-
লাল পাপোশের চার সৈন্য
আমাদের বারান্দার এক কোণে একটা পুরোনো লাল পাপোশ পড়ে থাকত। দিনকয়েক আগে একদিন সকালে উঠে দেখি, সেখানে দুটি অতি ক্ষুদ্র মাংসের দলা কুঁকড়ে বসে আছে। বিড়ালের দুটি ছানা। চোখ দুটিও ফোটেনি ভালো করে। বাড়ির গিন্নি দেখেই আঁতকে উঠলেন—”ওমা! এদের এখানে এনে রাখল কে? বাকি দুটো নিশ্চিত কোনো ছাদে রেখে এসেছে।”
আমাদের বাঁধাধরা হিসাব ছিল—না, বিড়ালের ছানা পোষা যাবে না। ওদের খাবার দেওয়া, ঘর ময়লা করা, আর তা পরিষ্কার করার মতো অত ঝুটঝামেলা সামলানোর মানুষ এই সংসারে নেই। ঠিক হলো তাড়িয়ে দেওয়াই ভালো। কিন্তু মা বিড়ালটি এসে এমন করুণ চোখে তাকাল আর এত অনুনয় করে ডাকল যে সেই অনুরোধ আমাদের কঠিন নিয়মকে নরম করে দিল। মনে মনে ভাবলাম, থাক দুটো দিন।
পরদিন সকালে বারান্দায় গিয়ে তো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ!মা বিড়ালটি চার-চারটি ছানাকে একসাথে তুলে এনেছে সেই ছেঁড়া পাপোশটার ওপর! চারটেই মায়ের কোলের উমে একদম মিশে আছে। এখন আর শুধু মা বিড়াল নয়, সে এক মূর্তিমান পাহাড়ে রূপ নিয়েছে। বারান্দায় কেউ কোনো কাজে একটু পা বাড়ালেই মা বিড়াল চোখ দুটো ড্যাবড্যাব করে বড় করে, কান দুটো পেছনে হেলিয়ে প্রখর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায়। কেউ আরেকটু কাছে গেলে মুখ হা করে দাঁত কিড়মিড়িয়ে গোঁ গোঁ করে ওঠে—যেন এক ইঞ্চি এগোলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে।
কখনো কখনো আবার অতিক্ষুদ্র চারপেয়েগুলো আমাদের অসাবধানতার ফাঁক গলে সোজা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে। খাটের নিচে বা সোফার পেছনে লুকানো সেই পিচ্চিদের বের করা যে কী ঝক্কি, তা কেবল ভুক্তভোগীই জানে!
কিন্তু দিন চারেক পর একদিন হঠাৎ দেখা গেল বারান্দার কোণটা একদম খালি। লাল পাপোশটা পড়ে আছে, কিন্তু মা বিড়াল আর তার চার সৈন্যের কাউকেই দেখা যাচ্ছে না।
গ্রামের বয়স্ক মানুষেরা বলেন, বিড়াল নাকি তার বাচ্চার ঠাঁই অন্তত সাতবার বদলায়। এটা কেবল ভয় থেকে নয়, এটা তাদের বেঁচে থাকার আদিম ইশকুল। বাচ্চাকে এখান থেকে ওখানে নিয়ে যাওয়া, এক ছাদ থেকে আরেক চালে ঘোরানোর পেছনে মা বিড়ালের একটাই গোপন পাঠ থাকে—পথঘাট চেনা, বিপদ চিনতে শেখা আর শূন্য হাতে এই নিষ্ঠুর জগতে নিজের তাগিতে টিকে থাকার বিদ্যা শেখানো।
আমাদের বারান্দার ছায়া আর ঘরের নিরাপত্তা ছেড়ে ছানাগুলো এখন হয়তো কোনো এক অচেনা কার্নিশে, কিংবা কোনো টিনের চালের ওপর জীবনের প্রথম বড় হওয়ার পাঠ নিচ্ছে। দামি বিদেশি পার্সিয়ানদের মতো নরম কুশনে দুধে-ভাতে ওদের হয়তো বড় হওয়া হবে না; কিন্তু ধূলিধূসর এই মাটির কঠিন লড়াই পেরিয়ে ওরাই একদিন হয়ে উঠবে এই খাঁটি পলিমাটির এক-একজন অপরাজেয় রাজা!
4 Comments
Friends
নাদিরা মোস্তারী শিখা
@nadiramostarishikha
Foyzur Khan
@foyzur-khan
সালমান সাদিক
@salmansadique
Humayra Archives
@nurhumayra
Borno
@borno1
শারমিন আক্তার
@sarmin
মোহাম্মদ নোমান
@nomankhalovi
শায়লা এ্যামিন
@shaylaaemin945gmail-com
সুবহা জাহান
@subhajahan

লাল পাপোশের চার সৈন্য মায়ের মমতার ছায়ায় বেঁচে থাকার প্রথম পাঠ শিখে অজানার পথে পা বাড়াল…🖤