Profile Photo

বিষণ্ন সুমনOffline

  • logolabbd
  • অরণ্যের শেষ প্রহর

    (অধ্যায় পাঁচ)
    পরদিন থেকেই রেজোয়ানের চলাফেরায় একটা পরিবর্তন দেখা গেল। আগের দিনের ঘটনাটা তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে, দিনের আলোয় দাঁড়িয়ে শক্তি দেখিয়ে এই লড়াই জেতা যাবে না। দুজন লোককে কয়েক সেকেন্ডে মাটিতে ফেলে দেওয়া তার কাছে কোনো বড় ব্যাপার নয়, কিন্তু সেই ঘটনার পর যদি কোম্পানি তাকে প্রকাশ্যে ঝামেলাপ্রবণ একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্ণেল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সুবিধাটা তাদের দিকেই যাবে।

    সে জানে, আইনগত লড়াইয়ে শুধু সত্যি থাকলেই হয় না, নিজের অবস্থানটাকেও পরিষ্কার রাখতে হয়। তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ তৈরি করা যত সহজ, পাহাড়ের ওপর চলতে থাকা অবৈধ নির্মাণ বন্ধ করা তত সহজ নয়। তাই এবার থেকে দিনের আলোয় রেজোয়ান অন্য মানুষ। সে কারও সঙ্গে তর্ক করবে না, কাউকে ভয় দেখাবে না, কাজের জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি করবে না। বরং সে এমনভাবে সরে দাঁড়াবে, যেন আগের দিনের ঘটনাটা ছিল সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝি। কিন্তু এই নীরবতার আড়ালে তার চোখ অন্য কাজ করতে শুরু করে দিল।

    খাগড়াছড়িতে তার একজন পুরনো পরিচিত মানুষ ছিল। বহু বছর আগে সামরিক জীবনে এই অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করার সময় পরিচয় হয়েছিল লোকটির সঙ্গে। তখনকার খাগড়াছড়ি আর এখনকার খাগড়াছড়ির মধ্যে অনেক পরিবর্তন এসেছে, নতুন রাস্তা হয়েছে, বসতি বেড়েছে, বাজার বড় হয়েছে, পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু পাহাড়ের ভেতরের অনেক পথ এখনো সেই আগের মতোই রয়ে গেছে।

    লোকটির নাম আবদুল করিম। বয়স এখন সত্তরের কাছাকাছি। শরীর আগের মতো নেই, চুল প্রায় সাদা, হাঁটার সময় বাঁশের লাঠি ব্যবহার করে, কিন্তু পাহাড়ের পথ সম্পর্কে তার জ্ঞান এখনো অসাধারণ। কোন ছড়াটা বর্ষায় ফুলে ওঠে, কোন ঢালে দুপুরের পর কুয়াশা জমে, কোন বাঁশঝাড়ের ভেতর পুরনো হাঁটার পথ আছে, কোন পাহাড়ি রাস্তা কোথায় গিয়ে অন্য পথের সঙ্গে মিশেছে, এসব তার কাছে মুখস্থ।

    সামরিক দায়িত্বে থাকার সময় করিমই একবার রেজোয়ানকে এই এলাকার ভেতরের কয়েকটা দুর্গম জায়গা চিনতে সাহায্য করেছিল। সেই সময়কার পরিচয় পরে বন্ধুত্বে পরিণত হয়েছিল। চাকরি বদলেছে, বছর কেটেছে, রেজোয়ান অবসর নিয়েছে, তবু সম্পর্কটা পুরোপুরি হারায়নি। বহু বছর আগে এই পাহাড়ে জমি কেনার সময়ও করিম তাকে জায়গাটা দেখতে সাহায্য করেছিল। সেই কারণেই এবার রেজোয়ান সরাসরি কোনো হোটেলে দীর্ঘদিন থাকার বদলে তার বাড়িতেই উঠল।

    করিমের বাড়িটা পাহাড়ের এক ঢালে, খুব সাধারণ একটা কাঠের ঘর। টিনের চাল বর্ষার বৃষ্টিতে বহুবার বদলানো হয়েছে, তবু পুরনো টিনের কয়েকটা অংশ এখনো রয়ে গেছে। সামনের ছোট উঠানে বাঁশের বেড়া, এক পাশে কলাগাছ, অন্য পাশে পেঁপে আর লেবুর গাছ। ঘরের পেছনে নেমে গেছে সবুজ ঢাল, তারও নিচে সরু একটা ছড়া। দুপুরের রোদে ছড়ার পানি ঝিলিক দেয়, আর সন্ধ্যার পর সেই একই জায়গা কালো অন্ধকারে মিলিয়ে যায়।

    কাছাকাছি আরও কয়েকটা পাহাড়ি বাড়ি থাকলেও রাতে দূরত্বের কারণে একটার আলো আরেকটা বাড়িতে পৌঁছায় না। বাতাসে বাঁশপাতা নড়ে, দূরে কোনো পাহাড়ি পাখি ডেকে ওঠে, কখনো কুকুরের ঘেউ ঘেউ ভেসে আসে, তারপর আবার চারপাশ এমন নিস্তব্ধ হয়ে যায় যেন মানুষ বলে কিছু এখানে কোনোদিন ছিলই না।

    রেজোয়ান কখনো করিমের বাড়িতে থাকে, কখনো নিজের গাড়ি নিয়ে খাগড়াছড়ি শহরের হোটেল মাউন্ট ইন-এ চলে যায়। সেখানে কয়েক ঘণ্টা থাকে, প্রয়োজনীয় কাজ সারে, কারও সঙ্গে দেখা করে, তারপর আবার পাহাড়ের দিকে ফিরে আসে। তার কোনো নির্দিষ্ট সময়সূচি নেই। কখনো সকালেই শহরে যায়, কখনো দুপুরে, কখনো বিকেলের পর। কখন কোথায় থাকবে, সেটা যেন তার নিজের কাছেও নির্দিষ্ট নয়। আসলে সে নিজেই নির্দিষ্ট করেই রাখেনি।

    তার লক্ষ্য একটাই, তাকে যেন কেউ সহজে অনুসরণ করতে না পারে। দিনের বেলায় রেজোয়ান পাহাড়টাকে নতুন করে দেখতে শুরু করল।

    এটা কোনো সাধারণ ঘোরাঘুরি ছিল না। একজন পর্যটক পাহাড়ে গেলে সৌন্দর্য দেখে, একজন সাধারণ জমির মালিক সীমানা দেখে, আর রেজোয়ান দেখছিল দুটোই, কিন্তু তার সঙ্গে আরও কিছু। সে দেখছিল চলাচলের সম্ভাব্য পথ, আড়াল, উচ্চতা, দূরত্ব, শব্দের প্রকৃতি, মাটির ধরন এবং মানুষের অভ্যাস।

    প্রথম দিন সে নিজের জমির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল না। দূরের একটা উঁচু ঢালে উঠে অনেকক্ষণ বসে থাকল। সেখান থেকে মেঘদূত মাউন্টেন রিসোর্টের কাজের জায়গার বেশিরভাগ অংশ দেখা যায়। নিচে মেশিন চলছে। লালচে মাটি কেটে বড় বড় স্তূপ তৈরি হচ্ছে। শ্রমিকেরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে কাজ করছে। কেউ বাঁশ কাটছে, কেউ পাথর সরাচ্ছে, কেউ রাস্তার পাশে মাটি চাপা দিচ্ছে। মাঝে মাঝে একটা ট্রাক এসে দাঁড়াচ্ছে, কয়েকজন লোক নেমে মালামাল নামাচ্ছে, তারপর আবার চলে যাচ্ছে।

    রেজোয়ান কিছুই করল না। শুধু দেখল। পরদিন সে অন্যদিকে গেল। তারপর আরও দূরে।

    একদিন একটা শুকনো ছড়ার ধার ধরে অনেকটা পথ হাঁটল। বর্ষার শেষে ছড়ায় পানি কমে এসেছে, কিন্তু পাথরের গায়ে এখনো ভেজা শ্যাওলা। কোথাও পানি হাঁটুর নিচে, কোথাও পাথরের ফাঁকে কালো গভীর গর্ত। সে হাঁটার সময় প্রতিটি পাথরের অবস্থান মনে রাখল। কোন জায়গায় পা রাখলে শব্দ হয়, কোথায় মাটি নরম, কোথায় শুকনো পাতা বেশি, কোথায় বাঁশঝাড়ের নিচে মাটি পরিষ্কার, এসব তার চোখে ধরা পড়তে লাগল।

    আরেকদিন সে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ওপরে উঠল। ঢালটা বাইরে থেকে যতটা খাড়া মনে হয়, ভেতর থেকে ততটা নয়। মাঝখানে কয়েকটা প্রাকৃতিক ধাপ আছে। একটা বড় গাছের শিকড় মাটির ওপর উঠে এসে পায়ের জন্য স্বাভাবিক আশ্রয় তৈরি করেছে। তার একটু ওপরে বাঁশঝাড়। আরও ওপরে গিয়ে একটা সরু সমতল জায়গা। সেখান থেকে নিচের রাস্তা দেখা যায়।

    রেজোয়ান জায়গাটা মনে রাখল। কোনো কাগজে লিখল না। তার প্রয়োজন নেই। মনে রাখার জন্য তার মাথাই যথেষ্ট।

    কয়েকদিনের মধ্যে পাহাড়টা তার কাছে বদলে গেল। আগে যেখানে সে শুধু পাহাড়, গাছ আর অরণ্য দেখত, এখন সেখানে সে একটা বিশাল জীবন্ত মানচিত্র দেখতে পাচ্ছে। কোথায় গেলে রিসোর্টের মূল কাজের জায়গা এড়িয়ে যাওয়া যায়, কোন পথটা নিচের রাস্তার সঙ্গে যুক্ত, কোথায় পাহাড়ি ছড়া প্রাকৃতিক বাধা তৈরি করেছে, কোন ঢাল থেকে পুরো এলাকা দেখা যায়, কোথায় দাঁড়ালে নিজেকে আড়াল করা যায়, এমনকি রাতের বাতাস কোন দিকে বেশি বইছে, তাও সে খেয়াল করতে লাগল।

    তার কমান্ডো প্রশিক্ষণ তাকে শিখিয়েছিল, প্রকৃতি কখনো নিরপেক্ষ থাকে না। যে মানুষ প্রকৃতিকে যত বেশী বুঝতে পারে, সে ততই তার সুবিধা নিতে পারে। পাহাড়ে এই সত্যটা আরও বেশি কার্যকরী

    এখানে দশজন মানুষ দশজনের শক্তি নিয়ে দাঁড়ালেই তারা শক্তিশালী হয়ে যায় না। যদি তাদের চলার পথে সীমাবদ্ধতা থাকে, যদি অন্ধকার তাদের চোখ থেকে আলো কেড়ে নেয়, যদি তারা জায়গাটাকে না চেনে, তাহলে সংখ্যাটা স্রেফ একটা সংখ্যাই মাত্র। অন্যদিকে একজন মানুষ যদি সময়, জায়গা আর গতি নিজের পক্ষে আনতে পারে, তাহলে সেই একজনই তখন যে কারো বা যে কোন দলের বিপক্ষে অনেক বড় শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

    রেজোয়ান জানত, তার বয়স কমেনি। বরং বেড়ে গিয়ে ইতিমধ্যে তা পঞ্চাশ পেরিয়ে গেছে।

    শরীর এখনো শক্ত, পেশিগুলো প্রশিক্ষিত, প্রতিক্রিয়া দ্রুত, কিন্তু সে আর এখন তরুণ নয়। তাই নিজের শক্তির ওপর অহংকার করার কোনো কারণ নেই তার। বরং বয়সের সঙ্গে এসেছে অভিজ্ঞতা। কোথায় ঝুঁকি নিতে হয় আর কোথায় ঝুঁকি এড়িয়ে যেতে হয়, এই পার্থক্যটা সে ভালোই জানে।

    রিসোর্টের লোকজনও তাকে মাঝে মাঝে দেখতে পেত। কখনো সে দূরের পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। কখনো আছে রাস্তার পাশে গাড়িতে বসে। আবার কখনো কোনো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলছে।

    তারা ভাবত, কর্ণেল সাহেব হয়তো জায়গাটা নিয়ে চিন্তিত। কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করবে, কিছু লোকজনের সঙ্গে কথা বলবে, তারপর ঢাকায় ফিরে যাবে।

    এই ধারণাটা রেজোয়ান বদলাতে চাইল না। বরং আরও শক্ত করল।

    একদিন দুপুরে সে এমন একটা জায়গায় বসে ছিল, যেখান থেকে রিসোর্টের প্রধান প্রবেশপথ দেখা যায়। নিচে কাজ চলছে। মেশিনের শব্দ পাহাড়ের ঢালে প্রতিধ্বনিত হয়ে বারবার ফিরে আসছে। গরম রোদে কাটা লাল মাটি প্রায় আগুনের মতো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। শ্রমিকদের মাথায় গামছা, কেউ ঘাম মুছছে, কেউ বোতল থেকে পানি খাচ্ছে। একটা ট্রাক ধীরে ধীরে ঢাল বেয়ে উঠল, চাকার নিচে মাটি চেপে গিয়ে গভীর দাগ তৈরি হলো।

    রেজোয়ান লক্ষ্য করল, দুপুরের পর কাজের গতি একদম কমে যায়। তারপর বিকেলের দিকে আবার বাড়ে। আবার সূর্য নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন শ্রমিক এখান থেকে চলে যায়।

    কিন্তু সবাই যায় না। কিছু লোক থেকে যায়। তাদের মধ্যে কয়েকজন পাহারা দেয়।

    রেজোয়ান সেদিন প্রথমবার বুঝল, রাতের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানে খুব সাধারণ।

    পরদিন সে আবার এল। এবার অন্য দিক দিয়ে। তারপর আরেকদিন।

    এভাবে কয়েক রাত ধরে দূর থেকে সে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করল।

    কোথায় আলো জ্বলে। কোথায় আলো পৌঁছায় না।

    কোন পাহারাদার একা হাঁটে। কোন দুজন একসঙ্গে থাকে।

    কে বেশি সতর্ক। কে কথা বলতে বলতে হাঁটে। কে বারবার পেছনে তাকায়।

    কে নিজের টর্চের আলো মাটির ওপর রাখে, আর কে আলো ছুড়ে চারপাশ দেখে।

    এসব ছোট ব্যাপার। কিন্তু রেজোয়ানের কাছে কোন কিছুই ছোট নয়। সে জানে একজন মানুষের হাঁটার ভঙ্গি থেকেও অনেক কিছু বোঝা যায়।

    রাতে সে কখনো নিজের গাড়িতে বসে দূর থেকে কাজের পুরো এলাকাটা দেখত। কখনো পাহাড়ের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকত। কখনো আবার একেবারেই আসত না। তার উপস্থিতি সম্পর্কে একটা অস্পষ্টতা তৈরি হতে লাগল।

    রিসোর্টের লোকজন জানত, রেজোয়ান আশপাশে আছে। কিন্তু ঠিক কোথায় আছে, সেটা তারা জানত না। মূলতঃ এটাই ছিল তার প্রথম লক্ষ্য।

    এক সন্ধ্যায় পাহাড়ের চূড়ার ওপর দাঁড়িয়ে রেজোয়ান সূর্য ডোবার দৃশ্য দেখছিল। খাগড়াছড়ির পাহাড়ে সূর্যাস্ত সমতলের মতো নয়। আলোটা ধীরে ধীরে হারিয়ে যায় না, বরং পাহাড়ের একটার আড়ালে আরেকটা পাহাড় উঠে এসে আলোকে টুকরো টুকরো করে ফেলে।

    পশ্চিম আকাশে কমলা রঙের একটা সরু রেখা ছিল, তার নিচে পাহাড়গুলো কালচে হয়ে উঠছিল। বাঁশঝাড়ের মাথাগুলো বাতাসে দুলছিল। দূরের কোনো পাহাড়ি গ্রাম থেকে ধোঁয়া উঠছিল, সম্ভবত রাতের রান্না শুরু হয়েছে। কোথাও একটা মোরগ অকারণে ডেকে উঠল। নিচে ছড়ার পানিতে অন্ধকার হওয়ার আগে শেষবারের মতো আলো প্রতিফলিত হলো।

    রেজোয়ান অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে নিচে নামল।

    সেদিন রাতে করিমের বাড়িতে ফিরে পুরনো একটা নোটবুক খুলল সে। পাতাটা একেবারে সাদা। সে কলম হাতে নিয়ে কয়েকটা শব্দ লিখল। ছড়া। উঁচু ঢাল। বাঁশঝাড়। পুরনো পথ। নতুন রাস্তা। কাজের এলাকা। পাহারার জায়গা।

    তারপর কলমটা বন্ধ করে নোটবুকটাও বন্ধ করল। এর বেশি লেখার প্রয়োজন নেই।

    রেজোয়ান জানে, পাহাড়ে লড়াই করতে গেলে শুধু অস্ত্র নয়, জায়গাটাকেও বুঝতে হয়। কোথায় দাঁড়ালে নিজেকে দেখা যাবে না, কোথা দিয়ে গেলে শব্দ কম হবে, কোথায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য কাউকে আটকে রাখা যায়, কোথায় মাটি পিচ্ছিল, কোথায় ঢাল ভেঙে পড়তে পারে, এসব জানা থাকলে পাহাড় নিজেই বিশ্বস্ত সহযোগী হয়ে ওঠে।

    তবে তার পরিকল্পনায় কোন হত্যা ছিল না।

    কোম্পানির লোকজন তাকে যতই বিরক্ত করুক, যতই তার জমিতে ঢুকুক, সে জানে তার সীমাটা কোথায়। কাউকে মেরে ফেলে সমস্যার সমাধান করা যায় না। বরং তখন সমস্যাটা আরও প্রকট হয়।

    তার উদ্দেশ্য একটাই। তাদের বোঝানো, এই পাহাড়ে রেজোয়ানের অনুমতি ছাড়া তার নিজের জমিতে ঢোকা নিরাপদ নয়।

    এরপর কয়েকটা রাত কেটে গেল। রিসোর্টে কাজ চলল স্বাভাবিক গতিতে। দিনের বেলায় মেশিনের শব্দ। শ্রমিকদের হাঁকডাক। ট্রাকের চলাচল। বাঁশ কাটার শব্দ। পাথর ভাঙার শব্দ।

    কিন্তু রাত নামলে পাহাড়টা আবার নিজের চেহারায় ফিরে যায়। অন্ধকারের মধ্যে দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাঁশপাতার ঘর্ষণ, ছড়ার পানির শব্দ আর মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক শুনা যায়।

    রিসোর্টের কাজের জায়গায় কয়েকটা বাতি জ্বলত। কিন্তু সেই আলো পাহাড়ের অন্ধকারকে পুরোপুরি সরাতে পারত না। বরং আলোর পরিধির বাইরে আরও ঘন অন্ধকার তৈরি হতো।

    সেই রাতেও আকাশে চাঁদ ছিল না। মেঘে আকাশ ঢাকা। হালকা বাতাস বইছিল।

    রিসোর্টের এক পাহারাদার টর্চ হাতে কাজের জায়গা থেকে একটু দূরে বের হলো। তার দায়িত্ব ছিল সীমানার একটা অংশ ঘুরে দেখা। লোকটা এই কাজে নতুন নয়, বরং কয়েকদিন ধরেই করছে। হাতে শক্তিশালী টর্চ, কোমরে বাঁশের লাঠি। সে আলোটা সামনে ফেলে ধীরে ধীরে হাঁটছিল।

    রিসোর্টের আলোয় প্রথমে তাকে দেখা যাচ্ছিল। তারপর সে বাঁশঝাড়ের কাছে পৌঁছাল। তার হাঠার তোড়ে আলোটা বাঁশের কা-ে পড়ে এদিক-ওদিক ছুটে বেড়াল।

    লোকটা অন্ধকারের মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর আর তাকে দেখা গেল না। কিছুক্ষণ বাদেও সে ফিরে এল না।

    প্রথমে কেউ ব্যপারটা গুরুত্ব দিল না। ভাবল, হয়তো অন্যদিকে গেছে। এভাবে আরও কিছু সময় কেটে গেল।

    তারপর একজন পাহারাদার বলল, “ও এখনো ফিরল না কেন?”

    আরেকজন টর্চ হাতে উঠে দাঁড়াল। দুজন মিলে তাকে খুঁজতে বের হলো।

    অরণ্যের ভেতর টর্চের আলো কেটে কেটে এগোতে লাগল। শুকনো পাতার ওপর পায়ের শব্দ হচ্ছিল। বাঁশঝাড়ের ভেতর বাতাস ঢুকে বাঁশগুলোকে একে অন্যের সঙ্গে ঘষে অদ্ভুত কর্কশ শব্দ তৈরি করছিল।

    তারা বারবার তার নাম ধরে ডাকল। কোনো উত্তর নেই। আরও কিছুদূর গিয়ে একজন হঠাৎ থেমে গেল। মাটিতে একটা টর্চ পড়ে আছে। আলো এখনো জ্বলছে।

    টর্চটা কাদার ওপর পড়ে সামান্য কাত হয়ে আছে, তার আলো একটা ঝোপের গোড়ায় স্থির হয়ে রয়েছে। কিন্তু পাহারাদার নেই।

    দুজন লোক একে অপরের দিকে তাকাল। এই প্রথম তাদের মনে হলো, ব্যাপারটা স্বাভাবিক নয়। শেষাবধি সারা রাত খোঁজ করেও তার কোন হদিস পাওয়া গেল না।

    ভোরে আরও লোক নামল। পাহাড়ের ঢাল, ছড়া, বাঁশঝাড়, পুরনো পথ, সবদিকে খোঁজা হলো।

    সূর্য ওঠার পর পাহাড়ের চেহারা বদলে গেল। রাতের ভয় কিছুটা কমল, কিন্তু অরণ্য তখনও ঘন। ভেজা পাতার ওপর সকালের আলো, মাটিতে কুয়াশার শেষ ছাপ, গাছের ডালে জমে থাকা পানির ফোঁটা, সবকিছু এত স্বাভাবিক যে আগের রাতের ঘটনাটা যেন বিশ্বাসই হতে চায় না।

    শেষ পর্যন্ত রিসোর্টের জায়গা থেকে অনেক দূরে, একটা নিচু ঢালের পাশে ঘন ঝোপের মধ্যে তাকে পাওয়া গেল। সম্পূর্ণ অচেতন।

    জামাকাপড় কাদায় ভরা। মাথার পাশে শুকনো রক্ত। ডান পায়ের নিচের অংশ ফুলে গেছে। একটা হাত শরীরের নিচে আটকে ছিল।

    তাকে তুলে আনার সময়ও তার জ্ঞান ফেরেনি।

    পরে দুপুরের দিকে জ্ঞান ফিরলে সে চারপাশে তাকিয়ে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল, সে আসলে কোথায়।

    কেউ জানতে চাইল, “কী হয়েছিল?”

    লোকটা চোখ বন্ধ করে আবার খুলল। তার মুখে ভয়। “আমি কিছুই দেখিনি।”

    “তাহলে পড়ে গেলে কীভাবে?”

    লোকটা মাথা নাড়ল। “আমি জানি না।” কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে শুধু বলল, “মনে হলো সামনে কেউ ছিল। তারপর…” কথাটা শেষ করল না।

    “কেউ ছিল?”

    লোকটা আতঙ্কিত চোখে অরণ্যের দিকে তাকাল। “কেউ ছিল কি না, তাও জানি না। হঠাৎ মাথায় এমন একটা আঘাত লাগল… মনে হলো একটা আস্ত গাছ ওপর থেকে পড়ল। তারপর আর কিছু মনে নাই।”

    চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল। কারও কাছে কোনো উত্তর নেই।

    সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার, লোকটাকে যেখানে পাওয়া গেছে, সেটা রিসোর্টের কাজের এলাকা থেকে এতটা দূরে যে আহত অবস্থায় নিজের পায়ে সেখানে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব। আর তার টর্চ পাওয়া গেছে আরও অনেক দূরে।

    সেদিন বিকেলে রিসোর্টে কাজ চলল ঠিকই। মেশিন চলল। শ্রমিকরা মাটি কাটল। ট্রাক এল।

    কাজ থামেনি। কিন্তু মানুষের মুখের হাবভাব বদলে গেছে। হাসি কমে গেছে। কথা বলার সময় সবাই আড়চোখে অরণ্যের দিকে তাকাচ্ছে।

    যে পাহাড়কে সকালে তারা শুধু কাজের জায়গা হিসেবে দেখেছিল, সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে সেটাই যেন তাদের কাছে অন্য কিছু হয়ে উঠল।

    আর সেই বিকেলে, রিসোর্টের অনেক দূরের একটা উঁচু ঢালে দাঁড়িয়ে রেজোয়ান নিচের কাজের জায়গাটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

    তার মুখে কোনো বিজয়ের হাসি নেই। চোখেও নেই উত্তেজনা। শুধু গভীর স্থিরতায় ঢাকা একফালি দৃষ্টি লেগে ছিল তাতে।
    (চলবে)

    2
    4 Comments
    • ধৈর্য, কৌশল আর প্রকৃতিকে বোঝার এই যুদ্ধকৌশল পড়ে মুগ্ধ হলাম। পরের অধ্যায়ের অপেক্ষায় রইলাম!

    • আপনার অরণ্যের এই রহস্যময় এবং ধীরস্থির বর্ণনাটি পড়ে খুব ভালো লাগল, বিশেষ করে ‘অন্ধকারের মধ্যে দূরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, বাঁশপাতার ঘর্ষণ, ছড়ার পানির শব্দ আর মাঝে মাঝে কোনো অচেনা পাখির ডাক শুনা যায়’—এই অংশটুকু যেন চোখের সামনে আস্ত একটা জঙ্গল তৈরি করে দেয়। আপনার বর্ণনায় পাহাড়ের নীরবতাকে যেভাবে একটি শক্তিশালী চরিত্রের মতো ফুটিয়ে তুলেছেন, তা অনেকটা প্রিয় কোনো ধ্রুপদী গল্পের অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দেয়, তাই এমন চমৎকার এক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আপনাকে সাধুবাদ জানাই। প্রতিটি শব্দে যে সতর্কতা এবং কৌশলের ছাপ আপনি রেখেছেন, তা পাঠককে মুহূর্তেই গল্পের গভীরে টেনে নিয়ে যায়। আপনি এভাবেই মনের আনন্দে লিখে যান এবং অরণ্যের প্রতিটি পরত আপনার লেখনীর মাধ্যমে আমাদের সামনে উঠে আসুক, এই কামনাই করি।

    • নীরব প্রতিরোধের আড়ালে পাহাড়ের রহস্য আরও গভীর হয়ে উঠেছে…..🤍🖤

    • বিষণ্ন সুমন, আপনার অরণ্যের শেষ প্রহরের এই রহস্যময় আর টানটান উত্তেজনার পর্বটি পড়ে শেষ করার পর সত্যি বলতে এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করছি।

আমি মানুষের ভীড়ে মানুষ খোঁজে ফিরি

বিষণ্ন সুমন

ডিজাইনার

স্কুল বয়েস থেকেই লিখালিখা করি। যদিও পড়ি তার আগে থেকেই। আমি বিশ্বাস করি, ভালো লিখতে হলে আগে ভালো পড়তে জানতে হবে। তাই এখন পর্যন্ত নিজেকে লেখক না ভেবে ভালো পাঠক হিসেবেই পরিচয় দিতে সাচ্ছন্দ্য বোধ করি। প্রথম প্রকাশিত বই সেই ১৯৯৬ সালের গ্রন্থমেলায় “কে বলে তুমি নেই” রোমান্টিক উপন্যাস এবং সম্পূর্ণ মৌলিক ওয়েস্টার্ণ “লোন রাইডার”। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বই মেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত গল্প সংকলন। মাঝে banglanews24.com এর সাহিত্যপাতায় নিয়োমিত লিখেছি। আসলে আমি লেখায় কখনোই অনর্গল নই। মাঝেমাঝেই বন্ধাত্ব্য এসে আমায় থামিয়ে রাখে। একটা শব্দও লিখতে পারিনা। তখন আমার পুরনো লিখাগুলো নিজেই পাঠক হয়ে পড়ি আর ভাবি, এ গুলো কি সত্যিই আমি লিখেছিলাম(?)। এই ৫৪ বছর বয়সে এসেও এই একটাই প্রশ্ন নিজেকে করে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

Skip to toolbar