-
একটি চারাগাছ ও মহীরুহের গল্প
১৯৮৯ সাল।
গাঁয়ের প্রাথমিক বিদ্যালয়টার কাঁচা মাটির শ্রেণিকক্ষ। সকালের রোদে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির ছোট ছোট পুতুলগুলোর হইচই, আর দুপুরের পর তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির ভিড়। গাদাগাদি করে বসা কতগুলো মুখ—কারো চোখে কৌতূহল, কারো চোখে প্রচ্ছন্ন ভয়। শিশুরা যখন পড়া পারে না, তাদের মিষ্টি মুখগুলো কেমন যেন কাচুমাচু আর অসহায় হয়ে ওঠে। দেখে বকা দেওয়ার বদলে বুক জড়িয়ে আদর করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু সময় বড় কম। এতগুলো শিশু, পড়া দেখা আর নতুন পড়া বুঝিয়ে দেওয়াতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায়। আলাদা করে কাউকে ধরে অঙ্ক শেখানোর সুযোগ কোথায়?একদিন পঞ্চম শ্রেণির অঙ্ক ক্লাস চলছিল। হোমওয়ার্কের খাতাগুলো একে একে টেবিলে জমা হলো। গুনেই দেখি, মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় একটা খাতা কম।
শ্রেণিকক্ষের দিকে চোখ বোলাতেই চিনে নিলাম সেই খাতা জমা না দেওয়া শিক্ষার্থীটি কে । একেবারে শেষ বেঞ্চে বসে থাকা ছিপছিপে ছেলেটি, যার চোখে এক আকাশ আকুলতা। ভয়ে মুখটা এতটুকু হয়ে আছে। আমি তাকে ডেকে বকা দিলাম না। মৃদু হেসে বোর্ডের সামনে গেলাম। চক তুলে নিয়ে অঙ্কটি খুব সহজ করে, ধাপে ধাপে বোর্ডে এঁকে বুঝিয়ে দিলাম। তারপর পুরো ক্লাসকে ঠিক একই নিয়মের আরেকটা অঙ্ক করতে দিলাম।
সবাই করল। অবাক হয়ে দেখলাম, শেষ বেঞ্চের সেই ভীত ছেলেটিও অঙ্কটা মিলিয়ে ফেলেছে!
কাছে গিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে বললাম, “দেখেছ? চেষ্টা করলে সবই পারো তুমি।”স্কুল ছুটির পর ওর হাত ধরে মেঠো পথ বেয়ে হেঁটে হেঁটে ওর বাড়ি গেলাম। ওর বাবা-মায়ের সাথে কথা বললাম। সেই থেকে ছেলেটির পড়াশোনার আলাদা যত্ন নিতে শুরু করলাম। একটু সাহস আর ভালোবাসার আলো পেতেই চারাগাছ যেমন তরতর করে বেড়ে ওঠে, ছেলেটিও তেমনি ক্লাসে আলোর মতো জ্বলতে লাগল। পঞ্চম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হলো, সাথে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি! এরপর জেলা স্কুলে ভর্তি হয়ে মাধ্যমিকের পাঠ শুরু করল সে।
তারপর জীবনের নিজস্ব গতিতে কত নদী বয়ে গেল। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকের জীবনে বদলি তো নিত্যদিনের সঙ্গী। নতুন স্কুল, নতুন গ্রাম, নতুন নতুন শিশুর মায়াবী চোখে আটকে যাওয়া। দেখা আর হয়নি ওর সাথে।
সময় গড়াল। জীবনের একপর্যায়ে গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে এলাম। প্রাইমারির অবসর জীবন, আয়-ব্যয়ের টানাটানি, পকেটে নেই তেমন মূলধন। কিন্তু বুকের ভেতর এক অদম্য ইচ্ছা—শূন্য থেকে ত্রিশ মাস বয়সী শিশুদের জন্য কিছু করতে হবে। শুরু করলাম মা ও শিশুদের জন্য এক লালনপালন শিক্ষা কেন্দ্র।
এখানে দম্পতিরা শেখেন কীভাবে গর্ভকালীন ও জন্মের পর শিশুদের যত্ন নিতে হয়। বিশেষ করে যে শিশুরা দাঁড়াতে পারে না, হাঁটতে পারে না কিংবা দেরিতে কথা বলে—বাবা-মায়ের সঠিক পরিচর্যা, অনুশীলন আর মায়াময় স্পর্শে কীভাবে তাদেরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা যায়, সেই লড়াইটাই চলত এই কেন্দ্রে।
২০২০ সাল।
কেন্দ্রের অফিসে বসে বেশ কিছু নতুন ভর্তি হওয়া মা-বাবার ফাইল দেখছিলাম। এমন সময় এক তরুণ দম্পতি ভেতরে এসে দাঁড়াল। তাদের কোলে এক ফুটফুটে পুতুল সদৃশ শিশু, কিন্তু ওর পা দুটি কেমন যেন অবশ, দুর্বল।আমার চুল তখন পেকে সব সাদা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, চামড়ায় বয়সের অনেকগুলো ভাঁজ। যুবকটি আমাকে চিনতে পারল না। বিনয়ের সাথে বলল, “স্যার, আমার এই প্রথম সন্তানটার জন্য এসেছি… ডাক্তার বলেছেন আপনার এখানকার হাত-পায়ের ব্যায়াম আর মায়ের যত্নে ও নাকি হাঁটতে পারবে।”
আমি নথি দেখে ফাইলটি খুললাম। এক মুহূর্তের জন্য আমার হাতটা থমকে গেল। চশমাটা একটু টেনে চোখের ওপর বসিয়ে ওর মুখের দিকে তাকালাম।
ত্রিশ বছর আগের সেই শেষ বেঞ্চের ভীতু, মায়াবী মুখটা যেন মুহূর্তের মধ্যে আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল! যে চোখদুটো একদিন একটা সাধারণ অঙ্কের ভয়ে কাচুমাচু হয়ে ছিল, আজ সেই চোখে একজন দায়িত্বশীল বাবার পরম আকুলতা।
আমি কিছু না বলে মৃদু হাসলাম। চেয়ার থেকে উঠে গিয়ে পরম মমতায় ওর কাঁধে হাত রাখলাম।
”অঙ্কটা খুব কঠিন নয় গো,” মৃদু গলায় বললাম, “একটু সাহস আর যত্ন পেলেই ও দেখবে ঠিক হেঁটে বাড়ি ফিরবে।”যুবকটি চমকে উঠে আমার মুখের দিকে তাকাল। সেই একই স্পর্শ, সেই একই ভালোবাসার স্বর! তার চোখ দুটি বড় বড় হয়ে উঠল, আর পরমুহূর্তেই একরাশ বিস্ময় ও অশ্রুভেজা শ্রদ্ধায় সে আমার পায়ে হাত দিয়ে বলে উঠল—”স্যার! আপনি…!”
বাইরে তখন নামল দুপুরের মিষ্টি রোদ। কত বছর আগে বোনা একটি সামান্য ভালোবাসার বীজ যে আজ আমার সামনেই এক আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা দেখে আমার প্রবীণ হৃদয়টা এক অপার্থিব ও মহাজাগতিক শান্তিতে ভরে গেল।8 Comments
Friends
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
সুবহা জাহান
@subhajahan
Anika
@anikaa
ঈশিতা ঈরু
@eshitabiswaseru15
মো মবিনুল ইসলাম সিয়াম
@mobinulislam
Khusi Moni
@khusimoni
Sharika Khatun
@sharika6924gmail-com
নূরুল আমিন সোহাগ
@aniketprantor
মো বুলবুল আহমেদ
@bulbul112026



Syed Farah, লেখাটা পড়ে এত ভালো লাগল যে এক অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছে। “কত বছর আগে বোনা একটি সামান্য ভালোবাসার বীজ যে আজ আমার সামনেই এক আশ্রয়দাতা বটবৃক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে”—এই লাইনটা একদম হৃদয়ে গেঁথে গেল।