Profile Photo

রাহেনা বেগমOffline

  • Rahena-Begum
  • Profile picture of রাহেনা বেগম

    রাহেনা বেগম

    3 weeks, 6 days ago

    নূর মহল ভিলার সেই রাত…

    অতিপ্রাকৃত গল্প শুনবেন?

    আমার শৈশবের একটা বড় অংশ কেটেছে “নূর মহল ভিলা”-তে।

    রাজশাহী শহরের রামচন্দ্রপুরের কালুমিস্ত্রীর মোড়ে ছিল আমাদের সেই প্রিয় বাড়ি—নূর মহল ভিলা। আমার যত লেখা তখন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হতো, সবকিছুর ঠিকানায় লেখা থাকত-

    “রুনা, নূর মহল ভিলা।”

    আমরা যখন বাড়িটিতে উঠি, তখন সেটা ছিল দ্বিতল। পরে আমাদের থাকাকালীন সময়ে বাড়িটি তৃতল হয়।

    দ্বি তলায় থাকতেন বাড়ির মালিক—আমাদের সবার প্রিয় নূর মহল খালাম্মা। তবে তিনি কখনো নিজেকে বাড়িওয়ালা ভাবতেন না, আমরাও তাঁকে কোনোদিন বাড়িওয়ালা ভাবিনি। তিনি ছিলেন আমাদের খালাম্মা।

    খালাম্মা-খালুর তিন মেয়ে—রোজি আপা, রুমা আর তুলি, আর এক ছেলে মিঠু।
    (খালাম্মা, তাঁর সব ছেলে-মেয়ে—সবাই এখনো আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড! 😊)

    বোয়ালিয়া থানা কোয়ার্টার ছেড়ে আমরা নূর মহল ভিলায় উঠেছিলাম। আর আব্বা একা চলে গিয়েছিলেন গুরুদাসপুর থানায়।

    বড়ভাই তখন রাজশাহী মেডিকেলে লেকচারার, মেজভাই, আপা ও ছোটভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। আর আমি তখন পিএন স্কুলের ক্লাস ফাইভের ছাত্রী।

    নূর মহল ভিলা ঠিক করেছিলেন আমার মেজভাই। তবে বাড়িটা পছন্দ করার পেছনে তাঁর একটা বিশেষ কারণ ছিল—খালাম্মার বছর দুয়েকের ছোট্ট, ফুটফুটে পরীর মতো মেয়ে – তুলি।

    তুলিকে নিয়ে অবশ্য একটা মহাকাব্য লেখা যায়। সে গল্প আরেকদিন হবে।

    এবার আসল গল্পে আসি…

    আমরা বাড়িতে ওঠার কিছুদিন পর এক প্রতিবেশী আম্মাকে এসে বললেন—

    “আপনারা যে বাড়িতে উঠেছেন, সেখানে তো একটা মেয়ে—নাম বেবী—আত্ম/হত্যা করেছিল। এরপর আর কেউ নাকি এই বাড়ি ভাড়া নিতে চায়নি। আপনারা কেন এই বাড়িতে উঠলেন? ওর আত্মা নাকি এখনো ঘুরে বেড়ায়!”

    আম্মা খবরটা শুনে ভীষণ ভয় পেলেন।

    তবে ভূতের ভয়ে নয়—আমার আপার ভয়ে! 😂

    কারণ আপা যদি কথাটা জানতে পারে, তাহলে একদিনও ওই বাড়িতে থাকবে না। আর আমার মেজভাইয়ের কী অবস্থা করবে, সেটা ভাবাই যায়!

    এমনিতেই সারাবছর আমার ভাইরা আপার ভয়ে তটস্থ থাকত। পান থেকে চুন খসলেই আপা ভাইদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিতেন। 😄

    তাই আম্মা বিষয়টা আপার কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখলেন।

    আর সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো—যে ঘরে আম্মা আর আমি থাকতাম, বলা হলো সেই ঘরেই বেবী মেয়েটি আত্ম/হত্যা করেছিল।

    এরপর থেকে রাত হলেই আমাদের মনে কেমন একটা ভয় কাজ করত।

    গভীর রাতে হঠাৎ মনে হতো, উপরতলায় কেউ যেন মার্বেল খেলছে—

    টুপ… টুপ… টুপ…

    কখনো মনে হতো কেউ যেন কয়েন ফেলছে।

    আমি আর আম্মা ঘুম থেকে উঠে বসতাম।

    আম্মা খুব স্বাভাবিকভাবে বলতেন—

    “কিছু না। মিঠু মনে হয় মার্বেল খেলছে। কালকে তোর খালাম্মাকে বলব।”

    ব্যস! 😶

    এইভাবেই রাতগুলো কাটত।

    কিন্তু আসল ঘটনা ঘটল এক গভীর রাতে…

    আমরা যখন বাড়িতে উঠেছিলাম, তখন থেকেই আমাদের ঘরের একটা টিউব লাইট নষ্ট ছিল। শুধু টিউব লাইট নয়, সেই লাইনের ইলেকট্রিক কানেকশনও নষ্ট ছিল। হোল্ডারসহ সবকিছুই অকেজো।

    তাই আমরা অন্য একটি হোল্ডারে ১০০ ওয়াটের ফিলিপ্স বাতি লাগিয়ে নিয়েছিলাম। আরেকটি হোল্ডারে ছিল জিরো পাওয়ারের লাইট।

    এভাবেই দিন কাটছিল।

    আব্বা মাঝেমধ্যে গুরুদাসপুর থানা থেকে আসতেন। সেদিনও সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিল।

    গভীর রাত।

    হঠাৎ আম্মা-আব্বা জেগে উঠলেন। ঘরের দরজা খুলে বাইরে বের হলেন।

    আমরাও ঘুম থেকে উঠে কী হয়েছে দেখতে বের হলাম।

    তারপর—

    ওমা!

    এ কী কাণ্ড!

    যে টিউব লাইটটা বছরের পর বছর নষ্ট, যে লাইনে বিদ্যুৎ সংযোগই নেই, যে সুইচ বন্ধ—

    সেই টিউব লাইট হঠাৎ জ্বলে উঠেছে!

    পুরো ঘর আলোয় ঝলমল করছে! 😳

    আম্মা তাড়াতাড়ি উপরে গিয়ে খালুকে ডেকে আনলেন।

    খালাম্মা-খালু সবাই নিচে এসে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

    খালু টিউব লাইটের ব্যালাস্ট খুলে ফেললেন—তবুও আলো জ্বলছে!

    খালাম্মা কিছুতেই খালুকে লাইটে হাত দিতে দিতে রাজি নন।

    খালু শেষ পর্যন্ত একটু ধমক দিয়ে বললেন—

    “আরে, চুপ করো! দেখি কী হয়েছে!”

    কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—লাইট তখনো জ্বলছে।

    শেষ পর্যন্ত খালু আম্মাকে বললেন একটা কাপড় আনতে। কারণ লাইটটা এত গরম হয়ে গিয়েছিল যে খালি হাতে ধরা সম্ভব নয়।

    আম্মা আব্বার একটা লুঙ্গি এনে দিলেন।

    খালু খুব সাবধানে কাপড় দিয়ে জ্বলন্ত টিউব লাইটটি খুলে নামিয়ে ফেললেন।

    আমরা ছোটরা তখন ভয়ে প্রায় চিৎকার করছি।

    কিন্তু…

    টিউব লাইটটা হাতে নামানোর পরও সেটা জ্বলছে!

    আম্মা তখন প্রায় কেঁদেই ফেললেন।

    বললেন—

    “আমি এই লাইট আর বাড়িতে রাখব না। আপনি নিয়ে যান!”

    খালু লাইটটা হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে শুরু করলেন।

    আর ঠিক তখনই…

    লাইটটা নিভে গেল।

    একেবারে নিভে গেল।

    তারপর?

    সেই রাত আর কেউ ঘুমাইনি।

    আমরা সবাই—আম্মা, আব্বা, ভাই-বোন, এমনকি খালাম্মা-খালুরাও—প্রায় সারারাত জেগে কাটালাম।

    আজ এত বছর পর ভাবি—

    নিশ্চয়ই এই ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।

    হয়তো বিদ্যুতের কোনো অদ্ভুত সমস্যা ছিল। হয়তো অন্য কোনো কারণ।

    কিন্তু…

    শৈশবের কিছু ঘটনা যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়, আবার কিছু ঘটনা স্মৃতির অন্ধকার কোণে রহস্য হয়েই থেকে যায়।

    “নূর মহল ভিলা”-র সেই রাতটা আমার কাছে আজও তেমনই এক রহস্য।

    হয়তো সত্যিই তার কোনো ব্যাখ্যা আছে…

    কিন্তু কিছু কিছু রহস্যকে রহস্যই থাকতে দেওয়া ভালো।

    শুভ রাত্রি।

    4
    9 Comments
    • আপনার শৈশবের এই ঘটনাটা পড়ে তো গা ছমছম করে উঠল! রহস্যে ঘেরা নূর মহল ভিলার এই স্মৃতিগুলো বেশ চমৎকারভাবে লিখেছেন আপনি।

    • মাঝরাতে অন্ধকার ঘরে বসে পড়ছি গল্পটা, জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি!

    • নূর মহল ভিলার স্মৃতিচারণমূলক এই রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার প্রতিটি পরতে যে রহস্য আর শৈশবের শিহরণ জড়িয়ে আছে, তা এক কথায় অপূর্ব। এমন প্রাণবন্ত লেখনীর ধার ধরে রাখার পাশাপাশি গ্রুপের অন্য সদস্যদের লেখায় লাইক ও কমেন্ট করে আমাদের এই ছোট পরিবারটিকে আরও প্রাণবন্ত রাখার অনুরোধ রইল।

      • অসংখ্য ধন্যবাদ ।অবশ্য ই পরিবারের সকল সদস্যদের নিয়ে আমরা একটা প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করবো

    • আপনার লেখা পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিলো! বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা থাকলেও কিছু রহস্য রহস্যই থেকে যায়!

Friends

Profile Photo
naznin shamim
@nazninshamim
Profile Photo
Md Mofiz
@mdmofiz
Profile Photo
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat
Profile Photo
wajibad
@wajibad
Profile Photo
MAHAJABIN AFROZE
@mahajabinafroze
Profile Photo
Intisar Jabed
@intisarjabed
Profile Photo
মেঘ
@megh
Skip to toolbar