Profile Photo

Rana ZamanOffline

  • RanaZaman
  • Profile picture of Rana Zaman

    Rana Zaman

    4 years, 10 months ago

    আসল নকল
    রানা জামান

    দু’টো জমজ শিশু কোলে হাস্যোজ্জ্বল সিম্ফনি। নৌসাদ ঢুকলো কেবিনে। হাতে প্রকাণ্ড আকারের এক ফুলের তোড়া। ওর পেছনে ঢুকলো অফিসের দু’জন অফিস সহায়ক। ওদের হাতে শিশুদের জন্য রাজ্যের জিনিসপত্র। ওরা জিনিসগুলো কেবিনের এক পাশে পাশাপাশি রেখে বেরিয়ে গেলো। নৌসাদ এগিয়ে গেলো বেডের দিকে।
    কনগ্রেচুলেশন! মেনি মেনি কনগ্রেচুলেশন! আই এম ভেরি মাচ হ্যাপি।
    নৌসাদ ফুলের তোড়াটা বাড়িয়ে ধরলো স্ত্রী সিম্ফনির দিকে। সিম্ফনির দুই বাহুতে দুই শিশু। ঘুমুচ্ছে। দুটি প্রস্ফুটিত শাদা গোলাপ যেনো। সিম্ফনি ভ্রু নাচিয়ে দেখালো হাত বন্ধ-ফুলের তোড়া নেবে কিভাবে?
    সরি!
    নৌসাদ ফুলের তোড়াটা পাশের টেবিলে রাখলো। বেডের পাশে বসে তাকিয়ে রইলো শিশু দুটোর দিকে। হাত বাড়ালো একটি শিশু কোলে নেবার জন্য।
    ঘুমুচ্ছে। এখন দেয়া যাবে না। ঘুম ভাঙুক। যাও এখন।
    যাবো কেনো? আমি ওদের বাবা না?
    তাই?
    নিশ্চয়ই!
    কিন্তু আমি খুশি হতে পারছি না পুরোপুরি।
    কেনো?
    বুবু চলে গেলো। শিশু দুটো বেঁচে থাকলেও ওর স্মৃতিটা থাকতো। আল্লাহয় কেনো যে এতো নিষ্ঠুর হলেন!
    আমার শাশুড়ি মানে তোমার মা খুব কাঁদছেন।
    মা এখনো আমার কাছে আসেন নি। আমার যাওয়া দরকার। তুমি কি আমাকে ধরে নিয়ে যাবে? ডাক্তার আমাকে বিছানা থেকে উঠতে বারণ করেছেন!
    একটা বিষয় বুঝতে পারছি না এখনো।
    কোনটা?
    বুবুর শিশু দুটো জীবিত ছিলো। হঠাৎ মারা গেলো কেনো?
    আমিও বুঝতে পারছি না। ডাক্তার কিছু বলেনি?
    ডাক্তারও কিছু বুঝতে পারছে না।
    আর বুবুর মৃত্যু? হঠাৎ বুবু মারা গেলো কেনো? আমার আদরের বুবু। আমাকে কত আদর করতো।
    সিম্ফনি ফুপিয়ে উঠলো। দুই হাত কেঁপে উঠায় শিশু দুটোর ঘুম গেলো ভেঙে। সাথে সাথে ওয়া ওয়া শব্দে কেঁদে উঠলো।
    নৌসাদ সিম্ফনির কোল থেকে একটা শিশু নিয়ে বললো, সিম্ফনি, একটা কথা।
    সিম্ফনি কোলের শিশুকে বুকের দুধ দেবার চেষ্টা করতে করতে বললো, কী?
    শেষ আল্ট্রাসনোগ্রামে ডাক্তার বলেছিলো তোমার গর্ভের বাচ্চা নড়ছে না। কিন্তু এই কথাটা আমি তোমাকে বলি নি তুমি কষ্ট পাবে বলে। এখন দেখছি ডাক্তারের বক্তব্য ঠিক ছিলো না।
    সিম্ফনি বিজ্ঞের মতো করে বললো, ডাক্তারের কথা সবসময় সত্য হয় না!
    নৌসাদের কোলের শিশুটি কেঁদেই চলেছে। কিন্তু সিম্ফনির কোলের শিশুটির কান্না না থামায় নৌসাদ বললো, কী ব্যাপার? দুধ পাচ্ছে না নাকি?
    সিম্ফনি অসহায়ের মতো নৌসাদের দিকে তাকিয়ে বললো, মনে হচ্ছে তাই। বাবুটা নিপল মুখে নিয়ে চুষে ছেড়ে দিয়েই কাঁদছে। এখন কী হবে?
    তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি সিস্টারকে ডাকছি।
    বেডের পাশে ঝুলানো সুইচ টিপে দিতেই সিস্টার ঢুকেই ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করলো, শিশু দুইটা কাঁদছে কেনো? বুকের দুধ! মার বুকের প্রথম দুধটা শিশুর জন্য খুবই পুষ্টিযুক্ত।
    সিম্ফনি বললো, চেষ্টা তো করছি। কিন্তু বুক দিয়ে কোনো দুধ বের হচ্ছে না।
    কোনো চিন্তা নাই। আমাদের স্টোরে আছে নিউ বর্ণ বেবির জন্য বেবিমিল্ক। পরে আপনারা কিনে নেবেন। আর একটার দাম দিলেই হবে।
    সিস্টার কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলো।
    নৌসাদ বললো, ওটাকেও আমার কাছে দাও। আচ্ছা তোমার পেটের অবস্থা কী? সেলাই ব্যথা করছে না তো?
    ব্যথা তো একটু করবেই। কিন্তু দুই শিশুর মুখ দেখলে আর ব্যথা অনুভূত হয় না!
    দাও, ওকেও আমার কাছে দাও।
    তুমি দুটো শিশু নিয়ে রাখতে পারবে?
    প্রথমবার তো নেই।
    সিম্ফনি বাচ্চাটা বাড়িয়ে ধরলে নৌসাদ ডান হাতের কোলে নিলো। তখন সিস্টার দুটো ফিডারে দুধ নিয়ে এলো। নৌসাদের কাছে এসে দুই হাতে দুই শিশুর মুখে ধরলো। শিশু দুটো কান্না থামিয়ে ফিডারের নিপল চুষতে লাগলো।
    কৌশল করে দুই হাতে দুটো ফিডারের বোতল ধরলে সিস্টার হাসিমুখে বললো, কী কিউট হয়েছে বাচ্চা দুইটা তাই না ভাইজান?
    নৌসাদ শিশু দুটোর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বললো, ইয়েস সিস্টার।
    এই খুশিতে একটা হ্যাণ্ডসাম বখসিস দিয়েন ভাইজান।
    ওকে। দেবো।
    সিম্ফনি বললো, বখসিস নিয়ে আপনি কোন চিন্তাই করবেন না সিস্টার। যাবার সময় কেনো, আগেই বখসিস দিয়ে দেবো।
    সিস্টার চলে যাবার সাথে সাথেই সাফিয়া খাতুন শব্দ করে কাঁদতে কাঁদতে কেবিনে ঢুকলেন। দুজনকে হাসিখুশি দেখে তাঁর রাগ হলো খুব। তিনি একবার হেকচি টেনে শাড়ির আঁচলে অশ্রু মুছে বললেন, আমার বড় মেয়েটা মরে গেলো, আর তোরা দু্ই জন হাসছিস! কী আশ্চর্য!
    নৌসাদ প্রথমে ভড়কে গেলো। পরক্ষণে সামলে নিয়ে বললো, আমরা হাসছি না আম্মা। এই প্রথম আমি বাচ্চা দুটোকে কোলে নিলাম।
    সিম্ফনি বললো, বুবুর মৃত্যু সংবাদ শুনে আমার খুব কষ্ট হয়েছে আম্মা। আমি যেতে চেয়েছি। কিন্তু ডাক্তার আমাকে নড়াচড়া করতে বারণ করেছে। হঠাৎ বুবু মারা গেলো আম্মা? বাচ্চা দুটোও মারা গেলো। আশ্চর্য! এমন ঘটনা আগে কখনো শুনি নি।
    তোর বুবুর নরমাল ডেলিভারি হয়েছিলো। বাচ্চা দুইটাও সুস্থ ছিলো। সন্ধ্যায় সব ঠিকঠাক ছিলো। ভোরে সবকিছু উল্টাপাল্টা হয়ে গেলো! এটা কী করে সম্ভব হলো?
    সাফিয়া খাতুন এগিয়ে এলেন নৌসাদের দিকে। শিশু দুটোকে অপলকনেত্রে তাকিয়ে থেকে কী মনে হতেই সিম্ফনির দিকে তাকালেন। বললেন, তোর আর অর্কেস্ট্রার ডেলিভারি কি একই সময় হয়েছে?
    নৌসাদ বললো, প্রায় আম্মা। বুবুর রাত আটটায় আর সিম্ফনি আটটা পাঁচ-এ।
    আমি অর্কেস্ট্রার কাছে ছিলাম। অর্কেস্ট্রার ডেলিভারি হবার পর তোর এখানে আসতে চাইলাম। আজকাল ডাক্তাররা নরমাল ডেলিভারি করতেই চায় না। সিজার করলেই মুঠোভর্তি টাকা। কিন্তু এরপর কী হলো আার মনে নেই। ভোরে ঘুম ভাঙলে দেখি অর্কেস্ট্রার পাশের বেডে শুয়ে আছি।
    সিম্ফনি বললো, তুমি বুবুর ডেলিভারি নিয়ে খুব টেনসনে ছিলে আম্মা। অথচ দেখো বুবুর হলো নরমাল ডেলিভারি আর আমার হলো সিজার।
    লাভ কী হলো তাতে। নিজেও মরলো, শিশু দুটোকেও সাথে নিয়ে গেলো।
    সাফিয়া খাতুন ফুপিয়ে উঠে মুখে শাড়ির আঁচল চাঁপা দিলেন।
    সিম্ফনি ফুপিয়ে উঠে বললো, বুবুর জন্য আমারও মন খারাপ করছে আম্মা। কিন্তু ডাক্তারের নিষেধ থাকায় শব্দ করে কাঁদতে পারছি না। বুবুর কবরের কী হবে আম্মা?
    জসিমকে দেখছি না। নৌসাদের দিকে তাকিয়ে সাফিয়া খাতুন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি দেখেছো ওকে নৌসাদ? নৌসাদ সিম্ফনিকে একবার দেখে বললো, না আম্মা। আমি তো এদিকেই ব্যস্ত ছিলাম। রাত থেকে দুলাভাই-এর সাথে আমার দেখা নাই।
    সিম্ফনি জিজ্ঞেস করলো, ডাক্তার কী বলে আম্মা?
    ডাক্তারকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ছুটি নিয়ে ইণ্ডিয়া চলে গেছে বেড়াতে।
    বুঝলে কিভাবে?
    চেম্বারে একটা ছুটির দরখাস্ত রেখে গেছে।
    আর দুলাভাই কোথায়?
    ওকেও তো দেখছি না।
    ফোন করেছিলে?
    ফোন বন্ধ পাচ্ছি।
    আমার মনে হয় এটা ঠিক দুলাভাই এর কাজ!
    চমকে উঠে নৌসাদ জিজ্ঞেস করলো, কী বলছো তুমি সিম্ফনি? দুলাভাই কী করেছে?
    অবাক দৃষ্টি নিয়ে সাফিয়া খাতুন সিম্ফনির দিকে তাকিয়ে রইলেন।
    বুবু আমাকে বলেছিলো দুলাভায়ের কোন একটা মেয়ের সাথে আনএথিক্যাল রিলেশন চলছিলো। আমার বিশ্বাস, ঐ মেয়েটার জন্যই দুলাভাই বুবু ও শিশু দুটোকে মেরে ভেগে গেছে!
    কী বলছিস তুই হাবিজাবি! জসিম অমন করতে পারে না! আমি বিশ্বাস করি না! তুই জানিস না জসিম অর্কেস্ট্রার জন্য কী রকম পাগল ছিলো? অর্কেস্ট্রা রাজি না হওয়া পর্যন্ত জসিম আমাদের বাসার সামনে এক পায়ে দাড়িয়ে ছিলো। সাতদিন। তখন বর্ষাকাল। মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। ও দাঁড়িয়েই আছে এক পায়ে। আমাদেরই মায়া হলো খুব। আমার দুইদিন ধরে অর্কেস্ট্রাকে বুঝালাম। তারপর সে সম্মতি দিলো। ততক্ষণে জসিমের হয়ে গেলো নিউমোনিয়া। যমে মানুষে টানাটানি অবস্থা। আর তুই বলছিস জসিমের অপর একটা মেয়ের সাথে আনএথিক্যাল সম্পর্ক ছিলো? ঐ মেয়েটার জন্য জসিম আমার অর্কেস্ট্রা আর সন্তান দুটোকে খুন করেছে?
    সত্য কিনা বলতে পারবো না। তুমি পোস্টমর্টেম করাও বুবু আর নবজাতক দুটোর।
    কী বলছিস তুই? তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে রে সিম্ফনি?
    নৌসাদ বললো, এই কথাটা সিম্ফনি ভালো বলেছে আম্মা। যদি সত্যই দুলাভাই আকামটা করে থাকে তাহলে পোস্টমর্টেম করলেই বুঝা যাবে।
    এদিকে শিশু দুটোর ফিডারের নিপল চুষা হয়ে গেলো দুধ শেষ হয়ে যেতেই। ঘুমিয়ে গেলো।

    পোস্টমর্টেম হলো অর্কেস্ট্রা ও দুটো নবজাতকের। অর্কেস্ট্রাকে গলা টিপে হত্যা করা হয়েছে তা প্রমাণিত; তবে শিশু দুটোর ব্যাপারটা পরিস্কার হয় নি-মৃত জন্মেছিলো নাকি জন্মাবার পরপরই গলা টিপে হত্যা করা হয়েছিলো বুঝা যাচ্ছে না।
    জসিমের বাড়িতে খবর দিলে সবাই ছুটে চলে এলো। সব শুনে ওরা হতবাক।
    কিন্তু জসিম কোথায়? ওকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। দু’জন ডাক্তারও নিখোঁজ, যে দু’জন দুইবোনের ডেলিভারি করেছিলো। থানায় একটি হত্যা মামলা ও তিনটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়রি করা হলো।
    আস্তে আস্তে ভুলে গেলো অর্কেস্ট্রা ও ওর দুই নবজাতকের মৃত্যু শোক এবং জসিমের নিখোঁজ হওয়ার ব্যথা। দুই যমজ বাড়ছে সিম্ফনির কোলে। যজমের নামাকরণ করা হলো সার্জিল ও শার্জিল। সঠিক উচ্চারণ শিখে ডাকতে হবে। এভাবে পার হয়ে গেলো তিন বছর।
    একদিন সাফিয়া খাতুন দুই নাতিকে কোলে নিয়ে চেহারার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলেন। একি! তিনি দুই হাতে চোখ রগড়াতে লাগলেন।

    3
    2 Comments
Skip to toolbar