-
ভালোবাসার নিমজ্জনে
সকাল থেকেই দারুণ একটা গল্পের প্লট মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। দিনের কর্মব্যস্ততায় ওটাকে মাথা থেকে নামাতে পারিনি। বেশি দেরি হলে বেটা আবার উবে যাবে। তাই রাতের খাবারের পর ভাবলাম ওটাকে নিয়ে একটু বসি। মশারিটা টানিয়ে দিয়ে মিতুকে বললাম, তুমি ঘুমাও – আমি ড্রইং রুমে বসে গল্পের ড্রাফটটা দাঁড় করিয়েই চলে আসছি।
মিতু দ্বিতীয় বারের মতো মা হতে যাচ্ছে। আমাদের প্রথম সন্তান শান্তনুর বয়স সাত। প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। নামের সাথে শান্তনুর কিন্তু স্বভাবের কোনো মিল নেই। খুবই চঞ্চল। মিতুকে সারাদিন অস্থির করে রাখে। তার উপর ওকে স্কুলে আনা-নেওয়া, খাওয়ানো, গোসল করানো, সংসারের অন্যান্য কাজকর্ম করতে করতে মিতু বেচারি সারাদিন একটু ফুসরতও পায় না। ওর এ শরীরে এখন যথেষ্ট বিশ্রামের প্রয়োজন। কিন্তু ও দিব্বি হাসিমুখে সব সামাল দিয়ে যাচ্ছে – এসব নিয়ে আমাকে ও একটু মুখও খুলতে দেয় না।
সুবোধ বালিকার মতো মিতু মশারির ভিতর ঢুকে গেলে আমি মশারীটা গুজে দিয়ে ড্রইং রুমে গিয়ে সোফায় বসি। পড়ার টেবিলটা শান্তনুর ঘরে। ঘুমিয়ে পড়েছে ও। ঐ ঘরে যাওয়া মাত্রই ও টের পেয়ে যাবে এবং আমার লেখার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। তাই ড্রইং রুমে চায়ের টেবিলে খাতা-কলম নিয়ে সোফার উপর এক পা মুড়ে বসে বেশ আয়েসি ভঙ্গিতেই শুরু করি লেখা। প্লট মাথায় সাজানোই ছিলো, তাই কলম বেশ দ্রুতই চলছে। মিনিট কয়েকের মধ্যেই একেবারে ডুবে যাই খাতার ভিতর।
মিতু কখন আবার উঠে গেছে টের পাইনি। আস্তে এসে চায়ের কাপটা খাতার পাশে রাখতেই বুঝতে পারি ঘুমায়নি। আমাকে রাত-বিরেতে চা খাওয়ানো ওর এক প্রিয় সখ। আমাদের বিয়ের আগে পরিচয়ের প্রথম থেকেই এ অভ্যাস। ও জানে চায়ের ব্যাপারে কোনো সময়েই আমার কোনো না নেই। রাত দুটোয় ঘুম থেকে ডেকে তুলে যদি কেউ বলে, চা খাবে? আমি সানন্দে বলি, অবশ্যই! যেন ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চায়ের জন্যই আমি অপেক্ষা করছিলাম!
কাপটা রেখে কোনো কথা না বলে আমার বাম দিকে সোফার হাতলটাতে বসে ডান হাতটা আমার ডান কাঁধের উপর রেখে বাম হাতে আমার বুকটা জড়িয়ে ধরে চিবুকটা আমার বাম কাঁধে রেখে ওর স্বভাবসুলভ প্রিয় ভঙ্গিতে আমার পিঠের সাথে লেপ্টে থেকে তাকিয়ে থাকে আমার লেখার দিকে।
আদরটুকু উপভোগ করতে করতে কৃত্রিম শাসনের সুরে বলি, তোমাকে না ঘুমাতে বলে এলাম, উঠে এলে কেন?
– তোমাকে ছাড়া একা লাগছে খুব – ঘুম আসছে না।
– তাহলে লেখা বন্ধ করে দেই। চলো, ঘুমাবে।
– না, তুমি লেখা শেষ করো, আমার এভাবেই ভালো লাগছে। আমি জানি, পরে আর তোমার লেখাটা হবে না – আমার খারাপ লাগবে।
– ওকে, সোনা!
আলতো করে ওর বাম গালটাতে একটু আদর করে আমি আবার ডুবে যাই লেখার খাতায় – লেখার খেইটা এখনো দিব্বিই আছে। মিতুটাও যেমন আগে ছিলো তেমনই আছে। ওর বানানো চায়ের স্বাদটাও অপরিবর্তিত আছে – সেই প্রথম যেদিন রাত সাড়ে বারোটায় ওদের বারান্দায় বসা আমাকে হঠাৎ চমকে দিয়ে মনকাড়া স্বাদের এক কাপ চা নিয়ে এসে সামনে ধরেছিলো, ঠিক একই স্বাদ আমি এখনো পাই ওর বানানো চায়ে। এটা কীভাবে সম্ভব? অথচ মিতু নিজে খুব একটা চা খায় না, বিশেষ করে রাতে। ভাবছি – ও যেন কখনো না বদলায়, এভাবেই যেন আমার পাশে থাকে সারাটা জীবন। ভালোবাসার মানুষের হাতের এমন এক কাপ চায়ের জন্যও একটা জীবন হাসিমুখেই কাটিয়ে দেয়া যায়!◾
…………………………..……………
3 Comments-
আপনার লেখায় মিতুর প্রতি সেই অমলিন ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ এবং চা বানানোর পেছনের আবেগটুকু খুবই হৃদয়স্পর্শী ও জীবন্ত হয়ে উঠেছে। যদি বর্ণনার মাঝে মিতুর শারীরিক ক্লান্তির বিষয়টিকে আরও কিছুটা ফুটিয়ে তোলা যেত, তবে হয়তো সম্পর্কের গভীরতা আরও নিবিড়ভাবে ফুটে উঠত; আপনার এই সুন্দর লেখনী নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে পাঠককে মুগ্ধ করে যাক।
Friends
Syed Farah
@syedfarah
Md. Lulul Al Marzan
@md-lululalmarzan
MD. RIZWAN ULLAH
@md-rizwanullah
মোঃ জামশেদ আলী
@zamshedali
MD AKTER HOSSAIN
@mdakterhossain
Md Bappy
@mdbappy
সালমা শিমু
@salmashimu74gmail-com
Nur-E- Elahi
@nur-e-elahi
Drako Shajib
@drako
M Abdul Haque, লেখাটা পড়ে এক কাপ গরম চায়ের মতো অদ্ভুত প্রশান্তি পেলাম আর মিতু-আপনার খুনসুটিগুলো খুব ভালো লেগেছে। এই গ্রুপটাকে প্রাণবন্ত রাখতে অন্য সবার পোস্টে একটু নিয়মিত লাইক বা কমেন্ট করবেন, তাহলে আমাদের কমিউনিটি আরও বেশি জমজমাট হয়ে উঠবে।