিমাপক নয়।
    একইভাবে ক্ষুধার্ত মানুষকে করুণা করার মধ্যেও যেন অহংকার না থাকে। কারণ করুণা মানুষকে নিচে নামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু সম্মান মানুষকে দাঁড়ানোর শক্তি দেয়।
    এক বেলার খাবার দেওয়া মানবিক কাজ; কিন্তু এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে মানুষকে প্রতিদিন খাবারের জন্য কারও দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে না—এটি আরও বড় মানবিক দায়িত্ব।
    তাই সমাজের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু দান নয়, সুযোগ সৃষ্টি; শুধু সহানুভূতি নয়, মর্যাদা নিশ্চিত করা; শুধু উপদেশ নয়, বাস্তব সহায়তা।
    একজন ক্ষুধার্ত মানুষকে বলা সহজ—“সৎ থেকো।”
    কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে বলা—
    “তুমি সৎ থাকো, তোমার বেঁচে থাকার পথটি আমরা মানবিকভাবে সহজ করার চেষ্টা করছি”—
    এটাই সামাজিক দায়িত্ববোধের উচ্চতর প্রকাশ।
    আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি সমাজ কেবল তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত সড়ক, প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দিয়ে উন্নত হয় না। একটি সমাজ কতটা উন্নত, তার অন্যতম মাপকাঠি হলো—সেই সমাজে সবচেয়ে দুর্বল মানুষটির জীবন কতটা নিরাপদ।
    যে সমাজে একজন বৃদ্ধ চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পান, একটি শিশু ক্ষুধার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দেয়, একজন কর্মক্ষম মানুষ কাজ না পেয়ে হতাশ হয়, একটি পরিবার সামান্য বিপর্যয়েই নিঃস্ব হয়ে পড়ে—সেই সমাজের উন্নয়নকে আরও মানবিক দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
    কারণ সভ্যতার আসল পরীক্ষা প্রাসাদের আলোয় নয়; বরং অন্ধকার ঘরের মানুষের মুখে।
    আমরা প্রায়ই সন্তানদের বলি—“সৎ হও, ভালো মানুষ হও, অন্যায় করো না।” এই শিক্ষা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু তার সঙ্গে আরও একটি শিক্ষা প্রয়োজন—
    “অন্যের কষ্ট বুঝতে শেখো।”
    কারণ বিবেক শুধু নিজের ভুল বুঝতে শেখায় না; বিবেক অন্যের ক্ষুধাও অনুভব করতে শেখায়।
    যে শিশু আজ ক্ষুধার্ত সহপাঠীকে নিজের খাবারের অংশ ভাগ করে দিতে শেখে, সে আগামী দিনের আরও মানবিক সমাজ গড়তে পারে। যে তরুণ দুর্বল মানুষকে অপমান না করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়, সে সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে শক্ত করে। যে পরিবার প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ায়, তারা শুধু একজন মানুষকে সাহায্য করে না—তারা সামাজিক আস্থাকে বাঁচিয়ে রাখে।
    সমাজে নিরাপত্তা শুধু আইনশৃঙ্খলা দিয়ে আসে না। নিরাপত্তা আসে পারস্পরিক বিশ্বাস থেকে। আসে এই অনুভূতি থেকে—
    “আমি বিপদে পড়লে কেউ আমাকে একেবারে একা ফেলে যাবে না।”
    এই অনুভূতি একটি সমাজের অদৃশ্য সম্পদ।
    তাই আমাদের প্রয়োজন এমন এক সামাজিক সংস্কৃতি, যেখানে মানুষ অন্যের দুর্দশাকে বিনোদন হিসেবে দেখবে না, উপহাসের বিষয় বানাবে না, সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করবে না। বরং সমস্যার গভীরে গিয়ে কারণ বোঝার চেষ্টা করবে।
    কেউ ভুল করলে তাকে শুধরে দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। কেউ বিপদে পড়লে সাহায্যের হাত বাড়াতে হবে। কেউ অন্যায় করলে ন্যায়বিচারের আওতায় আনতে হবে। আর কেউ ক্ষুধার্ত হলে তাকে নৈতিকতার বক্তৃতার আগে মানুষের মর্যাদায় বাঁচার সুযোগ দিতে হবে।
    কারণ শাস্তি সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, কিন্তু মানবিকতা সমাজকে পরিবর্তন করতে পারে।
    তবে মানবিকতার অর্থ কখনো আইনহীনতা নয়। সহানুভূতির অর্থ অন্যায়ের অনুমোদন নয়। বরং প্রকৃত মানবিক সমাজ এমন একটি ভারসাম্য তৈরি করে, যেখানে আইন অন্যায়কে প্রতিরোধ করে এবং মানবিকতা মানুষকে পতনের আগেই ধরে রাখার চেষ্টা করে।
    আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু দায়িত্ব আছে।
    পরিবারের দায়িত্ব—সন্তানকে শুধু সফল নয়, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা।
    শিক্ষার দায়িত্ব—জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি বিবেক জাগানো।
    সমাজের দায়িত্ব—দুর্বল মানুষকে অপমান না করে সহযোগিতার পরিবেশ তৈরি করা।
    রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব—মানুষের মৌলিক প্রয়োজন, ন্যায়সঙ্গত সুযোগ, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
    আর ব্যক্তির দায়িত্ব—নিজের সামর্থ্যের মধ্যে অন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানো।
    হয়তো আমরা পৃথিবীর সব ক্ষুধা দূর করতে পারব না। কিন্তু আমাদের আশেপাশের একজন মানুষের ক্ষুধা কিছুটা কমাতে পারি। হয়তো আমরা পুরো সমাজ বদলে দিতে পারব না। কিন্তু নিজের পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও প্রতিবেশে একটি মানবিক আচরণের সংস্কৃতি তৈরি করতে পারি।
    পরিবর্তন সবসময় বড় কোনো ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয় না। কখনো কখনো পরিবর্তন শুরু হয় একটি ভাগ করে দেওয়া রুটির টুকরো থেকে, একটি সম্মানজনক কথার মাধ্যমে, একটি সুযোগ করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে, কিংবা বিপদে থাকা একজন মানুষের পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
    শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু এই নয়—“ক্ষুধার্ত মানুষ কি বিবেক ধরে রাখতে পারে?”
    আরও বড় প্রশ্ন হলো—
    “আমরা কি এমন একটি সমাজ তৈরি করতে পারি, যেখানে একজন মানুষকে তার বিবেক ও ক্ষুধার মধ্যে বেছে নিতে হবে না?”
    এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের প্রত্যেকের কাজের মধ্যে লুকিয়ে আছে।
    কারণ ক্ষুধার্ত মানুষের বিবেককে পরীক্ষা করার আগে, আমাদের নিজেদের বিবেককে একবার প্রশ্ন করা উচিত—
    একজন মানুষ যখন বেঁচে থাকার জন্য লড়ছে, তখন তাকে বিচার করার আগে আমরা কি তাকে বাঁচার মতো একটি সমাজ দিতে পেরেছি?
    মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার ক্ষমতা নয়, তার সামাজিক অবস্থানও নয়।
    মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়—সে অন্য মানুষের কষ্টের সামনে কতটা মানুষ হয়ে উঠতে পারে।
    আর একটি সমাজের সবচেয়ে বড় অর্জন তখনই, যখন সেখানে ক্ষুধার্ত মানুষকে নীতির পরীক্ষা দিতে হয় না; বরং সমাজ তার পাশে দাঁড়িয়ে বলে—
    “তুমি বাঁচো। মর্যাদার সঙ্গে বাঁচো। তোমার বিবেকটুকু বাঁচিয়ে রেখো—কারণ সেই বিবেকই একদিন আমাদের সমাজকে আরও মানবিক করে তুলবে।”

    4
    7 Comments
    • দারিদ্র্যকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখার প্রবণতা বিষয়ে আপনার বিশ্লেষণ চোখ খুলে দেওয়ার মতো।

    • পি.কে. সরকার, আপনার লেখা এই লাইনটি— “ক্ষুধার্ত মানুষের সামনে যদি একদিকে থাকে নৈতিকতার উপদেশ আর অন্যদিকে থাকে একবেলার খাবার, তবে কেবল উপদেশ দিয়ে সমাজের দায়িত্ব শেষ হয় না”— একদম মনের কথা বলেছেন, যা পড়ে সত্যিই অনেক কিছু ভাবার আছে।

    • মানুষ বড় অদ্ভুত লেখকপ্রিয়, বৈচিত্রময়! কোন কিছু দিয়েই আসলে ঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। তবে, আমাদের জন্য একটা সুন্দর সোসাইটি গড়ে তোলার ভাবনাটুকুকে সম্মান জানাই, শুভ হোক!

    • আপনার এই লেখনীটি সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের গভীর দিকগুলো অত্যন্ত সুন্দর ও সাবলীল ভাষায় তুলে ধরেছে, যা পাঠক হিসেবে আমার হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে। ক্ষুধার সাথে বিবেকের যে টানাপোড়েন আপনি ফুটিয়ে তুলেছেন, তা আমাদের সমাজের চিত্রকে নতুনভাবে দেখার সুযোগ করে দেয়, তাই আপনি এমন ভাবনার চর্চা চালিয়ে যান যেন আরও অনেক সুন্দর লেখা আমাদের উপহার দিতে পারেন।

পি কে সরকার

 

“পি.কে. সরকার — শব্দের ভেতর মানবতা ও সমাজের গভীরতম সত্য খুঁজে চলা এক সমকালীন বাংলা লেখক।”

Skip to toolbar