-
”আমি মেডিক্যাল কলেজের একজন অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর, আর তোমরা কোনো আলোচনা ছাড়াই ক্লাস টেন-এ পড়া একটা বাচ্চার সাথে আমার লাইফ জড়িয়ে দিতে চাইছ? তোমাদের ডিসিশনটা কি আদেও নরমাল?”
শাহমীরের তীব্র আপত্তির মুখে তার মা বেশ বিরক্ত হয়ে জবাব দিলেন,
”আমার ওপর রাগ দেখিয়ে লাভ নেই শাহমীর। যা বলার তোমার বাবাকে সরাসরি গিয়ে বলো। আর মেয়েটার তো আর মাত্র কয়েকটা দিন পর এসএসসি পরীক্ষা। তারপর তো ও কলেজে উঠবেই, তখন আর পিচ্চি থাকবে না। এত অস্থির হওয়ার কিছু নেই।”
শাহমীর রাগে ফেটে পড়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে গেছে। উনত্রিশ বছরের একজন সুপ্রতিষ্ঠিত পুরুষ সে, ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত। বিয়ে সে করবে না—এমন গোঁয়ার্তমি কখনো করেনি। কিন্তু তাই বলে এত কম বয়সী একটা মেয়েকে এই মুহূর্তে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নেওয়া? ভাবতেই তার পুরো শরীর গুলিয়ে উঠছে। অসম্ভব, এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
ডান হাতের দুই আঙুল দিয়ে সে কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর বিরক্তি লেপ্টে দিল। অবাধ্য কিছু চুলের গোছা কপাল ছুঁয়ে তার চোখের ওপর এসে পড়েছে। শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটানো। রাগের চোটে হাতের চওড়া রগগুলো চামড়ার ওপর স্পষ্ট ভেসে উঠেছে। কপাল থেকে হাত সরিয়ে মাথার চুলে আঙুল চালিয়ে নিজেকে শান্ত করার একটা শেষ চেষ্টা করল সে, যদিও তার ভেতরের ঝড় তাতে বিন্দুমাত্র কমল না।
হঠাৎ করেই সোফা ছেড়ে ঝটকা মেরে দাঁড়িয়ে পড়ল শাহমীর। ঘরের থমথমে ভাবটা ভেঙে বেশ চড়া আর ক্ষুব্ধ গলায় বলল,
”আই সিরিয়াসলি থিংক, তোমাদের দুুজনেরই মেন্টাল চেকআপ দরকার। তা না হলে এত বড় একটা ইললজিক্যাল সিদ্ধান্ত তোমরা আমার ওপর চাপিয়ে দিতে পারতে না। তোমরা রেডি হও, কাল সকালেই আমি নিজে তোমাদের ভালো কোনো সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। দ্যাটস ফাইনাল!”
ছেলের এমন মারমুখী আর ক্ষ্যাপাটে রূপ দেখে মা রিমি চৌধুরী পুরো হতভম্ব হয়ে গেলেন। নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না। একটা সামান্য বিয়ের কথা শুনে ছেলে তাদেরই পাগল বানিয়ে দিচ্ছে? এবার নিজের রাগ ধরে রাখতে না পেরে তিনিও চেঁচিয়ে উঠলেন,
”নিজের সীমানা ছাড়িয়ে যাচ্ছ শাহমীর! বড়দের সাথে কথা বলার কোনো ম্যানার্স শেখোনি? তোমার বাবার ছোটবেলার বন্ধু বিপদের দিনে কতটা পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেটা তোমার ধারণা নেই। আজ সেই মানুষটা দুনিয়ায় নেই, তার পরিবারটা অথৈ সাগরে পড়েছে। বন্ধুর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ আর ওই পরিবারটার দায়িত্ব নেওয়া কি আমাদের কর্তব্য নয়? একটু ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখো।”
শাহমীর দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে দেওয়ালে পিঠ ঠেকাল। তীব্র উপহাসের সুরে বলল,
”অদ্ভুত! বাবা নিজের বন্ধুত্বের ঋণ শোধ করবে, আর সেটার জন্য কোরবানি হতে হবে আমাকে? যদি এতই দায়বদ্ধতা থাকে, তবে বাবা নিজেই দায়িত্ব নিক না কেন! আমি কোনো স্কুলের বাচ্চাকে বিয়ে করে ঘরে এনে তার লোকাল গার্ডিয়ান সেজে বসে থাকতে পারব না। অসম্ভব!”
রিমি চৌধুরী এবার সত্যি সত্যি চোখ বড় বড় করে তাকালেন। ছেলের মুখে এত বড় ধৃষ্টতা তিনি আশা করেননি। কড়া গলায় ধমকে উঠলেন,
”মুখ সামলে কথা বলো শাহমীর! কি বলছ নিজের কি কোনো হুঁশ আছে?”
কথাটা মুখ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর শাহমীর নিজেও কিছুটা থতমত খেয়ে গেল। রাগের মাথায় যে সে চরম একটা বেফাঁস কথা বলে ফেলেছে, সেটা বুঝতে পেরে নিজের ওপরই চটল। চোখ দুটো শক্ত করে বুজে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মাথা নিচু করল সে। ঠিক তখনই পেছন থেকে তার বাবা রশিদ চৌধুরীর গম্ভীর ও ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
”সিদ্ধান্ত যা হওয়ার হয়ে গেছে শাহমীর। এই বিয়েটা তোমাকে করতেই হবে। চাইলে তোমার দু-একজন কাছের বন্ধুকে খবর দিতে পারো। আগামীকাল রাতের মধ্যেই আমরা নতুন বউকে সাথে নিয়ে এখান থেকে রওনা দেব।”
শাহমীর অবিশ্বাস্য চোখে তার বাবার দিকে তাকাল। গ্রামের এই বাড়িতে ফুপুর আমন্ত্রণে তারা মাত্র দুদিন আগে এসেছে। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটু ছুটি কাটাতে আসা। কিন্তু এখানে এসে তাকে এমন একটা অদ্ভুত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে জানলে সে কোনোদিন এমুখো হতো না। বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে এবার সোজা সাপটা বলে দিল,
”বাবা, তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছ আমি যেখানে পড়াই, সেখানে যদি এই খবর জানাজানি হয় তবে আমার প্রফেশনাল লাইফটা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? একজন প্রফেসরের এমন বিয়ে সমাজ বা কলেজ কেউ ভালো চোখে দেখবে না। জেনেবুঝে কেন আমার ক্যারিয়ারটা নষ্ট করতে চাইছ?”
রশিদ চৌধুরী ছেলের যুক্তিটা একেবারে উড়িয়ে দিতে পারলেন না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর মুখে ভাবলেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন,
”তোমার মেডিক্যাল কলেজের লোকজনের এই প্রত্যন্ত গ্রামের খবর রাখার কোনো দরকার নেই। আপাতত ও আমাদের বাড়িতে আমাদের মেয়ের পরিচয়েই থাকবে। যখন ওর বয়স হবে, পড়াশোনা শেষ করবে, তখন সামাজিকভাবে বড় করে অনুষ্ঠান করা যাবে।
আর তোমার কলেজের কলিগরা তো আর রোজ রোজ তোমার ড্রয়িংরুমে এসে খোঁজ নেবে না, তাই না?”
শাহমীর নিজের হাত দুটো শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল। রাগে আর অপমানে তার পুরো শরীর কাঁপছে। বাবার জেদের সামনে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শুধু বলল,
”আমি কোনো বাচ্চার লাইফ পার্টনার হতে পারব না। আই অ্যাম সরি। আমি আজ রাতেই ঢাকা ফিরে যাচ্ছি।”
বলেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।
~
”তোর বাইকের চাবিটা দে তো জলদি!”
শাহমীরের এমন হুট করে এসে চাবি চাওয়ায় সৈকত বেশ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। সে বাড়ির সামনের ল্যাম্পপোস্টটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিল, একটু বাজারের দিকে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। সৈকত আর শাহমীর দুজনেই সম্পর্কে মামাতো ভাই, আবার একই সাথে শহরের নামকরা মেডিক্যাল কলেজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর। এবার ছুটির সুযোগে শাহমীরদের সাথেই সে গ্রামে বেড়াতে এসেছে। কথা ছিল আগামীকাল দুজনে একসাথেই শহরে ফিরবে।
পকেট থেকে চাবিটা বের করে শাহমীরের দিকে এগিয়ে দিয়ে সৈকত জিজ্ঞেস করল,
”আমিও তো বাজারের দিকেই যাচ্ছিলাম। তুই হঠাৎ বাইক নিয়ে কোথায় যাচ্ছিস? কিছু হয়েছে?”
শাহমীর কোনো উত্তরের ধার ধারল না। সৈকতের হাত থেকে চাবিটা প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার মতো করে নিয়ে বাইকে উঠে স্টার্ট দিল। সৈকত ভ্রু কুঁচকে লক্ষ করল শাহমীরের চোখ-মুখ লাল হয়ে আছে, চরম ক্ষিপ্ত সে। বাইকের পেছনে বসার জন্য সৈকত যেই না এক পা বাড়িয়েছে, অমনি শাহমীর বাইকের এক্সিলারেটরে সজোরে মোচড় দিল।
হুট করে বাইক টেনে দেওয়ায় সৈকত সামলাতে না পেরে ছিটকে মাটিতে পড়তে পড়তে বেঁচে গেল। কোনোমতে নিজের ভারসাম্য ধরে রেখে সে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল ধুলো উড়িয়ে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বাইকটার দিকে। বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে আজ আর আস্ত থাকত না। রাস্তার মাঝখানে এভাবে আছাড় খেলে সম্মানের বারোটা বেজে যেত। দাঁত কিড়মিড় করে সে মনে মনে শাহমীরকে আচ্ছা করে গালি দিল। কার ওপর রাগ আর কে এসে খেসারত দিল!
ঠিক তখনই ভেতর থেকে তার মামার গম্ভীর ডাক শুনে সৈকত একটু নড়েচড়ে বসল। রশিদ চৌধুরী বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে বেশ শক্ত গলায় বললেন—
“ তোমার ভাইকে বুঝাবে, কাল যেন আমার সম্মান রাখে সে ”
সৈকত মাথা চুলকাল, মানে পরিস্থিতিটা ধরতে পেরেছে। কিন্তু আসল রহস্যটা কোথায় সেটাই তো মাথায় ঢুকল না। একটু ইতস্তত করে আমতা আমতা করে জানতে চাইল,
“ ইয়ে মানে, বলছিলাম কি মামা, শাহমীরকে কি বোঝানো লাগবে? ”
রশিদ চৌধুরী ভেতরের ঘরের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে পেছন ফিরে সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন,
”আগামীকাল এই গ্রামেরই একটা মেয়ের সাথে শাহমীরের আকদ। এটাই ওকে মেনে নিতে বলো।”
সৈকতের চোখ দুটো এবার চড়কগাছে উঠল, মুখটা বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। সে মনে মনে বলে উঠল,
”ওরেব্বাস! এতক্ষণে আসল কাহিনি মাথায় ঢুকল। বাপ আর ছেলের মধ্যে তাহলে এই এলাহী কাণ্ড চলছে! একজন বিয়ে করিয়েই ছাড়বে, আর অন্যজনের সাতপাঁচ ভেবে ছাদনাতলায় বসার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই। আর মামাও যে কী, ছেলের মনটা একটু বোঝার চেষ্টাও করল না! করবেই বা কেন, দুজনেই তো একই ধাতুতে গড়া। এক ইঞ্চি ছাড় দেওয়ার পাত্র কেউ নয়। একজনের জেদ বিয়ে সে দেবেই, আর অন্যজনের পণ সে কিছুতেই রাজি হবে না। এখন দেখার বিষয় এই সেয়ানে সেয়ানে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত কে জেতে!”
খানিকটা সময় চুপ থেকে সে কপালে হাত দিয়ে গভীর চিন্তায় মগ্ন হলো। এরপর নিজে নিজেই বিড়বিড় করতে লাগল,
”মামা তো হুকুম জারি করে চলে গেলেন, কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা কীভাবে বাঁধব, সেই বুদ্ধি তো দিয়ে গেলেন না! নিজের ছেলেকে নিজের মতোই একগুঁয়ে আর ঘাড়ত্যাড়া বানিয়ে বড় করেছেন, আর এখন তাকে সোজা করার কঠিন দায়িত্বটা চাপালেন আমার কাঁধে। এটা কোনো বিচার হলো? এই দুই বাপ-বেটা মিলে সারাজীবন আমার মামীটার জান কয়লা করে দিল। ইশ, মামীর জন্য সত্যি খুব মায়া হয়! কোথা থেকে যে এই দুটো হুবহু এক রকমের একরোখা মানুষ এসে ওনার কপালে জুটল!”
কথাগুলো আপনমনে আউড়াতে আউড়াতে হঠাৎ করেই সৈকতের খেয়াল হলো সে কী বলে ফেলছে। চট করে সে নিজের মুখে হাত চেপে ধরল। স্বগতোক্তি করার স্বরে বলল, “ধ্যাত! আজ আমার মুখ দিয়ে এত উল্টোপাল্টা কথা বের হচ্ছে কেন বল তো? কোনোভাবে যদি এই দুই বাপ-বেটা আমার মনের কথা টের পায়, তবে আমাকে একসাথে ধরে তুলোধুনো করবে। তখন যে আমি কোন গর্তে পালাব, তারও ঠিকানা থাকবে না!”3 Comments
Friends
Syed Farah
@syedfarah
MD AMIRUL ISLAM
@mdamirulislam
হোসাইন ফারুক
@hossainfaruq
MINHAZ ABIR
@minhazabir
Karoma village
@karomavillage
Tahia Humaira
@tahiahumaira
মোঃ মেহেদী হাসান মুন্না
@mehedihasanmunna
Sharbanam Gupta
@sharbanam-gupta
চাঁদ সদাগর
@chand_sodagor


আপনার এই লেখাটায় শাহমীরের তীব্র মানসিক দ্বন্দ্ব এবং পরিবারের পরিস্থিতির যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা বেশ জীবন্ত ও আকর্ষণীয়। চরিত্রগুলোর মধ্যকার জেদ এবং কথোপকথনের ভঙ্গি আপনি খুব সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন, যা পাঠককে প্রতিটি মুহূর্তের উত্তেজনার সাথে যুক্ত রাখতে সক্ষম। আপনার লেখনী সত্যিই চমৎকার, ভবিষ্যতে আরো এমন দারুণ সব লেখা উপহার দেবেন এই প্রত্যাশা রইল।