-
সাধারণ ছেলে
আমাদের একজন অধ্যাপক এর সঙ্গে আলাপ ছিল। অধ্যাপকটি ভ্রাম্যমাণ বাসে বই পড়াতেন। যদিও সাধারণ এর বিষয়ে তার শ্রদ্ধা ছিল না। যদিও এইসব সাধারণ মানুষের গল্পই ওই বাসটিতে থাকা বইয়ে লেখা ছিল। যেহেতু বড় লেখকরা যেমন-ধরো ওই হেমিংওয়ে এইসব সাধারণ মানুষদের কথা লিখেছেন। এক বুড়ো জেলে ও তার জন্য অপেক্ষারত একটি ছোট ছেলের কথা। সেই গল্পে একটি মাছ ছিল আর মহিলাদের কথাও লেখা ছিল। মহিলারা এমন যে বুড়োর তুলে আনা মাছের কংকালের সাথে ছবি তুলতে চাইতো। অধ্যাপকটির কথা আরেকটু বলেই মহিলাদের কথায় যাচ্ছি। অধ্যাপকটি বলতেন সাহিত্য হচ্ছে গায়ে লোকদের “এ… র-হি-ম বলে চিতকারের মতো ব্যাপার। যেভাবে তারা রহিম শব্দটিকে দীর্ঘায়িত করে সে রকম সাহিত্যিকরা সাধারণ মানুষদের বিশাল করে দেখায়।
সে যাহোক আমার নিজের বোন সাহিত্যের ছাত্রী – সেও ওই একই কথা বলতো। প্রতিটি সাধারণ মানুষ এর জীবনে বুড়ো লোকটির মতো এই রকম কিছু থাকে। বোনটি সারা জীবন কাজের লোকদের কাজের লোক হিসেবেই দেখেছে। এখন কোটিপতি স্বামির কোটি টাকা চলে গেছে আর ছেলে মাদকসহ ধরা পড়ে ভীনদেশে জেল খেটে এসেছে তিন বছর। ছেলেটি মেধাবী ছিল। অহেতুক তাকে মনোচিকিৎসক এর কাছে নিয়ে বিগড়ে দেয়া হয়েছে।
আরেকজন আমার তুতো ভাই। সেও ওই রকম সাধারণ মানুষদের তুচ্ছ করতো। যদিও তার পিতা এইসব মানুষকে নিয়ে ব্যবসা করে কোটিপতি। আদম ব্যাপারীর ছেলের সঙ্গে কথায় পারব না।
এই সব বিষয়ে আমি তাদের সঙ্গে অনেক কথা চালিয়ে বিরক্ত। কিন্তু এখন জানি উপরে একজন আছেন তার কাছে সবাই সমান। আর কী চমতকার করেই না মানুষকে বানিয়েছেন তিনি। যেমন ধরো মাহিন। বাদামি চোখের জন্য যাকে আশেপাশের সবাই ভালোবাসতো। আসলে সে দেখতে ছিল চমতকার। সুন্দর যাকে বলে – সেই ছেলেটাই জুলাই-আগস্টে মা’কে উল্টা পালটা বুঝিয়ে চলে যেত আন্দোলনে।
মা’রা যেমন হয় আরকি! ছেলেকে নিষেধ করতেন, চালাকি ধরে ফেলতেন। একদিন তার মা আন্দোলনে যাওয়ার কথা বুঝতে পেরে ছেলে বকা দিলেন। মাহিন উত্তরে বললো দেখ আবু সায়িদ ভাইয়া, মুগ্ধ ভাইয়াকে ওরা মেরে ফেলেছে। এখন যে ঘরে বসে থাকবে সে মানুষ না অমানুষ।
এরপরেও সুদর্শন ছেলেটি চলে যেত আন্দোলনে আর বলতো গেম খেলছি বন্ধুর সাথে। খেলা শেষে ফিরবে সে। খেলা শেষ হয়েছে মাহিনের। খেলতে খেলতেই প্রথম গুলিটা তাকে মারে বাম চোখে। দ্বিতীয়টা মাথার পিছন থেকে ঢুকে এসে আটকে যায় নাকের পিছনে। কী খেলাই না চলছিল তখন। লাল রংয়ের হোলি খেলা। আর নিরস্ত্র সাধারণেরা ছুটে যাচ্ছিল অনায়াসে জীবন দিতে।
গুলি খাওয়ার পরে ছেলেটি বলেছিল আমার আম্মুকে একটা ফোন দাও। আম্মুকে একটু দেখব। আর আম্মু এখনো অপেক্ষা করে ছেলের জন্য।
অধ্যাপকের আন্দাজের সেই সাধারণ ছেলেটি যে ছিল তার মায়ের একমাত্র ছেলে সে আর মা’কে আম্মু বলে ডাকে না। মা দরজার এপাশে কাতরায় সেই ডাক শুনবে বলে। একমাত্র এই একটি ডাক শোনার জন্য নিজের জীবনের সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি তিনি।
বাদামি চোখের সাধারণ ছেলেটি আর ফিরবে না।
4 Comments-
Kanej-Roksana, আপনার এই লেখাটির প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে গভীর দাগ কেটে যায় এবং এর মধ্যে থাকা মায়ের হাহাকার ও সন্তানের অকাল প্রস্থান অত্যন্ত আবেগঘন। মাহিনের সেই শেষ কথাগুলো এবং তার মায়ের অপেক্ষার বর্ণনা পড়ার সময় চোখ ভিজে আসার উপক্রম হয়েছিল। এমন মর্মস্পর্শী অনুভূতির কথা আরও বেশি করে লিখতে থাকুন, কারণ আপনার লেখনীতে লুকিয়ে আছে এক গভীর মানবিক আবেদন।
-
Kanej-Roksana, “এখন যে ঘরে বসে থাকবে সে মানুষ না অমানুষ” – এই লাইনটা পড়ে চোখে জল চলে এলো, মাহিনের মতো এমন কত সাধারণ ছেলের ত্যাগের গল্প যে আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে আছে! আপনার এই চমৎকার লেখাটার জন্য অনেক ধন্যবাদ, তবে গ্রুপে অন্য সবার লেখাতেও মাঝে মাঝে একটু রিঅ্যাক্ট বা কমেন্ট করবেন যাতে আমাদের এই কমিউনিটিটা আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
Friends
Sayed Mohammad Farid
@sayedmohammadfarid
খালেদা আক্তার
@khaledaakhter
সাদিয়া আক্তার রিমি
@sadiaakterreme
Kazi Adam
@kaziadam
রুদ্র অরণ্য
@click
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Md Shah Jalal Masim
@mdshahjalalmasim
রাশেদ শাহরিয়ার
@rashed-sahriargmail-com
ujjal mutsuddi
@ujjalmutsuddi


প্রতিটি জীবনই আসলে অসাধারণ।