Profile Photo

Rashida BegumOffline

  • Rashida.BD
  • Profile picture of Rashida Begum

    Rashida Begum

    4 years, 9 months ago

    ক্যাকটাস ( ছোট গল্প)

    রাশিদা বেগম

    প্রতিদিনের অভ্যাস মতো বাদল টবে লাগানো ক্যাকটাস গাছগুলোতে পানি ঢালছে। গাছগুলোর জন্য তার মমতার শেষ নেই। এ মমতার জন্ম একদিনে হয়নি।ক্যাকটাস ছিল এ বাসার গৃহিনী রূপার প্রাণ। সময়ে অসময়ে সে এগুলোর যত্ন নিত। হাজব্যান্ডের অনুপস্থিতিতে সময় কাটানোর জন্য সে গাছগুলোর পাশে দাঁড়াতো,হাত বুলাতো,পানি দিত।

    বাদল এ বাসার একমাত্র তৃতীয় প্রাণী। রূপা নিজ গ্রাম থেকে এনেছিল বাদলকে।নিজ গ্রামের বলেই বাদলের প্রতি রূপার পূর্ণ আস্থা ছিলো।তাকে খুব আদরও করতো সে। বাবার বাড়ি যেতো না বলে বাদলকেই সে একান্ত আপনজন মনে করত। গাছগুলো ছিল রূপার প্রাণ।রূপার কথা ভেবেই যত্ন নিচ্ছে বাদল।রূপার একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন এই ক্যাকটাস।

    জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি রাকিবকে পাওয়ার জন্য মা বাবাকে হারাল রূপা। মা বাবার কঠিন সিদ্ধান্তে তার বাবার বাসার দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ভালোবাসায় অকৃপণ এ দুজন ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা জুটি। দুজন একই বিষয়ের ছিলো না। একজন রসায়নের একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের।দুজনকে একসঙ্গে বাঁধতে পেরেছিল প্রেম নামক এক আশ্চর্য শক্তি।

    দুজনের মিলনে ছিলো দুপরিবারের বাধা। অভিভাবকের অনড় সিদ্ধান্তের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল দুজন।পারিবারিক বৃত্তের বাইরে এসে ঘর বাঁধে তারা।রাকিবের প্রতিষ্ঠার জোরে নরসিংদীতে একটি বাড়ি করতে পারে। সেই থেকে চলে তাদের জীবনের অনায়াস পথ।সংসারে মতবিরোধের অনেক বিষয় ছিলো। কিন্তু রাকিবের সাথে রূপার ক্যাকটাস ছাড়া কোনো বিরোধ ছিলো না। রাকিব ব্যাংকে চাকরি করতো।রাকিবের অফিস,অফিসের যাবতীয় কাজ এমনকি অন্য কিছুই রূপার উপর থেকে তার মনোযোগ নষ্ট করতে পারত না। আর এটা রূপার ভালোবাসার জোরেই। রাকিবের ঘরে ফেরার নেশার কাছে বাকি সব বিফল হতো।

    বাসায় থাকার সময়টুকুতে রাকিব সারাক্ষণ রূপার সান্নিধ্যে থাকতে চায়।অথচ রূপা ক্যাকটাস গাছগুলো নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। এ নিয়ে রাকিবের হৈচৈ শুরু হয়ে যেতো।একদিন সে বলে,’ আচ্ছা রূপা, তুমি দেশটাতে আর কিছু পেলে না? ‘
    ‘ না, পেলাম না।তাতে হয়েছে কী?’
    ‘ ফুলহীন,ফলহীন,সৌন্দর্যহীন একটা তুচ্ছ গাছকে বেছে নিলে কেন, বলবে?
    ‘ সাহিত্যিকের চোখ দিয়ে দেখো।ভালো লাগবে।’
    সে রেগে বলে,’ এত দেখাদেখিতে কাজ নেই। এরপর এগুলোর কাছে তোমায় দেখলে সব গাছ উপড়ে ফেলব।’

    রাকিবের এ কথার পর রূপা চুপ হয়ে যায়। প্রায়ই মন খারাপ থাকে তার। কারণ সে কখনও এত রাগ করেনি। এটা রাকিবের চোখ এড়ায় না।রাকিব সম্পর্কটাকে সহজ করার জন্য গরিব ঘরের অসহায় বিড়ালের মতো বলে,’ দুদিন ধরে কোনো কথা বলছ না। কথা ছাড়া কি কোনোদিন এভাবে থেকেছি আমরা? দুদিনেও কি আমার শাস্তির মেয়াদ শেষ হয়নি?’
    রূপার কথার অপেক্ষা না করেই সে আবার বলে,’ ঠিক আছে। ক্যাকটাস নিয়ে তোমাকে আর কিছু বলব না।’
    কী যেন ভেবে রূপা বলে,’ সেদিন আমায় খুব ফিল করেছিলে তাই না? বিশ্বাস করো তোমার একাকীত্ব আমি চাইনি।মুহূর্তেই এত অস্থির হয়ে যাও যে, মনে হয় তুমি ছোটোমানুষ।’
    রূপার কথা শুনে রাকিবের আবেগী চোখ সহসাই পানিতে ভরে যায়।তখনই রূপার গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে কয়েক ফোঁটা পানি। দুদিনের জমানো কালোমেঘ হঠাৎ বৃষ্টিতে পরিণত হলো।এ কান্নায় তৃপ্তি আছে। মিলন নয়, মহা মিলন প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে দুজন।

    রাকিবের জীবনে একদিন নেমে আসে এক বিপর্যয়। মায়ের অসুখের খবর শুনে রূপাকে নিয়ে যায় মাধবপুর। রূপার শরীরও তেমন ভালো ছিলো না। বাড়িতে দুদিন থেকে নরসিংদী ফিরছিল। সিলেটের বাসের সাথে ধাক্কা খেয়ে তাদের বাসটি পড়ে যায় নিচু ভূমিতে।নির্মম দুর্ঘটনা রূপার মৃত্যুদূত হয়ে এসেছিল। আহত হয় রাকিব।জ্ঞান ফিরলে যখন জানল রূপা বেঁচে নেই,নির্বাক হয়ে যায় রাকিব। এক সময় সুস্থ হলেও ডান পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে কেটে ফেলতে হয়।সেই থেকে হুইল চেয়ার আর বাদল তার সঙ্গী হলো। বাদল তার দেখাশোনা করে। রান্নাবান্নাও জানে বাদল।তাই রাকিবের কোনো অযত্ন হয় না।

    প্রকৃতির প্রতিটি জিনিস একই রকম আছে। শহর- বন্দর, গ্রাম যেমন ছিলো তেমনই আছে। কত মানুষ ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে।সবার মধ্যে প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা যায়।শুধু রূপা নেই। শূণ্যতায় রাকিবের বুকের ভেতর হু হু করে উঠে। সে স্থবির,নিশ্চল একজন মানুষ। সে ভাবে, সুখের দিনগুলি আর ফিরে আসবে না। ভাগ্য এসে দেয়াল হয়েছে তাদের মাঝে। নিষ্ঠুর নিয়তির খেলায় রাকিবের পরাজয় হলো।মুহূর্তের দুর্ঘটনায় রূপা ছিটকে পড়েছে অপর পারে।।আর রাকিব অর্ধ জীবিত এক পঙ্গু মানুষ।পঙ্গুত্বকে আজ বরণ করে বেঁচে আছে সে। অসহায়তা,হতাশা তার ব্যর্থ জীবনকে ঘিরে ধরেছে।

    হুইল চেয়ারে করে সে বারান্দায় যায়। পেছনে পেছনে চায়ের কাপ নিয়ে এগিয়ে আসে বাদল। কাপে চুমুক দিতে দিতে সে বাদলকে বলে,’ তোর খুব কষ্ট হচ্ছে বাদল,তাই না?’
    না। আমার কষ্ট হচ্ছে না।তবে আপার জন্য মন কেমন কেমন করে। আমি আপনার জন্য সব করতে পারি।’
    ‘ ঠিক কাজের কথা বলছি না। একজন অচল, অসাড় মানুষের সেবা করা নিরানন্দের, তাই না?’
    ‘ না। মোটেও না।আমার কাজ করতে ভালো লাগে।’ বলেই সে অন্য কাজের তাগিদে চলে যায়।

    বারান্দার একপাশে টবে লাগানো কয়েক ধরনের ক্যাকটাসের উপর চোখ পড়ে রাকিবের।ঢাকা কলেজের সামনে থেকে রূপা এগুলো এনেছিল।রূপার মৃত্যুর পর আজই প্রথম রাকিব বারান্দায় গেল। ক্যাকটাসের উপর চোখ পড়তেই তার ভেতরটা ছলাৎ করে উঠে। গাছগুলো তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে রূপার সবকিছু। যতই ভাবছে ততই অস্পষ্ট হয়ে আসছে সব। হঠাৎ দেখতে পায় ক্যাকটাসের মধ্যে কেমন ধোঁয়াটে ভাব,শূণ্যতা।
    ফুল নেই,ফল নেই,ডালপালা নেই। গাছগুলোর সার্থকতা কোথায়? রাকিবের মতোই বিকল মনে হয় এগুলোকে। গাছগুলো মারাত্মকভাবে নিঃসঙ্গ,খুব একা। রাকিবের মতোই। এত মিল কেন তার সাথে? সে ভাবে এদেরও কি তার মতো কষ্ট হয়,? হয়তো বা হয়।বলার ভাষা নেই বলে সে বোঝে না। হয়তো বা হয় না।হলেই কি? বলবে কাকে? রাকিব যেমন বলার মানুষ পায় না।পঙ্গুর এ বিকল জীবনে দুঃখের ভাষা শোনার কেউ নেই।

    ভাবতে ভাবতে একসময় রাকিবের মগ্নতা কাটে। আর তখনই বৃষ্টি শুরু হয়। সেই সাথে প্রবল বাতাস। ঝড় বলা যায়। রাকিবের গায়ে ঝড়ো বাতাস ধাক্কা দেয়। অথচ সে বসে থাকে অনড়ভাবে।বৃষ্টি, বাতাস তাকে একটুও টলাতে পারেনি। প্রকৃতির এমন রূঢ় আচরণ তার ভেতরের কষ্ট,যন্ত্রণার সাথে যোগ হলো।সে শুনতে পায় রূপা বলছে,’ রুমে যাচ্ছ না কেন?ঠাণ্ডা লাগবে তো।’
    চারদিকে তাকালো রাকিব। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না সে। আবারো অলসভাবে,প্রাণহীনভাবে বসে থাকল।

    বাতাসে আন্দোলিত হচ্ছে ক্যাকটাস গাছগুলো। রাকিবের চোখের পলক পড়ছে ঘনঘন। প্রচণ্ড ভয়,উৎকণ্ঠায় সে তার বুকের ভেতর শুনতে পায় ভাঙ্গনের শব্দ। তারপর চারদিকে—–।

    সমাপ্ত
    ———

    1 Share
    6
    4 Comments
Skip to toolbar