-
সীমানা পেরিয়ে
(পূর্ণাঙ্গ ওয়েস্টার্ণ)অধ্যায় ২৬
পাহাড়ের ঢাল এবার ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে এসেছে, কিন্তু পথ সহজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিপদ কমেনি। বরং সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের প্রতিটি পাথর, প্রতিটি শুকনো ঝোপ, প্রতিটি উঁচু ঢাল এমন স্পষ্ট হয়ে উঠছিল যে লুকিয়ে থাকার সুযোগ যেন আরও কমে আসছিল।মারদেকা সবার আগে হাঁটছিল। তার চোখ কখনও মাটির দিকে, কখনও সামনের ঢালের দিকে, আবার কখনও দূরের পাথুরে রেখার ওপর গিয়ে স্থির হচ্ছিল। তার কোমরে ছুরি। হাত অস্ত্রের ওপর নেই, কিন্তু শরীরের প্রতিটি পেশি সতর্ক। পেছনে লারসেন, তার এক হাতের ক্ষত কাপড় দিয়ে বাঁধা, যদিও সেখান থেকে আবার রক্ত চুঁইয়ে বেরোতে শুরু করেছে। সবচেয়ে পেছনে এলিয়াস, আহত কাঁধের কারণে তার চলার গতি ধীর হয়ে গেছে।
সূর্যের প্রথম আলো পাহাড়ের মাথায় পড়লেও নিচের সরু গিরিখাতের মধ্যে এখনও ঠান্ডা জমে আছে। বাতাস শুকনো। পাথরের গায়ে রাতের শিশিরের সামান্য আর্দ্রতা কোথাও কোথাও চকচক করছে। দূরে একটা বাজপাখি আকাশে গোল হয়ে ঘুরছিল। তার ডানার নিচে পাহাড়ের বিশাল ছায়া মাটির ওপর দিয়ে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
কিন্তু মারদেকা পাখিটার দিকে তাকাচ্ছিল না। সে থেমে গেল। তার সামনে একটা জায়গায় পাহাড়ি পথ দুদিকে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁ পাশের পথটা নিচের দিকে নেমেছে, দেখতে তুলনামূলক সহজ। ডান দিকের পথটা উঁচু পাথরের গা ঘেঁষে ঘুরে গেছে। সেখানে চলতে কষ্ট হবে, কিন্তু জায়গাটা অনেক বেশি আড়াল দেওয়া।
লারসেন থামল। “কী হলো?”
মারদেকা উত্তর দেওয়ার আগে মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসল। সূর্যের আলো এখনও পুরোপুরি সেখানে পৌঁছায়নি। সে হাত দিয়ে মাটির ধুলো স্পর্শ করল। তারপর সামনের দিকে ঝুঁকে একটা পাথরের পাশে চোখ সরু করে তাকাল। কিছুক্ষণ পর উঠে দাঁড়াল। “বাঁ দিকের পথ।”
লারসেন তার দিকে তাকাল। “কেন?”
মারদেকা পেছনের দিকে তাকাল না। তার চোখ তখনও সামনে। “ওরা ভাববে আমরা ডান দিক দিয়ে যাব।”
এলিয়াস ক্লান্ত মুখে বলল, “ওটা আড়াল দেওয়া পথ।”
“তাই।” মারদেকা বলল। “আর ওরা জানে আমরা আড়াল চাইব।”
লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা পরিবর্তন দেখা গেল। সে কিছু বলল না। কয়েক মাস আগেও এমন পরিস্থিতিতে সে মারদেকাকে সামনে পাঠাত না। তাকে নিজের পেছনে রাখত। বিপদের জায়গায় ছেলেটিকে চোখের আড়াল হতে দিত না।
কিন্তু আজ সকালটা অন্যরকম। গত রাতের পর থেকে অনেক কিছু বদলে গেছে।
ড্যানিয়েল রিডের নাম এখন আর শুধু অতীতের কোনো অচেনা মানুষের নাম নয়। সে মারদেকার বাবা। একজন শ্বেতাঙ্গ শিকারি, দক্ষ স্কাউট, সীমান্তের দুর্গম পথের মানুষ। যে বিশ্বাসঘাতকতার সন্ধান পেয়েছিল। যে প্রমাণ জোগাড় করতে চেয়েছিল। আর যার মৃত্যুর আগে নিজের সাত বছরের ছেলেকে আগুন আর গুলির শব্দের মধ্যে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো একটা নির্দেশ দিয়েছিল।
দৌড়াও শব্দটা মারদেকার মাথার ভেতর এতদিন ধরে ঘুরেছে। স্বপ্নে, জেগে থাকা অবস্থায়, অন্ধকার পাহাড়ি পথে, ভয়ংকর মুহূর্তে। এখন আর সেটা কোনো অদ্ভুত রহস্য নয়। সেটা তার বাবার কণ্ঠ। মানুষটার মৃত্যুর আগের শেষ নির্দেশ।
মারদেকা বাঁ পাশের পথ ধরে হাঁটা শুরু করল। পেছনে লারসেন। তারও পেছনে এলিয়াস।
তারা খুব বেশি দূর যেতে পারেনি, হঠাৎ মারদেকা আবার থামল। এবার সে হাত তুলল না, কোনো শব্দও করল না। শুধু শরীর নিচু করল।
লারসেন সঙ্গে সঙ্গে পাথরের আড়ালে সরে গেল। এলিয়াসও। কয়েক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর দূরে একটা শব্দ। খুব হালকা। পাথরে ঘোড়ার লোহার খুর লাগার শব্দ। একবার। তারপর বিরতি। আবার।
মারদেকা ধীরে মাথা ঘুরিয়ে লারসেনের দিকে তাকাল। “ঘোড়া।”
লারসেন নিচু গলায় বলল, “কতগুলো?”
মারদেকা উত্তর দিল না। সে মাথা সামান্য কাত করল। বাতাস এখন তাদের দিক থেকে পাহাড়ের নিচে যাচ্ছে। শব্দের সঙ্গে বাতাসের দিক মিলিয়ে সে হিসেব করার চেষ্টা করল। একটা। দুইটা। তারপর অন্য একটা শব্দ, যেন কেউ লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামিয়েছে।
মারদেকা খুব আস্তে বলল, “তিনটা। হয়তো চারটা।”
এলিয়াস নিচু গলায় বলল, “কেইনের লোক।”
লারসেন পাথরের কিনারা দিয়ে সামান্য বাইরে তাকাল। তারপর আবার সরে এল। “আমাদের দেখতে পায়নি।”
মারদেকা এবার মাথা নাড়ল। “এখনও না।”
কথাটা শেষ হতেই দূরে একটা কণ্ঠ ভেসে এল। “নিচের পথটা দেখো!”
কণ্ঠটা এত দূরে যে মুখ চেনা সম্ভব নয়। কিন্তু পরিষ্কার বোঝা গেল, তারা কাউকে খুঁজছে।
লারসেন ধীরে পিস্তল বের করল। এলিয়াসের হাতও অস্ত্রের দিকে গেল।
মারদেকা দুজনের দিকে তাকাল। তার নিজের কোমরে ছুরি। গত রাতেই সে দেখেছে, বন্দুকের লড়াই কেমন। সে দেখেছে বন্দুক চালাতে। অন্তত এটা দেখেছে যে অস্ত্র কীভাবে ধরে, ট্রিগার কোথায়, কীভাবে গুলি ছোড়া হয়। কিন্তু দেখা আর করতে পারা এক জিনিস নয়। আর গুলি ছোড়া আর মানুষকে লক্ষ্য করে গুলি করা, তার থেকেও আলাদা।
লারসেন তার দিকে তাকাল। “তুমি এখানেই থাকবে। আমরা না বলা পর্যন্ত বের হবে না।”
মারদেকার চোখে অদ্ভুত একটা স্থিরতা দেখা গেল। “যদি ওরা এদিকে আসে?”
লারসেন এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তাহলে আগে আমাকে বলবে।”
মারদেকা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। তারা পাথরের আড়ালে অপেক্ষা করতে লাগল। সময় যেন ধীরে যেতে শুরু করল।
সূর্য একটু একটু করে উপরে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে। কোথাও সোনালি, কোথাও ফ্যাকাশে সাদা। শুকনো ঘাসের ডগাগুলো আলো পেয়ে চকচক করছে। নিচের দিকে দূরে একটা সরু সমতল জায়গা দেখা যাচ্ছে, তারপর আরও দূরে পাহাড়ের শেষ রেখা।
ওই পথ ধরলেই খোলা প্রান্তর। তারপর র্যাঞ্চ। কিন্তু তার আগে পাহাড়কে পেছনে ফেলে যেতে হবে। আর পাহাড় এখনও তাদের ছাড়েনি।
হঠাৎ বাঁ দিকের ওপরের ঢাল থেকে একটা রাইফেলের গুলি ছুটে এল। শব্দটা এত আচমকা যে এলিয়াস পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ধরল। গুলিটা তাদের থেকে অনেকটা দূরে পাথরে আঘাত করল।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় গুলি এলো। এবার আরও কাছে। পাথরের একটা অংশ ভেঙে মারদেকার মুখের ওপর ধুলো এসে পড়ল।
লারসেন পিস্তল তুলে একবার গুলি করল। তারপর চিৎকার করে বলল, “নিচু হও!”
এরপর আর কোনো সতর্কতা দেওয়ার সময় রইল না। চারদিক থেকে গুলির শব্দ শুরু হলো।
পাহাড়ি বন্দুকযুদ্ধের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, মানুষ কখনও নিশ্চিত হতে পারে না শত্রু ঠিক কোথায়। একটা গুলি সামনে থেকে আসে, তার প্রতিধ্বনি অন্য দিক থেকে ফিরে আসে। আরেকটা ওপরের পাথরে লাগে, মনে হয় যেন নিচের খাদ থেকে কেউ গুলি করেছে। ধুলো, শব্দ আর পাথরের ভাঙা টুকরোর মধ্যে দূরত্বের হিসেব হারিয়ে যায়।
কিন্তু মারদেকা চেষ্টা করছিল শব্দগুলো আলাদা করতে। বাম দিকে একজন। সামনে দুজন। আরেকজন অনেক দূরে। সে পাথরের সঙ্গে শরীর ঠেসে বসে রইল।
লারসেন আবার গুলি করল।
এলিয়াস এবারও অস্ত্র তুলেছে, কিন্তু আহত কাঁধের কারণে তার হাত স্থির রাখতে কষ্ট হচ্ছে। তবু সে একবার লক্ষ্য করে গুলি করল। তারপর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পড়ল। দূর থেকে একটা আর্তচিৎকার শোনা গেল।
মারদেকা বুঝতে পারল না গুলিটা কাউকে লেগেছে কি না। সে শুধু শুনছিল। একটা বুট পাথরের ওপর দিয়ে এগিয়ে আসছে। অন্যদের থেকে আলাদা। ধীরে। সাবধানে। সে কান দিয়ে লোকটার অবস্থান ধরতে লাগল। আরও কাছে। আরও। তারপর হঠাৎ থেমে গেল।
মারদেকা লারসেনের দিকে ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল, “একজন নিচ দিয়ে আসছে।”
লারসেন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল। “কোন দিক?”
মারদেকা হাত দিয়ে বাঁ দিকের নিচু ঢাল দেখাল। “ওখানে। পাথরের পেছনে।”
লারসেন কোনো প্রশ্ন করল না। সে ধীরে পাথরের অন্য প্রান্তে সরে গেল। কয়েক সেকেন্ড। তারপর একটি মানুষের ছায়া দেখা গেল।
লোকটা নিচু হয়ে এগোচ্ছিল। হাতে রাইফেল। মুখে দাড়ি। মাথায় ধুলো জমা টুপি। সে পাথরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে আসতেই লারসেন গুলি করল। লোকটা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে পড়ে গেল।
কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর থেকে আরেকটা গুলি এলো। লারসেনের টুপির কিনারা ছিঁড়ে সেটা উড়ে গেল।
মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা শুধু পালিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে না। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলছে।
এলিয়াস দাঁত চেপে বলল, “ওরা নিচের পথ বন্ধ করেছে।”
লারসেন এক ঝলক তাকাল। “আর ওপরে?”
এলিয়াস উত্তর দেওয়ার আগেই ওপরের ঢাল থেকে কেউ চিৎকার করে উঠল। “লারসেন!”
সবাই থেমে গেল। গুলির শব্দও থামল। কয়েক মুহূর্তের সেই নীরবতা বন্দুকের আওয়াজের থেকেও ভয়ংকর মনে হলো।
তারপর পাহাড়ের ওপরে একটা মানুষ দেখা দিল। সে অনেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় কালো টুপি। গায়ে লম্বা ধুলোমাখা কোট। তার মুখ এখান থেকে স্পষ্ট দেখা যায় না। কিন্তু লারসেন তাকে চিনল।
দূরের মানুষটা ধীরে ধীরে দুই হাত ছড়িয়ে দিল। “তেরো বছর, লারসেন। এত বছর ধরে আমি ভেবেছি, তোমার সঙ্গে আর কখনও দেখা হবে না।”
লারসেন পিস্তল নামাল না। “আমি ভেবেছিলাম তুমি মৃত।”
পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা হাসল। “তুমি অনেক কিছুই ভেবেছিলে।”
এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে গেল। “তোমাকে সেদিন মাটিতে পড়তে দেখেছিলাম।”
ভিক্টর কেইন মাথা সামান্য কাত করল। “তাহলে তুমি ভুল দেখেছিলে।”
তারপর তার চোখ নিচের দিকে ঘুরল। মারদেকার দিকে।
“ছেলেটা।” কেইন বলল। “আমি তাকে দেখতে চেয়েছিলাম।”
লারসেনের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল। “তুমি তাকে দেখেছ।”
কেইনের হাসি মিলিয়ে গেল। “সেই ছয় বছর আগে, এতটুকুন ছিল। তারপর পালিয়ে গিয়েছিল।” একটু থেমে আবার বললো, “এখন নিশ্চয়ই সেরকম নেই।”
তারপর আবার বন্দুকের গুলি শুরু হলো। মারদেকা নিচু হয়ে পড়ল। এবার গুলি আগের চেয়ে কাছ থেকে আসছে। পাথরের আড়াল আর নিরাপদ নেই। একটি গুলি এলিয়াসের মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল। আরেকটি লারসেনের পেছনের পাথরে আঘাত করল।
লারসেন দ্রুত চারপাশে তাকাল। তারপর বলল, “আমাদের অবস্থান বদলাতে হবে।”
মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে সামনে তাকাল। নিচে প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে একটা ভাঙা পাথুরে ঢাল। তার নিচে শুকনো ঝোপের সারি। জায়গাটা বিপজ্জনক, কিন্তু সেখানে পৌঁছাতে পারলে শত্রুরা তাদের সরাসরি দেখতে পাবে না।
মারদেকা পথটা দেখল। তারপর বলল, “ওদিক দিয়ে যাওয়া যাবে।”
লারসেন তার চোখের দিকে তাকাল। “নিশ্চিত?”
“ঠিক জানি না।” মারদেকার কন্ঠ দ্বিধান্বিত। “কিন্তু এখানে থাকলে ওরা আমাদের ঘিরে ফেলবে।”
লারসেনের মুখে খুব সামান্য একটা হাসির ছায়া দেখা গেল। এমন একটা মুহূর্তে, গুলির মধ্যে দাঁড়িয়ে, ছেলেটার উত্তরটা যেন তার ভালো লেগেছে। “চলো।” বললো সে।
এলিয়াস উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপরের দিক থেকে গুলির শব্দ হলো। এলিয়াসের শরীর ঝাঁকুনি খেলেও সে পড়ে গেল না। গুলিটা তার গায়ে লাগেনি। কিন্তু পাথরের একটা টুকরো ছিটকে এসে তার আহত কাঁধে আঘাত করল। সে দাঁত চেপে দেয়ালে হেলান দিল।
লারসেন বলল, “পারবে?”
এলিয়াস মুখ তুলে তাকাল। “এত বছর অপেক্ষা করেছি।” সে কষ্ট করে বলল। “এখন মরার ইচ্ছে নেই।”
মারদেকা প্রথমবার তার দিকে তাকিয়ে খুব সামান্য হাসল। তারপর তিনজন একসঙ্গে নড়ল।
লারসেন সামনে গুলি ছুড়ে শত্রুদের মাথা নিচু রাখতে চেষ্টা করল।
মারদেকা প্রথমে বেরিয়ে ডান দিকে ছুটল, তারপর পাথরের আড়াল ধরে নিচের দিকে নেমে গেল। তার পা একবারও থামল না। কোথায় শরীরের ভার দিতে হবে, কোন পাথর আলগা, কোন জায়গায় লাফ দিতে হবে, সে যেন চোখের আগেই বুঝে ফেলছে। পেছনে এলিয়াস। আর সবচেয়ে শেষে লারসেন।
হঠাৎ মারদেকা শুনল অন্যরকম একটা শব্দ। খুব কাছে। পেছনে নয়। সামনে। সে সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। তার হাত উঠে গেল লারসেনকে থামানোর জন্য।
কিন্তু ঠিক তখনই নিচের শুকনো ঝোপের ভেতর থেকে একজন মানুষ উঠে দাঁড়াল। তার হাতে রাইফেল। মারদেকার দিকে তাকিয়ে সে প্রথমে থমকে গেল।
সময়টা হয়তো এক সেকেন্ডেরও কম ছিল। কিন্তু সেই এক সেকেন্ডে লোকটার মুখের ভাব বদলে গেল। সে রাইফেল পুরোপুরি তুলল না। বরং বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
মারদেকা স্থির। লোকটা আরও এক পা সামনে এগিয়ে এল। তার চোখ এবার মারদেকার মুখের ওপর স্থির। ““ঈশ্বর…” সে বলল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। “তুই একদম ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”
মারদেকার শরীরের ভেতর যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। পেছনে কোথাও গুলি চলছিল। বাতাসে ধুলো উড়ছিল।
এলিয়াসের আহত নিঃশ্বাসের শব্দ ছিল। লারসেনের হাতে পিস্তল ছিল।
কিন্তু সেই মুহূর্তে মারদেকা শুধু একটা নাম শুনতে পেল। ড্যানিয়েল রিড। তার বাবা। আর সামনের লোকটার মুখে যে বিস্ময়, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।
এলিয়াস ধীরে লোকটার দিকে এগিয়ে এল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কিন্তু চোখ কঠিন। “এবার বুঝলে?” সে বলল।
লোকটা রাইফেল শক্ত করে ধরল। কিন্তু তার চোখ এখনও মারদেকার মুখ থেকে সরেনি।
এলিয়াস বলল, “সেদিন যে ছেলেটাকে আগুনের মধ্যে থেকে পালিয়ে যেতে দেখেছিলে, সে মারা যায়নি।”
মারদেকা ধীরে এলিয়াসের দিকে তাকাল। এলিয়াসের চোখে সেই পুরোনো রাতের ছায়া ফিরে এসেছে। সে মারদেকার দিকে তাকালো, “তুমি দৌড়ে পালিয়েছিলে। আর তোমার বাবা তোমাকে দৌড়াতে বলেছিল।”
মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।
এলিয়াসের কণ্ঠ এবার আরও নিচু। “তুমি পাহাড়ের ঢাল পেরিয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কয়েক মিনিট পর ড্যানিয়েলকে ওরা হত্যা করে।”
বাতাস থেমে গেছে বলে মনে হলো। কিন্তু পরের মুহূর্তেই সামনের লোকটা রাইফেল তুলল।
লারসেন গুলি করল। আর পাহাড় আবার বন্দুকের শব্দে কেঁপে উঠল।
মারদেকা এখন জানে, কেন লারসেন তাকে সন্তানের মত দেখে। তের বছর আগে সে যদি দল ছেড়ে পালিয়ে না যেত, হয়তো তার বাবাকে মরতে হতো না। মুলত অপরাধবোধের প্রায়শ্চিত্ত করতেই তাকে কাছে টেনে নেওয়া।
আজকের মারদেকাকে সে ড্যানিয়েল রিডের ছায়া হিসেবে গড়ে তুলেছে। সে কারণেই তার অতীত খুঁজে পেতে তাকে সাথে নিয়েই পাহাড়ে এসেছে। মাথার ভেতর সবসময় শব্দ করা তার অতীত আজ পরিস্কার ছবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আর সেই অতীতের মাঝখানে, বন্দুকের ধোঁয়া আর পাহাড়ের ধুলোর মধ্যে, এখনও জীবিত দাঁড়িয়ে আছে তার বাবার হত্যাকারীদের নেতা, ভিক্টর কেইন।
পাহাড়ের শেষ ঢালটা নিচের দিকে নেমে গেছে অনেকটা, কিন্তু পথটা সহজ নয়। রাতের শেষ অন্ধকার তখন ধীরে ধীরে পেছনে সরে যাচ্ছে, পূর্ব আকাশে জমে থাকা ধূসর আলো পাথরের ধারগুলোকে একে একে আলাদা করে তুলছে। কিছুক্ষণ আগেও যে জায়গাগুলো শুধু কালো ছায়া ছিল, এখন সেখানে দেখা যাচ্ছে ভাঙা ঢাল, শুকনো ঝোপ, গিরিখাতের মুখ আর বহু বছরের বৃষ্টিতে কেটে যাওয়া সরু জলধারা।
তিনজনের সামনে পাহাড় শেষ হয়ে দূরে খোলা জমি শুরু হয়েছে, কিন্তু সেই খোলা জায়গা এখনও অনেক দূরে। তার আগেই রয়েছে কয়েকটি উঁচুনিচু ঢাল, পাথরের ফাঁক, আর এমন কিছু জায়গা যেখানে আড়াল না পেলে মানুষের শরীর খোলা আকাশের নিচে সহজ লক্ষ্য হয়ে যায়।
এলিয়াস মাঝখানে হাঁটছিল। তার কাঁধের ক্ষত শক্ত করে বাঁধা হয়েছে, কিন্তু রক্ত পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কাপড়ের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে গাঢ় দাগ ছড়িয়ে পড়ছে। তার মুখ ফ্যাকাশে, তবু সে নিজের পায়ে হাঁটছে। লারসেন তার কাছাকাছি ছিল, আর মারদেকা সামনে কয়েক গজ দূরে পথ দেখছিল। ছেলেটার হাঁটার ভঙ্গিতে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু দ্বিধা ছিল না।
কয়েক ঘণ্টা আগেও এই পাহাড় তার কাছে ছিল রহস্যে ভরা এক অন্ধকার জায়গা, যেখানে সে নিজের অতীতের ছিন্ন অংশ খুঁজছিল। এখন রহস্যের অনেকটাই তার সামনে খুলে গেছে। তার বাবার নাম ড্যানিয়েল রিড। সে ছিল স্কাউট, পথচেনা মানুষ, লারসেনের পুরোনো সঙ্গী। আর ভিক্টর কেইন, সেই পুরোনো দলের বিশ্বাসঘাতক, বহু বছর মৃত বলে পরিচিত থেকেও বেঁচে আছে।
সবচেয়ে বড় কথা, মারদেকা এখন জানে কে সেই শব্দটা উচ্চারণ করে তাকে পালাতে বলেছিল। সেই রাতের আগুনের মধ্যে, গুলির শব্দ আর মানুষের চিৎকারের ভেতর, তার বাবা তাকে ডাক দিয়ে বলেছিল, দৌড়াও।
আর সে দৌড়েছিল। তারপরই ড্যানিয়েল রিডকে হত্যা করা হয়েছিল।
মারদেকা হাঁটতে হাঁটতে হাতের মুঠো শক্ত করল। কোমরের ছুরির হাতল তার তালুর কাছে ঠান্ডা লাগছিল। সে নিজের বাবাকে মনে করতে পারে না। মুখ মনে নেই। কণ্ঠের সম্পূর্ণ রূপও নেই। কিন্তু সেই একটি শব্দ রয়ে গেছে। হয়তো স্মৃতির সবকিছু ভেঙে গিয়েছিল, আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল, তারপর বছরের পর বছর ধরে তার মাথার ভেতর শুধু একটি শব্দ বেঁচে ছিল। দৌড়াও।
এখন আর সেই শব্দ তাকে ভয় দেখায় না। এখন সে জানে, কে বলেছিল। কেন বলেছিল। হঠাৎ মারদেকা থেমে গেল।
লারসেন সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে এলিয়াসকে থামতে বলল। কয়েক মুহূর্ত কেউ নড়ল না।
মারদেকা মাথা সামান্য নিচু করল। তার চোখ সামনে, কিন্তু সে দেখার চেয়ে বেশি শুনছে। ভোরের আগে পাহাড়ের বাতাসে একটা বিশেষ ধরনের নীরবতা থাকে। রাতের প্রাণীরা গর্তে ফিরে যায়, দিনের পাখিরা এখনও পুরোপুরি ডাক শুরু করে না। সেই নীরবতার মধ্যে দূরের শব্দও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
প্রথমে কিছুই শোনা গেল না। তারপর। খট। খুব ক্ষীণ শব্দ। যেন ধাতব কোনো বস্তু পাথরে ঠেকেছে। তারপর শুকনো পাথরের ওপর বুটের চাপ। মারদেকা ধীরে ডান দিকে তাকাল।
লারসেনের হাত ইতিমধ্যেই পিস্তলের ওপর। “কতজন?”
মারদেকা উত্তর দিল না। সে কয়েক মুহূর্ত অপেক্ষা করল। তারপর নিচু স্বরে বলল, “সামনে দুজন।” একটু থেমে সে মাথা ঘুরিয়ে বাম দিকের ঢালের দিকে তাকাল। “আর একজন ওপরে।”
এলিয়াসের মুখ শক্ত হয়ে উঠল।
লারসেন ধীরে বলল, “কেইন?”
“জানি না।” মারদেকা বলল। “কিন্তু ওরা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
তিনজন সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। তাদের সামনে যে জায়গাটা ছিল, সেটা একটা শুকনো জলধারার মতো নিচু হয়ে গেছে। বর্ষার সময় হয়তো এখানে পাহাড়ের ওপর থেকে পানি নেমে আসে, কিন্তু এখন শুধু পাথর আর শুকনো মাটি। তার ওপরে দুপাশে উঁচু ঢাল। সামনে এগোতে হলে ওই খোলা অংশ পার হতে হবে।
লারসেন চারপাশে একবার তাকাল। “ফিরে যাওয়া যাবে?”
এলিয়াস মাথা নাড়ল। “পেছনেও ওরা আছে।”
এই কথার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দূর থেকে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ এল। শব্দটা অনেক নিচে নয়, বরং পাহাড়ের অন্য দিক থেকে। শত্রুরা তাদের ঘিরে ফেলার চেষ্টা করছে। লারসেন বুঝতে পারল, কেইন পুরোনো পথগুলো এখনও মনে রেখেছে। তেরো বছর আগের সেই দল ভেঙে গেছে, মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে, কেউ মারা গেছে, কেউ হারিয়ে গেছে, কিন্তু যে মানুষটা পথ বিক্রি করে জীবন কাটিয়েছে, সে পথ ভুলে যায়নি।
ভোরের আলো আরও একটু বেড়ে উঠল। আর সেই আলোতেই সামনে পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে এল।
সে একা দাঁড়িয়ে আছে। দূরত্ব এত বেশি নয় যে তাকে দেখা যায় না, আবার এত কমও নয় যে তার মুখ পরিষ্কার বোঝা যায়। মাথায় কালো টুপি। কাঁধে রাইফেল। সে কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, “এত বছর পরও তুমি একইভাবে হাঁটো, লারসেন।”
লারসেনের মুখে কোনো পরিবর্তন হলো না। “আর তুমি এখনও ছায়ার আড়াল থেকে কথা বলো, কেইন।”
লোকটা হেসে উঠল। “ছায়া আমাকে অনেক বছর বাঁচিয়ে রেখেছে।” তারপর সে সামান্য মাথা কাত করল। “তুমি ভেবেছিলে আমি মরে গেছি।”
“আমরা সবাই তাই ভেবেছিলাম।” এলিয়াসের গলা ভারী ছিল।
সামনের লোকটা এবার তার দিকে তাকাল। “এলিয়াস।” তার কণ্ঠে এমন একটা স্বর ছিল, যেন বহু বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া কোনো দরজা হঠাৎ আবার খুলে গেছে। “তুমিও বেঁচে আছ।”
এলিয়াস উত্তর দিল না।
ভিক্টর কেইন ধীরে ধীরে সামনে এগোল না। সে জানত, আরেক কদম এগোলেই লারসেনের পিস্তলের নাগালের মধ্যে চলে আসবে। সে জানে বহু বছর আগে লারসেন দল ছেড়ে গেলেও তার বন্দুক তাকে ঠিকই টিকিয়ে রেখেছে। বরং সময়ের তোড়ে ওলফ লারসেন নেকড়ের মতই ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। তাই সে নিজের জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তার চোখ মারদেকার ওপর এসে থামল। কয়েক মুহূর্ত সে কিছু বলল না।
মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীরের বেশিরভাগ অংশ পাথরের আড়ালে, কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে। কেইনের চোখ ধীরে ধীরে তার মুখের ওপর ঘুরে গেল। কপাল, চোখ, গালের রেখা, চোয়াল। তার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
দূরের একজন শত্রু, যে অন্য একটা পাথরের আড়ালে ছিল, হঠাৎ সামনে একটু ঝুঁকে তাকাল। ভোরের আলো এবার যথেষ্ট। সে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর বিস্মিত গলায় বলে উঠল, “কেইন ওকে দেখো।”
কেইন নড়ল না।
লোকটা আবার বলল, “ছেলেটাকে দেখো।”
মারদেকার বুকের ভেতর কিছু একটা শক্ত হয়ে উঠল।
লোকটার কণ্ঠ এবার আরও স্পষ্ট। “ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।”
কয়েক মুহূর্ত পাহাড়ের সব শব্দ যেন থেমে গেল। বাতাস বইছিল। দূরে কোথাও একটা পাখি ডেকে উঠেছিল। কিন্তু মারদেকার কানে কিছুই পৌঁছাল না। শুধু সেই কথাটা ছাড়া, ড্যানিয়েল রিডের মতো দেখতে।
তারপর কেইনের চোখের ভেতর ধীরে ধীরে এমন একটা দৃষ্টি জন্ম নিল, যা লারসেনকে আরও সতর্ক করে তুলল।
“তাহলে সত্যিই।” বলল কেইন, “সে বেঁচে আছে।”
লারসেন এবার পিস্তল পুরোপুরি বের করল। “আর তুমি তাকে আর একবার দেখার সুযোগ পাবে না।”
কেইনের ঠোঁটে আবার হাসি ফুটল। “তেরো বছর, লারসেন। তেরো বছর আমি তোমার কাছে মৃত মানুষ হয়ে ছিলাম। আর দীর্ঘ ছয় বছর পর আমি জানতে পারলাম, ড্যানিয়েল রিডের ছেলে সেদিন মরে যায়নি।” সে চোখ সরাল না মারদেকার দিক থেকে। “এত বছর পরে সে তোমার কাছেই এসে পড়েছে।”
মারদেকা হঠাৎ বলল, “তুমি আমার বাবাকে মেরেছিলে?” প্রশ্নটা বলার পর সে নিজেই অবাক হলো, তার গলা কাঁপেনি।
ভিক্টর কেইন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, “তোমার বাবা নিজের মৃত্যুর কারণ নিজেই হয়েছিল।”
মারদেকার হাত ছুরির হাতলে চলে গেল। “মিথ্যে।”
এলিয়াসের কণ্ঠ হঠাৎ পাহাড়ের বাতাস কেটে বেরিয়ে এল। কেইন তার দিকে তাকাল। তার মুখ ফ্যাকাশে, কাঁধে রক্তের দাগ, তবু চোখে সেই মুহূর্তে কোনো দুর্বলতা ছিল না। “ড্যানিয়েল জানত তুমি কী করছ। সে জানত তুমি পথ বিক্রি করেছ। সে জানত, তুমি যাদের আমাদের খবর দিয়েছিলে, তাদের মধ্যে কয়েকজন মারা গেছে।”
কেইন হাসল না।
এলিয়াস বলল, “সে প্রমাণ নিয়ে বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল।”
“সে প্রমাণ কোথায়?” কেইনের কণ্ঠ ঠান্ডা।
লারসেন উত্তর দিল, “যেখানে তোমার হাত পৌঁছাবে না।”
এই কথার পর আর কোনো সতর্কতা রইল না। প্রথম গুলিটা কেইনের দিক থেকে এল।
লারসেন মারদেকার কাঁধ ধরে তাকে নিচে টেনে ফেলল। গুলিটা তাদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে পাথরে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে বন্দুকের শব্দ শুরু হয়ে গেল। পাথরের গায়ে গুলি লেগে ধুলো উড়ছে, শুকনো মাটি ভেঙে ছোট ছোট কণা ছড়িয়ে পড়ছে। ভোরের আলো এখন পাহাড়কে পুরোপুরি প্রকাশ করে দিয়েছে, আর সেই আলোয় মানুষগুলো আর ছায়া নয়। তারা বাস্তব শত্রু।
লারসেন একটা পাথরের আড়াল থেকে উঠে দুবার গুলি করল। একজন লোক সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল।
এলিয়াস তার রাইফেল তুলে কাঁধের ব্যথা সামলে নিশানা করল। তার প্রথম গুলি কোথায় লাগল বোঝা গেল না, কিন্তু পাহাড়ের ওপর থেকে একটা চিৎকার ভেসে এল।
মারদেকা পাথরের সঙ্গে শরীর চেপে ছিল। তার পাশে একটা রাইফেল পড়ে ছিল, কিছুক্ষণ আগে এলিয়াস নিচে বসার সময় হাত থেকে রেখে দিয়েছিল। সে রাইফেলের দিকে তাকাল। তারপর নিজের হাতের দিকে।
সে বন্দুক ধরতে জানে না। কিন্তু সে জানে বন্দুক দিয়ে মানুষ মারা যায়। এই সত্যটা এতদিন তার কাছে দূরের ছিল। সে বন্দুকের শব্দ শুনেছে, বন্দুক দেখেছে, লারসেনের কোমরে কোল্ট দেখেছে। কিন্তু একটা মানুষের দিকে বন্দুক তাক করা কেমন, সেটা সে জানে না।
তার বুকের ভেতর ভয় জমে উঠল। আর ঠিক তখনই তার মাথার ভেতর আবার সেই শব্দটা ফিরে এল। দৌড়াও। কিন্তু এবার সে জানে, সেই শব্দ কোথা থেকে এসেছে। তার বাবা তাকে বাঁচাতে বলেছিল। সাত বছরের মারদেকা দৌড়েছিল।
তেরো বছরের মারদেকা পাথরের আড়ালে বসে রইল। সে দৌড়াল না। তার চোখ পাথরের ওপর দিয়ে দ্রুত চারপাশে ঘুরে গেল। সামনে দুইজন। ডান দিকে একজন। কিন্তু একটু আগে যে লোকটা ওপরে ছিল, সে এখন কোথায়?
মারদেকা মাথা সামান্য কাত করল। বন্দুকের শব্দের ফাঁকে সে অন্য একটা শব্দ পেল। পাথর গড়াল। খুব ছোট শব্দ। তারপর বুট। উঁচু জায়গা থেকে নিচে নামছে কেউ। সে লারসেনের কাঁধে হাত রাখল। “বাঁ দিকে দেখুন।”
লারসেন সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকাল না। “কোথায়?”
“ওপরে ছিল। এখন নিচে নামছে।”
এক সেকেন্ড। দুই সেকেন্ড। তারপর পাথরের আড়াল থেকে একজন মানুষ উঠে আসতেই লারসেনের গুলি ছুটল। লোকটা চিৎকার করে পেছনে পড়ে গেল।
মারদেকা চোখ বন্ধ করল না। সে শুধু তাকিয়ে রইল।
লারসেন তার দিকে একবার তাকাল। কিছু বলল না। তারপর আবার গুলি শুরু হলো।
এবার তাদের অবস্থান বদলাতে হবে। তারা যেখানে আছে, সেখানে বেশিক্ষণ থাকলে শত্রুরা দুই দিক থেকে ঘুরে এসে তাদের আটকে ফেলবে।
মারদেকা সামনে একটা নিচু পথ দেখতে পেল। শুকনো ঝোপের ভেতর দিয়ে গেছে। বাইরে থেকে পুরোটা দেখা যায় না। সে বলল, “ওদিকে গেলে নিচে নামা যাবে।”
এলিয়াস তার দিকে তাকাল। “তারপর?”
“তারপর একটা পাথরের দেয়াল আছে। তার পেছনে পথ।”
লারসেন জিজ্ঞেস করল, “তুমি দেখেছ?”
মারদেকা মাথা নাড়ল। “শুনেছি।”
লারসেনের চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত একটা দৃষ্টি দেখা গেল। এত অল্প বয়সে এই ছেলেটা কীভাবে পাহাড়কে এভাবে পড়ে নিতে পারে, সে হয়তো এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারে না। কিন্তু এখন প্রশ্ন করার সময় নয়। “এগিয়ে যাও।”
মারদেকা নিচু হয়ে বেরিয়ে এল।
লারসেন তার পেছনে গুলি চালিয়ে আড়াল তৈরি করল। এলিয়াস কষ্ট করে রাইফেল হাতে এগোল। তার আহত কাঁধ এবার প্রায় অসাড় হয়ে এসেছে, কিন্তু সে অস্ত্র ফেলে দেয়নি।
তারা শুকনো ঝোপের ভেতর ঢুকতেই ডান দিক থেকে গুলি এল। মারদেকা সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে শুয়ে পড়ল। লারসেনও নিচু হয়ে গেল।
কিন্তু এলিয়াস এত দ্রুত নড়তে পারল না। গুলিটা তার পাশ দিয়ে চলে গেল, কাঁধে নয়, পাথরে লাগল। তবু ছিটকে আসা ধারালো পাথরের টুকরো তার মুখের পাশে কেটে দিল। সে একবার চোখ বন্ধ করল, তারপর আবার উঠে দাঁড়াতে গেল।
মারদেকা তার কাছে পৌঁছাল। “চলুন।”
এলিয়াস বলল, “আমি পারছি।”
“আমি জানি।” মারদেকা উত্তর দিল। তারপর দুজন আবার এগোল।
সামনে পাথরের দেয়ালটা দেখা গেল। খুব উঁচু নয়, কিন্তু তার নিচে একটা সরু ফাঁক। একসঙ্গে দুজন যেতে পারবে না। মারদেকা আগে ঢুকে ভেতরের জায়গাটা পরীক্ষা করল। পেছনে গুলির শব্দ আরও কাছে এসেছে। সে ঘুরে বলল, “এখানে।”
এলিয়াস আগে ঢুকল। তারপর লারসেন। ঠিক সেই মুহূর্তে পেছন থেকে একজন শত্রু ঝোপ ভেঙে বেরিয়ে এল। সে মারদেকাকে দেখতে পেয়ে থেমে গেল। হয়তো সে ভাবেনি, ছেলেটা এত কাছে থাকবে।
তার রাইফেল কাঁধে ওঠার আগেই মারদেকা নিচু হয়ে গেল। গুলি তার মাথার ওপর দিয়ে চলে গেল।
মারদেকা কোমর থেকে ছুরি বের করল। লোকটা রাইফেল ফেলে হাত দিয়ে তাকে ধরতে এগোল।
মারদেকা পেছনে সরে গেল না। সে লোকটার হাতের নাগালের বাইরে পাশ কাটিয়ে গেল। লারসেনের শেখানো পায়ের কাজ তখন তার শরীরের সঙ্গে এমনভাবে মিশে গেছে যে সে আর আলাদা করে ভাবতে হয় না। লোকটা তার দিকে ঘুরতেই মারদেকা নিচু হয়ে তার হাঁটুর পেছনে পা ঠেকাল। লোকটা ভারসাম্য হারাল।
মারদেকা তার বুকের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল না। সে পাশ কাটিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে ছুরির হাতল দিয়ে লোকটার মাথার পাশে আঘাত করল। লোকটা গড়িয়ে পড়ল। তার হাত থেকে পিস্তল বেরিয়ে মাটিতে পড়ল।
মারদেকা পিস্তলের দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো, সে সেটা তুলে নিতে পারে। কিন্তু সে তুলল না। সে ছুরিটা শক্ত করে ধরে আবার ফাঁকের ভেতর ঢুকে গেল।
পেছনে লারসেনের গলা শোনা গেল। “দ্রুত!” তিনজন আবার চলতে শুরু করল।
এবার পথটা পাহাড়ের নিচের দিকে। সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আলো বেড়ে যাচ্ছে। আকাশে হালকা সোনালি রং দেখা দিয়েছে। দূরে, বহু নিচে, খোলা প্রান্তরের ওপর কুয়াশার মতো ধুলো ভাসছে।
মারদেকা প্রথমবার বুঝতে পারল, তারা সত্যিই পাহাড়ের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। কিন্তু পেছনে এখনও গুলির শব্দ। আর সামনে এখনও শত্রুর শেষ মানুষটি। ভিক্টর কেইন।
হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল। এতক্ষণ ধরে চলা গুলির লড়াইয়ের পর সেই নীরবতা অস্বাভাবিক লাগল।
লারসেন থামল। এলিয়াস পাথরের গায়ে হেলান দিল। মারদেকা সামনে তাকিয়ে রইল। তারপর পাহাড়ের ওপর থেকে ঘোড়ার শব্দ এল। একটি। তারপর আরেকটি।
মারদেকা মাথা তুলল। উঁচু ঢালের কিনারায় ভিক্টর কেইনকে দেখা গেল। সে একা। তার সঙ্গে আর কেউ নেই। তার ঘোড়াটা কালো পাথরের পাশে দাঁড়িয়ে। সূর্যের প্রথম আলো তার টুপির কিনারা ছুঁয়ে গেছে। সে অনেকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে রইল।
লারসেন পিস্তল তুলল। কিন্তু দূরত্ব বেশি।
কেইনও জানে। সে শুধু একবার মারদেকার দিকে তাকাল। তারপর ঘোড়ার লাগাম ঘুরিয়ে দিল।
এলিয়াস নিচু স্বরে বলল, “ওকে যেতে দিও না।”
লারসেন গুলি করল। গুলিটা কেইনের অনেক দূরে পাথরে আঘাত করল।
কেইন আর পেছনে তাকাল না।
আরও কয়েকজন ঘোড়সওয়ার, যারা হয়তো আগে থেকে অন্য ঢালের আড়ালে ছিল, একে একে তার সঙ্গে মিলল। তাদের সংখ্যা বেশি নয়। বন্দুকযুদ্ধে যারা পড়েছে, তাদের কেউ আর ফিরছে না।
ভিক্টর কেইন পাহাড়ের কিনারা ধরে পশ্চিমের দিকে ঘুরে গেল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে তারা দৃষ্টির বাইরে।
মারদেকা স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তার মনে হলো, এতক্ষণ ধরে যে মানুষটাকে সে শুধু নাম হিসেবে চিনত, সে এখন বাস্তব। সে তার বাবার মৃত্যুর সঙ্গে জড়িত। সে মারদেকাকে খুঁজছে। এবং সে পালিয়ে গেছে।
লারসেন ধীরে পিস্তল নামাল। তার হাতের ক্ষত থেকে আবার রক্ত বের হচ্ছে।
এলিয়াস ক্লান্ত গলায় বলল, “সে জানে আমরা কোথায় যাব।”
লারসেন কোনো উত্তর দিল না। মারদেকা ঘুরে তাকাল।
দূরের প্রান্তর তখন সূর্যের আলোয় ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে। পাহাড় শেষ হয়েছে। সামনে বিস্তৃত খোলা পৃথিবী।
ছেলেটার মুখে ধুলো, চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ, জামায় পাথরের ঘষায় দাগ। কিন্তু তার চোখ আর আগের মতো নয়।
সে এখন জানে সে কে। সে জানে তার বাবা কে ছিল। সে জানে কেন তার বাবা মারা গেছে। আর সে জানে, ছয় বছর আগে আগুনের মধ্যে যে ছেলেটা দৌড়ে পালিয়েছিল, তাকে এখনও একজন মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে।
লারসেন ধীরে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। র্যাঞ্চে ফেরে চল।”
এলিয়াস পাথর থেকে নিজেকে সোজা করল। “কেইনও সেদিকেই যাবে।”
লারসেন দূরের প্রান্তরের দিকে তাকাল। তার মুখে ক্লান্তি ছিল, রক্ত ছিল, কিন্তু চোখে ছিল পুরোনো সেই কঠিন স্থিরতা। “তাহলে এবার ওকে সেখানে স্বাগত জানানো হবে।”
তারা পাহাড়ের শেষ ঢাল ধরে নিচে নামতে শুরু করল। মারদেকা এবারও সামনে হাঁটছিল। কিন্তু এইবার সে শুধু পথ দেখাচ্ছিল না। তার পেছনে পড়ে থাকল সেই পাহাড়, যেখানে সে নিজের জীবনের সব প্রশ্নগুলোর উত্তর পেয়েছে।
সামনে আছে খোলা প্রান্তর। ঘোড়া। র্যাঞ্চ। আর অপেক্ষা করছে আরেকটি যুদ্ধ। পাহাড় তাকে তার অতীত ফিরিয়ে দিয়েছে। এবার সামনে অপেক্ষা করছে তার ভবিষ্যৎ।
(চলবে)3 Comments
আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন
ডিজাইনার
স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।
Friends
sajjadul ehsan sakib
@sajjadulehsansakib
বিদ্যুৎ চৌধুরী
@bc001
Abdul Motaleb
@abdulmotaleb
আজমাইন ইনকিয়াত
@inqiyad
মোঃ ইফতেখার আহমেদ তাজিম
@tazim
রুনা জাহান
@runajahan
Robi Murmu
@robi
Rabbi
@rabbi1
দেবজীৎ ঘোষ প্রীতম
@debojit


দীর্ঘ এই শব্দের মিছিলে মন হারালেও, ভাবনার গভীরতা চমৎকার। এই আঙিনায় আপনার অক্ষরের আলো ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিনিয়ত। অন্তহীন শুভেচ্ছা!