-
Abul Hasan Tuhen is with নির্বোধ সুদীপ্ত and 9 others
লালমিয়া থেকে এস এম সুলতান
-আবুল হাসান তুহিন
এক।।
জন্ম হোক যথা তথা কর্ম হোক ভালো। মানুষ যেখানে জন্মগ্রহণ করুন না কেন প্রকৃত অর্থে মানুষ হতে না পারলে জন্মের কোন মূল্য থাকে না। তাইতো পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকূলের মধ্যেই একমাত্র মানুষকে মানুষ হওয়ার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে হয়। শিল্পী এস এম সুলতান এর কথাই বলছি তিনি অত্যন্ত গরীব ঘরে জন্ম গ্রহণ করেও পৃথিবীর বিখ্যাত শিল্পী হয়েছিলেন। তিনি ভালোবাসতেন শিশুদের, তাইতো শিশুদের জন্য১৯৮৭সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শিশুস্বর্গ নামে আর্ট স্কুল, নিজের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে ১৯৯২ সালে ১০ লাখ মতান্তরে ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬০ ফুট দৈর্ঘ্য ও ১৫ ফুট প্রস্থ বিশিষ্ট দ্বিতলা নৌকা তথা ভ্রাম্যমাণ শিশুস্বর্গ। তিনি চিন্তা করলেন যে শিশুদের কিভাবে সহজ পন্থায় ছবি আঁকা শেখানো যায়। এই জন্য তৈরি করলেন বিশাল এক বজরা নৌকা ভাসিয়ে দিলেন চিত্রা নদীর বুকে। উনার চিন্তাটা ছিল এমনই নদীতে নৌকা চলবে শিশুরা নৌকার ভিতর বসে চারদিকের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখবে এবং ছবি আঁকা শিখবে। এমন চিন্তা চেতনা সবার মাথায় থাকে না। শিল্পী এস এম সুলতানের মৃত্যুর পর নৌকাটি ডাঙায় উঠিয়ে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তাঁর অনন্য প্রতিভার মধ্যে চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি বাঁশি এবং সুরযন্ত্র বাজাতেন নিপুণভাবে। এই কারণে মধুর সুরে তিনি বাঁশি বাজাতে পারতেন। আরেকটি শখ ছিল পশু পাখি লালন পালন করা, বিষধর সাপ, ভল্লুক, বানর, খরগোশ, মদনটাক, ময়না, গিনিপিক, মুনিয়া, ষাঁড়সহ বিভিন্ন পশু-পাখি পুষতেন। এসব পশু পাখি সংগ্রহ করে বাড়িতে একটি মিনি চিড়িয়াখানা তৈরি করেছিলেন। সুলতান হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি পছন্দ করতেন না। এই মহতি মানুষের জন্ম বৃহত্তর যশোর জেলার বর্তমান নড়াইল জেলার ১০ আগস্ট ১৯২৩ মতান্তরে ১৯২৪ সালে চিত্রা নদীর পাড়ে,মাছিমদিয়া গ্রামে।আমাদের শিল্প সাহিত্য জগতের এক অনন্য নাম এস এম সুলতান। পুরো নাম শেখ মোহম্মদ সুলতান। যদিও শৈশবে তার বাবা নাম রেখেছিলেন লাল মিয়া, নড়াইলে রয়েছে খরস্রোতা অপরূপ এক নদী চিত্রা। সেই চিত্রার সঙ্গে একসাথেই বেড়ে উঠতে থাকলেন। সুলতানের জীবনী থেকে আমরা জানতে পারি মা মাজু বিবি বাবা শেখ মোহাম্মদ মেসের আলীর মূল পেশা কৃষি। শুধু চাষবাস করে সংসার চলে না। তাই রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মাঝে মাঝে ঘরামিগিরিও করেন। রাজমিস্ত্রিদের কাজে পদে পদে ছিল শিল্পের ছোঁয়া। বাবা যখন লোকের দালানবাড়ি তৈরি করতেন, সেসবে কত কারুকাজ, নকশা করতে হয়। শিশু সুলতান ওরফে লাল মিয়া যেতেন বাবার পিছু পিছু। বাবার কাজ মুগ্ধ হয়ে দেখতেন। বাবার সেই পেশাই সুলতানের ভেতরে শিল্পীসত্তার জন্ম দেয় বলে আমরা ধারণা করতে পারি। রাজমিস্ত্রি হলেও সুলতানের বাবার আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না।পারিবারিক সামর্থ্য না থাকলেও তাকে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। কিন্তু স্কুলের ধরাবাঁধা নিয়মে শিক্ষালাভ ছিল তার স্বভাব বিরুদ্ধ। পাখির মতো মুক্ত প্রাণ নিয়েই যেন সুলতানের জন্ম। ১৯২৮ সালে তবু তাঁকে ভর্তি করানো হয় নড়াইলের ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট স্কুলে। তখন সুলতানের বয়স ১০ বছর।১৯৩৩ সালে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় জমিদার শ্যামাপ্রাসাদ মুখোপাধ্যায়ের একদিন স্কুল পরিদর্শনে আসেন সুলতান তাঁর একটা স্কেচ এঁকে তাক লাগিয়ে দেন। কিন্তু স্কুলের বাঁধা ধরা নিয়ম পড়ালেখা তার ভালো লাগতো না। সময় কাটতো প্রকৃতিকে অনুভব করে। কখনো ক্লাসে বসে আবার কখনো চিত্রা নদীর পাড়ে বসে স্কেচ করতেন। স্কুলের শিক্ষক রঙ্গলাল ব্যাপারটি খেয়াল করলেন।সুলতানের খাতা দেখে বুঝতে পারলেন তার মধ্যে এক শিল্পী বাস করছে। তিনি সুলতানের ভেতরের সেই সত্ত্বাকে গড়ে তুলেতে চাইলেন। তিনি সুলতানকে তার নিজের বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে রঙ্গলাল সুলতানকে তার সব জ্ঞান উজাড় করে দিলেন।রঙ্গলালের বড় মেয়ে অররা একসাথে পড়তো। অররার সাথে সুলতানের প্রেম হয়ে যায়। কিন্তু রঙ্গলাল তাদের সম্পর্ক মেনে নেননি কখনো। অররার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। ফলে মনের কষ্টে জর্জরিত হয়ে তিনি চলে আসলেন। সাথে নিয়ে আসেন অররার হাতে বানানো নকশীকাঁথা সেই নকশী কাঁথা মাথার নিচে দিতেন। সেই কারণে হয়তো অভিমানে শিল্পী সারা জীবন চিরকুমার থেকে গেছেন।
লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে সুলতান বাবার সঙ্গে যোগ দেন রাজমিস্ত্রির কাজে। বিভিন্ন দালান–বাড়িতে বাবার আঁকা নকশা তাঁর মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে। বাবা রাজ মিস্ত্রী হলেও সুলতানের কাছে তাঁর বাবা ছিলেন একজন শিল্পী। এর মধ্যেই চলে তাঁর আঁকাআঁকি। বাবা জমিদার বাড়ির দালান তৈরি করেন। সেই দালানে মনের মাধুরী মিশিয়ে নকশা আঁকেন। বাবার সঙ্গে ছেলেও হাত লাগান। জমিদার বাড়ির অনেক নকশা সুলতানের বাবার করা। সুলতান সেসব কাজ দেখেছেন একদম কাছ থেকে যা তাকে পরবর্তীতে শিল্পী হতে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে ।জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাবা-ছেলের কাজে মুগ্ধ হন।তিনি সুলতানের ছবি আঁকার শখেরকথা জানতে পারেন। তাঁর ছবি আঁকা আঁকির কিছু নমুনাও দেখেন। দেখে আপ্লুত হন।
কলকাতায় গিয়ে আর্ট শিখতে চাইলেও সেই আর্থিক সঙ্গতি ছিলো না সুলতানের। এক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত।১৯৪১ সালে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত সুলতানকে নিয়ে যান কলকাতায়।, সুলতান কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেন এবং প্রথম স্থান অধিকার করেন। কিন্তু সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা তার ছিলো না। সেখানে ভর্তি হওয়ার জন্য তাকে সহযোগিতা করেন শিল্প সমালোচক শাহেদ সোহরাওয়ার্দী। এ সময় শাহেদ সোহরাওয়ার্দী তার লাল মিয়া নাম পাল্টে এস এম সুলতান (শেখ মোহাম্মদ সুলতান) রাখেন। ভর্তি করিয়ে দেন কলকাতা আর্ট স্কুলে। জমিদার ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের আরেকটা বাড়ি ছিল কলকাতায়। সেই বাড়িতেই সুলতানের থাকার ব্যবস্থা হয়। কিন্তু সুলতান বরাবরই স্বাধীনচেতা মানুষ। আর্ট স্কুলের ধরাবাঁধা নিয়ম তাঁর ভালো লাগে না। ভালো লাগে না কলকতার বদ্ধ পরিবেশও। তিন বছর সেখানএকাটিয়ে১৯৪৩ মতান্তরে ১৯৪৪ সালে, একেবারে শেষ বছরে পড়াশোনা অসমাপ্ত রেখে ফিরে আসেন গ্রামে।
দুই।।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সময়, ভবঘুরে বাঙালি যুবক ঘুরে বেড়িছেন কাশ্মীরের পথে-প্রান্তরে, পাহাড়ে-জঙ্গলে। আদিবাসীদের সঙ্গে দারুণ সখ্য তাঁর। তাদের সঙ্গেই থাকেন, খান, ঘুরে বেড়ান আর ছবি আঁকেন। ভারতবর্ষের গ্রাম-প্রকৃতি, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ তাঁর ছবির বিষয় বস্তু। সেসব ছবি তিনি বিক্রি করেন যুদ্ধরত সৈনিকদেরকাছে। সৈনিকেরা ছবি কেনেন, দু–চার টাকা দেন, তা দিয়েই সেই ভবঘুরে যুবকের পেট চলে যায়। গ্রামেও বেশি দিন থাকেননি সুলতান। ১৯৪৩ সালে চলে যান কাশ্মীরে। সেখানকার প্রকৃতি ও আদিবাসীদের জীবন তাঁকে গভীরভাবে আকর্ষণ করে। সে সবই ফুটিয়ে তোলেন নিজের চিত্রকর্মে।তিনি ছিলেন প্রকৃতি প্রেমী একজন আবেগি মানুষ তাই তিনি অস্বীকার করেছিলেন যান্ত্রিকতা পিষ্ট নগর ও নাগরিক জীবনকে। ১৯৪৩ সালে তিনি খাকসার আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তারপর দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তিনি বেড়িয়ে পড়েন উপমহাদেশের পথে পথে। ছোট বড় শহরগুলিতে ইংরেজ ও আমেরিকান সৈন্যদের ছবি আঁকতেন। ছবি প্রদর্শনী ও ছবি বিক্রি করে চলত তাঁর জীবন। শিল্পী হিসেবে তিনি তখন কিছুটা পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কিন্তু জাগতিক বিষয়ের প্রতি ছিল তাঁর প্রচণ্ড অনাগ্রহ। শিকড় ছড়াবার আগেই তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন। আর তাই তখনকার আঁকা তাঁর ছবির নমুনা, এমনকি ফটোগ্রাফও এখন আর নেই। তবে সে সময় তিনি নৈসর্গিক দৃশ্য ও প্রতিকৃতির ছবি আঁকতেন। কাশ্মীরে কিছুদিন থেকে তিনি প্রচুর ছবি এঁকেছিলেন। ১৯৪৫ মতান্তরে ১৯৪৬ সালে ভারতের সিমলায় প্রথম তাঁর চিত্রকর্মের প্রথম প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়, কানাডিয়ান শিল্পপ্রেমী মিসেস হাডসন সেই প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এরপর ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের লাহোরে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধন করেন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ। সেখানে পারসি স্কুলে দু’বছর শিক্ষকতা করেন। সে সময় চুঘতাই ও শাকের আলীর মত শিল্পীদের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। পরের বছর দেশ ভাগ হয়।সুলতান ফিরে আসেন গ্রামে।সেখান থেকে চলে যান তত্কালীন পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোরে। সেখানকার এক স্কুলে আর্টের শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। অনেক নামীদামি শিল্পীর সঙ্গে সুলতানের পরিচয় হয় তখন। লাহোর ও করাচিতে দুটি প্রদর্শনীও হয়। সেখান থেকেই এক শিল্প সম্মেলনে যোগ দিতে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেটা ১৯৫০ সালের কথা। সেখানেই একের পর এক হয় তাঁর চিত্র প্রদর্শনী—নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, শিকাগো ও বোস্টনে। এরপর লন্ডনে তাঁর চিত্র প্রদর্শনী হয়। ইউরোপজুড়ে কুড়িটির মতো চিত্র প্রদর্শনী হয় তাঁর। পাবলো পিকাসো, সালভাদর দালির মতো বিখ্যাত চিত্রকরদের আঁকা ছবির সঙ্গে সুলতানের ছবি প্রদর্শিত হয়। কিছুটা আন্তর্জাতিক খ্যাতি জোটে সুলতানের কপালে। কিন্তু সে পর্যন্তই। বাংলাদেশের মানুষ তখনো তাঁর গুণের খবর পায়নি।১৯৫৩ সালে ঢাকায় ফেরেন সুলতান। ঢাকায় একটা চাকরির খোঁজও করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছিল না বলে ঢাকায় চাকরি মেলেনি।১৯৫৩ সালে বাধ্য হয়ে নড়াইলে চলে আসেন । শিশু-কিশোরদের সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি চারুকলা শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ফিরে যান নড়াইলে নিজের গ্রামে। নিজের এলাকায় একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করার খুব ইচ্ছা। তার জন্য ভালো একটা জায়গা চাই। সুলতান গ্রামকে, প্রকৃতিকে ভালোবাসেন। গ্রামে প্রকৃতির খুব কাছাকাছি হোক স্কুলটা, সুলতান তা-ই চাচ্ছিলেন। অনেক সন্ধান করেন। চাচুড়ী ও পুরুলিয়া গ্রামের মাঝামাঝি জায়গায় একটা ভাঙা জমিদারবাড়ির খোঁজ পান। সেটা সুলতানের পছন্দ হয়। স্থানীয় প্রশাসনের১৯৫৫ সালে সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত করেন ‘নন্দন কানন প্রাথমিক বিদ্যালয়’ এবং ‘নন্দনকানন ফাইন আর্টস স্কুল’। পরে আর্ট স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু প্রাথমিক বিদ্যালয়টি এখনো চালু আছে ‘চাচুড়ী পুরুলিয়া প্রাথমিক হাইস্কুল’ নামে। আর্ট স্কুলটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে অনেকটা অভিমান নিয়েই সুলতান চলে যান নড়াইলে। সেখানেই চলে তাঁর শিল্পচর্চা। ১৯৫৬ সালে পল্লীকবি জসীমউদদীনের সাথে কয়েকদিন আবস্থান করেন। ১৯৫৮-৬৯ সালে যশোরের নীলগঞ্জ শশ্মানে মাঝে মাঝে ধ্যান করতেন শিল্পী । ১৯৬০ সালে যশোরের চাঁচড়ার জমিদারবাড়িতে কিছুকাল অবস্থান করেন। ১৯৬৫ সালে সবার অগোচরে আবার পশ্চিম পাকিস্তানে গমন করেন। হারিয়ে যাওয়া লাল মিয়াকে ১৯৬৭ সালে নড়াইলের অদূরে এক গ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়। তৎকালীন যশোর জেলা প্রশাসক এনাম আহম্মেদ চৌধুরী তাকে যশোরে নিয়ে আসেন। ১৯৬৮ সালে যশোর-খুলনা কাবে তার একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করেন।
তাঁর ছবিতে গ্রামীণ সমাজের প্রকৃতি ও কৃষকদের জীবনচিত্রই উঠে এসেছে বারবার। বাংলার মাঠ, ফসলের খেত, টলটলে নদী, দাঁড় বাওয়া মাঝি, মাছ শিকারি জেলে, গাঁয়ের বধূ এবং বলিষ্ঠ কৃষকের ছবি এঁকেছেন তিনি পরম মমতায়। কৃষকদের ছবি তিনি এঁকেছেন পেশিবহুল শক্তিশালী পুরুষের রূপে। এদেশের কৃষকরা মোটেও তাঁর ছবির মতো শক্তিমানপুরুষ ছিলেন না সেকালে। কিন্তু যে কৃষকেরা আমাদের অন্ন জোগান, দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি যাঁরা, তাঁদের সুলতান বলিষ্ঠ, শক্তিশালী করে আঁকতেই ভালোবাসতেন। শুধু কৃষকেরা নয়, গাঁয়ের গৃহিণীদেরও তিনি বলিষ্ঠ চেহারায় এঁকেছেন। অবশ্য দুটো নেতিবাচক ছবিও তিনি এঁকেছেন। সেই ছবি দুটো হলো হত্যাযজ্ঞ ও চর দখল। এঁকেছেন বন্যায় বিপর্যস্ত মানুষের ছবিও।
তিন।।
১৯৬৯ সালের ১০ জুলাই, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে শিল্পের বীজ ছড়িয়ে দিতে যশোরে প্রতিষ্ঠা করেন ‘একাডেমি অব (দি ইনস্টিটিউট) অব ফাইন আর্টস কলেজ’। এখন সেটা ‘চারুপীঠ’ নামে পরিচিত। যশোর জেলার পৌর পার্ক এর ভিতর বর্তমান অবস্থান। উদ্বোধন করেন যশোরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক ইনাম আহম্মদ চৌধুরী। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় শিল্পী জেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে যুদ্ধের ছবি আঁকেন। স্বাধীন দেশের নিজ শহরে ঘুরে বেড়িয়েছেন এক স্থান থেকে অন্য স্থানে। সে সময় প্রতিদিন রাতে শহরের বিভিন্ন বাড়িতে একটা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে তিনি কাটিয়েছেন । তার ব্যাগে একগাদা আড়বাঁশির সাথে থাকত সাপ, কখনো বেজী। শোনা যায় পশুপাখিরা তার কথা শুনত। একটি গল্প প্রচলিত আছে একটি সাপ এবং বেজিতে একদিন প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয় তিনি এ বিষয়টা দেখতে পেয়ে উভয়কে থামতে বলেন অমনি সাপ এবং তাদের মারামারি থামিয়ে দেয়।
পঞ্চাশ, ষাট ও সত্তরের দশকে সুলতান কাছ থেকে দেখেছেন এ দেশের মানুষ, প্রকৃতি, মানুষের জীবনাচার। আর নিজের বোধ ও মেধাকে শাণিত করেছেন আবেগ, অনুভূতি ও উপলব্ধির মাধ্যমে। এরই ফল হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে তার ছবি আকার ধরনেও পরিবর্তন আসে। বাংলার কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষকে তিনি নতুন রূপ ও শক্তিতে হাজির করেন তার ছবিতে।
সুলতান তার শিল্পকর্মে খেটে খাওয়া মানুষ এবং সংগ্রামী জীবনের কথাই বেশি চিত্রিত করেছেন। রয়েছে পরিবেশ বন্ধু বৃক্ষরোপণের ছবিও।তাঁর জীবনের মূল সুর-ছন্দ খুঁজে পেয়েছিলেন বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন, কৃষক এবং কৃষিকাজের মধ্যে। আবহমান বাংলার সেই ইতিহাস-ঐতিহ্য, দ্রোহ-প্রতিবাদ, বিপ্লব-সংগ্রাম এবং বিভিন্ন প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার ইতিহাস তার শিল্পকর্মকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছে। তার ছবিতে গ্রামীণ জীবনের পরিপূর্ণতা, প্রাণপ্রাচুর্যের পাশাপাশি শ্রেণির দ্বন্দ্ব এবং গ্রামীণ অর্থনীতির হালও অনেকটা ফুটে উঠেছে। তার ছবিগুলোতে বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্র হিসেবে গ্রামের মহিমা উঠে এসেছে এবং কৃষককে এই কেন্দ্রের রূপকার হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি থাকলেও তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাছে রয়ে যান অচেনাই।১৯৭৬ সাল পর্যন্ত। এর একটা বড় কারণ তাঁর ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগহীনতা। আসলে শহুরে জীবন কখনোই সুলতানের ভালো লাগেনি। ঢাকায় এসে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার তাগিদও তাঁর ছিল না। ১৯৭৬ সালে ঢাকার শিল্পসমাজে এস এম সুলতানের স্বীকৃতি মেলে। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁর আঁকা ছবি নিয়ে একটা প্রদর্শনীর আয়োজন করে সে বছর। এরপর থেকেই দেশব্যাপী এই মহান শিল্পী ব্যাপক পরিচিতি পান।এস এম সুলতান ছবি আঁকতেন জলরং ও তেলরঙে। কিন্তু তাঁর কাগজ আর রঙের মান ছিল খুব সাধারণ। কিছু কিছু ছবি তিনি কয়লা দিয়েও এঁকেছেন। তাই তাঁর অনেক ছবিই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রচারবিমুখ এ মানুষটি তার কাজের প্রতিও ছিলেন বেখেয়ালী। জীবনে নানা জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছেন। যে জায়গায় কাজ করেছেন সেখানেই তা ফেলে এসেছেন। এভাবে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেছে সুলতানের অনেক কাজ। সুলতানের এই অসচেতনতা উপর অনেক গল্প আছে,আমার শ্রদ্ধাভাজন বড় মাসুম ভাই যশোর ঘোপ জেল রোড এর বাড়ি। ভাই এস এম সুলতানের অনেক ভক্ত ছিলেন তিনি অনেক ডকুমেন্টারি ভিডিও ফুটেজ তার উপর নির্মাণ করেছিলেন। তিনি শিল্পীকে প্রস্তাব করলেন ছবি আঁকা অবস্থায় প্রামাণ্য ভিডিও ফুটেজ শুট করবেন। কি ভেবে শিল্পী বললেন তুই আমার কি ছবি আঁকা নিবি এই বলে হাতে একটি বাঁশি নিলেন বাঁশিতে সুন্দরভাব সুর তুললেন এবং নৃত্যের তালে তালে চুনের ভেতর পা ডুবিয়ে ডুবিয়ে উনি মাটিতে ছবি আঁকতে লাগলেন, মাসুম ভাইয়ের ভাষ্যমতে বিশাল একটি ক্যানভাস উনি মাটিতেই অংকন করলেন। ভিডিও ফুটেজটি পরবর্তীতে তিনি সংগ্রহে রাখতে পারেন নি। হারিয়ে গেল এই অসামান্য ক্যানভাসটি। বিভিন্ন সময়ে যশোরের বিভিন্ন স্থানে তিনি আড্ডা দিতেন এবং সেখানে কয়লা দিয়ে অনেকে অনেক ছবি এঁকে দিয়েছেন সেগুলো সংগ্রহ করা যায়নি।
এই মহান শিল্পী কে১৯৮১ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ সম্মাননা প্রদান করে।নিউইয়র্কের বায়োগ্রাফিক্যাল সেন্টার থেকে ‘ম্যান অব অ্যাচিভমেন্ট’ এবং এশিয়া উইক পত্রিকা থেকে ‘ম্যান অব এশিয়া’ পুরস্কার লাভ করেন। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে১৯৮২ সালে একুশে পদক ও ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি তাঁকে ‘আর্টিস্ট অব রেসিডেন্ট’ ঘোষণা করে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার ‘গ্যালারি টোন’-এ শেষবারের মতো তাঁর চিত্র প্রদর্শনী হয়।
চিত্রকর্মের স্বকীয়তায় যিনি ‘লাল মিয়া’ থেকে হয়ে ওঠেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব, তিনি মাটি ও মানুষের শিল্পী এস এম সুলতান। তার পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান।১৯৮৭ সালে ঢাকার গ্যেটে ইনস্টিটিউটে সুলতানের একটি প্রদর্শনী হয়। আশির শেষ দিকে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হতে থাকে। ১৯৯৪ সালে ঢাকার গ্যালারি টোন’এ তাঁর শেষ প্রদর্শনীটি হয়। সে বছর আগস্ট মাসে ব্যাপক আয়োজন করে তাঁর গ্রামের বাড়িতে তাঁর জন্মদিন পালন করা হয়। এরপর পরই ১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে অসুস্থ অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মরদেহ সামরিক হাসপাতাল থেকে এনে যশোর বাসীর পক্ষ থেকে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন করে প্রিয় জন্মভূমি নড়াইলে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় মাটি ও মানুষের শিল্পী এস এম সুলতানকে। এরপর নড়াইলবাসীর দাবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সুলতানের বসতবাড়ি সংলগ্ন ২ একর ৫৭ শতক জমিতে ২০০১ সালের জুলাই মাসে শিশুস্বর্গের আদলে সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা নির্মাণ শুরু হয়। ২০০৩ সালের জুলাই মাসে নির্মাণকাজ শেষ হয়। বর্তমানে সপ্তাহের প্রতিদিন সুলতান সংগ্রহশালা দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা প্রকল্পের অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে আর্ট গ্যালারি ভবন, শিশুস্বর্গ ও অডিটোরিয়াম ভবন, সংগ্রহশালা, প্রধান ফটক, শিল্পীর মাজার, শিশুস্বর্গ নৌকা ইত্যাদি। প্রতি বছর শিল্পীর জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকীতে থাকে নানা আয়োজন।
০৯/০৯/২০২১যশোর7 Comments

Abul Hasan Tuhen
Friends
abrar
@abrar
জামান বারভী
@zamanbarovi
MUHAMMAD TAHSEEN
@muhammadtahseen
Kokeshas King
@kokeshasking
মোরশেদ সাকিব
@morshedsakib
Ekhtiar Uddin
@ekhtiar2003
ইভান
@ivan
মো: ফারহান হাবীব
@farhan-habib
Masfi K
@masfi-mohammad



অসাধারন লেখা