-
ফেইল্ড
সকাল সকাল কমলা শার্ট আর নেভি প্যান্ট পরে স্কুলে হাজির সাদ। একটু দেরি হয়ে গেছে তার। ছেলেদের হোস্টেলের দিক থেকে দৌড়ে এসেম্বলির পিছনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লো ছেলেদের সারিতে। এসেম্বলি তখন জাতীয় সংগীত গাইছে। সাদ গলা মেলায়। সকালে সে দুটো রুটি খেয়েছে। স্কুলে আসার পথে রাস্তায় গরম গরম সিংগাড়া ভাজতে দেখেছে সে। কড়াইতে সিংগাড়াগুলো প্রথমে সাদা রংয়ের থাকে আর তেলে বুদবুদ ছড়ায়। আস্তে আস্তে সিংগাড়াগুলো সোনালী হয়ে যায় আর তাতে আটা, আলু আর মসল্লার গন্ধ মিশে যায়। সিংগাড়া দেখলেই জিভে জল আসে সাদের। তাই সঙ্গে থাকা টাকা দিয়ে একটা সিংগাড়া কিনে বুক পকেটে রেখে দেয়। যদিও তখুনি তার সেটা খাওয়ার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু রাস্তার দুই পাশ দিয়ে কমলা আর গোলাপি স্কুল ড্রেস পরে ছেলে মেয়ের দল স্কুলে চলছে। এদের মাঝে হাঁটতে হাঁটতে সিংগাড়া খাবে ভাবতেই কেমন অস্বস্তি লাগে সাদের।
সাদ তাই এসেম্বিলি শেষে কলের কাছে পানি খেতে গিয়ে সিংগাড়াটা মুখে পুরে দৌঁড়ে যায় ক্লাসে। এক্ষুনি ক্লাসে টিচার আসবে। ঐ যে ম্যাডাম আসছে হাতে তার পরিক্ষার খাতা। ভয়ের একটা শিরশিরানি সাদের গায়ে বয়ে যায়। ম্যাডাম যাকে সপ্তাহের ছয়দিনই দেখে সাদ তার অস্তিত্ব এখন নাই হয়ে গেলেই সবচেয়ে ভালো হয়। উ: কী ব্যাপারটাই না ঘটতে যাচ্ছে। রোল কল হয়ে গেল। সাদ স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের মতো “উপস্থিত” বলে গেল। এবার আবার রোল ধরে ডেকে পরীক্ষার খাতা দিচ্ছে ম্যাডাম। সাদ কিছু দেখছে না। এক্ষুণি ম্যাডামের বাঁকা হাসি দেখা যাবে। ক্রুর হাসি হেসে সাদকে ম্যাডাম জানাবে সে ফেল করেছে। অংকে ফেইল ছাত্র সাদ। কীভাবে কীভাবে যেন ব্যাপারগুলো ঘটে গেল। ম্যাডাম বাঁকা হাসি হাসলেন। তড়বড় করে কিসব বললেন। সাদ তেমন কিছু শুনছিল না। কী একটা ঘোরে ঘোরে স্কুল টাইম চলে গেল। মাথায় রয়ে গেল সে ফেল করেছে। কিছু উচ্ছসিত ছাত্র! যারা অংকে একশ’তে একশ পেয়েছে। আর সাদ! মাত্র তেইশ পেয়েছে সে।
বাসায় এসে ভাত খেয়ে ঝিমায় সে কিছুক্ষণ। কী একটা দিন গেল। মেয়েগুলো তাকে নিয়ে কী হেসেছিল?
যারা একশ’তে একশ পেয়েছে তারা এখন অন্য গ্রহের লোক। সাদ একটি ব্যর্থ পৃথিবীর মানুষ। এখন তাদের সঙ্গে সাদের বিস্তর ব্যবধান। ওরা সবাই তার শত্রু। স্কুলে এখন সে পিছনের বেঞ্চে বসবে। পিছনের বেঞ্চে অনেকেই ফেল করে- তাদের সঙ্গে একটা আত্মীয়তা খুঁজে পায় সাদ।টেবিলে একটা কৌটায় কিছু লেবুর বিঁচি জমিয়ে রেখেছিল সাদ। এমনি ভাত খাবার সময় লেবুর টুকরো থেকে বিঁচিগুলো আলাদা করে রেখেছিল সে। এখন সেগুলো নিয়ে পরলো সে। একটা ফেলে দেওয়া প্ল্যাস্টিকের বোলে মাটি নিয়ে তাতে পুতে দিল বিঁচিগুলো।
সাদ স্কুলে যায় ফিরে আসে। অংকগুলো প্র্যাক্টিস করে। এখন ওগুলো সে ভালোই পারে। হঠাতই একদিন চোখ যায় ফেলে দেওয়া প্ল্যাস্টিকের বোলে। খুদে খুদে কতগুলো চারা গজিয়েছে তাতে। সাদ ভাবে টিফিনের টাকা জমিয়ে সে মাটির টব কিনে এনে গাছগুলো আলাদা করে লাগাবে। মামার দেওয়া টাকা আর জমানো টাকায় সাতটি টব কিনে লেবুর খুদে গাছগুলো রুয়ে দেয় সাদ। ঘরের পাশেই সেগুলো পরে থাকে। কিন্তু সাদ প্রায় বিকেলে এগুলোর যত্ন করে। গাছে পানি দেয় – মাটি বদলে দেয়। সত্যি সত্যিই সাদের লেবু গাছের একটিতে সাদা ফুল এসেছে। সকাল বিকাল গাছটির দিকে খেয়াল রাখে সাদ। তার গাছে ফুল এসেছে। উহ! কী আনন্দ! নিজের কাছেই অনেক ভালো লাগে তার।
গাছগুলোর দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকে সাদ। সব সময় মনে কী এক ভালো লাগা তার। স্কুলে পিছনের বেঞ্চে বসেও ভালো লাগে। মনের আনন্দে ক্লাসের পড়াও করে ফেলে সে। ওই যে চশমা চোখে রুবাই-ক্লাসে সব সময় যে ফার্স্ট হয় আর ওই নিগার সুলতানা-খুব বড়াই তার। পড়ালেখায় ভালো বলে দেমাগে পা মাটিতে পরে না। আর পুরো ক্লাস-কী সব গাল গল্প করে তারা। তাদের কারোর কী নিজের গাছ আছে? যেই গাছে সাদা সুন্দর ফুল ধরে! এ কথা কাউকে বুঝিয়ে বলা যায় না। শুধু তার সৌন্দর্য অনুভব করা যায়।
না! এখন আর সে ফেইল্ড না। অপূর্ব এক ভালো লাগায় ভরে আছে তার মন।
4 Comments-
সাদের মনের ভেতরকার অব্যক্ত একাকীত্ব আর ছোট্ট চারাগাছটিকে ঘিরে যে আশার সঞ্চার হয়েছে, তা খুব নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন আপনি। অংকের খাতায় শূন্য বা কম নম্বর পেলেও সাদের জীবনের ছোট ছোট অর্জনগুলো যে আনন্দের বড় উৎস হতে পারে, সেই অনুভূতিটি সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। হাতের কাছের সাধারণ ঘটনা দিয়ে জীবনের গভীর সত্য প্রকাশের এই প্রচেষ্টাটি অব্যাহত রাখলে আপনি আরও দারুণ সব সৃষ্টি আমাদের উপহার দিতে পারবেন।
Friends
Sayed Mohammad Farid
@sayedmohammadfarid
খালেদা আক্তার
@khaledaakhter
সাদিয়া আক্তার রিমি
@sadiaakterreme
Kazi Adam
@kaziadam
রুদ্র অরণ্য
@click
নাজমুল হক জুয়েল
@nazmulhoqjewel
Md Shah Jalal Masim
@mdshahjalalmasim
রাশেদ শাহরিয়ার
@rashed-sahriargmail-com
ujjal mutsuddi
@ujjalmutsuddi


সবাই নম্বরের হিসাব রাখে, কিন্তু একটা শিশুর মনের খবর কজন রাখে?