-
পুজোর আলো
আদিত্য ভৌমিক
তারিখ: ৫/১০/২০২৬শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। বাতাসে শিউলির মিষ্টি গন্ধ। কাশফুলের দোলায় প্রকৃতি যেন আপন মনে গেয়ে উঠেছে আগমনী গান। চারপাশে ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পরিবেশ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে রঙিন আলো, পূজামণ্ডপে শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জা, কোথাও ঢাকের তালে তালে মহড়ার শব্দ, কোথাও আবার শঙ্খধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছে সন্ধ্যার বাতাস।
পুজো এসেছে।
এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই যেন লুকিয়ে আছে কত শত অনুভূতি। অপেক্ষা, আনন্দ, প্রার্থনা, ভালোবাসা আর ফিরে পাওয়ার এক অপূর্ব অনুভব।
ষষ্ঠীর সকাল থেকেই পূজামণ্ডপে শুরু হয় উৎসবের আবহ। নতুন সাজে সেজে ওঠে মণ্ডপ। ফুলের মালা, আলোর ঝলকানি আর ধূপের সুগন্ধে চারপাশ হয়ে ওঠে পবিত্র। প্রতিমার মুখের মায়াবী হাসি যেন সমস্ত ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়। মায়ের চোখের দিকে তাকালে মনে হয়, তিনি শুধু মণ্ডপে স্থাপিত নন, তিনি যেন মানুষের বিশ্বাস আর ভালোবাসার গভীরে বিরাজ করছেন।
সন্ধ্যা নামতেই ঢাকের শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক। ধুনুচির ধোঁয়া ধীরে ধীরে আকাশের দিকে উঠে যায়। শঙ্খধ্বনির সঙ্গে মিশে যায় ঘণ্টার আওয়াজ। আলোয় আলোকিত মণ্ডপের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, শরতের এই কয়েকটি দিন যেন পৃথিবীর সব অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই এসেছে।
সপ্তমীর সকালে অঞ্জলির সময় চারপাশে নেমে আসে এক অন্যরকম নীরবতা। মন্ত্রোচ্চারণের প্রতিটি ধ্বনি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। হাতজোড় করা অসংখ্য মানুষের প্রার্থনায় পূজামণ্ডপ হয়ে ওঠে আশার এক পবিত্র ঠিকানা। সেখানে ব্যক্তিগত চাওয়া পাওয়ার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে শান্তির আকাঙ্ক্ষা, ভালো থাকার প্রার্থনা এবং সকলের মঙ্গল কামনা।
অষ্টমীর সন্ধ্যায় পুজোর আনন্দ যেন পূর্ণতা পায়। ধুনুচির ধোঁয়া, ঢাকের তালে নৃত্য, শঙ্খধ্বনি আর প্রদীপের আলো মিলে তৈরি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ। মনে হয়, পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেছে। চারপাশের হাসি, আনন্দ আর উৎসবের রঙে মনও হয়ে ওঠে নির্মল।
নবমীর রাত আরও গভীর। পূজামণ্ডপের আলো তখনও জ্বলছে। বাতাসে ধূপের গন্ধ। দূরে কোথাও ঢাকের মৃদু আওয়াজ। প্রতিমার সামনে জ্বলতে থাকা প্রদীপের শিখাগুলো যেন নীরবে বলে যায়, অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি ছোট্ট আলোও তাকে হার মানাতে পারে।
তারপর আসে বিজয়া।
বিসর্জনের সময় ঢাকের শব্দে আনন্দের সঙ্গে মিশে যায় এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। প্রতিমা ধীরে ধীরে মণ্ডপ ছেড়ে বিদায়ের পথে এগিয়ে যায়। চারপাশে তখনও শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর প্রার্থনা। চোখের সামনে থেকে মায়ের প্রতিমা দূরে সরে যেতে থাকে, অথচ মনে হয়, তিনি কোথাও যাচ্ছেন না।
কারণ পুজো শেষ হলেও পুজোর আলো শেষ হয় না।
প্রতিমা বিসর্জিত হয় জলে, কিন্তু বিশ্বাস বিসর্জিত হয় না। মণ্ডপ খালি হয়ে যায়, কিন্তু হৃদয় খালি হয়ে যায় না। ঢাকের শব্দ থেমে যায়, কিন্তু আগমনী সুর থেকে যায় স্মৃতির গভীরে।
শরতের আকাশ আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। কাশফুলের মাঠে বাতাস আবার দোলা দেয়। শিউলি ঝরে পড়ে নীরবে।
তবু মনে থেকে যায় সেই পবিত্র কয়েকটি দিন।
পুজো তাই শুধু প্রতিমা, মণ্ডপ, আলো আর উৎসবের নাম নয়। পুজো হলো অন্ধকারের মধ্যে আলোর প্রত্যাশা, বিষাদের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নেওয়া, আর হৃদয়ের গভীরে ভালোবাসা ও শুভবোধকে জাগিয়ে তোলার এক চিরন্তন আয়োজন।
মা আসেন, কিছুদিন থাকেন, তারপর বিদায় নেন।
কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আলো থেকে যায়।
চিরকাল।
2 Comments
Friends
tazbin smrity
@tazbinsmrity
মোঃ খাইরুল ইসলাম
@mykhairulislam47gmail-com
হুসেইন মোঃ শাহাদত লিটন
@shahadatliton645gmail-com
Nijhum Nadia
@nijhumnadia
Silent Discipline
@silentdiscipline
Sagar Barua
@sagarbarua
বৃষ্টি কবিতা - Bristy Kobita
@apon1
Md Shalin
@mdshalin
Mashuk Hossain
@mashukhossain


পুজো শেষ হয়ে যায়, মণ্ডপ খালি হয়ে যায়, কিন্তু স্মৃতি আর ভালোবাসা থেকে যায়