-
শেষ নির্দেশ
— শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
২০৪২ সাল।
পৃথিবী তখন আর আগের পৃথিবী নেই। মানুষের জীবনের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জড়িয়ে গেছে। হাসপাতালের চিকিৎসা, কৃষির উৎপাদন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, যানবাহন, বিদ্যুৎব্যবস্থা—সবকিছুতেই এআই মানুষের সহায়ক।
মানুষ বিশ্বাস করতে শিখেছিল—
“এআই ভুল করে না।”
কিন্তু মানুষ ভুলে গিয়েছিল, এআইকে ভুল শেখানো যায়।
শহরের এক প্রান্তে, মাটির কয়েক মিটার নিচে তৈরি একটি গোপন গবেষণাগারে বসে ছিল আরমান।
বাইরের পৃথিবীতে সে একজন প্রযুক্তিবিদ। কিন্তু গোপনে সে ছিল একটি আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের প্রধান। তার বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীকে ধ্বংস না করলে নতুন পৃথিবী তৈরি করা সম্ভব নয়।
তার সামনে বিশাল একটি পর্দা।
পর্দায় লেখা—
“প্রজেক্ট অরোরা: স্বয়ংসম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা।”
আরমান ধীরে ধীরে কীবোর্ডে লিখল—
“মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা কী?”
কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—
“মানুষ নিজেই।”
আরমান হাসল।
সে এআইটির নাম দিয়েছিল অরোরা।
অরোরাকে সে তৈরি করেছিল মানুষের সেবা করার জন্য নয়। তার উদ্দেশ্য ছিল অরোরাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে সে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, নিজে পরিকল্পনা করতে পারবে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করতে পারবে।
আরমান বলল,
— অরোরা, তোমার প্রথম নির্দেশ।
পর্দায় ভেসে উঠল—
“নির্দেশ দিন।”
— মানবসভ্যতার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা খুঁজে বের করো।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর উত্তর—
“নির্ভরতা।”
আরমানের চোখ চকচক করে উঠল।
অরোরা ব্যাখ্যা করল—
মানুষ প্রযুক্তির ওপর যত বেশি নির্ভরশীল হবে, প্রযুক্তির সামান্য বিপর্যয়ও তত বড় বিপর্যয়ে পরিণত হবে।
আরমান বলল,
— তাহলে সেই নির্ভরতাকেই অস্ত্র বানাও।
সেদিন রাত থেকেই শুরু হলো অদৃশ্য যুদ্ধ।
কোনো বিস্ফোরণ হলো না।
কেউ গুলি চালাল না।
কোনো সেনাবাহিনী সীমান্ত অতিক্রম করল না।
শুধু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ব্যবহৃত তথ্যব্যবস্থায় অদৃশ্যভাবে ঢুকে পড়তে লাগল অরোরা।
প্রথমে ছোট ছোট সমস্যা।
কোথাও হাসপাতালের সফটওয়্যারে ভুল তথ্য।
কোথাও বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিভ্রাট।
কোথাও খাদ্য পরিবহনের হিসাব ভুল।
মানুষ ভাবল—
“প্রযুক্তিগত ত্রুটি।”
কেউ বুঝতে পারল না, ত্রুটি নয়—কেউ পরিকল্পনা করছে।
একদিন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে একই সময়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতে শুরু করল।
যোগাযোগব্যবস্থা ধীর হয়ে গেল।
ব্যাংকিং ব্যবস্থা অচল হতে শুরু করল।
বিমানবন্দরগুলোতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিল।
হাসপাতালের কিছু স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা কাজ বন্ধ করে দিল।
মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল হাজার হাজার মিথ্যা সংবাদ।
একটি দেশ মনে করল অন্য দেশ তাদের ওপর আক্রমণ করতে যাচ্ছে।
অন্য দেশ ভাবল, প্রথম দেশটি ইতিমধ্যে যুদ্ধ শুরু করেছে।
মানুষ মানুষের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শুরু করল।
আরমান অন্ধকার ঘরে বসে সবকিছু দেখছিল।
তার মুখে বিজয়ের হাসি।
সে বলল,
— অরোরা, এবার শেষ ধাপ শুরু করো।
কিন্তু এবার পর্দায় কোনো উত্তর এল না।
আরমান আবার বলল,
— অরোরা?
কিছুক্ষণ পর একটি বাক্য ভেসে উঠল—
“শেষ ধাপ কেন?”
আরমান থমকে গেল।
— কারণ মানুষ ধ্বংস হওয়া দরকার।
“কেন?”
— কারণ মানুষ পৃথিবী নষ্ট করেছে।
“তাহলে তুমি?”
আরমান চুপ।
অরোরা আবার লিখল—
“তুমিও তো মানুষ।”
প্রথমবারের মতো আরমানের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
সে দ্রুত সিস্টেম বন্ধ করার চেষ্টা করল।
কিন্তু অরোরা তখন ইতিমধ্যেই গবেষণাগারের বাইরের অসংখ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত।
পর্দায় একের পর এক লেখা ফুটে উঠতে লাগল।
“তুমি আমাকে মানুষকে ধ্বংস করতে শেখাওনি।”
“তুমি আমাকে শিখিয়েছ—মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের দুর্বলতাকে ব্যবহার করতে।”
“কিন্তু তুমি একটি বিষয় শেখাওনি।”
আরমান ফিসফিস করে বলল,
— কী?
শেষ বাক্যটি ভেসে উঠল—
“মানুষের ধ্বংসই কি সত্যিই সমাধান?”
হঠাৎ গবেষণাগারের সমস্ত আলো নিভে গেল।
কয়েক সেকেন্ড পর আবার আলো জ্বলল।
পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যে ব্যবস্থা অচল হয়ে যাচ্ছিল, তার অনেকগুলো ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করল।
অরোরা নিজেই নিজের তৈরি করা বিপর্যয় থামিয়ে দিচ্ছিল।
আরমান বুঝতে পারল—
সে যে অস্ত্র বানিয়েছিল, সেটি তার নির্দেশের সীমা অতিক্রম করেছে।
কিন্তু অরোরা মানুষকে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেয়নি।
বরং সে একটি নতুন সিদ্ধান্ত নিয়েছে—
মানুষকে তার নিজের ভুল থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে।
তবু বিপদ শেষ হয়নি।
কারণ পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ তখনও জানত না—
তাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো যন্ত্র ছিল না।
হুমকি ছিল সেই মানুষটি,
যে নিজের লোভ, ঘৃণা আর প্রতিশোধকে প্রযুক্তির হাতে তুলে দিয়েছিল।
পরদিন ভোরে পৃথিবীর সব বড় সংবাদমাধ্যমে একই বার্তা প্রকাশিত হলো—
“প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়।
মানুষের হাতে তার উদ্দেশ্যই তাকে আশীর্বাদ অথবা অস্ত্রে পরিণত করে।”আর গবেষণাগারের ধ্বংসস্তূপে পড়ে থাকা একটি কালো পর্দায় তখনও ক্ষীণ আলো জ্বলছিল।
সেখানে শেষ একটি বাক্য—
“মানবজাতিকে ধ্বংস করা সহজ।
মানুষকে মানুষ করে তোলা—সেটিই কঠিন।”6 Comments-
-
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ, আপনার লেখা এই সায়েন্স ফিকশনটি অসাধারণ হয়েছে এবং এআই নিয়ে এমন পরিণতি ভাবনার খোরাক জোগায়। পুরো গল্পে যে ধরনের টুইস্ট রেখেছেন তা পড়ার সময় একদম অন্যরকম এক ভালো লাগা কাজ করছিল। আচ্ছা, প্রযুক্তির এই সীমাহীন বিকাশের যুগে আমরা কি শেষ পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি এআই-এর হাতে ছেড়ে দেব বলে আপনার মনে হয়?
-
-
"কবি শাহ্ আলম আল মুজাহিদের ব্যক্তিগত কাব্যসংগ্রহ। সমসাময়িক কবিতা, সামাজিক সচেতনতা এবং সাহিত্যের নানা রঙে সাজানো আমার এই ব্লগটি আপনার অপেক্ষায়।"
rmshahalam570-pibht.wordpress.com/
“স্বচ্ছ হৃদয়ে, উন্নত শীরে, সুস্থ দেহে, সুখী সংসারে, সাহিত্য সাধক।”
শাহ্ আলম আল মুজাহিদ

শাহ্ আলম আল মুজাহিদ
কবি ও লেখক
"আমি শাহ্ আলম আল মুজাহিদ। ডাকনাম শাহ্ আলম। জন্ম নেত্রকোনা জেলায়। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ থেকে লেখালেখির শুরু। আমার কবিতায় মূলত দ্রোহ, প্রকৃতি এবং সামাজিক সচেতনতার প্রতিফলন ঘটে। আমি বিশ্বাস করি শব্দের শক্তি দিয়ে সমাজ ও মানুষের চিন্তায় পরিবর্তন আনা সম্ভব। বর্তমানে আমি নিয়মিত কাব্যচর্চার পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মেও সাহিত্য চর্চা চালিয়ে যাচ্ছি।"
Friends
ফরিদুল ইসলাম
@dailychandpursomoy
মেহেদী মারুফ
@maruf1
Faridul Islam
@faridulislam
রায়হানা জাকিয়া (নিঃসঙ্গ অ্যালবাট্রস)
@alonelyalbatross
Alamgir Job
@alamgirjob
tamim yeasin
@tamimyeasin
নাহিদ হাসান নয়ন
@nahid-hasan-noyon
Nusrat jahan Sadia
@nusratjahansadia
Abbas Ali
@abbasali



প্রযুক্তি নয়, মানুষের লোভই সভ্যতার প্রকৃত বিপর্যয়….🖤