-
“কে কি বলেছে তোমায়?”
আবরারকে অমন রেগে থাকতে দেখে ঘাবড়ে যায় ইন্তিহা। লোকটা কি জানে কিছু? ওর থেকে কোন প্রতিউত্তর না পেয়ে আবরার রান্নাঘরের দিকে যেতে নিলে তড়িঘড়ি গিয়ে থামায় লোকটাকে। অযথা বিষয়টা বাড়তে দেয়া যায় না।
“আপনি রুমে আসুন, কিছু হয়নি।”
“কিছু না হলে কান্না কেন করছিলে তুমি? আমি বেঁচে থাকতে এই বাড়িতে কেউ তোমাকে অসম্মান করে কথা বলবে, তুমি কান্না করবে আর আমি বসে বসে দেখবো সেসব? ছাড়ো আমাকে, দেখতে দাও।”
আবরারের এমন প্রতিক্রিয়ায় এবার সত্যিই ভয় পেয়ে যায় মেয়েটা। শাশুড়ি তো ওর পক্ষ নিয়ে বললোই যা বলার। এখন যদি আবার আবরার যায়, ব্যাপারটা বেশি বেশি হয়ে যাবে। কোনোমতে লোকটাকে শান্ত করে, ফিরিয়ে রুমে নিয়ে আসলো সে।এই মুহূর্তে এর বেশি কিছু হতে দেয়া যায় না।
দেখতে দেখতে পেরিয়ে যায় অনেকগুলো দিন।শ্বশুরবাড়িতে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে শেখে ইন্তিহা। কখনোবা কিছু মানুষের আঘাত করে বলা কথায় চোখ ভরে উঠে কান্নায়, লুকিয়ে মুখ চেপে কাঁদেও। তবে আবরারের ছোট ছোট যত্নে,শাশুড়ির আদরে আর ছোট জায়ের বোনের মতো ভালবাসায় ভুলে যায় সেসব। এতো মানুষের ভালোবাসা পেয়েও যদি মন খারাপ করে থাকে, অকৃতজ্ঞতা হয়ে যাবে না?
একদিন রাতে প্রচণ্ড মাথাব্যথা থাকায় খাবার খেতে চায় না ইন্তিহা।তবুও জোর করে দু লোকমা খাইয়ে দেয় আবরার।খাওয়া দাওয়ার ব্যাপারে একচুল ছাড় দিতে চায় না ছেলেটা।এক বেলা না খেয়ে থেকে পার পাওয়া যায় না এখন আর।এ নিয়ে অবশ্য বেজায় বিরক্ত সে।
ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই হাত পা সহ পুরো শরীর কাঁপিয়ে জ্বর আসে।কাঁথা মুড়িয়ে আরো খানিকটা জড়সড় হয়ে শুয়ে থাকে সে। এরমধ্যেই রুমে আসে আবরার। ওকে অমন করতে দেখে ভ্রু কুচকে এগিয়ে যায় ওর দিকে। সন্দেহবশত কপালে হাত রেখে দেখে প্রচণ্ড জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। অস্থির হয়ে উঠে ছেলেটা। ড্রয়ার থেকে কম্বল বের করে মুড়িয়ে দেয় আগে।বালতি ভর্তি করে পানি এনে মাথায় ঢালতে থাকে অনবরত। ভাগ্যিস তখন মাথা ব্যথার কথা শুনে ঔষধ খাইয়ে দিয়েছিল জোর করে। স্বাভাবিক হুশে নেই মেয়েটা। প্রায় আধঘণ্টা পর জ্বরটা খানিক ছেড়ে আসলে চোখ খুলে মেয়েটা।খুব লাল হয়ে আছে চোখ দুটো তার। জ্বরের ঘোরে হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দেয় লোকটার গাল। একেবারেই যে সেন্স নেই তার, এমনও নয়। তবে এর আগে কখনো রাতের বেলায় জ্বরের ঘোরে কাউকে পাশে পায়নি তো সেভাবে, আবরারকে আজ খুব আপন ,কাছের মনে হচ্ছে, খুব।নিজের মায়ের থেকেও বেশি কিনা জানা নেই, তবে এর আগে কখনো কাউকে এতোটা দরদ নিয়ে, আপন করে ভাবা হয়নি। চোখ বুজে আলতো হাসে মেয়েটা। কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া একফোঁটা প্রাপ্তির অশ্রু আজ সাক্ষী দেয় লোকটার প্রচণ্ড যত্নের, মায়ার।আবরার কিছু বলে না তেমন।আগের পানিটুকু পাল্টে এনে পুনরায় ঢালতে থাকে প্রেয়সীর কপাল জুড়ে।
–
–
–“এসব কি এনেছেন আপনি?”
ইন্তিহার ছোট জা, খাদিজার প্রশ্নে হাবিব সাহেব, উনার স্বামী স্বভাবসুলভ বিরক্তমাখা কণ্ঠে বলে উঠেন,
“ সবকিছুতে এতো কৈফিয়ত কেনো দিতে হবে তোমাকে?আর দরজার সামনে থেকে সরে দাড়াও, ভেতরে যাবো আমি। আসতে না আসতেই শুরু হয়ে গেছে জেরা করা!”
স্বামীর অমন তিরস্কারমুলক কথাবার্তায় অভ্যস্ত তিনি। গায়ে লাগে না এখন আর।হাবিব সাহেব তার হাতে থাকা বড় ব্যাগটা এনে রাখলেন সোফার উপর। ডাকলেন মা সহ সবাইকে।একে একে সবাই এলেও আসে নি ইন্তিহা। না আসারই কথা। আবরার বেরুতে নিচ্ছিলো মাত্রই। ভাইয়ের ডাকে এসে দাঁড়ায় ড্রয়িংরুমে। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে এসে বসে সোফায়।
“কি এনেছিস এসব?”
মায়ের কথায় মাথা নেড়ে ব্যাগ খুলেন তিনি। বিভিন্ন পদের মিষ্টি, চমচম, আইসক্রিম দিয়ে ভর্তি। হাতের কাছে যা যা পেয়েছেন সব কিনে নিয়েছেন যেন।
“এতো কিছু কার জন্য এনেছিস?আর টাকা পেয়েছিস কোথায় এতোগুলো?”
অবাক হন আসমা বেগম সহ বাকিরাও। যেখানে মাত্র কিছুদিন আগেই ব্যবসার এতো বড় লোকসান হলো, সেখানে আজ ব্যাগ ভরে এতোসব জিনিস কিনে আনা কি আশ্চর্যের না?তবে খাদিজা বেগম অবাক হলেন না বিন্দুমাত্র। তিনি বুঝে গেছেন স্বামী তার টাকা কোথায় পেয়েছে। রাগে কান্না চলে আসে উনার। সেখানে আর এক মুহূর্ত দাড়িয়ে থাকেন না, সোজা চলে যান রান্নাঘরের দিকে।
“ভাইয়া, তুমি কি আবার লোণ নিয়েছো ব্যাংক থেকে?’
অবাকের রেশ দেখা যাচ্ছে আবরারের চোখে মুখেও।মাত্র কয়েক বছর আগেই এই লোণ নিয়ে সময়মতো দিতে না পারায় কি এক ঝড় গেছে পুরো পরিবারের উপর। হাবিব সাহেবের ভুলের মাসুল গুনতে হয়েছিলো সব ভাইকে। শেষে গ্রামের বাড়িটা বিক্রি করে শোধ করতে হয়েছিলো সেই ঋণ।বাবার কাছে কসম কেটে বলেছিল, আর কখনো যাবে না লোণের কাছে। অথচ বাবার মৃত্যুর কয়েক বছর না ঘুরতেই সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি!
“তুই কি মানুষ হবি না আর? আবরারের কথা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তুই মা ডাকবি না আমাকে কখনো। মৃত বাবার শেষ কথাটুকুও রাখতে পারে না যেই ছেলে, তার মুখে মা ডাক শুনতে চাই না।”
“আরে মা, এতো রাগ কেন করছেন? এবার একদম সময়মতো দিয়ে দিবো সব। ব্যাবসাও বাড়িয়েছি এবার।”
“ব্যাবসা বাড়িয়েছিস মানে?কবে তুলেছিস টাকা?এর মধ্যে এতকিছু করা হয়ে গেছে?”
মায়ের অবাকতায়ও নির্লিপ্ত থাকেন তিনি, যেন কোন ভুলই করেননি! ব্যাংক লোণ নিতান্তই তুচ্ছ একটা বিষয় তার কাছে।আবরার উঠে চলে যায় বাইরে। এসব দেখে আর ভালো লাগে না তার। যত চেষ্টা করে সুদ থেকে দূরে সরতে, ততই যেন পরিবারটা জড়িয়ে যায় সেদিকে।পাপের ডালপালা যে এতো সহজে ছাড়ার না।
–
–
–বিকেলে আজ তারাতারি ফিরে আসে আবরার। কাল সারারাত মাথায় পানি দেয়ায় সকালের দিকে জ্বরটা ছেড়েছে ইন্তিহার। গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকায় ওর এমন অবস্থায়ই চলে যেতে হয়েছে অফিসে।অবশ্য নিজের মা’কে ডেকে বলে গিয়েছে সে যাওয়ার আগে।
“জ্বরটা এসেছিল আর?”
ইন্তিহার কপালে হাতের উল্টোপীঠ রেখে প্রশ্ন করে আবরার।সাথে সাথে দুচোখ বন্ধ করে ফেলে মেয়েটা। মাথা নেড়ে না বোঝায়। আবরার ভ্রু কুচকে কিছুক্ষন চেয়ে থাকে ওর দিকে। তারপর কপাল থেকে হাত সরিয়ে প্রশ্ন করে ফের,
“খেয়েছো কিছু?”
“হ্যাঁ।”
“ঔষধ ?”
“দুপুরে খেয়েছিলাম।”
“মাথাব্যথা করছে?”
“একটু!”
ড্রয়ার থেকে ছোট্ট একটা ঔষধের শিশি বের করে সে। ইন্তিহাকে বসিয়ে, ওর কপালের উপরের দিকটায় আলতো হাতে দিয়ে দেয় ঔষধটুকু। ভালোলাগার আবেশে চোখ বুজে আসে মেয়েটার। আচ্ছা, লোকটা কি জাদু জানে? নইলে, সে আশেপাশে থাকলেই এতো সুখ সুখ লাগে কেন? সবকিছুতে এতো ভালোলাগা কাজ করে কেন?লোকটা যতই ঠোঁটকাটা কথা বলুক না কেন, চিরকুটে অনুভবের মেঘ ভাসাক না কেন, চার অক্ষরের ‘ভালোবাসি’ কথাটি বলেনি একবারো। তবে তার প্রতিটা কথায়, কাজে প্রচণ্ড ভালোবাসা খুজে পায় মেয়েটা।
“আইসক্রিম খেয়েছিলে ?”
“না!”
অবাক হয় আবরার। যে মেয়ে কিনা আইসক্রিম দেখলে লোভ সামলাতে পারে না, আবরারের সাথে রাগ করেও জিততে পারে না আইসক্রিম দেখলে, সে কিনা ফ্রিজভর্তি আইসক্রিম থাকা সত্ত্বেও খাবে না, এটাও বিশ্বাস করতে হবে! সন্দেহের চোখে পুনরায় প্রশ্ন করে সে।
“সত্যিই খাওনি?”
“না।”
“কেন? জ্বর দেখে?”
“না!”
“তাহলে?”
চুপ থাকে ইন্তিহা। বলতে পারে না, সুদের টাকায় কেনা খাবার কিভাবে খাবো আমি? এই খাবার তো হারাম টাকায় কেনা! আপনিও তো খাবেন না। ওর চুপ থাকা দেখে আর প্রশ্ন করে না আবরার। হয়তো বুঝতে পেরেছে, নয়তো না।তবু মেয়েটাকে মাথাব্যথার মধ্যে বারবার প্রশ্ন করে বিরক্ত করতে চায় না সে।
রাতে জোর করে কয়েক লোকমা খাবার খাইয়ে ঔষধ খাইয়ে দেয় ওকে। এমনিতেও তো খেতে চায় না তেমন, এখন তো আরো অসুস্থতার বাহানা পেয়েছে। মাঝে মাঝে দুঃখে কপাল চাপড়ায় ছেলেটা।যেখানে বউ তার আদর যত্ন করে খাইয়ে দিবে, সেখানে কিনা ছোট্ট বাচ্চার মতো জোর করে করে খাওয়াতে হয় বউকেই। এতো দুঃখ কই রাখবে ছেলেটা! যদিও ওর অমন দুঃখ আসল নাকি অভিনয়, তা বলা যায় না!
বারান্দায় ইন্তিহাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে এগিয়ে যায় সেদিকে। এই বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর একটা জিনিস হচ্ছে বারান্দাগুলো। অনেক বড় বড় আর প্রতিটা বারান্দায় ফুলের টব রাখা।গত সপ্তায় এই রুমের বারান্দার জন্য একটা দোলনা এনেছে আবরার। দুইজন বসা যায়।“কি হয়েছে? মন খারাপ? এতো চুপচাপ যে?”
আবরারের উপস্থিতি টের পেয়ে ওর জন্য জায়গা করে দেয় পাশে।নিঃশব্দে বসে সেথায় ছেলেটা। মাথা ঘুরিয়ে তাকায় ইন্তিহা। চোখাচোখি হলেও চোখ নামায় না এখন আর।
“আপনি এতো ভালো কেন?”
এমন প্রশ্ন একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল ছেলেটার কাছে। কয়েক সেকেন্ড লাগে ব্যাপারটা বোধগম্য হতে।আর বুঝতে পেরেই দুষ্টুমির হাসি ফুটে উঠে চোখেমুখে।
“আমি ভালো ?”
“ অনেক!”
“ আচ্ছা?”
আবরারের ভাবসাব বুঝতে না পেরে, মাথা নেড়ে সায় জানায় বোকা মেয়েটা। ধূর্ত লোকটার গতিবিধি বুঝে উঠার আগেই করে ফেলে অপ্রত্যাশিত প্রশ্নটা,
“প্রেমে পড়েছো বুঝি?”
________________________________________(চলবে)
তোমার আকাশ আমার মেঘ
পর্ব-১১
– তিতা ফুল4 Comments-
-
তিতা ফুল, আপনি চমৎকার মায়ার বুনন আর সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতির এক অনন্য চিত্রপট ফুটিয়ে তুলেছেন, যেখানে ইন্তিহার মনের দ্বন্দ্ব আর আবরারের নিঃশব্দ যত্নের মুহূর্তগুলো হৃদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে যায়। প্রতিটি সংলাপের আড়ালে যে মানসিক টানাপোড়েন আপনি তুলে ধরেছেন, তা যে কোনো পাঠকের হৃদয়ে অনুরণন তুলবে; আর সেই সাথে সংসারের ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে জীবনের যে বাস্তব শিক্ষা আপনি ফুটিয়ে তুলছেন, তা যেকোনো অনুপ্রেরণামূলক উপন্যাসের সাথে অনায়াসেই মানিয়ে যায়। আপনার লেখনীর সাবলীল ধারা আর চরিত্রগুলোর আবেগকে ফুটিয়ে তোলার এই অনন্য দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়, তাই আপনি এভাবেই নিয়মিত লিখে যান এবং আমাদের এমন আরও সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিতে থাকুন।
-
Friends
Md.Mohsin Ali
@fivertrading007gmail-com
Redowan Hussain
@redowanhussain
নৈশান
@noishan
Hashem Molla
@hashemmolla
Kazi Mahabubur Rahman
@kazimahabuburrahman
mithila jannat
@mithilajannat
Sk Sagor
@sksagor
Md. Ashraful Alam
@md-ashrafulalam
Fazilatun Nesa
@fazilatun-nesa


যত্ন যখন ভাষা হয়ে ওঠে, ভালোবাসা তখন আর লুকিয়ে থাকে না।