-
অধিকারের ইতি
চল্লিশ ছুঁইছুঁই বয়সে এসেও দারিদ্র্য যার নিত্যসঙ্গী, দুঃখের সাথে তার সখ্যতা জন্মসূত্রের। খুব বেশি দূর লেখাপড়া করা হয়নি আমার, ভাগ্যটাও কখনো সহায় হয়নি। অভাবের সংসারে বাবা মারা গেছেন বছর তিনেক আগে। সারাজীবন বাবা মাকে খুব সুখে রাখতে পারেননি, আর বড় ছেলে হয়ে আমিও যে খুব পেরেছি—তা নয়। ঢাকায় ছোটখাটো একটা কাজ করি, আর স্ত্রী-সন্তানেরা গ্রামেই থাকে।
মা চিরকালই অভাবের সংসারে খিটখিটে মেজাজের ছিলেন। বকাঝকা করতেন, বউ-শাশুড়ির ঝগড়া লাগত, আমি চড়া গলায় মায়ের সাথে কত তর্ক করেছি! কিন্তু অভাব যেমনই হোক, মা তো মা-ই। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই গুঞ্জন ছিল মা হয়তো অন্য কোথাও চলে যাবেন। অভাবের কারণে মাকে কাছে এনে আগলে রাখার সাধ্যও আমার ছিল না। মা কখনো গ্রামে, কখনো অন্য ভাইবোনের কাছেই থাকতেন।
হঠাৎ একদিন গ্রাম থেকে খবর এলো—মা অন্য জায়গায় বিয়ে করে চলে গেছেন।
খবরটা শুনে মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। বুকটা ফেটে চুরমার হয়ে যাচ্ছিল, চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। বাবাকে হারালাম কিছুদিন আগে, আর আজ মা-ও চলে গেল? আমার সন্তানেরাও বুঝতে পারল—বাবার এই চরম আর্থিক টানাপোড়েন আর দারিদ্র্যই আজ দাদিকে দূরে ঠেলে দিল।
প্রথমে রাগ, ক্ষোভ আর ঘৃণায় ছেয়ে গিয়েছিল মনটা। কিন্তু দিন যত যেতে লাগল, রাগটা কেমন যেন এক অজানা আশঙ্কায় রূপ নিল। মা কেমন আছে? ভালো আছে তো? কোনো খারাপ মানুষের পাল্লায় পড়ল না তো?
আর থাকতে না পেরে একদিন মাকে ফোন দিলাম। মায়ের কাঁপা কাঁপা গলার আওয়াজ পেয়েই মনটা নরম হয়ে গেল। নিয়মিত খোঁজ নিতে নিতে একদিন বুঝলাম—মা সেখানে সত্যি ভালো আছে। অভাব-অনটন নেই, লোকটাও যত্ন নেয়। মায়ের চেহারায় আর জীবনের সেই জীর্ণতাটুকু নেই। মা সুখে আছে দেখে আমার মনটা হালকা হলো, পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিলাম।
কিন্তু, এখন আর আমি সেই আগের মা-কে খুঁজে পাই না।
আগে যে মায়ের সাথে বাজে ব্যবহার করতাম, চেঁচিয়ে কথা বলতাম—আজ সেই মায়ের সাথে অচেনা আন্টি বা খালাদের মতো ভীষণ ভদ্রভাবে কথা বলি। কোনো উঁচু গলা নেই, কোনো রাগ নেই। মা যা বলে, এক বাধ্য ছেলের মতো কেবল ‘হ্যাঁ’ বলে যাই। মা-ও একদিন কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চাইল, “বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিস…”
আসলে মায়ের ওপর আজ আর আমার কোনো রাগ বা ক্ষোভ নেই। সারাজীবন কষ্ট পাওয়া মা আমার শেষ বয়সে এসে সুখে আছে, এটাই তো অনেক।
তবুও বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা বিশাল শূন্যতা হাহাকার করে ওঠে। মনে হয় পরম মূল্যের কিছু একটা হারিয়ে ফেলেছি। বুঝে গেছি—যে মা কোনোদিন সন্তানের ওপর থেকে অধিকার ছাড়েনি, অভাবের নির্মম টানে আজ আমার সেই মায়ের ওপর শাসন করার, রাগ করার কিংবা অধিকার দেখানোর কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।
মায়ের প্রতি আজ আর কোনো অধিকার নেই, রয়ে গেছে শুধু দূর থেকে পালন করা কিছু দায়িত্ব।5 Comments-
Zaman, আপনার লেখায় “যে মা কোনোদিন সন্তানের ওপর থেকে অধিকার ছাড়েনি, অভাবের নির্মম টানে আজ আমার সেই মায়ের ওপর শাসন করার, রাগ করার কিংবা অধিকার দেখানোর কোনো সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই” এই কথাটির গভীর হাহাকার জীবনবোধের এক চরম সত্যকে ফুটিয়ে তুলেছে, তাই আপনার এই চমৎকার লেখনী নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে আরও অনেক মানুষের হৃদস্পর্শ করবে বলে আমার বিশ্বাস।
Friends
Urmee Islam
@urmeeislam
shilpi,Ranisankail
@shilpiranisankail
Sumaiya Ashraf
@ali-ashraf-m1960gmail-com
EMON
@emon1
শাহরিয়ার সাওম
@shahriarsaum760gmail-com
Mahdia Rashid
@mahdiarashid
mithila jannat
@mithilajannat
সাদিয়া আক্তার রিমি
@sadiaakterreme
Ayesha akter Shilpi
@ayeshaaktershilpi


মায়ের জন্য অগাধ ভালবাসা ।