Profile Photo

Rana ZamanOffline

  • RanaZaman
  • Profile picture of Rana Zaman

    Rana Zaman

    4 years, 8 months ago

    বান্দর কান ধর!
    রানা জামান

    এই বান্দর কান ধর!
    বানরটাও সাথে সাথে বললো, তুইও কান ধর!
    বানরকে কথা বলতে দেখে চমকে গেলো লোকগুলো। বানর বাঁদরামি করে এই বিবেচনায় ওর এ কথায় কেউ কিছু মনে করলো না। তবে সবাই অবাক ওর কথা বলায়। অবশ্য বানরের হাতে একটা টর্চ লাইটের মতো ছোট ডিভাইস আছে।
    একজন ভদ্রলোক ওকে তাচ্ছিল্য না করে ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা বানর, নিশ্চয়ই তোমার একটা নাম আছে।
    তুমি মানুষের মতো কথা বলা শিখলে কিভাবে?
    বানরটি গলায় ডিভাইস ঠেকিয়ে বললো, আমাকে তাচ্ছিল্য না করার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আমার নাম আওরঙ্গজেব। নামটা আমিই নিয়েছি। আর আমি কথা বলি এই ডিভাইসের সাহায্যে।
    আমাদের পূর্ব পুরুষ! এই ডিভাইস আবিস্কার করলো কে?
    প্রফেসর মাসুদ।
    প্রফেসর মাসুদটা কে?
    আরেকজন এগিয়ে এসে বিস্মিত কণ্ঠে বললো, প্রফেসর মাসুদকে চেনেন না? বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক; তবে অনেকটাই পাগল টাইপের। সেকারণে নাম কামাতে পারলেন না-টাকাপয়সা তো নয়ই।
    আওরঙ্গজেব বললো, আমি গেলাম। সবাই ভালো থাকবেন। আর একটা কথা: আমার প্রফেসর পাগল না।
    আওরঙ্গজেব এগিয়ে চললো। ও কখনো রিক্সা বা গাড়িতে চড়ে না। একটা কলার দোকান দেখে দাঁড়ালো। সব বানরের মতো ওরও কলায় খুব লোভ।
    দোকানের সামনে আসতেই বেঞ্চে বসা একজন ভদ্রলোক বললেন, এই বান্দর যা! গরীব মানুষের কলা চুরি করিস না!
    আওরঙ্গজেব কন্ঠে ডিভাইস ঠেকিয়ে কথা বলায় সবাই চমকে ওর দিকে তাকালেন। ও বললো, আমি চোর না! কলা চুরি করবো না।
    পাশে বসা আরেক ভদ্রলোক বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, দেখেছো, বানরটা মানুষের মতো কথা বলছে!
    দোকানী বললেন, তুমি ভুল শুনেছো রায়হান। বানর কথা বলবে কিভাবে?
    তখন আওরঙ্গজেব টকিং ডিভাইসটা দেখিয়ে ফের বললো, আমি এই ডিভাইসের সাহায্যে কথা বলতে পারি। আমি কলা কিনতে এসেছি। হালি কত করে?
    দোকানী বিস্ময় হজম করতে গিয়ে তোতলিয়ে বললেন, আ-আচ্ছা! কলার হালি কুড়ি টাকা।
    ওকে। আমাকে এক ডজন এক হালি দিন। কলাতে ফরমালিন দেয়া নেই তো?
    বলতে পারি না। থাকতেও পারে।
    আওরঙ্গজেব এক ডজন কলা কিনে ওখানে বসে এক হালি কলা খেয়ে খোসাগুলো ডাস্টবিনে ফেলে ডেরার দিকে চললো আওরঙ্গজেব।
    কিছু উৎসাহী পথচারী ওর পিছু নিলে আওরঙ্গজেব পেছনে তাকিয়ে বললো, আমি বানর। এর আগেও আপনারা বানর দেখেছেন। কাজেই আমার পিছু নিয়েন না। আপনারা আমার পিছু নিলে আমার হাটতে সমস্যা হয়।
    ওর কথা শুনে থেমে গেলো উৎসুক পথচারীগণ। আরেকটু দ্রুত হেটে আওরঙ্গজেব চলে এলো ডেরায়। বাসায় ঢুকে দেখে প্রফেসর মাসুদ ল্যাবে কাজ করছেন। আওরঙ্গজেব দরজার পাশে ঝুলিয়ে রাখা ইন্টারকমে বললো, খুব বেশি ব্যস্ত না হলে কলা খেতে পারো। এক ডজন এক হালি কিনেছিলাম। দোকানে বসেই খেয়ে ফেলেছি এক হালি।
    খুব ভালো কাজ করেছো। বাকিগুলোও তুমি খেয়ো। রাতে। এখন এক কাপ কফি করো। নো সুগার!
    তুমি কি শুধু রান্নাবান্নার জন্য আমাকে রেখেছো?
    কেনো? তুমি তো শপিং-এও যাচ্ছো?
    আওরঙ্গজেব এক চিলতে হেসে বললো, ব্রুট জোকিং!
    তুমি কী করতে চাও আওরঙ্গজেব?
    তোমার ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট হতে চাই।
    আমার এই ল্যাবে অন্য কারো ঢুকা নিষেধ। তাছাড়া রিসার্চ করার মতো তুমি এতো বুদ্ধিমান হয়ে উঠোনি।
    তুমি চেষ্টা করলে আমার ব্রেনের আরো ডেভেলপমেন্ট সম্ভব।
    তোমার ধারনা ভুল আওরঙ্গজেব। মানুষের ব্রেনের সাথে বানরের ব্রেনের তুলনা হয় না। এ নিয়ে তুমি আর জেদ করো না।
    এ জীবন আমার ভালো লাগে না প্রফেসর। আমাকে মুক্তি দাও। আমি ফিরে যেতে চাই জঙ্গলে।
    তুমি এভাবে জঙ্গলে গেলে টিকতে পারবে না।
    কেনো?
    তোমার মাঝে আর বানরের বিহেভিয়ার নাই।
    আমি কি মিউটেন্ট মাঙ্কি?
    প্রফেসর ল্যাব থেকে বের হয়ে বানরের হাত ধরে ড্রয়িংরুমে ঢুকলেন। আওরঙ্গজেবকে একটি চেয়ারে বসিয়ে হুইলচেয়ারের চাকা ফিক্স করে বললেন, না আওরঙ্গজেব। তোমার মাঝে মিউটেশন করা হয় নি। এক্সক্লুসিভ ট্রেনিং দিয়ে তোমার বিহেভিয়ার চেঞ্জ করা হয়েছে। মাথা খারাপ করো না আওরঙ্গজেব। এসো। এখন আমি কফি বানাবো। তার আগে তোমার সাথে কলা খাবো। কলা খাওয়ার একটা কম্পিটিশন হয়ে যাক। কী বলো? তুমি কলাগুলো নিয়ে এসো এখানে।
    বানরটা নিরাসক্ত ভাব দেখিয়ে চলে গেলো ভেতর। একটু পর দুই হালি কলা নিয়ে ফিরে এলো। কলাগুলো রেখে দিলো টেবিলে। ওর ফের বেশ লোভ লাগছে কলাগুলো দেখে। অপেক্ষায় আছে প্রফেসরের শুরু বলার।
    প্রফেসর মাসুদ কলাগুলো একবার দেখে মনে মনে বললেন: বেশ বড় বড় কলা! কটা খেতে পারবো আমি। প্রকাশ্যে বললেন, তো আওরঙ্গজেব, শুরু করা যাক। কী বলো?
    আওরঙ্গজেব বললো, জ্বী প্রফেসর।
    আমি এক দুই করে পাঁচ বলার সাথে সাথে খাওয়া শুরু করবো। এক দুই তিন চার পাঁচ!
    পাঁচ বলা শেষ হবার আগেই বানর থাবা বসালো কলায়। প্রফেসর মাসুদের এক কলার সাথে আওরঙ্গজেবের এক হালি খাওয়া শেষ! প্রফেসর আরেকটি কলা তুলে নিলেন কাদি থেকে।প্রফেসরের অর্ধেক কলা শেষ হবার আগেই বানরের ছয় কলা খাওয়া শেষ।
    প্রফেসর আধখাওয়া কলাটা বানরের দিকে বাড়িয়ে ধরে বললেন, এটাও তুমি খেয়ে ফেলো!
    বানর থাবা দিয়ে প্রফেসর মাসুদের হাত থেকে কলাটুক নিয়ে খেয়ে ফেললো।
    প্রফেসর মাসুদ বললেন, আমার দেড় কলার সাথে তুমি ছয়টি কলা খেয়ে ফেলেছো! সাব্বাস! এবার চলো বাহির থেকে ঘুরে আসি। মন কি তোমার এখনো খারাপ আওরঙ্গজেব?
    আওরঙ্গজেব বললো, চলো প্রফেসর।
    হুইলচেয়ার অটো হলেও চলছে আস্তে আস্তে। পাশে হাটছে বানর। মানুষ উৎসুক। নিজ কাজ ফেলে অনেকেই পিছু নিচ্ছে ওদের।
    মধ্যবয়স্ক এক ভদ্রলোক ওদের পাশে গিয়ে বললেন, কেমন আছেন প্রফেসর? বহুদিন পর আপনাক বের হতে দেখলাম।
    প্রফেসর মাসুদ ভদ্রলোককে চিনতে না পারলেও বললেন, অসুস্থ থাকায় বের হই নি।
    জন্তু-জানোয়ার না পুষে একজন মানুষ রাখলেই তো পারেন প্রফেসর?
    প্রফেসর মাসুদ হাসিমুখে বললনে, মানুষের চেয়ে জন্তু-জানোয়ার বিশ্বস্থ বেশি। এরা চুরিচামারি করে না।
    এটা ঠিক বলেছেন প্রফেসর। ভালো থাকবেন। চলি, কেমন?
    ভদ্রলোক পিছিয়ে চলে যেতে থাকলেন নিজ গন্তব্যের দিকে। ওরা ঢুকলো পাশের ওয়াকিং স্পেসে। মধ্যবয়স্ক হতে বুড়োরা হাটছে ওয়াকিং ওয়ে ধরে। হকাররা মাঠে হাটছে আর নিজ পণ্যের নাম ধরে হাকছে।
    প্রফেসর মাসুদ বানরকে জিজ্ঞেস করলেন,বাদাম চিবুবে আওরঙ্গজেব?
    আওরঙ্গজেব ঠোঁট উল্টে বললো, বাদাম খাওয়া ঝামেলা! চোচা ফেলতে হয়। আমি চোচা ফেলতে পারি না!
    তাহলে আইসক্রিম খেতে পারো। চোচা ফেলার ঝামেলা নাই!
    ঠিক আছে। একটা আইসক্রিম খাই।
    আইসক্রিমওয়ালা দেখলে ডাকো।
    কোনো আইসক্রিমওয়ালা ভেতরে না থাকায় আওরঙ্গজেব বললো, ভেতরে কোনো আইসক্রিমওয়ালা নেই। আমি বাহির থেকে আইসক্রিম আনতে যাচ্ছি।
    টাকা আছে তোমার কাছে আওরঙ্গজেব?
    হাঁ প্রফেসর।
    আওরঙ্গজেব চলে গেলো বাইরে। এক ভ্যান আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো ভেতরে। সাথে সাথে ছেলেমেয়েরা ওকে ঘিরে ধরে আইসক্রিম চাইতে থাকলো। হতভম্ব আওরঙ্গজেব ইতস্তত করলেও শেষে দিতে থাকলো আইসক্রিম শিশুদের হাতে।
    ওর জন্য থাকলো না একটিও। প্রফেসর মাসুদ ওর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন মাত্র।

    পরদিন প্রফেসর মাসুদ একটি বিজ্ঞপ্তি স্থানীয় পত্রিকায় পাঠাতে বাধ্য হলো। বিজ্ঞপ্তির বিষয়বস্তু এরকম: একটি বানরকে বানরের আচার-আচরণ শিখাবার জন্য প্রশিক্ষক প্রয়োজন। দৈনিক আধুনিক জমিনের সম্পাদক ভ্রু কুচকে ভাবলেন: নিশ্চয়ই এটা বুড়ো প্রফেসরের ভুল; মানুষ বানরের আচার-আচরণ শেখাবে কিভাবে? প্রশিক্ষক শব্দের আগে বানর শব্দটি লাগিয়ে ছাপিয়ে দিলেন পত্রিকায়। প্রশিক্ষক হিসেবে কোনো মানুষ না আসায় বা যোগাযোগ না করায় প্রফেসর মাসুদের সাথে আওরঙ্গজেবও হতাশ হলো খুব।
    দুই দিন পর সকাল দশটায় সাইরেনের শব্দে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে হয়ে গেলেন হতভম্ব। শতেক বানর রাস্তা বন্ধ করে বসে আছে। সবার হাতে একটা প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা: বানরের আচার-আচরণ শেখানোর অভিজ্ঞ প্রশিক্ষক।

    6
    4 Comments
Skip to toolbar