-
প্রজাতন্ত্রের শবাগারে নিরাপত্তার কীর্তন
অধিকারহীনতার রাষ্ট্রতত্ত্ব, পুরুষতান্ত্রিক নীতিশাস্ত্র এবং সভ্যতার ছদ্মবেশে ক্ষমতার ইতরামিরাষ্ট্রের একটি বিশেষ প্রতিভা আছে: সে মানুষের বিপন্নতাকে পরিসংখ্যানে রূপান্তরিত করতে পারে, আর পরিসংখ্যানকে এমন নির্বিকারভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যেন মৃত্যুরও কোনো ব্যক্তিগত ব্যাকরণ নেই। একজন মানুষ নিহত হলে রাষ্ট্রের ভাষায় একটি ঘটনা ঘটে; একাধিক মানুষ নিহত হলে কয়েকটি ঘটনা ঘটে; আর একই ধরনের ঘটনা যখন রাষ্ট্রের নৈতিক বিবেককে বারবার অভিযুক্ত করে, তখন সেগুলোকে বলা হয় বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রাষ্ট্রের এই শব্দতাত্ত্বিক কুশলতা দেখে অভিধানও সম্ভবত লজ্জায় মুখ ঢাকে।
এখানে মৃত্যু অপেক্ষা মৃত্যুর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাটি অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। কে মরলেন, কেন মরলেন, তাঁকে বাঁচানোর প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেন বাঁচানো গেল না, অপরাধীর দণ্ডবিধান কোথায় গিয়ে ঠেকল, কোন কর্তৃপক্ষের অবহেলা কোন পর্যায়ে দায়মুক্তির আবরণ পেল, এসব প্রশ্নের চেয়ে রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ রাখার প্রশ্নটি যখন অধিক জরুরি হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে রাষ্ট্র তার নাগরিকের চেয়ে নিজের প্রতিকৃতির প্রেমে বেশি নিমগ্ন।
রাষ্ট্রের প্রতিকৃতিটি অবশ্য বড় যত্নে নির্মিত। সেখানে রাষ্ট্র সর্বদা সদাশয়, প্রশাসন সদা তৎপর, আইন সর্বদা নিরপেক্ষ, নিরাপত্তাব্যবস্থা সর্বদা সজাগ এবং বিপর্যয়গুলো নিছক কিছু অনভিপ্রেত ব্যতিক্রম। কেবল বাস্তবের নাগরিকটি সেই প্রতিকৃতির ফ্রেমে ঢুকতে পারেন না। তিনি ফ্রেমের বাইরে দাঁড়িয়ে দেখেন, তাঁর দুর্দশার ওপর রাষ্ট্রের গাম্ভীর্য কী চমৎকারভাবে আলো ফেলে রেখেছে।
নিরাপত্তা এখানে অধিকার নয়, একপ্রকার প্রশাসনিক অলংকার। রাষ্ট্র সেটিকে প্রদর্শন করে, বক্তৃতায় ব্যবহার করে, প্রয়োজনমতো তার পরিভাষা পাল্টায়; অথচ নিরাপত্তাহীন মানুষের কাছে তার কার্যকারিতা কতটুকু, সেই প্রশ্নটি উত্থাপিত হলেই রাষ্ট্রের কপালে জবাবদিহির ঘাম দেখা দেয়। তখনই শুরু হয় বিজ্ঞপ্তির পবিত্র আবৃত্তি, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা এবং দায়িত্বের এমন এক পরস্পরবিরোধী বণ্টন, যেখানে সবাই দায়িত্বশীল, অথচ দায়ী কেউ নন।
এ এক অভিনব প্রজাতান্ত্রিক ধর্মতত্ত্ব। রাষ্ট্রের ভুল হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রকে ভুল বলা যায় না; প্রশাসনের ব্যর্থতা থাকতে পারে, কিন্তু ব্যর্থতার দায় নির্দিষ্ট করা যায় না; নাগরিকের অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার দাবি করার সময়, স্থান ও পদ্ধতি নির্ধারণের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব যেন নাগরিকের হাতে নেই। রাষ্ট্র নাগরিককে অধিকার দিয়েছে, অতএব নাগরিকের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত; রাষ্ট্র অধিকার রক্ষা করতে পারেনি, অতএব নাগরিকের ধৈর্য ধরা উচিত। এই যুক্তির দার্শনিক সৌন্দর্য এমনই যে, এর কাছে স্ববিরোধিতাও মাথা নত করে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং পরবর্তী মানবাধিকার-সংক্রান্ত অনুসন্ধানগুলো আমাদের সামনে যে প্রশ্ন রেখে গেছে, তা নিছক কোনো সরকারের ব্যর্থতার বিচার নয়। প্রশ্নটি ক্ষমতার প্রকৃতি নিয়ে। যে ক্ষমতা একসময় নিজেকে অপরিহার্য ঘোষণা করে নাগরিকের প্রতিবাদকে শত্রুতা হিসেবে পাঠ করতে শেখে, তার পতন ঘটলেও সেই পাঠপ্রণালি সমাজ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত হয় না। ক্ষমতার পোশাক বদলাতে পারে, তার উচ্চারণে নতুন শব্দ সংযোজিত হতে পারে, কিন্তু নাগরিককে সন্দেহের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা থেকে গেলে শাসনব্যবস্থার অন্তর্লীন ব্যাকরণটি বদলায় না।
এইখানেই ইতিহাসের কৌতুকটি সবচেয়ে নির্মম। যে মানুষটি গতকাল ক্ষমতার দম্ভে ক্ষুব্ধ ছিলেন, আজ ক্ষমতার নৈকট্যে পৌঁছে তিনিই দম্ভের যৌক্তিকতা আবিষ্কার করতে পারেন। যে কণ্ঠস্বর একদিন স্বাধীনতার জন্য ব্যাকুল ছিল, সেটিই একসময় অন্যের স্বাধীনতাকে শৃঙ্খলিত করার পক্ষে যুক্তি সাজাতে পারে। বিপ্লব তখন ইতিহাসের একটি ঘটনা হয়ে থাকে, কিন্তু বিপ্লবের নৈতিকতা ক্ষমতার অলিন্দে প্রবেশের অনুমতি পায় না।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে তাই আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত আরও মৌলিক। রাষ্ট্র কাকে নিরাপদ রাখতে চায়? নাগরিককে, নাকি ক্ষমতার অবাধ চলাচলকে? আইন কাকে সংযত করে? অপরাধীকে, নাকি প্রশ্নকারীকে? প্রশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক আনুগত্য কোন দিকে নিবদ্ধ? সংবিধান ও নাগরিক অধিকারের দিকে, নাকি সাময়িক ক্ষমতাকেন্দ্রের সদিচ্ছার দিকে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর কোনো শোভন সংবাদ সম্মেলনের গদ্যে পাওয়া যাবে না। উত্তর পাওয়া যাবে সেই মানুষটির অভিজ্ঞতায়, যিনি বিপদের সময় সাহায্য চান; সেই পরিবারের দীর্ঘশ্বাসে, যারা ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষায় বছরের পর বছর কাটায়; সেই নারীর নীরবতায়, যাঁর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করার আগেই সমাজ তাঁর চরিত্রের ময়নাতদন্ত শুরু করে; সেই ভিন্নমতাবলম্বীর সংশয়ে, যিনি কথা বলার আগে নিজের নাগরিকত্বের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবেন।
অধিকারহীনতা মানুষের কাছ থেকে প্রথমে সুযোগ কেড়ে নেয়, তারপর আত্মবিশ্বাস, তারপর প্রতিবাদের ভাষা। দীর্ঘস্থায়ী বঞ্চনার সবচেয়ে সফল রূপটি তাই প্রকাশ্য নিপীড়ন নয়, বরং বঞ্চিত মানুষকে তাঁর বঞ্চনার সঙ্গে অভ্যস্ত করে তোলা। একসময় মানুষ ন্যায়বিচারকে নিজের প্রাপ্য বলে দাবি করার পরিবর্তে ন্যায়বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দরকষাকষি করেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা সংকুচিত হতে হতে এমন পর্যায়ে পৌঁছায়, যেখানে তিনি আর অন্যায়ের অবসান চান না; চান, অন্যায়টি যেন অন্তত তাঁর ঘরের দরজায় এসে না দাঁড়ায়।
এমন সমাজে রাষ্ট্রের সাফল্য পরিমাপ করা সহজ। নাগরিক যত কম প্রশ্ন করবেন, শাসন তত স্থিতিশীল বলে বিবেচিত হবে। মানুষ যত বেশি ভয়কে ব্যক্তিগত সতর্কতা বলে মেনে নেবেন, নিরাপত্তাব্যবস্থা তত বেশি সফল বলে প্রচারিত হবে। আর নাগরিক যখন নিজের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার আগেই সম্ভাব্য পরিণতির হিসাব কষতে শুরু করবেন, তখন রাষ্ট্রকে আর প্রতিটি কণ্ঠস্বর দমন করতে হয় না। মানুষ নিজের ভেতরেই একটি ক্ষুদ্র প্রহরী নিয়োগ করেন।
এই প্রহরী রাষ্ট্রের সবচেয়ে সাশ্রয়ী আবিষ্কার। তার বেতন লাগে না, ইউনিফর্ম লাগে না, অস্ত্র লাগে না। সে কেবল মানুষের বিবেকের পাশে বসে থেকে প্রতিটি বাক্যের আগে জিজ্ঞেস করে, এ কথা বললে বিপদ হবে না তো? এ প্রশ্ন করলে অসুবিধা হবে না তো? এ অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে নিজেরই ক্ষতি হবে না তো? একসময় নাগরিকের মুখ বন্ধ করার জন্য রাষ্ট্রকে আর হাত বাড়াতে হয় না; নাগরিক নিজেই নিজের কণ্ঠস্বরের গলায় হাত রাখেন।
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ এই আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রবণতাকে আরও গভীর করে, বিশেষত নারীর জীবনে। এখানে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের ভাষা এতই পরিশীলিত যে তার অন্তর্গত নিয়ন্ত্রণকামিতাটি প্রথম দর্শনে ধরা পড়ে না। নারীকে বলা হয় সতর্ক হতে, সংযত হতে, সাবধানে চলতে, পোশাক ও আচরণে বিবেচক হতে। অপরাধীর সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধের দায়টি ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হয় সম্ভাব্য ভুক্তভোগীর জীবনযাপনের ওপর।
অর্থাৎ যে সমাজ অপরাধীর হাত থামাতে অপারগ, সে সমাজ নারীর পা বেঁধে দেওয়ার প্রস্তাব করে। তারপর সেই বন্ধনকে সুরক্ষা, সেই সংকোচনকে শালীনতা এবং সেই অধীনতাকে পারিবারিক মূল্যবোধের নাম দেয়। শব্দের এমন নৈতিক আত্মসাৎ দেখলে মনে হয়, অভিধানটি বুঝি দীর্ঘদিন ধরে পুরুষতান্ত্রিক অভিভাবকত্বের অধীনে রয়েছে।
নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় অপরাধীর পরিচয়ের পাশাপাশি ভুক্তভোগীর পোশাক, চলাফেরা, সম্পর্ক, সময়জ্ঞান এবং ব্যক্তিগত অভ্যাস নিয়ে যে সামাজিক অনুসন্ধিৎসা দেখা যায়, তা প্রকৃতপক্ষে ন্যায়বিচারের অনুসন্ধিৎসা নয়; এটি ক্ষমতার আত্মরক্ষামূলক কৌতূহল। সমাজ জানতে চায়, নারীটি এমন কী করেছিলেন যে তাঁর ওপর অপরাধটি সংঘটিত হলো। অথচ প্রথম প্রশ্নটি হওয়া উচিত, অপরাধী এমন কী অধিকারবোধে বিশ্বাসী ছিলেন যে অন্য একজন মানুষের শরীর, ইচ্ছা ও স্বাধীনতার ওপর নিজের কর্তৃত্ব আরোপ করতে পারলেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে পুরুষতন্ত্রের শিকড়ে হাত দিতে হয়। সেখানে পাওয়া যায় নারীকে স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসেবে নয়, পরিবারের সম্মান, পুরুষের কর্তৃত্ব কিংবা সামাজিক শালীনতার বাহক হিসেবে বিবেচনা করার দীর্ঘ অভ্যাস। নারীর শরীরকে তাঁর নিজের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্র হিসেবে স্বীকার করার পরিবর্তে সেটিকে পরিবারের নৈতিক পুঁজির অংশ বানানো হয়। ফলে নারীর ওপর সহিংসতা সংঘটিত হলে সমাজের একাংশের প্রথম উদ্বেগ হয় পরিবারের সম্মান, অপরাধীর দায় নয়।
সম্মান নামক এই বিমূর্ত সম্পত্তিটির মালিকানা আশ্চর্যজনকভাবে পুরুষের হাতে থাকে, অথচ তার রক্ষণাবেক্ষণের সমস্ত দায় নারীর ওপর ন্যস্ত। পুরুষের আচরণে পরিবারের সম্মান ক্ষুণ্ণ হয় না, নারীর স্বাধীনতায় হয়; পুরুষের অনৈতিকতা ব্যক্তিগত বিচ্যুতি, নারীর অনৈতিকতা সামাজিক বিপর্যয়। পুরুষের জন্য নৈতিকতার বিধান নমনীয়, নারীর জন্য তা প্রস্তরলিপি। এই বিধান রচয়িতাদের কেউ কেউ আবার নারী-সম্মানের রক্ষাকর্তা হিসেবেও পরিচিত। আত্মপ্রবঞ্চনার এমন সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর আর কোথাও আছে কি না, গবেষণা করে দেখা যেতে পারে।
রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই অদ্ভুত আত্মীয়তা এখানেই। উভয়েই কখনো কখনো মানুষের স্বাধীনতাকে সম্ভাব্য বিপদের উৎস হিসেবে কল্পনা করে। রাষ্ট্র ভিন্নমতকে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা বলে, পুরুষতন্ত্র নারীর স্বাধীনতাকে সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ বলে। রাষ্ট্র নাগরিকের কণ্ঠস্বরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, পুরুষতন্ত্র নারীর শরীর, চলাচল ও আকাঙ্ক্ষাকে। উভয়েরই যুক্তি, নিয়ন্ত্রণ না থাকলে বিপর্যয় ঘটবে। উভয়েরই অস্বস্তি এই সত্যে যে স্বাধীন মানুষকে শাসন করা যায়, কিন্তু মালিকানার বস্তুতে পরিণত করা যায় না।
এই সমাজে নিরাপত্তা তাই ক্রমশ এক পরিহাসমূলক ধারণায় পরিণত হয়। নারীকে নিরাপদ রাখতে তাঁর স্বাধীনতা সংকুচিত করা হয়, নাগরিককে নিরাপদ রাখতে তাঁর মতপ্রকাশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়, রাষ্ট্রকে নিরাপদ রাখতে রাষ্ট্রের সমালোচনাকে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তার নামে সবাইকে নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে আপস করতে শেখানো হয়। কেবল নিয়ন্ত্রণকারীরা নিজেদের নিরাপদ মনে করেন।
আর পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে বড় কৌতুকটি হলো, সে নিজেই নিজের উৎপাদিত ভয়ের প্রতিষেধক হিসেবে নিজেকে বাজারজাত করে। যে সামাজিক বিধান নারীকে দুর্বল, নির্ভরশীল ও পরাধীন করে তোলে, সেই বিধানই পরে দাবি করে, নারীকে রক্ষা করার জন্য তার কর্তৃত্ব অপরিহার্য। এটি অনেকটা আগুনের কাছে অগ্নিনির্বাপণের চুক্তি স্বাক্ষর করানোর মতো। আগুন নিজেই শর্ত নির্ধারণ করবে, কতখানি পুড়িয়ে দেওয়ার পর তাকে নেভানোর অনুমতি দেওয়া হবে।
অতএব রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের অধিকারকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড় করানো একটি মৌলিক রাজনৈতিক প্রতারণা। যে রাষ্ট্র নাগরিকের স্বাধীনতাকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি মনে করে, সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবোধে গভীর অসুস্থতা রয়েছে। যে সমাজ নারীর স্বাধীনতাকে তার নিরাপত্তার অন্তরায় মনে করে, সে সমাজের নৈতিক চিকিৎসা প্রয়োজন। আর যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ক্ষমতার সমালোচনাকে শত্রুতা বলে, তার গণতন্ত্রবিষয়ক বক্তৃতা যতই দীর্ঘ হোক, তার শ্রবণেন্দ্রিয়ের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।
প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্র কতটা শক্তিশালী, তা নয়; রাষ্ট্রের শক্তি কাকে রক্ষা করছে। প্রশ্নটি সমাজ কতটা ঐতিহ্যনিষ্ঠ, তা নয়; ঐতিহ্যের নামে কার স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। প্রশ্নটি নিরাপত্তাব্যবস্থার বাহ্যিক জাঁকজমক কতখানি, তা নয়; সবচেয়ে অসহায় মানুষটির বিপদের মুহূর্তে সেই ব্যবস্থা কতখানি মানবিক।
রাষ্ট্রের হাতে অস্ত্র থাকতে পারে, সমাজের হাতে বিধান থাকতে পারে, পুরুষতন্ত্রের হাতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সঞ্চিত অভ্যাস থাকতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুই মানুষের মর্যাদার ঊর্ধ্বে নয়। রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নাগরিকের অধিকার থেকে বৈধতা পায়, নাগরিকের অধিকার রাষ্ট্রের অনুগ্রহ থেকে নয়। নারীর স্বাধীনতা পুরুষের সদিচ্ছার দান নয়, মানুষের সমান মর্যাদারই অনিবার্য পরিণতি।
যে রাষ্ট্র এই সত্য বিস্মৃত হয়, সে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ক্রমশ ক্ষমতার নিরাপত্তায় পর্যবসিত হয়। যে সমাজ এই সত্য অস্বীকার করে, সে সমাজে শালীনতার মুখোশের আড়ালে নিপীড়ন দীর্ঘজীবী হয়। আর যে নাগরিক অন্যের অধিকারহীনতায় স্বস্তি খুঁজে পান, তিনি বুঝতে পারেন না, নিজের স্বাধীনতার কবর খননের কাজে তিনিও নীরবে অংশ নিচ্ছেন।
রাষ্ট্রের বর্ম যতই পুরু হোক, তার ভেতরে যদি নাগরিকের আর্তনাদ অনুপ্রবেশ করতে না পারে, তবে সেই বর্ম নিরাপত্তার নয়, বধিরতার। সমাজের নৈতিক বিধান যতই প্রাচীন হোক, তা যদি মানুষের মর্যাদাকে সংকুচিত করে, তবে তার প্রাচীনত্ব গৌরব নয়, কেবল দীর্ঘস্থায়ী অপরাধের সাক্ষ্য। আর সভ্যতার যতই ঢাকঢোল বাজুক, মানুষ যদি নিজের শরীর, কণ্ঠস্বর ও স্বাধীনতার ওপর নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারেন, তবে সেই সভ্যতা মূলত ক্ষমতার সুসজ্জিত আত্মপ্রবঞ্চনা।
রাষ্ট্র হয়তো তার সীমানা পাহারা দিচ্ছে। সমাজ হয়তো তার সম্মানের সংজ্ঞা রক্ষা করছে। পুরুষতন্ত্র হয়তো তার প্রাচীন সিংহাসনে বসে শালীনতার বিধান পাঠ করছে। কিন্তু মানুষের মর্যাদা যখন এই তিন প্রহরীর মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বের বৈধতা প্রমাণ করতে বাধ্য হয়, তখন প্রশ্ন জাগে: আমরা কি সত্যিই সভ্যতার মধ্যে বাস করছি, নাকি বর্বরতার এমন এক পরিশীলিত সংস্করণে, যেখানে নিপীড়নের হাত রক্তমাখা না থেকে কেবল দস্তানায় ঢাকা থাকে?
— মুহাম্মদুল্লাহ বিন মোস্তফা
লেখক; কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলা সাহিত্য আন্দোলন

মুহাম্মদুল্লাহ বিন মোস্তফা
কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলা সাহিত্য আন্দোলন
নামের মাঝেই যেন মিশে আছে এক গভীর মগ্নতা আর সুদূরপ্রসারী সংকল্প। তাঁর জন্ম সুনামগঞ্জের ছাতকের জল-হাওয়ায়, যেখানে প্রকৃতি আর মানুষের জীবন সমান্তরালে বহমান। সেখান থেকেই তিনি কুড়িয়ে নিয়েছেন শব্দের কারুকাজ, যা আজ বাংলা সাহিত্যে এক ভিন্ন সুর তুলে ধরছে। তিনি কেবল একজন লেখক নন, বরং 'বাংলা সাহিত্য আন্দোলন'-এর রূপকার এবং 'কলমকার' ম্যাগাজিনের সম্পাদক হিসেবে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সাহিত্যের একনিষ্ঠ সেবায়। তাঁর কলম কখনো শান্ত নদীর মতো বয়ে চলে হৃদয়ের গহীনে, আবার কখনো গর্জে ওঠে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রখর চেতনার মশাল হয়ে। তিনি সেই বিরল ঘরানার শব্দশিল্পী, যিনি শব্দকে সাজান অস্তিত্বের তাগিদে। তাঁর কাছে লেখা মানে শুধু কাগজ ভরানো নয়, বরং প্রতিটি অক্ষর যেন তাঁরই একেকটি নিঃশ্বাস। লেখার মাধ্যমেই তিনি খুঁজে ফেরেন মানুষের জীবনের মানে, প্রেম আর দ্রোহের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। মুহাম্মদুল্লাহ বিন মোস্তফার কাছে সাহিত্য হলো সময়ের জীবন্ত দলিল। তাঁর প্রতিটি লেখায় ফুটে ওঠে সমাজ, সংস্কৃতি আর মানুষের আত্মার প্রতিচ্ছবি। তিনি বিশ্বাস করেন, কলমের প্রতিটি আঁচড় একেকটি বিপ্লব আর প্রতিটি পঙ্ক্তি মানুষের মুক্তির একেকটি মন্ত্র। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো-'বিজয়ের সেই গান' (২০২২), 'ডাক দিয়েছি তোমাকে' (২০২৪) এবং 'আজাদির কবিতা' (২০২৫)-পাঠকের মনে সেই গভীর উপলব্ধিরই জন্ম দেয়।