Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • Profile picture of বিষণ্ন সুমন

    বিষণ্ন সুমন

    1 week, 5 days ago

    সীমানা পেরিয়ে
    (পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)

    অধ্যায়–সতের
    আকাশে কোনো মেঘ নেই। ভোরের আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে প্রেইরির ওপর। রাতের শেষ অন্ধকার অনেক আগেই সরে গেছে, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ঠান্ডা এখনও বাতাসের মধ্যে মিশে আছে। পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠে এসেছে, আর তার ফ্যাকাশে সোনালি আলো ধীরে ধীরে শুকনো ঘাসের মাথা, কাঠের বেড়া, র‍্যাঞ্চের পুরোনো বাড়ি আর শেডের দেয়ালের ওপর গড়িয়ে পড়ছে। রাতের শিশির এখনও কোথাও কোথাও ঘাসের ডগায় আটকে আছে। সূর্যের আলো পড়লে সেগুলো ক্ষুদ্র কাচের টুকরোর মতো ঝিলিক দিয়ে উঠছে। দূরের পাহাড়গুলোর গায়ে আলো আর ছায়ার খেলা চলছে। কোথাও সোনালি আলো, কোথাও ধূসর ছায়া, আবার কোথাও পাহাড়ের ঢাল এখনও সকালের নীলচে অন্ধকারে ঢাকা।

    ঘোড়াগুলোও ধীরে ধীরে রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। আস্তাবলের ভেতর থেকে মাঝে মাঝে খুরের শব্দ ভেসে আসছে। কোনো ঘোড়া নাক ঝেড়ে মাথা ঝাঁকাচ্ছে, কোনোটা কাঠের দরজায় মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভোরের বাতাসে ঘোড়ার শরীরের উষ্ণ গন্ধ, শুকনো খড় আর ভেজা মাটির গন্ধ মিশে আছে। অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও এই একই জায়গায় গুলির শব্দে রাত কেঁপে উঠেছিল।

    সকালের আলোয় শেডের দেয়ালের ক্ষতটা এখন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। লারসেনকে লক্ষ্য করে ছোড়া সেই একটি গুলি শেডের কাঠে গিয়ে আঘাত করেছিল। যেখানে গুলিটি কাঠে ঢুকেছিল, সেখানে ছোট একটি গর্তের চারপাশে কাঠের তন্তু ছিঁড়ে বাইরে বেরিয়ে আছে। আঘাতের ধাক্কায় গর্তটির চারপাশের কাঠ সামান্য ফেটে গেছে। তার কাছাকাছি রাতের গোলাগুলির সময় তৈরি হওয়া আঘাতের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে। কোথাও কাঠের সরু ফালি ভেঙে ঝুলে আছে, কোথাও আঘাতের জায়গায় কালচে বারুদের দাগ লেগে আছে। দেয়ালের নিচে ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঠের ছোট টুকরো, শুকনো ঘাস আর রাতের তাড়াহুড়োয় এদিক-ওদিক সরে যাওয়া কিছু জিনিস। অন্ধকারে যেসব চিহ্ন চোখে পড়েনি, সূর্যের আলো সেগুলোকে এখন একে একে প্রকাশ করছে। কয়েক ঘণ্টা আগেও মৃত্যু কতটা কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল, সেই কথাই যেন নীরবে বলে যাচ্ছে শেডের কাঠের সেই ক্ষত।

    র‍্যাঞ্চের লোকেরা নিজেদের কাজে ফিরে গেছে। রাতের আতঙ্কের পরেও কাজ থেমে থাকে না। কেউ উত্তর দিকের বেড়া পরীক্ষা করছে, কেউ ঘোড়াগুলোর দেখাশোনা করছে, কেউ শেডের ক্ষতিগ্রস্ত কাঠ পরীক্ষা করছে। মিগুয়েল আস্তাবলের ভাঙা দরজার কবজা খুলে বসেছে। রুবেন কোল শেডের দেয়ালের ক্ষত পরীক্ষা করে কাঠের অবস্থা দেখছে। ক্লে মরগান পশ্চিম দিকের সীমানা ঘুরে এসেছে। প্রত্যেকেই কাজে ব্যস্ত, কিন্তু তাদের চলাফেরার মধ্যে আগের দিনের স্বাভাবিকতা নেই। কেউ বেশি কথা বলছে না। দূরে কোথাও ঘোড়ার হঠাৎ শব্দ উঠলে কয়েকজনের মাথা একসঙ্গে সেই দিকে ঘুরে যাচ্ছে। বাতাসে শুকনো ঘাসের মৃদু শব্দ হলেও চোখ চলে যাচ্ছে প্রেইরির দিকে।

    লারসেন কাউকে র‍্যাঞ্চের সীমানার বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। রাতের অন্ধকারে যারা এসেছিল, তাদের পেছনে ছুটে গিয়ে অজানা জায়গায় নিজেদের লোক হারানোর মতো বোকামি সে করতে চায় না। যারা এসেছিল, তারা যদি আবার ফিরে আসে, আলোয় তাদের দেখা যাবে। আর যদি তারা চলে গিয়ে থাকে, তবে মাটির ওপর রেখে যাওয়া চিহ্নই তাদের পথের কথা বলবে।

    বাড উত্তর দিকের বেড়ার কাছে দুজন লোক দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পশ্চিম দিকটাও পরীক্ষা করা হয়েছে। কোথাও তাজা ঘোড়ার খুরের চিহ্ন, কোথাও চাপা পড়া ঘাস, কোথাও মানুষের বুটের দাগ। কিন্তু রাতের অন্ধকার আর তাড়াহুড়োর মধ্যে কোনো চিহ্নই পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।

    বাইরে থেকে র‍্যাঞ্চটা আবার ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে বলে মনে হয়। কিন্তু যারা গত রাতের ঘটনাটা দেখেছে, তারা জানে এই স্বাভাবিকতা খুব পাতলা একটা পর্দা। তার নিচে এখনও ভয় আছে। সন্দেহ আছে। আর আছে এমন এক অদৃশ্য বিপদের অনুভূতি, যার কোনো মুখ এখনও দেখা যায়নি।

    বাড়ির ভেতরের ছোট ঘরটায় লারসেন একা দাঁড়িয়ে ছিল। জানালার কাঠের পাল্লা অর্ধেক খোলা। সকালের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে ঘরের মেঝের ওপর তির্যক একটা উজ্জ্বল রেখা তৈরি করেছে। সেই আলোর মধ্যে ধুলোর ক্ষুদ্র কণাগুলো ধীরে ধীরে ভেসে বেড়াচ্ছে। ঘরের বাতাসে পুরোনো কাঠ, চামড়া আর রাতের ঠান্ডা মিশে আছে।

    টেবিলের ওপর এলি ব্রুকসের চিঠি খোলা। তার পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। আর তার পাশে পড়ে আছে কালচে ধাতব চাকতিটি।

    লারসেন অনেকক্ষণ কোনো কিছু স্পর্শ করল না। তার দুই হাত জানালার কাঠের ওপর রাখা। চোখ বাইরে, কিন্তু সে আসলে প্রেইরি দেখছে না। তার মনে বারবার ফিরে আসছে এলি ব্রুকসের অফিসঘর। দেয়ালে ঝোলানো মানচিত্র। তিনটি জায়গায় চিহ্ন। সেই তিনটি জায়গাকে কল্পনায় যুক্ত করলে মাঝখানে এসে পড়ে তার র‍্যাঞ্চ। তারপর সিল মারা খাম। আর সেই চিঠির কয়েকটি লাইন। ওরা হয়তো তোমার জমি চায় না। তোমার জমির চেয়েও পুরোনো কোনো জিনিসের জন্য ওরা ফিরে এসেছে।

    লারসেন ধীরে জানালা থেকে সরে এসে টেবিলের কাছে গেল। চিঠির ওপর হাত রাখল না। শুধু তাকিয়ে রইল। তার মুখে কোনো ভাব প্রকাশ পেল না, কিন্তু চোখের গভীরে চিন্তার রেখা আরও গাঢ় হলো। তারপর তার দৃষ্টি গিয়ে থামল কালচে চাকতিটার ওপর।

    একই চিহ্নের দ্বিতীয় চাকতি এখন মারদেকার কাছে। গত রাতের অচেনা লোকটা সেটা রেখে গেছে। লারসেন কেন চাকতিটা মারদেকাকে দিয়েছে, সেই সিদ্ধান্তের পুরো ব্যাখ্যা সে নিজেকেও দেয়নি। তবে একটা বিষয় সে জানে, বিশ্বাস কোনোদিন এক লাফে তৈরি হয় না। ছোট ছোট পরীক্ষার মধ্য দিয়ে সেটা তৈরি হয়।

    সে দেখতে চেয়েছিল, মারদেকা এমন একটা জিনিস নিজের কাছে রাখতে পারে কি না যার অর্থ সে জানে না, কিন্তু যার গুরুত্ব সে বুঝতে পারে। গত রাতের ঘটনাগুলো ছেলেটাকে তার চোখে আরও বদলে দিয়েছে।

    মারদেকা ভয় পেয়েছিল। কিন্তু ভয়কে নিজের চোখের ওপর বসতে দেয়নি। সে লক্ষ্য করেছে মানুষের মুখ, দৃষ্টি, থেমে যাওয়া কথা, বদলে যাওয়া আচরণ। লারসেন বহু বছর ধরে মানুষের চোখ পড়েছে। বন্দুক হাতে থাকা লোক নিজের মুখের কথা দিয়ে অনেক কিছু লুকাতে পারে, কিন্তু তার চোখ অনেক সময় সত্যিটা বলে দেয়।

    মারদেকা সেই জিনিসটা বয়সের তুলনায় অস্বাভাবিক দ্রুত বুঝতে শুরু করেছে। এই ক্ষমতা তাকে বিপদের মধ্যে ফেলতে পারে। আবার ঠিকভাবে শেখানো গেলে একদিন এটাই তাকে বাঁচাতেও পারে।

    দরজায় হালকা শব্দ হলো। লারসেন মুখ না ঘুরিয়েই বলল, “ভেতরে এসো।”

    দরজা খুলে বাড ঢুকল। হাতে রাইফেল। কাঁধে সকালের ঠান্ডা বাতাসের গন্ধ। বুটের নিচে শুকনো মাটি লেগে আছে। রাত জাগার ক্লান্তি মুখে থাকলেও চোখে সেই পুরোনো সতর্কতা।

    ঘরে ঢুকে বাড প্রথমে লারসেনের দিকে তাকাল। তারপর টেবিলের ওপর রাখা চাকতি আর চামড়ার টুকরোটার দিকে তার দৃষ্টি গেল। বাইরে থেকে আসা আলোয় চাকতিটা কালচে ধাতুর মতো নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে।

    বাড ধীরে বলল, “উত্তরের দিকটা এখন শান্ত।”

    লারসেন জানালার বাইরে তাকিয়েই জিজ্ঞেস করল, “পশ্চিম?”

    “ক্লে মরগান দেখে এসেছে। তাজা লোকের চিহ্ন নেই। তবে বেড়ার ওপারে একটা জায়গায় ঘাস চাপা পড়েছে।”

    লারসেন এবার তার দিকে ফিরল। “কেউ অনুসরণ করেনি তো?”

    বাড মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনার কথা পরিষ্কার ছিল। কেউ সীমানার বাইরে যাবে না।”

    লারসেন আবার জানালার দিকে তাকাল। তার চোখে কঠিন স্থিরতা। “আমরা এখন তাদের পেছনে গেলে তারা বুঝবে আমরা কী জানি। আমি বরং চাই, তারা ভাবুক আমরা কিছুই জানি না।”

    বাডের মুখে সামান্য হাসি ফুটল। সে রাইফেলটা দেয়ালের পাশে ঠেকিয়ে রেখে বলল, “আপনি কখনও সহজ পথ নেন না।”

    লারসেনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি দেখা গেল। “সহজ পথ সবসময় নিরাপদ পথ নয়।”

    কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে রইল। বাইরে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। তারপর আবার নীরবতা।

    বাডের চোখ ধীরে ধীরে টেবিলের ওপরের চাকতিতে গিয়ে থামল। সে বলল, “ওটা কি আগে দেখেছেন?”

    লারসেন উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”

    বাড আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। লারসেনের অতীত সম্পর্কে সে অনেক কিছু জানে না। জানার চেষ্টাও করে না। বহু বছর ধরে সে বুঝে গেছে, মানুষের জীবনে কিছু দরজা থাকে যেগুলো বাইরে থেকে খুলতে যাওয়া উচিত নয়।

    তবে কিছুক্ষণ পর সে আবার বলল, “মারদেকার হাতে ওটা ……..!” কথাটা শেষ করল না।

    লারসেন তার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমিই দিয়েছি।”

    বাডের চোখে এবার চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “ওকে বিশ্বাস করছেন?”

    লারসেন পাল্টা প্রশ্ন করল, “তুমি করো না?”

    বাডের মুখে এবার সত্যিকারের হাসি ফুটল। “আমি ওকে অনেক দিন ধরেই বিশ্বাস করি।”

    লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য উষ্ণতা দেখা গেল।

    মারদেকা যখন প্রথম এই র‍্যাঞ্চে এসেছিল, তখন সে ছিল পাহাড় থেকে পালিয়ে আসা এক কিশোর। ক্ষুধা ছিল, ভয় ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল একরোখা জেদ। বাডই প্রথম তাকে র‍্যাঞ্চের কাজের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। ঘোড়ার পরিচর্যা, পানি তোলা, খড় সরানো, বেড়া মেরামত, জিন পরিষ্কার করা, ভোরে ওঠা, রাতের কাজ শেষ করে সরঞ্জাম গুছিয়ে রাখা, একটা র‍্যাঞ্চ কীভাবে মানুষের হাত আর ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, এসব মারদেকা প্রথম শিখেছিল বাডের কাছ থেকেই।

    বাড বলল, “আমি শুধু ভাবছিলাম, চাকতিটা ওর কাছে রাখা ঠিক হবে কি না।”

    লারসেন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তুমিও জানো, এটা সাধারণ জিনিস নয়।”

    বাড জানালার বাইরে তাকাল। প্রেইরির ওপর সকালের আলো তখন আরও উজ্জ্বল হয়েছে। সে ধীরে বলল, “আমি ওকে ভয় দেখাতে চাই না।”

    লারসেনের কণ্ঠ শান্ত রইল। “ওকে ভয় দেখানো আর সত্যিটা থেকে দূরে রাখা এক জিনিস নয়।”

    বাড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। তারপর বলল, “ছেলেটা এমনিতেই যা দেখে তার চেয়ে বেশি বুঝতে শুরু করেছে।”

    লারসেনের চোখে আবার সেই চিন্তার ছাপ ফুটে উঠল। “গত রাতে সে একজন লোকের হাঁটার ধরনও মনে রেখেছে।”

    বাড এবার সরাসরি তার দিকে তাকাল। “ও কথাটাই আমি আপনাকে বলতে এসেছিলাম।”

    লারসেন চুপ করে রইল।

    বাড বলল, “মারদেকা বলেছে, লোকগুলোর একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। আমি নিজে সেটা নিশ্চিত করে দেখিনি। রাতের আলো ভালো ছিল না। কিন্তু ছেলেটা বলছে, লোকটা ঘোড়ার দিকে যাওয়ার সময় বাঁ পায়ের ওপর পুরো চাপ দিচ্ছিল না।”

    লারসেনের চোখ সরু হয়ে এল। সে কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলল না। তারপর ধীরে বলল, “ওকে ডেকে আনো।”

    বাড দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে থেমে পেছন ফিরে তাকাল।
    “ও রাত থেকে ঘুমায়নি। বলেছিলাম একটু শুয়ে নিতে। শুনল না।”

    লারসেনের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। “কেন?”

    বাড হেসে বলল, “বলেছে, যারা এসেছিল তাদের একজনের হাঁটা ভুলে যেতে চায় না।”

    লারসেন কিছুক্ষণ বাডের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, “ওকে পাঠাও।”

    বাড বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর ঘরটা আবার নীরব হয়ে গেল।

    লারসেন টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, মারদেকাকে এখন শুধু আরও কিছু শেখানো দরকার। ছেলেটা দেখতে শিখছে। মানুষের আচরণ পড়তে শিখছে। কিন্তু চোখ যা দেখে, শরীর যদি তার সঙ্গে তাল না মেলায়, তবে বিপদের মুহূর্তে সেই জ্ঞান কোনো কাজে আসে না।

    কয়েক সপ্তাহ আগে সে মারদেকাকে বলেছিল, “আগামীকাল থেকে তোমার পা শিখবে।”
    সেই শিক্ষা এখনও শেষ হয়নি। আজ তার সঙ্গে আরও কিছু যোগ হবে।

    লারসেন টেবিল থেকে চাকতিটা তুলে নিল। ধাতব পৃষ্ঠে আঙুল বোলাল না। শুধু কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দিল। ছেলেটার হাতে এখন অন্য চাকতিটা আছে। আজ সেটাই যথেষ্ট। রহস্যের পুরো ভার এখনই তার কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই।

    কিছুক্ষণ পর বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। মারদেকা দরজার কাছে এসে দাঁড়াল। তার পেছনে বাড। ছেলেটার চোখে রাত জাগার ক্লান্তি থাকলেও মুখে সেই অদ্ভুত সতর্কতা এখনও আছে।

    লারসেন বাডের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি যাও। উত্তরের লোকগুলোকে বলে দাও, দুপুরের আগে কেউ সীমানা ছাড়বে না।”

    বাড মাথা নেড়ে বেরিয়ে যেতে লাগল। দরজার কাছে গিয়ে সে মারদেকার কাঁধে হাত রাখল। মুখে কঠিন ভাব এনে বলল, “ইলাই তোমাকে খাবার খেতে বলেছে। খালি পেটে কোনো প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না।”

    মারদেকা হেসে বলল, “আমি পরে খাব।”

    বাড ভুরু কুঁচকে তার দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল, “লারসেনকে যত খুশি প্রশ্ন করো, কিন্তু ইলাইকে অপেক্ষা করিয়ে রেখো না। ওটা আমার পক্ষে সামলানো কঠিন।”

    লারসেনের মুখেও ক্ষীণ হাসি ফুটল। বাড চলে গেল। মারদেকা ঘরে ঢুকে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

    লারসেন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “চাকতিটা কোথায়?”

    মারদেকা মাথা নেড়ে পকেট থেকে চাকতিটা বের করল। সকালের আলোয় কালচে ধাতব পৃষ্ঠে ক্ষীণ ঝিলিক দেখা গেল। সে চাকতিটা মুঠোর ওপর রেখে লারসেনের দিকে বাড়িয়ে ধরল।

    লারসেন সেটা হাতে নিল না। শুধু তাকিয়ে রইল।

    মারদেকা কিছুক্ষণ চাকতিটার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনি কি জানেন এটা কী?”

    লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “তুমি কী মনে করো?”

    মারদেকা একটু ভেবে বলল, “কোনো চিহ্ন।” আবার চাকতিটার দিকে তাকাল। “হয়তো কোনো লোককে চেনায়।”

    লারসেন কিছু বলল না।

    মারদেকা আরও কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “হয়তো পুরোনো কোনো ঘটনার সঙ্গে জড়িত।”

    লারসেনের চোখে সামান্য হাসি ফুটল। “এবার তুমি অনুমান করছ।”

    মারদেকা মাথা নিচু করল।

    লারসেন শান্ত গলায় বলল, “অনুমান করা খারাপ নয়। কিন্তু অনুমানকে সত্যি মনে করা বিপজ্জনক।”

    মারদেকা মাথা তুলল। “আপনি বলেছিলেন।”

    লারসেন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “আজ তোমার আরেকটা শিক্ষা হবে।”

    মারদেকার চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল। “কী শিক্ষা?”

    লারসেন কোনো উত্তর দিল না। শুধু দরজার দিকে এগিয়ে গেল।

    মারদেকা চাকতিটা আবার পকেটে রেখে তার পেছনে বেরিয়ে এল।

    বাড়ির পেছনে র‍্যাঞ্চের পুরোনো শেডের আড়ালে একটা ছোট খোলা জায়গা ছিল। একসময় সেখানে ঘোড়ার সরঞ্জাম রাখা হতো। এখন জায়গাটা প্রায় ব্যবহার হয় না। চারদিকে খসখসে কাঠের বেড়া। এক পাশে পড়ে আছে শুকনো গাছের মোটা গুঁড়ি। মাটির ওপর ছোট ছোট পাথর, শুকনো ঘাস আর পুরোনো খড়ের টুকরো ছড়িয়ে আছে। জায়গাটার ওপারে কোনো বাধা নেই। শুধু বিস্তৃত প্রেইরি।

    সকালের বাতাসে ঘাসের সমুদ্র ধীরে ধীরে দুলছে। দূরে পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো আরও নেমে এসেছে। কোথাও একটা বাজপাখি আকাশে চক্কর দিচ্ছে। তার ডানার নিচে আলো পড়ে এক মুহূর্তের জন্য সাদা ঝিলিক দেখা গেল। তারপর সে আবার উঁচুতে উঠে গেল।

    লারসেন মাঝখানে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। তারপর কোমরের পাশ থেকে একটা ছুরি বের করল।

    মারদেকার চোখ সঙ্গে সঙ্গে ছুরিটার দিকে চলে গেল। ছুরিটা বড় নয়। হাতলের কাঠ বহু ব্যবহারে মসৃণ হয়ে গেছে। ফলার একপাশে সকালের সূর্যের আলো পড়ে চিকচিক করছে। ধাতুর ওপর বয়সের ক্ষীণ দাগ আছে, কিন্তু ধার এখনও পরিষ্কার।

    মারদেকা বুঝে গেল। তার চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

    তার মুখের পরিবর্তন লারসেনের চোখ এড়াল না। বলল, “আজ থেকে তুমি ছুরি নিক্ষেপ শেখা শুরু করবে।”

    কথাটা শুনে মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল। যেন সে নিজের কানে শোনা কথাটা বিশ্বাস করতে চাইছে, কিন্তু পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।

    লারসেন এবার তার দিকে তাকিয়ে বলল, “তবে মনে রেখো, এটা খেলা নয়।”

    মারদেকার মুখের আনন্দ একটু থেমে গেল। সে গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে দাঁড়াল।

    লারসেন গাছের গুঁড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। পুরোনো কাঠের গায়ে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দাগ। কোথাও কুঠারের আঘাত, কোথাও কাঠের ফাটল, কোথাও পুরোনো ছুরির সরু চিহ্ন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের রং মলিন হয়ে গেছে, কিন্তু প্রতিটি দাগ এখনও নিজের গল্প বহন করছে।

    লারসেন একটা নির্দিষ্ট জায়গার দিকে ইঙ্গিত করল। “ওখানে তাকাও।”

    মারদেকা তাকাল।

    “কী দেখছ?”

    “অনেক দাগ।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “কোনটা নতুন?”

    মারদেকা চোখ সরু করল। বাতাসে শুকনো ঘাসের ডগা দুলছে। তার মাঝেও ছেলেটার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে মাঝামাঝি একটা সরু দাগ দেখিয়ে বলল, “ওটা।”

    লারসেন সন্তুষ্ট হলো। “ভালো। তোমার চোখ এখনও কাজ করছে।”

    তারপর সে মারদেকাকে কয়েক পা দূরে নিয়ে গেল। “এখানে দাঁড়াও।”

    মারদেকা দাঁড়াল। লারসেন তার পায়ের দিকে তাকাল। কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা তার চোখে অভ্যাস হয়ে গেছে। দুই পা পাশাপাশি নয়। শরীরের ভার একদিকে জমিয়ে নয়। মাটির ওপর এমনভাবে দাঁড়াতে হবে যেন হঠাৎ নড়তে হলেও ভারসাম্য হারিয়ে না যায়।

    মারদেকা নিজের পায়ের অবস্থান ঠিক করল। লারসেন বলল, “গত কয়েক সপ্তাহে আমরা যে জিনিসটা শিখেছি, আজ সেটাই কাজে লাগবে।”

    মারদেকা বুঝল। “পায়ের ভারসাম্য?”

    “হ্যাঁ।”

    লারসেন ছুরিটা তার হাতে দিল। “ধরো।”

    মারদেকা সাবধানে ছুরিটা ধরল। লারসেন তার আঙুলের অবস্থান দেখল। তারপর বলল, “স্বাভাবিকভাবে ধরো। শক্ত করে নয়।”

    মারদেকা হাতের চাপ কমাল।

    লারসেন বলল, “এখন ছুরিটাকে অস্ত্র হিসেবে ভাববে না। ওজন হিসেবে অনুভব করো।”

    মারদেকা ছুরিটার দিকে তাকাল। হাতের তালুতে ধাতুর ঠান্ডা অনুভূত হলো। কিছুক্ষণ পর বলল, “ভারটা সামনে।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ঠিক।”

    সে ছুরিটা আবার নিজের হাতে নিল। “আজ তুমি শুধু একটা জিনিস শিখবে। হাত, চোখ আর শরীর যেন একই মুহূর্তে একই কাজে থাকে।”

    মারদেকা মন দিয়ে শুনল।

    লারসেন নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়াল। কয়েক মুহূর্ত সে নড়ল না। বাতাস তার জামার প্রান্ত সামান্য দুলিয়ে দিচ্ছে। দূরের ঘাসের ওপর সূর্যের আলো নড়ছে। অথচ লারসেন যেন সবকিছুর বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তার পা মাটিতে স্থির। দৃষ্টি গাছের গুঁড়ির একটি নির্দিষ্ট জায়গায়। তারপর হঠাৎ তার হাত এগিয়ে গেল। ছুরিটা বাতাস কেটে গিয়ে গাছের গুঁড়িতে গিয়ে ঠুকে বসে রইল।

    মারদেকার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। সে প্রায় এগিয়ে যাচ্ছিল।

    লারসেন শান্ত গলায় বলল, “থামো।”

    মারদেকা থেমে গেল।

    লারসেন ছুরিটার দিকে তাকিয়ে বলল, “প্রথম শিক্ষা?”

    মারদেকা কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “তাড়াহুড়ো করা যাবে না।”

    লারসেন মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। “আগে দাঁড়াতে হবে। তারপর লক্ষ্য দেখতে হবে।”

    মারদেকার হাতে এবার ছুরিটা উঠল। উত্তেজনা তার চোখে স্পষ্ট।

    লারসেন সেটা বুঝতে পারল। “নিজেকে শান্ত করো।”

    মারদেকা গভীর শ্বাস নিল। তারপর নিজের জায়গায় দাঁড়াল। গাছের গুঁড়ির দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। তারপর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। কাঠের গুঁড়িতে লাগল না। মাটির পাশে গিয়ে পড়ল। মারদেকার মুখে হতাশা নেমে এল।

    লারসেন ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “ভালো।”

    মারদেকা অবাক হয়ে তাকাল।

    লারসেন বলল, “এখন তুমি জানলে, শুধু ইচ্ছা করলেই হয় না।”

    মারদেকা মাটিতে পড়ে থাকা ছুরিটার দিকে তাকাল। সে সেটা তুলে নিল।

    দ্বিতীয়বারও লক্ষ্যভেদ হলো না। তৃতীয়বার ছুরিটা গুঁড়ির কিনারায় গিয়ে লাগল, কিন্তু কাঠে আটকে থাকার আগেই নিচে পড়ে গেল। মারদেকার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।

    লারসেন তার মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, রাগ হচ্ছে। “রাগ করছ?”

    মারদেকা মাথা নেড়ে বলল, “না।”

    লারসেনের কণ্ঠে কঠোরতা এল। “করছ।”

    মারদেকা এবার চুপ করে গেল।

    লারসেন তার কাছে এসে দাঁড়াল। সকালের আলোয় দুজনের ছায়া শুকনো মাটির ওপর লম্বা হয়ে পড়ে আছে। “এই রাগটাই কিন্তু তোমার সবচেয়ে বড় শত্রু হতে পারে।”

    মারদেকা নিচু গলায় বলল, “আমি পারব।”

    লারসেন বলল, “পারবে। কিন্তু পারার আগে ব্যর্থ হতে হবে।”

    কিছুক্ষণ পরে মারদেকা আবার ছুরিটা হাতে নিল। লারসেন এবার তাকে থামিয়ে দিল।
    “চোখ বন্ধ করো।”

    মারদেকা অবাক হলেও চোখ বন্ধ করল। চারপাশের শব্দ তখন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। দূরে ঘোড়ার নড়াচড়া, কাঠের কোথাও হালকা কড়কড় শব্দ, বাতাসে ঘাসের ঘর্ষণ, আর অনেক দূরে কোনো পাখির ডাক।

    লারসেন বলল, “পায়ের নিচের মাটি অনুভব করো।”

    মারদেকা স্থির রইল।

    “এখন চোখ খোলো।”

    সে চোখ খুলল।

    “এবার কাঠের গুঁড়িটা দেখো না,” লারসেন বলল। “একটা নির্দিষ্ট জায়গা দেখো।”

    মারদেকা গাছের গুঁড়ির ওপর ছোট একটা দাগ বেছে নিল। তার দৃষ্টি সেখানে স্থির হলো। কিছুক্ষণ পর ছুরিটা তার হাত থেকে বেরিয়ে গেল। এবার ছুরিটা গুঁড়ির মাঝামাঝি গিয়ে আঘাত করল। কাঠের ভেতর ছুরিটা কেঁপে উঠল।

    মারদেকা কয়েক মুহূর্ত নড়ল না। তারপর মুখে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল।

    লারসেনও সামান্য হাসল। “এইবার হয়েছে।”

    মারদেকার চোখে আনন্দ জ্বলে উঠল। “আমি পেরেছি!”

    লারসেন বলল, “একবার সফল হওয়া মানে শেখা শেষ নয়।”

    মারদেকার হাসি একটু কমে গেল। সে মাথা নেড়ে আবার ছুরির দিকে এগোল।

    তারপর আরও কয়েকবার চেষ্টা হলো। কখনও ছুরি কাঠে লাগল, কখনও পাশে গিয়ে পড়ল, কখনও গুঁড়ির ওপর আঘাত করে মাটিতে গড়িয়ে গেল। সূর্য ধীরে ধীরে আরও ওপরে উঠতে লাগল। সকালের ঠান্ডা একটু একটু করে কমে এল। শুকনো ঘাসের ওপর শিশির শুকিয়ে গেল। দূরের পাহাড়ের ছায়া সরে গিয়ে আরও বেশি জায়গা সোনালি আলোয় ভরে উঠল।

    মারদেকার কপালে ঘাম জমল।

    লারসেন তাকে থামাল। “আজ যথেষ্ট।”

    মারদেকা ক্লান্ত গলায় বলল, “আরেকবার।”

    লারসেন মাথা নেড়ে না বলল। “শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে শেখার ওপর জোর করা উচিত নয়।”

    মারদেকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও ছুরিটা ফিরিয়ে দিল।

    লারসেন সেটা কোমরের পাশে গুঁজে নিল।

    কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।

    গাছের গুঁড়িতে নতুন দাগগুলো সকালের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পুরোনো দাগের ভিড়ে তারাও এখন নতুন হয়ে উঠেছে। খুব বড় নয়, খুব গভীরও নয়। কিন্তু মারদেকা জানে, এগুলো তার নিজের হাতের তৈরি।

    লারসেন গাছটার দিকে তাকিয়ে বলল, “আজ তুমি একটা জিনিস বুঝলে।”

    মারদেকা তার দিকে তাকাল।

    “ছুরি নিক্ষেপের আসল লড়াই লক্ষ্য আর ছুরির মধ্যে নয়।”

    দূরে তখন বাডের গলা শোনা গেল। র‍্যাঞ্চের লোকজনকে সে কোনো নির্দেশ দিচ্ছে। তারপর ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি উঠল। একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ এল। র‍্যাঞ্চ আবার দিনের কাজে ঢুকে পড়েছে।

    লারসেন হাঁটতে শুরু করল।

    মারদেকা তার পাশে এসে হাঁটল।

    কয়েক পা এগিয়ে লারসেন হঠাৎ থেমে গেল। মাটির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “এখানে কী দেখছ?”

    মারদেকা নিচু হলো। শুকনো মাটিতে মানুষের পুরোনো বুটের দাগ। তার পাশে ঘোড়ার খুরের চাপ। কয়েকটি ঘাস মাটির দিকে বাঁকা হয়ে আছে। বাতাসে কিছু দাগ ইতিমধ্যে ঝাপসা হয়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করে বলল, “কেউ এখানে দাঁড়িয়েছিল।”

    লারসেন জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ?”

    মারদেকা আবার দাগগুলোর দিকে তাকাল। তারপর মাথা তুলল। “জানি না।”

    লারসেনের চোখে সন্তুষ্টির ক্ষীণ ছাপ ফুটে উঠল। “এই উত্তরটাই চাই। যেটা জানো না, সেটা জানি না বলতে পারা বড় শিক্ষা।”

    মারদেকা মাথা নেড়ে আবার তার পাশে হাঁটতে লাগল। র‍্যাঞ্চের দিকে ফিরতে ফিরতে সে পকেটের ভেতর হাত ঢোকাল। আঙুলের ডগায় ঠান্ডা ধাতব চাকতিটা অনুভব করল। গত রাতের রহস্য এখনও তার সামনে অন্ধকার।

    অচেনা লোকগুলো কারা, কেন তারা এসেছিল, কেন তাদের একজন সেই চাকতি রেখে গেল, লারসেন তার সম্পর্কে কতটা জানে, এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও নেই।

    কিন্তু আজ সকালে সে অন্য কিছু শিখেছে। অন্ধকারের মধ্যে শুধু সাহস নিয়ে হাঁটা যায় না। চোখ খোলা রাখতে হয়। অপেক্ষা করতে হয়। নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আর সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে নিজের ভেতরের ভয় ও রাগকে নিজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে দেওয়া যায় না।

    সামনে লারসেন হাঁটছিল। তার কোমরের পাশে ছুরিটা নীরবে দুলছিল। সকালের আলোয় তার ধাতব ফলায় মাঝেমধ্যে সূর্যের ক্ষীণ ঝিলিক দেখা যাচ্ছিল। পেছনে পড়ে রইল পুরোনো গাছের গুঁড়িটা। তার গায়ে এখন মারদেকার হাতে তৈরি কয়েকটি নতুন দাগ। ছোট দাগ। অগভীর দাগ। কিন্তু নিজের হাতে তৈরি।

    মারদেকা আরেকবার পকেটের ভেতর চাকতিটা স্পর্শ করল। তারপর চোখ তুলে সামনে তাকাল।

    র‍্যাঞ্চের বাড়ি ধীরে ধীরে কাছে আসছে। উঠোনে লোকজনের চলাফেরা। ঘোড়ার শব্দ। কাঠের চাকার কড়কড়। রান্নাঘরের দিক থেকে ভেসে আসছে সকালের খাবারের গন্ধ।
    জীবন যেন আবার স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। কিন্তু লারসেন জানে, এই স্বাভাবিকতা স্থায়ী নয়।

    প্রেইরির ওপারে কোথাও যারা রাতের অন্ধকারে এসেছিল, তারা হয়তো এখনও তাকিয়ে আছে। হয়তো তারা দূর থেকে র‍্যাঞ্চের গতিবিধি দেখছে। হয়তো তারা অপেক্ষা করছে পরবর্তী সুযোগের জন্য। আর তাদের একজন বাঁ পায়ে সামান্য খুঁড়িয়ে হাঁটে। এই ছোট্ট তথ্যটাই এখন লারসেনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।

    সে জানে, মানুষের মুখ মনে রাখা কঠিন। কিন্তু হাঁটার ভঙ্গি বদলানো আরও কঠিন।
    মারদেকা সেটা লক্ষ্য করেছে। এই কারণেই ছেলেটাকে আরও শেখানো দরকার।

    শুধু ছুরি নয়। শুধু চোখ নয়। মানুষকে পড়তে হবে। মাটিকে পড়তে হবে। বাতাসকে পড়তে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের ভেতরটাকেও পড়তে হবে।

    র‍্যাঞ্চের উঠোনে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। দূরের প্রেইরি তখন পুরোপুরি সূর্যের আলোয় ভেসে গেছে। রাতের অন্ধকারের কোনো চিহ্ন সেখানে নেই। শুধু ঘাসের ঢেউ আর তার ওপরে নীল আকাশ। তবু লারসেনের চোখে সেই প্রেইরি শান্ত মনে হলো না।

    বাড়িতে ঢোকার আগে লারসেন একবার পেছনে তাকাল। তার চোখ প্রথমে শেডের দিকে গেল। তারপর উত্তরের বেড়া। তারপর পশ্চিমের খোলা জমি। এরপর দূরের পাহাড়। ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। মারদেকা তার পেছনে।

    ঘরের ভেতর এখন আর সকালের সেই ঠান্ডা নেই। জানালা দিয়ে সূর্যের আলো ঢুকে মেঝের একটা বড় অংশ উজ্জ্বল করে তুলেছে। টেবিলের ওপর আগের মতোই এলি ব্রুকসের চিঠি পড়ে আছে। পাশে পুরোনো চামড়ার টুকরো। তার পাশে কালচে ধাতব চাকতিটা।

    লারসেন চেয়ার টেনে বসল। কিন্তু বসেও বিশ্রাম নিল না। তার চোখ চাকতিটার ওপর গিয়ে স্থির হলো। হাত বাড়িয়ে টেবিলের চাকতিটা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে দেখল। ধাতব পৃষ্ঠে সময়ের ক্ষত আছে। কোথাও ক্ষীণ আঁচড়, কোথাও কালচে জমাট দাগ। মাঝখানের চিহ্নটা এত পুরোনো যে তার রেখাগুলো প্রায় মসৃণ হয়ে এসেছে। তবু লারসেনের চোখে সেটার প্রতিটি বাঁক এখনও পরিষ্কার।

    বহু বছর আগে সে এই চিহ্ন দেখেছিল। খুব কাছ থেকে। এমন এক সময়, যখন সে এখনও লারসেন হয়ে ওঠেনি। সেই স্মৃতিটা হঠাৎ তার মনে উঠল, কিন্তু সে সঙ্গে সঙ্গে সেটাকে সরিয়ে দিল। এখন অতীতে ফিরে যাওয়ার সময় নয়। বর্তমানই যথেষ্ট বিপজ্জনক।

    সে চিঠিটা আবার হাতে নিল। এলি ব্রুকসের লেখা কয়েকটি লাইন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। তিনটি জায়গা। তিনটি চিহ্ন। আর মাঝখানে তার র‍্যাঞ্চ।

    এতদিন সে ভেবেছিল, হয়তো জমির কোনো পুরোনো মালিকানা নিয়ে ব্যাপারটা। হয়তো পুরোনো কোনো দলিল, কোনো গোপন জমি, কোনো খনিজ সম্পদ। কিন্তু গত রাতের লোকগুলো সেই ধারণাকে দুর্বল করে দিয়েছে।

    যদি শুধু জমির জন্য তারা আসত, তবে এতটা সাবধানে আসার প্রয়োজন ছিল না। তারা গুলি চালিয়েছে।

    কিন্তু র‍্যাঞ্চে ঢোকার পর যতটা সময় পেয়েছিল, তার মধ্যে কেউ লুটপাট করেনি। একটা ঘোড়াই শুধু নিয়েছে। সেটারও যুৎসই কোন কারণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।তবে আর কিছু নেওয়ার চেষ্টা করেনি। খাবার বা অস্ত্র চুরি করেনি। তারা যেন শুধু কিছু খুঁজছিল। আর সেই কিছুটা কী?

    লারসেনের চোখ মারদেকার ওপর গিয়ে থামল। তার কাছে থাকা দ্বিতীয় চাকতিটা যেন অদৃশ্যভাবে এই প্রশ্নের উত্তর বহন করছে।

    মারদেকা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে টেবিলের সামনে দাঁড়াল। “ওরা কি এইটার জন্য এসেছিল?” সে জিজ্ঞেস করল।

    লারসেন চাকতিটা নামিয়ে রাখল। “হতে পারে।”

    “কিন্তু, প্রথমটা তো সে ফেলে গিয়েছিল।”

    লারসেন এবার তার দিকে তাকাল। “হতে পারে দুটো এক জিনিস নয়।”

    মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। সে আর প্রশ্ন করল না।

    এই ছেলেটার একটা পরিবর্তন লারসেন লক্ষ করল। কয়েক মাস আগে হলে মারদেকা পরপর প্রশ্ন করত। এখন সে অপেক্ষা করতে শিখছে। উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত চুপ থাকতে পারছে। গত কয়েক সপ্তাহের শিক্ষা হয়তো সত্যিই তার ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছে।

    লারসেন জানালার দিকে তাকাল। বাইরে বাড এখন শেডের পাশে দাঁড়িয়ে। তার সঙ্গে ক্লে মরগান কথা বলছে। দুজনের মুখের ভঙ্গি দেখে বোঝা যায়, তারা কোনো সাধারণ র‍্যাঞ্চের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করছে না।

    কিছুক্ষণ পর বাড দরজায় এসে দাঁড়াল। “লারসেন।”

    লারসেন মাথা তুলল।

    বাড ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করল। তার হাতে একটা ছোট কাপড়ের টুকরো। মুখে আগের চেয়ে বেশি গম্ভীর ভাব। সে টেবিলের ওপর কাপড়টা রাখল। “পশ্চিমের বেড়ার কাছে পেয়েছি।”

    লারসেন কাপড়টা তুলে নিল। আঙুলের মধ্যে ঘষে দেখল। সেটা মাটির রঙে মলিন হয়ে গেছে। একটা প্রান্ত ছেঁড়া। কাপড়ের ওপর শুকনো কাদার দাগ।

    বাড বলল, “আর পেয়েছি কতগুলো ঘোড়ার খুরের দাগ।”

    লারসেন চোখ তুলল। “কয়টা?”

    “দুটো ঘোড়া। একজনের ঘোড়া ভারী ছিল। অন্যটার খুর ছোট।”

    লারসেন কাপড়টা নামিয়ে রাখল। তার চোখে চিন্তার ছাপ ঘন হলো।

    “ওরা কি দুজন ছিল?”

    বাড মাথা নেড়ে বলল, “নিশ্চিত নই। তবে দাগ দুটো আলাদা।” একটু ইতস্তত করে বলল, “মারদেকা যে লোকটার কথা বলেছিল, তার মতো একটা পায়ের দাগও আছে।”

    ঘরের বাতাস যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। মারদেকা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কথাটা শুনে তার চোখ বাডের দিকে উঠল।

    বাড কাপড়টা আবার তুলে দেখাল। “ডান পায়ের ছাপ গভীর। বাঁ পায়েরটা তুলনায় হালকা। মনে হচ্ছে লোকটা বাঁ পায়ে পুরো ভর দিচ্ছিল না।”

    লারসেন উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এবার আগের সেই স্থিরতা নেই। তার জায়গায় এসেছে ঠান্ডা মনোযোগ। সে জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। পশ্চিম দিকের প্রেইরি সকালের আলোয় চকচক করছে। ঘাসের ঢেউয়ের মধ্যে কোথাও কোনো মানুষ নেই। কোনো ঘোড়া নেই। শুধু দূরে কয়েকটা কালো বিন্দু, হয়তো গরু।

    মারদেকা তখনও জানালার দিকে তাকিয়ে।

    লারসেন তার দিকে ফিরে বলল, “তুমি যে লোকটার হাঁটার কথা বলেছিলে, সেটা আবার মনে করার চেষ্টা করো।”

    মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। বরং জানালার বাইরে তাকিয়েই স্মৃতিটা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করল। রাতের অন্ধকার। ঘোড়ার ছায়া। মানুষের দৌড়।

    তারপর একজন একটু ধীরে হাঁটছে। বাঁ পা। সে ধীরে বলল, “লোকটা পুরোপুরি খুঁড়িয়ে হাঁটছিল না।”

    লারসেন অপেক্ষা করল।

    “শুধু বাঁ পায়ে চাপ কম ছিল। যেন ব্যথা ছিল।”

    “আর কিছু?”

    মারদেকা কপাল কুঁচকাল। “সে ঘোড়ার কাছে যাওয়ার আগে একবার থেমেছিল।”

    “কেন?”

    “জানি না।”

    লারসেন মাথা নেড়ে বলল, “ভালো। জানো না বলেছ।”

    মারদেকা এবার তার দিকে তাকাল।

    লারসেনের মুখে সামান্য প্রশান্তি দেখা গেল।

    এই ছেলেটাকে তাড়াহুড়ো করে বড় করে তোলা যাবে না। সে এখনও শিশু। কিন্তু তার চোখের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। সেই চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

    টেবিলের ওপর রাখা চাকতিটার দিকে তার দৃষ্টি আবার গেল। হয়তো এই ছোট ধাতব টুকরোটাই সেই পুরোনো দরজার চাবি, যার অস্তিত্ব এতদিন সে ভুলে থাকতে চেয়েছিল।
    (চলবে)

    4
    3 Comments
    • দীর্ঘ এই শব্দের মিছিলে মন হারালেও, ভাবনার গভীরতা চমৎকার। এই আঙিনায় আপনার অক্ষরের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিনিয়ত। অন্তহীন শুভেচ্ছা!

    • ‘যেটা জানো না, সেটা জানি না বলতে পারা বড় শিক্ষা’—লারসেনের এই উপদেশটি অত্যন্ত গভীর! অজ্ঞতা স্বীকার করাই জ্ঞানের প্রথম ধাপ!

    • মঞ্চে আপনার এই উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ! আমাদের এই গ্রুপে অনেক সুন্দর সুন্দর লেখা আসছে, আপনিও অন্যদের লেখায় একটু সময় নিয়ে লাইক আর কমেন্ট করলে সবার সাথে বেশ ভালো একটা আড্ডা জমে উঠবে।

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar