-
যেখানে কোনো পতাকা নেই
আঁধার তখন ধীরে ধীরে ঘনীভূত হচ্ছে চটের ছাউনিটার ওপর। টিনের থালায় এক মুঠো ঠান্ডা ভাত মাখতে মাখতে মেহেরুন হাত দুটো চেপে রাখলেন। ওপাশে বসে থাকা সাত বছরের মেয়েটা অপলক চোখে মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। কতদিন পর ভাত! এই কিছুদিন আগেও তো রাতে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে পাওয়া দুই মুঠো চাল কিংবা আটার গন্ধই ছিল মেহেরুনদের আস্ত এক সুখের সংসার।
কিন্তু এক রাতেই যেন এক হিংস্র ঝড় এসে মেহেরুনদের জীবন থেকে স্বস্তির আকাশটুকু কেড়ে নিল। অপরাধ? মেহেরুনের মুখে বাংলা ভাষা। যে ভাষা তাঁর বাপের, দাদার, প্রজন্মের পর প্রজন্মের—যে ভাষার টানে তিনি এই মাটির গন্ধে শিকড় চিনেছিলেন। এক ঝাঁক সাদাপোশাকের মানুষ এসে তুলে নিয়ে গেল তাঁকে। জন্মসনদ, আধার কার্ড, ভোটার তালিকা—সব কাগজের স্তূপ রাষ্ট্রযন্ত্রের বুটের নিচে এক লহমায় অর্থহীন হয়ে গেল। ভূখণ্ডের অধিপতিরা বলল, ‘ওগুলো শুধুই কাগজের টুকরো। তোর ভাষাটাই তো তোর অপরাধ।’
কোনো বিচারালয়ের বারান্দায় দাঁড়াতে দেওয়া হয়নি, কোনো শুনানি হয়নি। পাঁচ দিনের অন্ধকার কুঠুরি শেষে এক মধ্যরাতে মেহেরুনকে ঠেলে দেওয়া হলো কাঁটাতারের নো ম্যানস ল্যান্ডে। পেছনে ফেলে আসা ছোট ছেলেটার অবোধ কান্না আর সামনে এক নিশুতি রাতের কাদা-জল। রাষ্ট্রের এক অদৃশ্য সংকেতে মেহেরুনের গা থেকে নাগরিকত্বের নামাবলী খুলে নিয়ে ঠেলে দেওয়া হলো অজানায়।
সে এক ছায়াহীন রাজ্য। যেখানে কোনো মানচিত্র নেই, কোনো জাতীয় পতাকা নেই, কোনো আইন বা মানবাধিকারের বড় বড় বুলি নেই। সেখানে আছে কেবল সীমানা পাহারা দেওয়া কঠিন রাইফেল আর খোলা আকাশের নিচে মানুষের চরম লাঞ্ছনা। মেহেরুন দেখলেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা যাকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’র তকমা দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকে, প্রকৃতি আর স্রষ্টার বিচারে সে কেবলই এক রক্তাক্ত মানুষ। কাদা-মাটি আর বৃষ্টিতে ল্যাট্রিনের কোনো ব্যবস্থা নেই; অন্ধকারের পর্দাকেই সম্ভ্রম ভেবে খোলা চরে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কাঁটাতার কীভাবে মানুষের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, তা এই ভূখণ্ডহীন ভূমিতে না দাঁড়ালে বোঝা যায় না।
অবশেষে মেহেরুন ঠাঁই পেলেন এপারের এক সাধারণ কৃষকের ভাঙা ভিটেয়। যে রাষ্ট্র ও তার নিয়মকানুন নথি দেখে মানুষকে চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হলো, মাটির গন্ধে চেনা এক পরম অচেনা মানুষ তাঁকে কোনো শর্ত ছাড়াই আপন করে নিল। এপারের মাটির সুবাস আর ওপারের বাতাসের গতি তো একেবারেই এক। মাঝখানে কেবল মানুষেরই আঁকা কিছু বিষাক্ত রেখা আর পাসপোর্টের কৃত্রিম দেওয়াল।ওপারে ছেঁড়া নথিপত্র নিয়ে ছেলেটা আদালতের দুয়ারে ঘোরে। রাষ্ট্র তার নিজ আইনি দলিলে হিসাব কষে, নোটিশ পাঠায়, সময়ক্ষেপণ করে। কিন্তু নদীর চরে বসে মেহেরুন অন্য হিসাব কষেন। জলের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবেন—স্রষ্টা তো পুরো পৃথিবীটাই বানিয়েছিলেন মানুষের নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য। এই নদী, এই হাওয়া, এই সুবিশাল মাটি—কোথাও তো সীমানার দাগ টানা ছিল না।
কবে মানুষ মুক্ত হবে পাসপোর্ট, ভিসা আর মানচিত্রের এই আধুনিক দাসত্ব থেকে? রাষ্ট্র ও তার তৈরি কৃত্রিম বর্ডারগুলো যখন নিরাপত্তার অজুহাতে কোটি মানুষকে নিঃস্ব আর সহায়হীন করে তোলে, তখন মানবতা শব্দটা ওই কাঁটাতারের খাঁজেই থমকে থাকে। যখন দুই পারের পাওয়ার পলিটিক্স মানুষকে গৃহহীন করে, মেহেরুন তখন নীরব চোখে আকাশের দিকে চেয়ে থাকেন—যেখানে কোনো সীমান্ত নেই, কোনো পাসপোর্ট বা ভিসার জাঁতাকল নেই; শুধুই এক মুক্ত ও সীমাহীন সার্বভৌম নীল।8 Comments
Friends
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
সুবহা জাহান
@subhajahan
Anika
@anikaa
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
মো মবিনুল ইসলাম সিয়াম
@mobinulislam
Khusi Moni
@khusimoni
Sharika Khatun
@sharika6924gmail-com
নূরুল আমিন সোহাগ
@aniketprantor
মো বুলবুল আহমেদ
@bulbul112026



জীবনের অকাট্য বাস্তব লেখচিত্রে বিস্ময়বিমুগ্ধতা… শুভ ও কল্যাণ হোক সবারই