-
মনের অদৃশ্য রোগ
শহরের একটি নামকরা মানসিক চিকিৎসাকেন্দ্র। চেম্বারের দরজার পাশে বড় একটি নামফলকে লেখা—
ডা. রায়ান এমবিবিএস, এফসিপিএস (মনোরোগবিদ্যা), এমডি (মনোরোগবিদ্যা)
অধ্যাপক, মনোরোগবিদ্যা বিভাগ
ন্যাশনাল মেডিকেল ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড হসপিটাল
চেম্বারে বসে আছেন মন্টু মিয়া।
ডাক্তার রায়ান বললেন,
— আপনার নাম কী?
— মন্টু মিয়া।
— বয়স কত?
— পঞ্চান্ন হইব, ডাক্তার সাব।
— বাড়ি কোথায়?
— মধুপুর গেরামে।
— লেখাপড়া কতদূর করেছেন?
— দুই ক্লাস পর্যন্ত পড়ছিলাম। হেরপর আর পড়ন হয় নাই।
— কী কাজ করেন?
— গেরামে মুদির দোকান চালাই।
— আচ্ছা, কী সমস্যা নিয়ে এসেছেন?
মন্টু মিয়া একটু ইতস্তত করে বললেন,
— হাত ধুই, ডাক্তার সাব।
— কতবার হাত ধোন?
— ওইডা গুনে রাখি নাই।
— হাত ধোয়ার পর কি মনে হয় হাত পরিষ্কার হয়েছে?
— কিছুক্ষণ মনে হয় হইছে। আবার মনে হয় ভালো কইরা ধুই নাই।
— তখন কী করেন?
— আবার ধুই।
— হাত না ধুলে কী হয়?
— বুকের মইধ্যে ছটপট করে। মনে হয় কোনো বিপদ হইব।
— কী কী জিনিস ধরলে এই অনুভূতি বেশি হয়?
— বাজারের টাকা, দরজার হাতল, দোকানের জিনিস—সব ধরলেই মনে হয় হাতে ময়লা লাগছে।
— পরিবারের কাউকে স্পর্শ করার পরও কি হাত ধোন?
মন্টু মিয়া একটু নিচু স্বরে বললেন,
— হ, ডাক্তার সাব।
— এতে কি আপনার দৈনন্দিন কাজে সমস্যা হচ্ছে? – মেলা ঝামেলা হইতাছে ডাক্তার সাব, দোকানে কাস্টমাররা টাকা দিলেই আমার মনে হয় হাত নোংরা হইয়া গেছে। তখন আর দোকানে বইসা থাকতে পারি না, হাত ধুইতে চইলা যাই। কাস্টমাররা জিগায়, “কী হইছে ?” এইভাবে বারবার হাত ধুইতে যাইতে আইতে দোকানের কামে দেরি হয়, কাস্টমারও বইসা থাকে। দোকান থেইকা বাড়ি যাইতে দেরি হয়। খাওয়ার আগেও কতবার যে হাত ধুই! আমার বউ কয়, হাত ধুইতে ধুইতে হাতটাই বিগড়াইয়া ফেলবা। কিন্তু হাত না ধুইলে মনডা কিচ্ছুতেই শান্ত অয় না।
ডাক্তার কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, — মন্টু মিয়া, আপনার ওসিডি অর্থাৎ অবসেসিভ-কমপালসিভ ডিসঅর্ডার হয়েছে।
মন্টু মিয়া অবাক হয়ে বললেন,– এইডা আবার কী রোগ? ডাক্তার বললেন, — সহজ ভাষায় বলি। ওসিডি এমন একটি মানসিক সমস্যা, যেখানে অনিচ্ছাকৃত কিছু চিন্তা, ভয় বা সন্দেহ বারবার মানুষের মনে আসে। এই চিন্তা থেকে অস্বস্তি কমানোর জন্য মানুষ একই কাজ বারবার করতে বাধ্য বোধ করে। আপনার মনে হচ্ছে বারবার হাত পরিষ্কার হয়নি—এটা হলো অবসেশন। আর সেই অস্বস্তি কমাতে বারবার হাত ধোয়া হলো কমপালশন।
মন্টু মিয়া মাথা নাড়লেন। — না ডাক্তার সাব, এইডা কোনো রোগ না। হাত ময়লা হইলে মানুষ হাত ধোয়!
ডাক্তার শান্তভাবে বললেন, — হাত ধোয়া রোগ নয়। কিন্তু হাত পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পরও যদি বারবার মনে হয় পরিষ্কার হয়নি এবং সেই কারণে আপনার স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়, তখন সেটি চিকিৎসার প্রয়োজন। একটু থেমে ডাক্তার আবার বললেন
— আর একটা কথা মনে রাখবেন, মন্টু মিয়া। ওসিডি হওয়ার সঙ্গে মানুষের লেখাপড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব—যে কারও এই সমস্যা হতে পারে। তাই লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই। এই রোগ শুধু বারবার হাত ধোয়ার মধ্যেই হয় এমন নয়। কারও ক্ষেত্রে বারবার পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার চিন্তা আসে, কারও ক্ষেত্রে বারবার দরজা-জানালা বন্ধ আছে কি না পরীক্ষা করার তাগিদ হয়, আবার কারও মনে অনিচ্ছাকৃত ভয় বা সন্দেহের চিন্তা বারবার আসতে পারে।
মন্টু মিয়া নিজের লাল হয়ে যাওয়া হাতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
— তাইলে ডাক্তার সাব, এই রোগ ভালো হইব?
— অবশ্যই। চিকিৎসা আছে। নিয়মিত থেরাপি, প্রয়োজন হলে ওষুধ এবং নিজের চেষ্টা—সব মিলিয়ে আমরা আপনার সমস্যাটা নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব। মন্টু মিয়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, — তাইলে আমি চিকিৎসা করুম। কিন্তু একটা কথা কন ডাক্তার সাব—আগের মতো কি আবার ঠিকঠাক হইতে পারুম? ডাক্তার মৃদু হেসে বললেন, — অবশ্যই। রোগটা আপনার জীবন চালাবে না; এবার আপনি আপনার জীবন চালাবেন।
মন্টু মিয়া দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। বের হওয়ার আগে নিজের হাতের দিকে একবার তাকালেন। তারপর বহুদিন পর হাত না ধুয়েই চেম্বার থেকে বেরিয়ে গেলেন।9 Comments-
-
আমরা শারীরিক অসুস্থতাকে যত সহজে মেনে নিই, মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে এখনও অনেক সংকোচ আছে। এমন গল্প মানুষের সেই সংকোচটা একটু হলেও কমাতে পারে। সুন্দর ও সচেতনতামূলক লেখা।
-
-
-
Friends
Sayed Mohammad Farid
@sayedmohammadfarid
মুহাম্মদ জে.এইচ রপ্পি
@e3be408dd3bbf0f44f453682891eb4cb
মানিকুল ইসলাম মানিক (কবি/সাহিত্যিক)
@manik123mmmgmail-com
রায়হানা জাকিয়া (নিঃসঙ্গ অ্যালবাট্রস)
@alonelyalbatross
Shojan Maria Shoche
@shojanmaria
কাশফিয়া নাহিয়ান
@kashfianahian
Alamgir Job
@alamgirjob
iampori
@iampori
ডাঃ মোঃ ইনজামামুল শিকদার
@mdinzamamulsikder


আপনার লেখাটি পড়ে মন্টু মিয়ার মনের অস্থিরতা এবং ডাক্তারের শান্ত প্রতিচ্ছবি বেশ হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘রোগটা আপনার জীবন চালাবে না; এবার আপনি আপনার জীবন চালাবেন’—এই বাক্যটি দারুণ এক আশার আলো ছড়িয়ে দেয়। নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে আপনি আপনার লেখনীকে আরও গভীর ও ঋদ্ধ করে তুলতে পারেন, যা ভবিষ্যতে আমাদের আরও মুগ্ধ করবে।