-
জীবন কখনো কথা বলে ১.
জীবন কখনো কথা বলে। যেমন এখন সে আমায় বলছে, “গরম চা টা ঠান্ডা করে ধীরে সুস্থে খাও।”
বাহিরে অনেক কনকনে শীতল বাতাসে রীতিমতো ঠক ঠক করে কাঁপছি। গায়ে পাতলা একটা চাদর। এই সময়ে হাতের কাছে আগুন গরম এক পেয়ালা চা। কে আর জীবনের কথা শুনে! একটু ফু দিয়ে গলায় ঢেলে দিলাম সেই তরল অমৃত। জিভটা মনে হয় পুড়ে গেল। গলা দিয়ে নেমে গেল গরম আগুন। পাকস্থলী ও মনে হয় বুঝতে পারল উত্তপ্ত কিছু একটা ভেতরে এসেছে। অথচ শরীরের বেশ আরাম পেলাম। কোন যন্ত্রণা অনুভব হলো না। পরপর আরো কয়েকবার চুমুক দিলাম। একই অনুভূতি ঘুরে এলো আমার মস্তিষ্কে। কিন্তু বুঝতে পারলাম পরবর্তীতে এর খেসারত দিতে হবে আমাকে।
জীবন আমাকে একটা কথা জানালো। যে, “তুমি আগে মানুষ হও।”
এদিকে আমার চা পান করা শেষ। শরীর আগের তুলনায় উষ্ণ হয়ে আছে। তবুও ঠান্ডা আটকানোর জন্য দুহাত দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে ধরে নোংরা বেঞ্চিটার উপর বসে পড়লাম। দোকানটা আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হয়তো বন্ধ করে ফেলবে। তখন আমি হয়তো সম্পূর্ণ একা হয়ে যাব। এদিকে আমার জিভটাও পুড়ে গেছে। মুখের ভেতর কিছু অনুভব করতে পারছি না। আবার জীবনকেও তার জবাব দেওয়া দরকার— তুমি আগে মানুষ হও।
মনে মনে তাকে বললাম,
“যার শারীরিক গঠনে উন্নত একটা মস্তিষ্ক আছে। যে অন্যকে বুঝতে পারে, নিজের মনভাব প্রকাশ করতে পারে। তাকেই তো মানুষ বলে। আর আমিও তো তেমন একজন। আসলে তুমি কোন মানুষের কথা বলছো?”
জীবন বললো,
“তুমি যদি তা বুঝতে না পারো। তাহলে তুমি একজন অমানুষ।”
আমি মনে মনে মৃদু ভাবে হেসে মুখভঙ্গিতে তা প্রকাশ করে তাকে বললাম,
“তুমিও কি আমার সঙ্গী নও? নাকি তুমি আমার…
জীবনের কাছে কথাটা শেষ করতে পারলাম না। তার আগেই বাস্তবতায় দোকানদারের একটা ঝাড়ি খেলাম। শীতের মধ্যে বাহিরে বসে থেকে অকারনে আমাকে হাসতে দেখে তার মনে হতো অন্যরকম অনুভূতির জন্ম নিচ্ছিল। সে বিরক্তি মাখা সুরে বললো,
“এখন যাও। এখন আমি দোকান বন্ধ করবো।”
খোলা শুনশান মাঠে একটা ঝুপড়ি দোকান মতো। তার বাহিরে মাটিতে বাঁশ পুতে তৈরিকৃত বেঞ্চে আমি উপবেশন করে আছি। জিভ অকার্যকর থাকায় অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে দোকানদারকে বুঝাতে চাইলাম, এই অসময়ে আমি এখন কোথায় যাব। তাই বাইরে এখানে কিছুক্ষণ থাকতে চাই। কিন্তু সে আমার অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে কি যে বুঝলো—তা সেই জানে। সে আরো ক্ষেপে গিয়ে ধমকের সুরে আমায় বললো,
“পাগল, যা পালা শালা। এক্ষুনি যা! নইলে কিন্তু এবার মারবো।”
আমি অমায়িকভাবে হাসতে লাগলাম। মনে মনে তাকে বললাম,
“তুমি ভুল বুঝছো ভাই।”
কিন্তু তারপরেও আমাকে উঠতে হলো। হাবভাব বাদ দিয়ে আমার চেহারায় বাকি যা কিছু আছে তার সম্মিলিত বিবরণ একজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষেরই মতো। তাই হয়তো আমি উঠে দাঁড়ানোর সাথে সাথেই দোকানদার আমার কাছে চায়ের পেয়ালার জন্য টাকা চাইলো। আমি তখন সঙ্গে থমকে গেলাম। মনে পড়লো, আমি এক শূন্য মানুষ। থমথমে চেহারার দোকানদারের বাড়িয়ে দেওয়া খালি হাতের দিকে মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আমার আর কোন করার ছিল না।
ধুপ করে দোকানের ছাউনি টা আমার মুখের সামনে পড়ে গেল। দোকানদার আমাকে নীরবে বিতাড়িত করলো। আমার সুবিশাল আত্মসম্মানে সূচের মতো একটা ক্ষত দিয়ে। আমার জীবনের ভেতরটা তখন আমাকে উপহাস করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। আমি মৃদুভাবে মাথা নেড়ে হাটতে শুরু করলাম।
প্রান্তর জুড়ে কেউ নেই। চারিদিকে জলা জঙ্গল আর কুয়াশার চাদরে ঢাকা। আর আমি একা। হাঁটতে হাঁটতে একটা গ্রামার কাছে এসে পৌঁছলাম। ঠান্ডায় পুরো শরীর তখন অবশ হয়ে এসেছে। জীবন একনাগারে মাথার ভিতর তখন কি আবোল তাবোল বলছে— তাতে মনোযোগ দিলাম না।
গ্ৰামের ভেতরের সারি সারি বাড়িগুলো অন্ধকারে বুকের আলো জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরেই যেন সকল আশ্রয়। আমি আবারো হাঁটতে শুরু করলাম। আমার যাবার আর কোন জায়গা নেই। ঠান্ডায় ধুলো মাখা এই রাস্তার মধ্যে অল্পক্ষণই হতো অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবো।
4 Comments
Friends
MAHMUD HAYAT
@mahmudhayat1
Alamgir Job
@alamgirjob
iampori
@iampori
Md. Jahangir Alam
@md-jahangiralam
shimul gupta
@shimulgupta
Md Sojib Ahmeed
@mdsojibahmeed
tazbin smrity
@tazbinsmrity
Ahmed Al Amin
@ahmedalamin
Nijhum Nadia
@nijhumnadia

গল্পের চরিত্রটির হাসির আড়ালে যে অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে, সেটাই সবচেয়ে বেশি মন খারাপ করে দেয়। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।